ফরাসি বিপ্লবে নারী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ফরাসি বিপ্লবের নেতৃত্বে লেডি লিবার্টি

বিংশ শতকের শেষদিক থেকেই ঐতিহাসিকেরা আলোচনা করে এসেছেন যে, নারীরা কীভাবে ফরাসি বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিল এবং ফরাসি নারীদের ওপর বিপ্লবের কী দীর্ঘকালীন প্রভাব পড়েছিল। বিপ্লব-পূর্ববর্তী ফ্রান্সে নারীদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না, তাদেরকে নিষ্ক্রিয় নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হত এবং তারা নিজেদের ভালো-মন্দ বিচারের জন্য পুরুষদের ওপর নির্ভর হতে বাধ্য ছিল। তবে এইসময় নারীবাদ-এর প্রভূত অগ্রগতি পরিস্থিতিটির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটায়। প্যারিসে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের একটি অঙ্গ হিসেবে নারীবাদের উদ্ভব হয়েছিল। ফরাসি নারীরা প্রথমে পুরুষদের মতো সমান অধিকার এবং পরে পুরুষতন্ত্রের অবসানের জন্য আন্দোলন করে।এই আন্দোলনে তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল নানান ধরনের প্রচারপত্র ও বিভিন্ন নারী সংগঠন, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্ল্যেখযোগ্য ছিল বিপ্লবী প্রজাতান্ত্রিক নারীদের সংঘ (Society of Revolutionary Republican Women)। তবে ১৭৯৩-এর অক্টোবরে শাসকদল জ্যাকোবিন (গোঁড়াপন্থী) সমস্ত ধরনের নারী সংগঠনের অবসান ঘটায় এবং তাদের নেত্রীদেরকে গ্রেপ্তার করে।এরফলে আন্দোলনের গতি রুদ্ধ হয়। ডেভান্স এই সিদ্ধান্তকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যুদ্ধকালে পুরুষতন্ত্রের প্রাধান্য, রাজকার্যে নারীদের হস্তক্ষেপ নিয়ে মারি আঁতোয়ানেতের কুখ্যাতি এবং চিরাচারিত পুরুষ আধিপত্যকে দায়ী করেছেন।[১] এর এক দশক পরে নেপোলিয়নের আইনস্ংহিতা নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা প্রদান করে।[২]

চিরাচরিত ভূমিকা[সম্পাদনা]

বিপ্লব-পূর্ববর্তী ফ্রান্সে নারীদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না, তারা ভোট দিতে পারত না এবং সরকারের কোনো পদে থাকতে পারত না।তাদেরকে 'নিষ্ক্রিয়' নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হত এবং তারা নিজেদের ভালো-মন্দ বিচারের জন্য পুরুষদের ওপর নির্ভর হতে বাধ্য ছিল। আসলে পুরুষেরাই তাদের স্বার্থের জন্য নারীদের ক্ষেত্রে এই অসমতার সৃষ্টি করেছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের প্রাধান্য স্বীকার করতেও বাধ্য ছিল।[৩]

পঠনপাঠনের ক্ষেত্রেও নারীদেরকে একজন ভালো স্ত্রী ও মা হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হত। এর ফলে তারা কখনোই রাজনৈতিক চৌহদ্দির মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনি। তাদের কর্মকাণ্ড শিশুদেরকে ভাবী নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতেই সীমাবদ্ধ ছিল।[৪] প্রাক-বিপ্লব সমাজে নারীদের এই গৌণ ভূমিকাকে উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে ১৭৫০ সালে প্রকাশিত ফ্রেডারিচিইয়ান কোড-এ। নারীদের এই ভূমিকার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন জ্ঞানালোক (Enlightenment) আদর্শে বিশ্বাসী দার্শনিক ও তাদের রচনাসমূহ।[৫]

