বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীব (ইংরেজি: Genetically modified organism) বলতে এমন সব জীবকে বোঝায়, যাদের বংশগতীয় উপাদান তথা বংশাণুসমগ্রকে (জিনোম) পরীক্ষাগারে বংশাণু প্রকৌশলের মাধ্যমে পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে, যাতে জীবটি কোনও পছন্দনীয় শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে বা যাতে পছন্দনীয় কোনও জৈব পণ্য উৎপাদন করা যায়। "বংশাণুগত পরিবর্তন" এবং "বংশাণু প্রকৌশল" বলতে সঠিক করে কী বোঝায়, সে ব্যাপারে মতভেদ আছে। তবে সাধারণভাবে কোনও জীবের যদি "স্বাভাবিক প্রজনন কিংবা স্বাভাবিক পুনর্যোজনের মাধ্যমে জন্ম না হয়", তাহলে তাকে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীব বলা হয়।[১][২][৩] এ পর্যন্ত বহু বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীবের বংশাণুগত পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। একই প্রজাতির জীবদের মধ্যে (Cisgenesis), এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে (আন্তঃবংশাণু জীব), এমনকি একটি জীবজগৎ থেকে আরেকটি জীবজগতেও বংশাণু স্থানান্তর করা হয়েছে। কোনও বংশাণুসমগ্রে নতুন বংশাণু অনুপ্রবেশ করানো হতে পারে, ইতিমধ্যে বিদ্যমান বংশাণুর উন্নতি বা পরিবর্তন সাধন করা হতে পারে এমনকি কোনও বংশাণু বহিস্কারও করা হতে পারে।

প্রথাগত গবাদি পশু উৎপাদন, কৃষি খামার এমনকি পোষা প্রাণীর প্রজননের ক্ষেত্রেও বহুকাল ধরেই কোনও প্রজাতির বিশেষ কিছু জীবকে নির্বাচন করার চল আছে, যাতে তারা পছন্দনীয় বৈশিষ্ট্য সম্বলিত সন্তানের জন্ম দেয়। তবে বংশাণুগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পুনর্যোজনমূলক বংশাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন সমস্ত জীব উৎপাদন করা সম্ভব, যাদের বংশাণুসমগ্র সুক্ষ্মতার সাথে আণবিক স্তরে পরিবর্তিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সাধারণত অন্য কোনও সম্পর্কহীন প্রজাতির জীব থেকে বংশাণু অনুপ্রবিষ্ট করানো হয়, যেগুল পছন্দনীয় বৈশিষ্ট্যগুলির সঙ্কেত বহন করে। এই ব্যাপারটি প্রথাগত নৈর্বাচনিক সুপ্রজনন পদ্ধতির দ্বারা সহজে লাভ করা সম্ভব নয়।  

বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীবগুলিকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেমন পুনর্যোজনকারী ডিএনএ প্রযুক্তি ও প্রজননীয় অবিকল প্রতিরূপ বা ক্লোন সৃষ্টিকরণ ব্যবহার করা হয়। প্রজননীয় অবিকল প্রতিরূপ জীব উৎপাদন পদ্ধতিতে উৎস বা দাতা জীবের একটি কোষ থেকে এর কোষকেন্দ্র বা নিউক্লিয়াসটিকে বের করে নেওয়া হয় এবং সেটিকে কোনও কোষকেন্দ্রহৃত পোষক ডিম্বাণুকোষের কোষপঙ্কে (সাইটোপ্লাজম) প্রবেশ করানো হয়। এই প্রক্রিয়ার ফলে এমন একটি অপত্য জীবের সৃষ্টি হয়, যেটি দাতা জীবটির সাথে বংশাণুগতভাবে অবিকল সমপ্রকৃতির। এই অবিকল প্রতিরূপায়ন কৌশলের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রথম প্রাণীটি ছিল ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ডলি নামের একটি ভেড়া। এরপর আরও বেশ কিছু প্রাণী যেমন শূকর, ঘোড়া ও কুকুর প্রজননীয় অবিকল প্রতিরূপায়ন প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়েছে।

অন্যদিকে পুনর্যোজনকারী ডিএনএ প্রযুক্তি নামক কৌশলে কোনও উৎস প্রজাতির একটি জীব থেকে এক বা একাধিক স্বতন্ত্র বংশাণুকে ভিন্ন একটি প্রজাতির ডিএনএ-তে প্রবেশ করানো হয়।  

