বিষয়বস্তুতে চলুন

প্রাক-কলম্বীয় সংস্কৃতিতে শিশু বলিদান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ত্লাতেলোলকোতে বলি দেওয়া এক আজটেক শিশুর সমাধি।

প্রাক-কলম্বীয় সংস্কৃতিতে—বিশেষ করে মেসোআমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে—মানুষ বলিদানের প্রথা প্রত্নতাত্ত্বিক রেকর্ড এবং লিখিত উৎস উভয় মাধ্যমেই সুপ্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন প্রাক-কলম্বীয় সংস্কৃতিতে শিশু বলিদানের পেছনের সঠিক মতাদর্শ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে প্রায়শই মনে করা হয় যে নির্দিষ্ট দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য এটি করা হতো।

মেসোআমেরিকা

[সম্পাদনা]

ওলমেক সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]
লা ভেন্তা থেকে প্রাপ্ত আলতার ৫ (Altar 5)। কেন্দ্রীয় মূর্তির হাতে থাকা নিশ্চল 'ওয়ার-জাগুয়ার' শিশুটিকে কেউ কেউ শিশু বলিদানের ইঙ্গিত হিসেবে মনে করেন।
বিপরীতভাবে, এর পার্শ্বদেশগুলোতে জীবন্ত ওয়ার-জাগুয়ার শিশু ধরে থাকা মানুষের কারুকার্য দেখা যায়।

যদিও ওলমেক সভ্যতায় শিশু বলিদানের অকাট্য কোনো প্রমাণ নেই, তবুও এল মানাতি বলিদানের জলাভূমিতে নবজাতক বা অনাগত ভ্রূণের পূর্ণ কঙ্কাল, সেইসাথে বিচ্ছিন্ন ঊর্বস্থি (ফিমার) এবং মাথার খুলি পাওয়া গেছে। এই হাড়গুলো বলিদানের উপঢৌকনগুলোর সাথে, বিশেষ করে কাঠের মূর্তির সাথে সম্পর্কিত। নবজাতকগুলো কীভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল তা এখনও জানা যায়নি।[]

কিছু গবেষক ওলমেক ধর্মীয় শিল্পকলায় প্রদর্শিত নিশ্চল "ওয়ার-জাগুয়ার" শিশুদের সাথেও শিশু বলিদানের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো লা ভেন্তার আলতার ৫ (ডানদিকে) অথবা লাস লিমাস মূর্তি। নিশ্চিত উত্তরের জন্য আরও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রয়োজন।

মায়া সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

২০০৫ সালে কোমালকালকো অঞ্চলে মায়া সভ্যতার বলি দেওয়া এক থেকে দুই বছর বয়সী শিশুদের একটি গণকবর পাওয়া যায়। কোমালকালকো অ্যাক্রোপলিসে মন্দির নির্মাণের সময় সম্ভবত পবিত্রকরণের উদ্দেশ্যে এই বলিদানগুলো সম্পন্ন করা হয়েছিল।[]

মায়া যুগের এমন কিছু মাথার খুলিও পাওয়া গেছে যা শিশু বলিদানের ইঙ্গিত দেয়। মায়া বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, আজটেকদের মতো মায়ারাও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শিশু বলি দিত। উদাহরণস্বরূপ, আরও শক্তিশালী ব্যক্তিদের আত্মা ভক্ষণ করতে পারে এমন অতিপ্রাকৃত সত্তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য শিশু বলি দেওয়া হতো।[] ধ্রুপদী যুগে (Classic period) মায়া শিল্পের কিছু নিদর্শনে নতুন রাজাদের সিংহাসনে আরোহণ বা মায়া বর্ষপঞ্জির শুরুতে শিশুদের হৃৎপিণ্ড বের করে নেওয়ার চিত্র অধ্যয়ন করা হয়েছে।[] এই ধরনের একটি ক্ষেত্রে, গুয়াতেমালার পিয়েদ্রাস নেগ্রাসে অবস্থিত ১১ নম্বর স্তম্ভে (Stela 11) একটি বলি দেওয়া ছেলেকে দেখা যায়। চিত্রিত জারেও বলি দেওয়া বালকদের দৃশ্য দৃশ্যমান।

তিওতিউয়াকান সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

তিওতিউয়াকান সংস্কৃতিতেও শিশু বলিদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯০৬ সালের দিকে লিওপোল্ডো বাট্রেস 'পিরামিড অব দ্য সান'-এর চার কোণে শিশুদের সমাধি উন্মোচন করেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বেদীর সাথে সম্পর্কিত নবজাতকের কঙ্কাল খুঁজে পেয়েছেন, যা থেকে কেউ কেউ "পরিকল্পিত শিশু বলিদানের মাধ্যমে মৃত্যু" হওয়ার সন্দেহ পোষণ করেন।[]