১৭৫০-এর দশকের অত্যন্ত প্রভাবশালী বিশ্বকোষ জ্ঞানালোক-এর ধারণাকে পেশ করে এবং এর চিন্তাধারাই ফ্রান্সে পরবর্তীকালে বিপ্লবে ইন্ধন জুগিয়েছিল। ফরাসি পণ্ডিত লুই দে জোকুয়ো সমাজে নারীদের অবস্থান নিয়ে নানান প্রবন্ধ লিখে তাদের চিরাচরিত ভূমিকাকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, “একজন স্বামীর আধিপত্য করার ক্ষমতা যে প্রকৃতি-প্রদত্ত, তার প্রমাণ দেওয়া একদিকে যেমন যথেষ্ট কঠিন; ঠিক তেমনই এই ধারণাটি মানব সমতার পরিপন্থী... একজন পুরুষ সর্বদাই একজন নারী অপেক্ষা শারীরিক, মানসিক, বৌদ্ধিক কিংবা আচরণগত দিক থেকে অধিক শক্তিশালী হতে পারে না...ইংল্যান্ড এবং রাশিয়ার ঘটনা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে, নারীরা মধ্যপন্থী এবং স্বৈরাচারী উভয় শাসনতন্ত্রেই সফলতার সাথে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে...।”[৫] নারীর ভূমিকার এই বিপ্লবী ও প্রজাতান্ত্রিক রূপান্তরের পূর্বাভাস পাওয়া যায় জঁ-জাক রুসোর বিখ্যাত শিক্ষামূলক গ্রন্থ এমিলি-তে (১৭৬২)।[৬] এইসময় বহু সংস্কারমুক্ত মানুষ নারীর ভোটাধিকার-সহ তাদের সমানাধিকারকে সমর্থন জানায়। এক্ষেত্রে নিকোলা দ্য কুঁদোরসে তার সমর্থনকার্যের জন্য বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখেন। তিনি নারীদের সমানাধিকারের সমর্থনে Journal de la Société de 1789-এ বহু লেখালেখি করেন এবং ১৭৯০ সালে প্রকাশ করেন De l'admission des femmes au droit de cité ("For the Admission to the Rights of Citizenship For Wom)en[৭][৮]

বিপ্লবী কার্যকলাপ[সম্পাদনা]

বিপ্লবের সূচনাকালে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে বহু নারী তাদের ক্রিয়াশীল ভাবমূর্তিকে জাহির করতে সজোরে প্রত্যাঘাত হানে। বিপ্লবের সময় নারীদেরকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রের বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি।তারা স্বদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়। এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলেন কর্ডে ডার্মন্ট, যিনি জিরন্ডিস্টদের বিপ্লবী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েন এবং জ্যাকোবিন নেতা ম্যারাকে হত্যা করেন। এ ছাড়া বিপ্লবের সময় অন্যান্য নারী যেমন পলিন লিঁয় এবং তার 'বিপ্লবী প্রজাতান্ত্রিক মহিলাদের সংঘ' গোঁড়াপন্থী জ্যাকোবিন দলকে সমর্থন জানায়, জাতীয় সভায় ধর্না প্রদর্শন করে এমনকি সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে দাঙ্গাতেও অংশগ্রহণ করে।[৯]

নারীবাদী আন্দোলন[সম্পাদনা]

ফরাসি বিপ্লবের সময় অহিংস নারীবাদী আন্দোলনের একটি অনন্য উদাহরণ হল ভার্সাই-এ নারীদের মিছিল। 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা'-য় নাগরিকের বর্ধিত অধিকার-সংক্রান্ত প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলেও এইসময় পলিন লিঁয় এবং থেরওয়াইন দ্য মেরিকুয়ো নারীর পূর্ণ নাগরিকত্বের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যান। এতদসত্ত্বেও নারীরা সক্রিয় নাগরিকত্ব (১৭৯১) এবং গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের(১৭৯৩) রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়ে গিয়েছিল।[১০]