সম্পূর্ণ বংশাণুসমগ্র প্রতিস্থাপন, যাতে একটি ব্যাকটেরিয়ার বংশাণুসমগ্রকে অন্য একটি অণুজীবের কোষপঙ্কে বা কোষদেহে প্রতিস্থাপন করা হয়, সম্পাদিত হয়েছে বলে প্রকাশ পেয়েছে। তবে এই প্রযুক্তিটি বর্তমানে প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 

বংশাণু প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীবগুলি বর্তমানে দৈনন্দিন জীবনের অংশে পরিণত হয়েছে। কৃষি, চিকিৎসা, গবেষণা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলির মাধ্যমে সমাজে এগুলির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এগুলি মানবসমাজকে বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করলেও এগুলির কিছু নেতিবাচক দিকও বিদ্যমান। এই কারণে বিশ্বের বহু দেশে ও অঞ্চলে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীবদের উৎপাদন এখনও অত্যন্ত বিতর্কিত একটি বিষয়।

একটি বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীব সৃষ্টি করা একটি একাধিক ধাপবিশিষ্ট প্রক্রিয়া। বংশাণু প্রকৌশলীরা যে বংশাণুটিকে পোষক জীবদেহে অনুপ্রবিষ্ট করতে চান, সেই বংশাণুটিকে পৃথক করতে হয়। এরপর সেই পৃথকীকৃত বংশাণুটিকে অন্যান্য বংশগতীয় উপাদানের সাথে সংযোজন করতে হয়, যাদের মধ্যে একটি পৃষ্ঠপোষক অঞ্চল (Promoter) ও একটি সমাপ্তিসূচক অঞ্চল (Terminator) এবং প্রায়ই একটি নির্বাচনীয় নির্দেশক (selective marker) থাকে। বংশাণু যোগান অর্থাৎ পৃথকীকৃত বংশাণুটিকে পোষক বংশাণুসমগ্রে অনুপ্রবিষ্ট করানোর অনেকগুলি কৌশল আছে। বংশাণুসমগ্র সম্পাদনার ব্যবহারে সাম্প্রতিক উন্নতির সুবাদে, বিশেষ করে ক্রিস্পার প্রযুক্তির মাধ্যমে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীব উৎপাদন অনেক সহজতর হয়ে গেছে। 

মার্কিন বিজ্ঞানীযুগল হার্বার্ট বয়ারস্ট্যানলি কোয়েন ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীব সৃষ্টি করেন, যা ছিল ব্যাকটেরিয়া-নিরোধক ঔষধ ক্যানামাইসন সহ্যকারী একটি ব্যাকটেরিয়া। ১৯৭৪ সালে রুডল্ফ ইয়েনিশ সর্বপ্রথম একটি বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণী সৃষ্টি করেন, যা ছিল একটি ইঁদুর। ১৯৮৩ সালে প্রথম বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত উদ্ভিদ সৃষ্টি করা হয়। ১৯৯৪ সালে উৎপাদিত ফ্লেভার সেভার টমেটো ছিল সর্বপ্রথম বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্য। ২০০৩ সালে গ্লোফিশ ছিল প্রথম বাজারজাতকৃত বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণী। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো একটি বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়; এটি ছিল আকুঅ্যাডভান্টেজ স্যামন নামক মাছ। 

ব্যাকটেরিয়াদেরকে সবচেয়ে সহজে বংশাণু প্রকৌশলের মাধ্যমে পরিবর্তিত করা যায়। এগুলিকে গবেষণা, খাদ্য উৎপাদন, শিল্পক্ষেত্রে প্রোটিন বিশোধন, কৃষি এমনকি শিল্পকলাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশগত উদ্দেশ্য বা ঔষধ হিসেবে এগুলি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। ছত্রাক জাতীয় জীবের উপরেও একইভাবে বংশাণু প্রকৌশল খাটানো হয়েছে। অন্য জীবদেহে বংশগতীয় তথ্য অনুপ্রবেশের জন্য বাহক জীব হিসেবে ভাইরাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বংশাণু চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ভূমিকাটি খুবই তাৎপর্যবহ। কেউ কেউ ভাইরাস থেকে রোগসৃষ্টিকারী ও সংক্রমণকারী বংশাণুগুলিকে অপসারণ করে টিকা সৃষ্টি করার প্রস্তাব দিয়েছেন। উদ্ভিদের উপরে বংশাণু প্রকৌশল প্রয়োগ করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নতুন রঙের উদ্ভিদ, টিকা সরবরাহ ও উন্নততর ফসল ফলানোর কাজগুলি সম্পাদন করা হয়েছে। বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত শস্যগুলি জনচেতনায় সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত কিছু বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীব।  সোনালী চাল ধানের একটি জাত যাতে তিনটি বংশাণু প্রকৌশলজাত করে এর পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত শস্যগুলিকে জৈব-বিক্রিয়ক হিসেবে ব্যবহার করে জৈব ঔষধ নির্মাণ, জৈব জ্বালানি ও অন্যান্য ঔষধ তৈরি করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

