বিষয়বস্তুতে চলুন

ফাদালা ইবনে উবাইদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

ফাদালা ইবনে উবায়দ আল-আনসারি (আরবি: فَضَالَةَ بْنِ عُبَيْدٍ الأَنْصَارِيِّ ; মৃ. ৬৭৩ বা ৬৭৮/৭৯ খ্রি.) ছিলেন একজন সাহাবি। তিনি দামেস্কের কাজীউমাইয়া খলিফা প্রথম মুয়াবিয়ার ( শা. ৬৬১–৬৮০) অধীনে একজন সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামি ও বাইজেন্টাইন সূত্রগুলিতে বিভিন্নভাবে ৬৬৭/৬৮ থেকে ৬৭২ সালের মধ্যে ফাদালার নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি নৌ অভিযানসহ একাধিক সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে আবরদের প্রথম কনস্টান্টিনোপল অবরোধের সময় তিনি সাইজিকাসে অবস্থান করেন। মুসলিম সূত্র অনুসারে, তিনি সাধারণত ৬৭৩ সালে দামেস্কে কাজি থাকা অবস্থায় মারা যান; যদিও খলিফা ইবনে খায়্যাত তাঁর মৃত্যু ৬৭৮/৭৯ সালে উল্লেখ করেছেন।

প্রাথমিক জীবন ও কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

ফাদালা ইবনে উবায়দ ছিলেন মহানবি মুহাম্মদের একজন সাহাবি। তিনি মদিনার আনসারদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ইসলামের স্বর্ণযুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন হিসেবে পরিচিত।[][] ৬৪০-এর দশকের শুরুতে মুসলিমরা যখন মিশর বিজয়ের অভিযান পরিচালনা করে, তখন ফাদালাও সেই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানের মাধ্যমে মুসলিম বাহিনী মিশরীয় অঞ্চলকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে দখল করে ইসলামি শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে। এই সামরিক অভিযানের পর ফাদালা সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নগরী দামেস্ক গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সে সময় দামেস্ক ইসলামি প্রশাসন ও জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। দামেস্কে অবস্থানকালে তিনি বিখ্যাত সাহাবি ও আলেম আবু দারদার শিষ্য হন। আবু দারদা তখন শহরের কাজি (প্রধান বিচারক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি কুরআন, ফিকহ ও হাদিস শিক্ষার জন্য পরিচিত ছিলেন। ফাদালা তাঁর কাছ থেকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেন এবং ধীরে ধীরে একজন সম্মানিত আলেম ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আবু দারদা মৃত্যুর আগে নিজেই ফাদালাকে।তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করেন। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর ফাদালা দামেস্কের কাজির পদে অধিষ্ঠিত হন।[][]

৬৫৬ সালে তৃতীয় খলিফা উসমান ইবন আফফান নিহত হওয়ার পর মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয় এবং পরে আলি খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তখন আনসারদের একটি ক্ষুদ্র অংশ আলির প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেনি। ফাদালা সেই সংখ্যালঘু আনসারদের মধ্যে ছিলেন। এই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে আরো কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবি ছিলেন; যেমন জায়েদ ইবনে সাবিত, মাসলামা ইবনে মুখাল্লাদ ও নুমান ইবনে বশির। এদের পরবর্তীতে সাধারণত “উসমানিয়া" নামে সম্বোধন করা হতো, যার অর্থ হলো খলিফা উসমানের সমর্থক।[]

আরব–বাইজেন্টাইন যুদ্ধে সেনাপতি

[সম্পাদনা]

খলিফা প্রথম মুয়াবিয়ার (৬৬১–৬৮০) সময় তিনি আরব–বাইজান্টাইন যুদ্ধে একজন গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি হিসেবে কাজ করেন। সমসাময়িক ও পরবর্তী অনেক ইতিহাসবিদ তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত একাধিক শীতকালীন সামরিক অভিযানের কথা উল্লেখ করেছেন।[]

সিরীয় খ্রিস্টান ইতিহাসবিদ থিওফিলাস (মৃত্যু ৭৮৫) তাঁর বর্ণনায় বলেন যে, ৬৬৭/৬৬৮ সালে হেক্সাপোলিস অঞ্চলের বিরুদ্ধে পরিচালিত শীতকালীন অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ফাদালা। গ্রিক উৎসগুলোতে তাঁর নাম “ফাদালাস” রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, পরবর্তী বছরে এই অভিযানে ফাদালাকে শক্তিশালী করতে খলিফা মুয়াবিয়ার পুত্র প্রথম ইয়াজিদ অতিরিক্ত সৈন্য নিয়ে যোগ দেন।[]

অন্যদিকে মুসলিম ইতিহাসবিদদের বর্ণনাতেও ফাদালার সামরিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন তাবারি (মৃত্যু ৯২৩) ও আল-খাওয়ারিজিমি উল্লেখ করেন যে, তিনি ৬৬৯/৬৭০ সালে বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে পরিচালিত শীতকালীন অভিযানের নেতৃত্ব দেন। আল-ইয়াকুবি বর্ণনা করেন যে, ঐ অভিযানের সময় তিনি অনেক বন্দীও সংগ্রহ করেন।[]