১৭৯২ সালের ৬ মার্চ পলিন লিঁয় জাতীয় সভায় ৩১৯ জন নারীর স্বাক্ষর সংবলিত একটি আবেদনপত্র পেশ করেন, যেখানে তিনি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে প্যারিসকে রক্ষা করারা জন্য একটি জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করার অনুমতি চান।[১১] এর পাশাপাশি তিনি নারীদের বর্শা, পিস্তল, তলোয়ার, রাইফেল প্রভৃতি অস্ত্র রাখার এবং ফরাসি রক্ষীবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের অনুমতি চান। তবে তার আবেদন খারিজ করা হয়।[১২] পরে ১৭৯২ সালে থেরওয়াইন দ্য মেরিকুয়ো বিপ্লব রক্ষার স্বার্থে নারী সৈন্যবাহিনী (legions of amazons) গঠন করার আহ্বান জানান। তার এই প্রয়াসের অঙ্গ হিসেবে তিনি দাবি জানান যে, অস্ত্র রাখার অধিকারের ফলে নারীরা রাষ্ট্রের নাগরিকে রুপান্তরিত হবে।[১৩]

জ্যাক লুই ডেভিডের আঁকা ম্যারার মৃত্যু (১৭৯৩)

১৭৯২ সালের ২০ জুন সশস্ত্র মহিলার একদল একটি মিছিলে অংশগ্রহণ করে আইনসভার কক্ষগুলির মধ্য দিয়ে প্রথমে টুইলারিজ বাগান এবং পরে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে।[১৪] জঙ্গি নারীরা ১৭৯৩ সালের ১৩ জুলাই ম্যারার হত্যার পর তার অন্ত্যেষ্টি কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ম্যারার শবযাত্রার অংশ হিসেবে তারা ম্যারার বাথটব, যেখানে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার রক্তে রাঙা জামাকেও সঙ্গে নিয়ে চলে।[১৫]

সর্বাপেক্ষা উগ্র নারীবাদী কার্যকলাপে যুক্ত ছিল 'বিপ্লবী প্রজাতান্ত্রিক মহিলাদের সংঘ'। এটি প্রতিষ্ঠা করেন লিঁয় এবং তার সহকর্মী ক্লেয়া লাকম্ব ১৭৯৩ সালের ১০ মে।[১৬] এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল প্রজাতন্ত্রের শত্রুদের বিভিন্ন কাজকর্মকে জনসাধারণের হতাশার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা।এই সংঘের সমাবেশে সর্বোচ্চ ১৮০জন নারী যোগ দিয়েছিলেন। সংগঠনটি খাদ্যশস্যের অবৈধ মজুত ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধেও কাজ করে।[১৭] ১৭৯৩ সালের ২০ মে একটি গণসমাবেশের সম্মুখে দাঁড়িয়ে এই নারীরা ‘রুটি এবং ১৭৯৩-এর সংবিধানের’ দাবি জানায়। তাদের প্রচেষ্টার কোনো সুফল না পাওয়ায় অবশেষে তারা হিংসার পথ অনুসরণ করে ক্রমে দোকানপাট লুঠ এবং সরকারি কর্মচারীদের অপহরণ করতে শুরু করে।[১৮]

১৭৯৩ নাগাদ 'বিপ্লবী প্রজাতান্ত্রিক মহিলাদের সংঘ'-টি একটি নতুন আইনের দাবি জানায়, যার মাধ্যমে প্রত্যেক মহিলা প্রজাতন্ত্রের প্রতি তাদের আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ তেরঙা ককেড (tricolore cockade) পরতে বাধ্য হবে। এ ছাড়াও তারা গরিবদের দৈনন্দিন খাবার রুটিকেও মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে বাঁচানোর স্বার্থে এর মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বারংবার সরব হয়। অবশেষে ১৭৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সভা ককেড আইন পাস করলে বিপ্লবী সংগঠনটি মহিলাদের ওপর এই আইনটি কঠোরভাবে বলবত করার দাবি জানায়। তবে বাজারে কর্মরত মহিলা, প্রাক্তন কর্মচারী, ধার্মিক মহিলারা, যারা মুল্য নিয়ন্ত্রণের বিরোধ করেছিল (কেন-না তাদের কারবারের ক্ষতি হচ্ছিল) তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের বক্তব্য ছিল যে, “কেবল পতিতা এবং মহিলা জ্যাকোবিনরা ককেড পরে।”[১৯] এর ফলে এই দুই বিপরীত ধারায় বিশ্বাসী মহিলাদের মধ্যে বিরোধ বাধে।[২০]