প্রাণীদের বংশাণুগত পরিবর্তন সাধন অপেক্ষাকৃত বেশি কঠিন। এ সংক্রান্ত বেশিরভাগ প্রচেষ্টাই গবেষণা পর্যায়ে আছে। স্তন্যপায়ী প্রাণীরা এক্ষেত্রে  প্রতিমাবাচক জীব হতে পারে। এই ধরনের প্রাণীগুলিকে বংশাণু প্রকৌশলের মাধ্যমে পরিবর্তিত করে মানবদেহের গুরুতর রোগগুলির অনুরূপ রোগ তাদের দেহে অধ্যয়ন করে বিভিন্ন নতুন চিকিৎসা আবিষ্কার ও বিদ্যমান চিকিৎসার উন্নতিসাধন করা যেতে পারে। স্তন্যপায়ী প্রাণীতে যেসব মানব প্রোটিন অভিব্যক্ত হয়, সেগুলির প্রাণীদের স্বাভাবিক প্রোটিনের সদৃশ হবার সম্ভাবনা বেশি, উদ্ভিদ বা অণুজীবে অভিব্যক্ত প্রোটিনের তুলনায়। গবাদিপশুদেরকে অর্থনৈতিকভাবে গুরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যাবলি যেমন বৃদ্ধির হার, মাংসের মান, দুধের উপাদান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও বহুদিন বেঁচে থাকার ক্ষমতা, ইত্যাদি উদ্দেশ্যে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত করা হয়। বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত মাছ বৈজ্ঞানিক গবেষণার পাশাপাশি পোষা প্রাণী হিসেবে এবং খাদ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মানুষের বেশ কিছু ঘাতক ব্যাধির বাহক প্রাণী মশাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বংশাণু প্রকৌশল ব্যবহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মানব বংশাণু চিকিৎসা যদিও এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তা সত্ত্বেও এটিকে গুরুতর সংযুক্ত অনাক্রম্যতার অভাব এবং লেবারের জন্মগত ক্ষণান্ধত্ব (Leber's congenital amaurosis) নামক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়েছে।

বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত জীবসমূহের উদ্ভাবন, বিশেষ করে এগুলির বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে অনেক যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে। বেশিরভাগ বিরুদ্ধ যুক্তিই বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত শস্য সম্পর্কে। বিশেষ করে এগুলি ভক্ষণ স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ কি না এবং এগুলির ফলন পরিবেশের উপরে বিরূপ ফল সৃষ্টি করবে কি না, সে ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এছাড়া অন্যান্য উদ্বেগের কারণগুলির মধ্যে আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহের নৈর্ব্যক্তিকতা ও নিয়মনিষ্ঠা, বংশাণুগতভাবে অপরিবর্তিত খাদ্যে দূষণ, খাদ্য যোগান নিয়ন্ত্রণ, জীবনের কৃতিস্বত্বমেধা সম্পদের অধিকারের ব্যবহার। বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য এই যে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত ফসল থেকে প্রাপ্ত খাদ্য প্রথাগত পদ্ধতিতে উৎপন্ন খাদ্যের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তা সত্ত্বেও সমালোচকের কাছে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্যের নিরাপত্তা একটি বড় প্রশ্ন। বংশাণু প্রবাহ তথা অনুদ্দিষ্ট জীবসমূহের উপরে প্রভাব ও পলায়ন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত উদ্বেগজনক বিষয়।

অনেক দেশ এইসমস্ত উদ্বেগজনক প্রশ্নের উত্তরে নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধভিত্তিক সমাধান হাতে নিয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণকারী বিধিনিষেধগুলি দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের মধ্যে এই পার্থক্য প্রকট৷ নিয়ন্ত্রকদের আলোচনাধীন প্রধান প্রধান বিষয়গুলির মধ্যে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্যগুলিতে তকমা বা লেবেল লাগানো হবে কি না এবং বংশাণু-সম্পাদিত জীবসমূহের মর্যাদা কী হবে, ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Section 2: DESCRIPTION AND DEFINITIONS"www.fao.org। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০১-০৩ 
  2. "Frequently asked questions on genetically modified foods"WHO। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০১-০৩ 
  3. "The EU Legislation on GMOs - An Overview"EU Science Hub - European Commission। ২০১০-০৬-২৯। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০১-০৩