তোলতেক সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

২০০৭ সালে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ঘোষণা করেন যে, তারা ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী ২৪টি শিশুর দেহাবশেষ বিশ্লেষণ করেছেন যা ত্লালোকের একটি মূর্তির সাথে সমাহিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তোলতেক রাজধানী তুলার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের কাছে পাওয়া এই শিশুদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। দেহাবশেষগুলোর সময়কাল ৯৫০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক লুইস গাম্বোয়া বলেছেন, "একই স্থানে ২৪টি মৃতদেহ কেন দলবদ্ধভাবে ছিল তার কারণ ব্যাখ্যা করার একমাত্র পথ হলো এখানে নরবলি দেওয়া হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া।"[]

আজটেক সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]
১৬শ শতাব্দীর শেষের দিকের কোডেক্স রিওসে প্রদর্শিত ত্লালোক (Tláloc)।

আজটেক ধর্ম অন্যতম বহুলভাবে নথিভুক্ত প্রাক-হিস্পানিক সংস্কৃতি। দিয়েগো দুরান তার 'বুক অব দ্য গডস অ্যান্ড রাইটস'-এ জলের দেবতা ত্লালোক এবং চালচিউতলিকুয়ে-র প্রতি নিবেদিত ধর্মীয় আচার সম্পর্কে লিখেছেন। তাদের বার্ষিক আচারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নবজাতক এবং ছোট শিশুদের বলিদান।

বের্নারদিনো দে সাহাগুনের মতে, আজটেকরা বিশ্বাস করত যে, ত্লালোককে বলি না দিলে বৃষ্টি হবে না এবং তাদের ফসল ফলবে না। প্রত্নতাত্ত্বিকরা তেনোচতিতলানের মহান পিরামিডের উপঢৌকনগুলোর মধ্যে ত্লালোকের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া ৪২টি শিশুর (এবং কয়েকজন এহেকাতল কুয়েতজালকোয়াতল-এর উদ্দেশ্যে) দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রায় ছয় বছর বয়সী এই ৪২টি শিশু (যাদের অধিকাংশই পুরুষ) গুরুতর দাঁতের গর্ত, ফোড়া বা হাড়ের সংক্রমণে ভুগছিল, যা তাদের ক্রমাগত কাঁদানোর জন্য যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক ছিল। ত্লালোকের জন্য শিশুদের অশ্রুর প্রয়োজন ছিল যাতে সেই অশ্রু পৃথিবী ভিজিয়ে দেয়।

আজটেক বংশধর এবং কোডেক্স ইক্সত্লিলক্সোচিতলের লেখক ফার্নান্দো দে আলভা কর্তেস ইক্সত্লিলক্সোচিতল দাবি করেছেন যে, মেক্সিকা প্রজাদের প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে একজনকে বার্ষিক হত্যা করা হতো। তবে ঐতিহাসিকরা এই উচ্চ সংখ্যাটি নিশ্চিত করেননি। এর্নান কর্তেস তার 'চিঠিপত্র' ()-এ এই ধরনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:

"এবং তারা তাদের প্রতিমাদের হত্যা ও উৎসর্গ করার জন্য তাদের শিশুদের নিয়ে যেত।"

সোচিমিলকোতে তিন থেকে চার বছর বয়সী এক বালকের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। মাথার খুলিটি ভাঙা ছিল এবং হাড়গুলোতে কমলা/হলুদ রঙের আভা, কাঁচের মতো টেক্সচার এবং ছিদ্রযুক্ত ও সংকুচিত টিস্যু ছিল। আজটেকরা মাংস সরিয়ে মাথার খুলি তজোমপান্তলিতে রাখার জন্য কিছু বলির শিকারের দেহাবশেষ সিদ্ধ করার জন্য পরিচিত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, মাথার খুলিটি সিদ্ধ করা হয়েছিল এবং মগজ ফুটন্ত হওয়ার চাপে এটি ফেটে গিয়েছিল। খুলিটির ছবি বিশেষজ্ঞ জার্নালগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে।[]

হিস্ট্রি অব দ্য থিংস অব নিউ স্পেন গ্রন্থে সাহাগুন স্বীকার করেছেন যে তিনি এই সত্যটি দেখে অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়েছিলেন যে, বছরের প্রথম মাসে শিশু বলিদানগুলো তাদের নিজেদের পিতামাতার মাধ্যমেই অনুমোদিত হতো এবং তারা তাদের সন্তানদের ভক্ষণও করতেন।[]