আরেকজন ঐতিহাসিক ইবনে আবদুল হাকিম (মৃত্যু ৮৭১) বলেন, এই সামরিক অভিযানে তিনি সিরিয়ার নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। তখন মিশরের প্রাদেশিক নৌবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সাহাবি উকবা ইবনে আমির। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, আরব বাহিনী স্থল ও নৌ উভয় দিক থেকেই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করে।[]

ইবন আবদুল হাকামের বর্ণনায় আরও বলা হয়, ৬৭১/৬৭২ সালের শীতকালে ফাদালা তাঁর বাহিনী নিয়ে সাইজিকাস শহরে অবস্থান করেন। এই শহরটি মার্মারা সাগরের অপর পারে অবস্থিত ছিল, যা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের খুব কাছাকাছি হওয়ায় সামরিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।[]

ইতিহাসবিদ আল-ইয়াকুবি ও তাবারি আরো উল্লেখ করেন যে, ৬৭১/৬৭২ সালের শীতকালীন বাইজান্টাইনবিরোধী অভিযানের ফাদালা নেতৃত্ব দেন। অন্যদিকে খলিফা ইবনে খাইয়াত (মৃত্যু ৮৫৪) লেখেন যে, ওই অভিযানের সময় তিনি আরব নৌবাহিনীর সর্বাধিনায়কও ছিলেন।[]

এই অভিযানের লক্ষ্য কী ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। তবে ধারণা করা হয় যে, এই অভিযানটি একটি আকস্মিক হামলা ছিল, যার লক্ষ্য ছিল তিউনিসিয়ার দ্বীপ জিজেবরা দখল করা। তবে আধুনিক ইতিহাসবিদ মারেক ইয়ানকোভিয়াক মনে করেন যে, এই দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, ফলে বিষয়টি এখনো গবেষণাধীন রয়েছে।[]

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

তিনি ৬৭৩ সালে দামেস্কে কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন বলে অধিকাংশ ইসলামি সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তবে থিওফানিস (মৃত্যু ৮১৮) উল্লেখ করেন যে, ৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে ফাদালা ও আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস ক্রীট দ্বীপে একটি অভিযান পরিচালনা করেন। অন্যদিকে খলিফা ফাদালার মৃত্যুর সাল ৬৭৮/৬৭৯ সাল বলে উল্লেখ করেন। [১০]

তাকে দামেস্কের বাবে সাগির কবরস্থানে সমাহিত করা হয়, যেখানে তার কবর আবু দারদা এবং তার স্ত্রী উম্মে দারদার কবরের নিকটে অবস্থিত ছিল। অন্তত ১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত তার কবরটি জিয়ারতের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল।[১১]

ফাদালার পর দামেস্কের কাজি হিসেবে আবু দারদার পুত্র বিলাল বা নুয়াইম ইবনে বশির নিযুক্ত হন। ফাদালার ছাত্র আবদুর রহমান ইবনুল হাসহাস খলিফা দ্বিতীয় উমরের (শা. ৭১৭–৭২০) আমলে দামেস্কের কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[১২]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Judd 2014, পৃ. 106।
  2. Tsigonaki 2019, পৃ. 164।
  3. 1 2 Brockett 1997, পৃ. 6।
  4. 1 2 Caskel 1966, পৃ. 243।
  5. 1 2 Jankowiak 2013, পৃ. 264।
  6. Jankowiak 2013, পৃ. 266–267।
  7. Jankowiak 2013, পৃ. 290, note 236।
  8. Jankowiak 2013, পৃ. 267।
  9. Jankowiak 2013, পৃ. 274, note 149।
  10. Tsigonaki 2019, পৃ. 163–164।
  11. Meri 2001, পৃ. 36।
  12. Judd 2014, পৃ. 148।

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • Brockett, Adrian, সম্পাদক (১৯৯৭)। The History of al-Ṭabarī, Volume XVI: The Community Divided: The Caliphate of ʿAlī I, A.D. 656–657/A.H. 35–36। SUNY Series in Near Eastern Studies.। Albany, New York: State University of New York Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৯১৪-২৩৯১-২
  • Caskel, Werner (১৯৬৬)। Ğamharat an-nasab: Das genealogische Werk des His̆ām ibn Muḥammad al-Kalbī, Volume II (German ভাষায়)। Leiden: Brill।{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: অচেনা ভাষা (লিঙ্ক)
  • Jankowiak, Marek (২০১৩)। "The First Arab Siege of Constantinople"। Zuckerman, Constantin (সম্পাদক)। Travaux et mémoires, Vol. 17: Constructing the Seventh Century। Paris: Association des Amis du Centre d’Histoire et Civilisation de Byzance। পৃ. ২৩৭–৩২০।
  • Judd, Steven C. (২০১৪)। Religious Scholars and the Umayyads: Piety-Minded Supporters of the Marwanid Caliphate। Abingdon, Oxon: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪১৫-৮৪৪৯৭-০
  • Meri, Josef W. (২০০১)। "Guide to Pilgrimage Places, also known as Syrian Pilgrimage Places"। Medieval Encounters (1): ১৯–৭৮। ডিওআই:10.1163/157006701x00085
  • Tsigonaki, Christina (২০১৯)। "Crete, a Border at the Sea: Defensive Works and Landscape–Mindscape Changes, Seventh–Eighth Centuries A.D."। Ontiveros, Miguel Angel Cau; Florit, Catalina Mas (সম্পাদকগণ)। Change and Resilience: The Occupation of Mediterranean Islands in Late Antiquity। Oxford: Oxbow Books। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৭৮৯২৫-১৮০-৭