ইতিমধ্যে জ্যাকোবিন দলের মুখ্য নিয়ন্ত্রক পুরুষগোষ্ঠী 'বিপ্লবী প্রজাতান্ত্রিক নারীসমূহ' (Revolutionary Republican Women) দলকে মারাত্মক হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী বলে তাদের বৈধতা খারিজ করে। জ্যাকোবিন এই সময় শাসকদল হওয়ায় তারা সংগঠনটিকে ভেঙে দেয় এবং আইন জারি করে নারীদের সমস্ত ধরনের সংঘ ও সংগঠনকে অবৈধ ঘোষণা করে। এই নারীদেরকে জানানো হয় যে, তারা যেন ঘরে থেকে পরিবারের দেখাশোনা করে এবং সর্বসাধারণের ব্যাপারগুলোকে সমাজের পুরুষদের হাতে ছেঁড়ে দেয়। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ অক্টোবরের পর থেকে ফরাসি বিপ্লবে নারীদের সংগঠন চিরতরে বিলুপ্ত হয়।[২১]

সাংগঠনিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত বহু নারীদেরকে তাদের জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য শাস্তি দেওয়া হয়। শাস্তি হিসেবে তাদের গণ ভর্ৎসনা, গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ড, নির্বাসন প্রভৃতি দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, থেরওয়াইন দ্য মেরিকুয়ো-কে তার বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য গ্রেপ্তার করে, প্রকাশ্যে প্রহার করা হয়। এরপর তিনি যাবজ্জীবন পাগলাগারদে অতিবাহিত করেন। পলিন লিঁয় এবং ক্লেয়া লাকম্ব-কে গ্রেপ্তার করে পরে মুক্তি দিলেও পরবর্তীকালে তাদের বৈপ্লবিক কাজকর্মের জন্য গঞ্জনা শুনতে হয়েছিল। এ ছাড়াও বহু বিপ্লবী নারীকে প্রজাতন্ত্রের অখণ্ডতা ভঙ্গ করার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।[২২]

মহিলা লেখক[সম্পাদনা]

একজন বিপ্লবী
আলম্প দ্য গুজ

একদিকে যখন নারীরা আন্দোলনের জন্য হিংসার পথ বেছে নিয়েছিল, অন্যদিকে তখন কয়েকজন নারী তাদের লেখা ও সভা-সঙ্ঘের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিপ্লবকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিলেন। এরকমই একজন নারী ছিলেন আলম্প দ্য গুজ। তিনি এইসময় বহু নাটক, ছোটোগল্প ও উপন্যাস লেখেন। তিনি তার লেখার মাধ্যমে প্রচার করতেন যে, ‘প্রাকৃতিকভাবে নারী ও পুরুষ দুটি পৃথক সত্তা’–শুধুমাত্র এই কথা মাথায় রেখে তাদেরকে আইনের সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। ‘নারীর অধিকার ঘোষণা’-তেও তিনি নারীর অধিকার বিশেষত বিবাহবিচ্ছেদ ও অবৈধ সন্তানের বৈধতার ক্ষেত্রে জোরালো সওয়াল করেছেন।[২৩]