আজটেক বর্ষপঞ্জির 'আতলাকাকাওয়ালো' (Atlacacauallo) মাসে (২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত), জলদেবতা ত্লালোক, চালচিতলিকুয়ে এবং এহেকাতলের উদ্দেশ্যে শিশু এবং বন্দীদের বলি দেওয়া হতো।

'তোজোজতোনতলি' (Tozoztontli) মাসে (১৪ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত), কোয়াতলিকুয়ে, ত্লালোক, চালচিতলিকুয়ে এবং তোনা-র উদ্দেশ্যে শিশুদের বলি দেওয়া হতো।

'হুয়েইতোজোজতোনতলি' (Hueytozoztli) মাসে (৩ এপ্রিল থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত), সিনতেওতল, চিকোমেকাকোয়াতল, ত্লালোক এবং কুয়েতজালকোয়াতলের উদ্দেশ্যে একজন পরিচারিকা, একজন বালক এবং একজন বালিকাকে বলি দেওয়া হতো।

'তেপেইলহুইতল' (Tepeilhuitl) মাসে (৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত), হৃদপিণ্ড নিষ্কাশন এবং চামড়া ছাড়ানোর মাধ্যমে শিশু এবং দুজন সম্ভ্রান্ত নারীকে বলি দেওয়া হতো; এটি ত্লালোক-নাপাতেকুহলি, মাতলালকুয়েয়ে, সোচিতেকাতল, মায়াহুয়েল, মিলনাহুয়াতল, নাপাতেকুহলি, চিকোমেকোয়াতল এবং সোচিকুয়েতজালের সম্মানে করা একটি আনুষ্ঠানিক মানুষ ভক্ষণ প্রথা ছিল।

'আতেমোজতলি' (Atemoztli) মাসে (২৯ নভেম্বর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত), ত্লালোকাসদের (Tlaloques) সম্মানে শিশু এবং ক্রীতদাসদের শিরশ্ছেদ করে বলি দেওয়া হতো।

দক্ষিণ আমেরিকা

[সম্পাদনা]

প্রত্নতাত্ত্বিকরা দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি প্রাক-কলম্বীয় সংস্কৃতিতে শিশু বলিদানের ভৌত প্রমাণ উন্মোচন করেছেন। একটি প্রাথমিক উদাহরণ হিসেবে, উত্তর পেরুর মোচে জাতি ব্যাপকভাবে কিশোর-কিশোরীদের বলি দিত। প্রত্নতাত্ত্বিক স্টিভ বোরগেট ১৯৯৫ সালে ৪২ জন পুরুষ কিশোরের হাড় খুঁজে পাওয়ার পর এই তথ্যটি নিশ্চিত করেন।[] [১০]

কাপাকোচা (Capa Cocha) আচারের জন্য ব্যবহৃত পুরুষ মূর্তি, ইনকা, ১৪৫০–১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ, সোনা, ডাম্বার্টন ওকস মিউজিয়াম, ওয়াশিংটন, ডি.সি.

চিমু সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

ইনকাদের আগে উত্তর পেরু দখলকারী এবং স্প্যানিশদের আগমনের কয়েক দশক আগে ইনকাদের দ্বারা পরাজিত চিমু (Chimú) জাতি হুয়ানচাকোতে (Huanchaco) সম্ভবত ইতিহাসের বৃহত্তম একক গণ শিশু বলিদানের ঘটনা ঘটিয়েছিল। হুয়ানচাকোতেই তাদের প্রধান শহর চ্যান চ্যান অবস্থিত ছিল। গবেষকরা অন্তত ২২৭ জন ব্যক্তিকে বলির শিকার হিসেবে শনাক্ত করেছেন। বিশ্বাস করা হয় যে, চিমু অঞ্চলে চরম বৃষ্টিপাত সৃষ্টিকারী আবহাওয়ার প্রতিকূলতা থেকে দেবতাদের শান্ত করার জন্য এই গণ বলিদান করা হয়েছিল। [১১]

মোচে সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

মোচে সংস্কৃতিতে নরবলি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জন্য রক্ষী হিসেবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আচার এবং আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে পরাজিত মোচে যোদ্ধাদের রক্তক্ষরণ আচারের মাধ্যমে বলি দেওয়া হতো।[১২]

ইনকা সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]
লা দনসেলা বা কুমারী। সালতা প্রদেশে (আর্জেন্টিনা) প্রাপ্ত য়ুয়াইইয়াকো মমি।