আলম্প দ্য গুজ লিঙ্গনিরপেক্ষ (non-gender) রাজনৈতিক মতাদর্শ পোষণ করতেন। এমনকি সন্ত্রাসের শাসনের পূর্বে দ্য গুজ রোবসপিয়ারকে ‘পলিম’ বলে ডাকতেন এবং তাকে বিপ্লবের কলঙ্ক ও লজ্জা বলে প্রচার করতেন। বিপ্লব যে চরমপন্থাকে উস্কানি দিচ্ছে সে সম্পর্কে তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেন যে, "নেতারা নতুন শৃঙ্খল তৈরি করছে যদি [ফ্রান্সের জনগণের স্বাধীনতার ভীত] নড়ে।"  তিনি সিন নদীতে ঝাঁপ দেবেন যদি রোবসপিয়ার তার সাথে যোগদান করে--এই কথা প্রচার করে তিনি ফ্রান্সের জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন এবং রোবসপিয়ার দ্বারা সংঘটিত সন্ত্রাসের সম্বন্ধে অবহিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।[২৩] তার সাহসী লেখনীর পাশাপাশি রাজার পক্ষ নেওয়া তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ ছিল। বিপ্লবের গোড়ার দিকে তার পরামর্শের ভিত্তিতে ১৭৮৯ সালে জাতীয় সভায় স্বেচ্ছা, স্বদেশপ্রেমী কর গৃহীত হয়।[২৪]

মাদাম রোঁলা ছিলেন এরকম আর-একজন ব্যক্তিত্ব। তবে তিনি তার দৃষ্টি শুধুমাত্র নারী ও তাদের মুক্তির দিকেই নিবদ্ধ রাখেননি, রাজনীতির অন্যান্য শাখাতেও নিজেকে মনোনিবেশ করেছিলেন। বিপ্লবী নেতাদেরকে পাঠানো তার ব্যক্তিগত চিঠিপত্র তাদের নীতি নির্ধারণকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। এ ছাড়াও ব্রিসোটিনে তিনি রাজনৈতিক সভার আহ্বান করতেন, যাতে কিনা মহিলারাও অংশ নিতে পারত।[২৫]

একজন মহিলা হয়েও মাদাম রোঁলা বিপ্লবী আদর্শ প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি তার রাজনৈতিক সহযোগীদের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সাহায্য করেছেন।তিনি সরাসরি কোনো নীতি নির্ধারণ বা ক্ষমতায় থেকে নীতির বাস্তবায়ন করতে না পারলেও সরকারকে প্রভাবিত করে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করেছেন। মাদাম রোঁলা নারীদের তথাকথিত দুর্বলতা ও রাজনীতির মতো গুরুতর বিষয়ে অংশগ্রহণে অক্ষমতার কারণ হিসেবে অশিক্ষাকেই দায়ী করেছেন। তিনি মনে করতেন যে, নিম্নমানের শিক্ষাই নারীদেরকে এক মূর্খ সামাজিক প্রাণীতে পরিণত করেছে। তবে তিনি এও জানতেন যে, সুযোগ পেলে তারাই আবার গুরুত্বপূর্ণ কর্ম সম্পাদন করতে পারবে।[২৫]

১৭৯৩ সালের ৮ নভেম্বর গিলোটিনে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে তিনি চিৎকার করে বলেন, “হে স্বাধীনতা! তোমার নামে কী অপরাধ করা হয়েছে?” তার জীবন-মরণের সাক্ষীরা এবং বহু সম্পাদক ও পাঠকেরা তার বহু অসমাপ্ত লেখা শেষ করতে ও মৃত্যুর পরে তার লেখার বহু সংস্করণ প্রকাশ করতে সাহায্য করেছিল। যদিও তিনি লিঙ্গ রাজনীতিকে তার লেখার মুখ্য বিষয় করেননি তবুও বিপ্লবের ওই অস্থির সময়ে নারীদের পাশে থেকে এক সক্রিয় ভুমিকা পালন করেছেন এবং প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, নারীরাও রাজনীতির মতো গুরুতর বিষয়ে অংশগ্রহণ করতে পারে।[২৬]

এতসব প্রচেষ্টার পরে বিপ্লবের শেষে নারীরা ভোটাধিকার অর্জন করতে না পারলেও, শাসনক্ষমতায় তাদের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক কার্যকলাপে তাদের ভুমিকাকে বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তারা পরবর্তীকালে নারীবাদী প্রজন্মের জন্য একটি নজির সৃষ্টি করেছিল।

প্রতিবিপ্লবী নারী[সম্পাদনা]

ফরাসি বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অবখ্রিস্টায়ন (Dechristianization) আন্দোলন, যাকে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। এইসময় ফ্রান্সের গ্রাম্য মহিলাদের ক্ষেত্রে ক্যাথোলিক চার্চের অবলোপ মানেই ছিল স্বাভাবিক জনজীবনের সমাপ্তি। উদাহরণস্বরূপ, সারা নগর জুড়ে ধ্বনিত চার্চের ঘণ্টার আওয়াজ জনসাধারণকে তাদের দোষস্বীকারের জন্য আহ্বান জানাত এবং এটি ছিল জনসাধারণের সম্প্রীতির প্রতীক।[২৭] অবখ্রিস্টায়ন অভিযানের সূচনার দিকে রিপাব্লিকরা চার্চের ঘণ্টাকে নীরব করে দেয় এবং পাশাপাশি সংখ্যাগুরু ক্যাথোলিকদের ধার্মিক উদ্দীপনাকেও নিস্তেজ করে দেয়।[২৭]

চার্চের ক্ষেত্রে এই বৈপ্লবাত্বিক পরিবর্তন মহিলাদের মধ্যে বিপ্লবের বিরুদ্ধে বিপ্লব অর্থাৎ প্রতিবিপ্লবের ধারণাকে জন্ম দেয়।এই মহিলারা ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে সংঘটিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনকে মেনে নিলেও ক্যাথোলিক চার্চের ভাঙন এবং বিপ্লবপ্রসূত ধর্মবিশ্বাস যেমন রোবসপিয়ার প্রতিষ্ঠিত সর্বশ্রেষ্ঠ সত্তার ধর্মবিশ্বাস (Cult of Supreme Being)-কে মেনে নিতে পারেনি।[২৮] অলওয়েন হাফটনের মতে, এই মহিলারা নিজেদেরকে ‘ধর্মের রক্ষক’ হিসেবে দেখত।[২৯] তারা বিপ্লবীদের দ্বারা আরোপিত চার্চের বিরুদ্ধে হওয়া এই পরিবর্তনকে ঠেকানোর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়েছিল।

প্রতিবিপ্লবী মহিলারা তাদের জীবনে রাষ্ট্রের এই অনধিকার প্রবেশকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।[৩০] বহু মহিলা কৃষক অ্যাসাইনেট-এর মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রয় করতে রাজি হয়নি কেন-না এই প্রকার মুদ্রা ছিল অস্থিতিশীল এবং চার্চের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে এই মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।[৩১] প্রতিবিপ্লবী মহিলাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় ছিল ১৭৯০-এ সিভিল কন্সটিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি বলবত করা। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মহিলারা শপথবিরোধী প্রচারপত্র বিলি করতে শুরু করে। এ ছাড়া  যেসব পুরোহিত রিপাব্লিক-দের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছিল, তাদের দ্বারা আয়োজিত প্রার্থনা সমাবেশে উপস্থিত হতে তারা অস্বীকার করে। ক্রমে রিপাব্লিক-দের আনুকুল্যে থাকা এই পুরোহিতদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস পায় কেন-না তাদের ধর্মসভায় খুব কমজন-ই  আসত এবং মহিলারা ব্যাপ্টিস্ম এবং বিবাহের মতো গুরুত্বপুর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদেরকে আহ্বান করা বন্ধ করে দেয়। এর পরিবর্তে তারা রিপাব্লিকদের বিরুদ্ধে থাকা পুরোহিতদের সবার অলক্ষে রাখত এবং তাদের দ্বারা গোপনে আয়োজিত প্রথাসম্মত প্রার্থনা সমাবেশে অংশগ্রহণ করত।[৩২] এই মহিলারা তাদের চিরাচরিত খ্রিস্টান প্রথা যেমন-মৃতদেহ সৎকার করা, সন্তদের নামে তাদের সন্তানদের নামকরণ করা ইত্যাদি মেনে চলত।[৩৩]

সিভিল কন্সটিটিউশন অব দ্য ক্লার্জি এবং অবখ্রিস্টায়ন আন্দোলনের বিরুদ্ধে মহিলাদের এই দৃঢ় প্রতিরোধ ক্যাথোলিক চার্চকে একটি গুরুত্বপুর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনরায় তুলে ধরতে সাহায্য করেছিল। বিপুল সংগ্রামের মধ্যেও এই মহিলারা অবশেষে চার্চের ক্ষমতা এবং তার পাশাপাশি চিরাচরিত পারিবারিক জীবন ও সামাজিক স্থিরতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। এই ঘটনার প্রতিফলন সহজেই চোখে পড়ে ১৮০১-এর কোঁকোরদাত-এর সময়, যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাথোলিক চার্চকে ফ্রান্সে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়।[৩৪] অবিখ্রিস্টায়ন বা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ধর্মের বিরুদ্ধে আংশিকভাবে ধর্মপ্রাণ এই প্রতিবিপ্লবী মহিলাদের বহু বছরের প্রচেষ্টার ফল ছিল এই আইনটি।

উৎসসমূহ[সম্পাদনা]

  1. Louis Devance, "Le Féminisme pendant la Révolution Française," Annales Historiques de la Révolution Française (1977) 49#3 pp 341-376
  2. Jane Abray, "Feminism in the French Revolution," American Historical Review (1975) 80#1 pp. 43-62 in JSTOR
  3. Scott "Only Paradoxes to Offer" 34–35
  4. Marquise de Maintenon, "Writings" 321
  5. Susan G. Bell and Karen M. Offen, eds. (1983). Women, the family, and freedom. 1. 1750 - 1880. Stanford U.P. pp. 29–37. ISBN 9780804711715.
  6. Joan Landes, Women and the Public Sphere in the Age of the French Revolution (1988)
  7. David Williams,"Condorcet, Feminism, and the Egalitarian Principle." Studies in Eighteenth-Century Culture 5 (1976): 151+
  8. Barbara Brookes, "The feminism of Condorcet and Sophie de Grouchy." Studies on Voltaire and the Eighteenth Century 189 (1980): 314+
  9. Dalton "Madame Roland" 262
  10. Rebel Daughters: Women and the French Revolution Edited by Sara E Melzer and Leslie W. Rabine pg. 79
  11. Women and the Limits of Citizenship in the French Revolution by Olwen W. Hufton pg. 23–24
  12. Rebel Daughters by Sara E Melzer and Leslie W. Rabine pg. 89
  13. Women and the Limits of Citizenship by Olwen W. Hufton pg. 23–24
  14. Rebel Daughters by Sara E Melzer and Leslie W. Rabine pg. 91
  15. Women and the Limits of Citizenship by Olwen W. Hufton pg. 31
  16. Rebel Daughters by Sara E Melzer and Leslie W. Rabine pg. 92
  17. Women and the Limits of Citizenship by Olwen W. Hufton pg. 25
  18. Gender, Society and Politics: France and Women 1789–1914 by James H. McMillan pg. 24
  19. Dominique Godineau (1998). The Women of Paris and Their French Revolution. University of California Press. pp. 160–61.
  20. Darline Gay Levy, Harriet Branson Applewhite and Mary Durham Johnson, eds. Women in Revolutionary Paris, 1789-1795 (1981) pp 143-49
  21. Levy et al. Women in Revolutionary Paris, 1789-1795 (1981) pp 143-149
  22. Deviant Women by Beckstrand pg. 20
  23. De Gouges "Writings" 564–568
  24. Mousset "Women’s Rights" 49
  25. Dalton "Madame Roland" 262–267
  26. Walker "Virtue" 413–416
  27. Hufton, Olwen. Women and the Limits of Citizenship 1992 pg. 106–107
  28. Desan pg. 452
  29. Hufton, Olwen. "In Search of Counter-Revolutionary Women." 1998 pg. 303
  30. Hufton, Women and the Limits of Citizenship 1992 pg. 104
  31. Hufton, "In Search of Counter-Revolutionary Women." pg. 303"
  32. Hufton, Olwen. Women and the Limits of Citizenship 1992 pg. 104-5
  33. Hufton, "In Search of Counter-Revolutionary Women." 1998 pg. 304, 311
  34. Hufton, "In Search of Counter-Revolutionary Women." 1998 pp. 130, 326