'কাপাক হুচা' ছিল ইনকাদের মানুষ বলিদানের একটি প্রথা, যেখানে প্রধানত শিশুদের ব্যবহার করা হতো। ইনকারা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সময় বা পরে শিশু বলি দিত, যেমন সাপা ইনকা বা সম্রাটের মৃত্যু অথবা দুর্ভিক্ষের সময়। শিশুদের বলির শিকার হিসেবে বেছে নেওয়া হতো কারণ তাদের সবচেয়ে বিশুদ্ধ সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই শিশুরা শারীরিকভাবে নিখুঁত এবং সুস্থ ছিল, কারণ তারা ছিল তাদের দেবতাদের কাছে উৎসর্গ করার মতো সেরা উপহার। বলির শিকার শিশুদের বয়স ৬ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে হতে পারত।

বলিদানের তীর্থযাত্রার কয়েক মাস বা এমনকি বছর আগে থেকেই শিশুদের পুষ্ট করা হতো। তাদের খাদ্যতালিকায় অভিজাতদের খাবার যেমন ভুট্টা এবং প্রাণিজ প্রোটিন থাকত। তাদের সুন্দর পোশাক ও গয়না পরানো হতো এবং সম্রাটের সাথে সাক্ষাতের জন্য কুজকোতে নিয়ে যাওয়া হতো, যেখানে তাদের সম্মানে ভোজের আয়োজন করা হতো। সমাধিস্থলে এই শিশুদের সাথে ১০০টিরও বেশি মূল্যবান অলঙ্কার সমাহিত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

ইনকা প্রধান পুরোহিতরা শিশুদের বলিদানের জন্য উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যেতেন। এই যাত্রা অত্যন্ত দীর্ঘ এবং শ্রমসাধ্য ছিল, বিশেষ করে অল্পবয়সী শিশুদের জন্য। তাই তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সহায়তা করার জন্য কোকো পাতা খাওয়ানো হতো যাতে তারা জীবিত অবস্থায় সমাধিস্থলে পৌঁছাতে পারে। সেখানে পৌঁছানোর পর শিশুদের যন্ত্রণা, ভয় এবং প্রতিরোধ কমানোর জন্য একটি নেশাজাতীয় পানীয় দেওয়া হতো। এরপর তাদের হয় শ্বাসরোধ করে, মাথায় আঘাত করে অথবা প্রচণ্ড ঠান্ডায় জ্ঞান হারিয়ে মারা যাওয়ার জন্য ফেলে রাখা হতো।[১৩]

প্রাথমিক ঔপনিবেশিক স্প্যানিশ মিশনারিরা এই প্রথা সম্পর্কে লিখেছিলেন, তবে সম্প্রতি জোহান রেইনহার্ডের মতো প্রত্নতাত্ত্বিকরা আন্দিজ পর্বতের চূড়ায় এই শিকারদের মৃতদেহ খুঁজে পেতে শুরু করেছেন। হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা এবং শুষ্ক পাহাড়ী বাতাসের কারণে এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই মমি হয়ে গেছে।

ইনকা মমিসমূহ

[সম্পাদনা]

১৯৯৫ সালে মাউন্ট আম্পাতোতে প্রায় পুরোপুরি জমে যাওয়া এক ইনকা কিশোরীর (বয়স ১৫) দেহ আবিষ্কৃত হয়, যার নাম দেওয়া হয় মমি জুয়ানিতা। এর কিছুদিন পর কাছেই বরফে সংরক্ষিত আরও দুটি মমি পাওয়া যায়—একটি মেয়ে (বয়স ৬) এবং একটি ছেলে (বয়স ৮)। সবার শরীরেই অ্যালকোহল এবং কোকো পাতার উপস্থিতি ছিল, যা তাদের ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল এবং তারা জমে মারা গিয়েছিল। ছেলেটিই ছিল একমাত্র যার মধ্যে প্রতিরোধের চিহ্ন দেখা গিয়েছিল, কারণ তার হাত-পা বাঁধা ছিল। ধারণা করা হয় সে শ্বাসরোধ হয়ে মারা গিয়ে থাকতে পারে, কারণ তার পোশাকে বমি ও রক্ত পাওয়া গেছে।

১৯৯৯ সালে য়ুয়াইইয়াকোর ৬,৭৩৯ মি (২২,১১০ ফু) উচ্চতার শিখরের কাছে একটি আর্জেন্টাইন-পেরুভিয়ান অভিযাত্রী দল প্রায় ৫০০ বছর আগে বলি দেওয়া তিনটি ইনকা শিশুর অক্ষত মৃতদেহ খুঁজে পায়।[১৪] এদের মধ্যে ছিল ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী যাকে "লা দনসেলা" (কুমারী) নাম দেওয়া হয়েছে, সাত বছর বয়সী এক বালক এবং ছয় বছর বয়সী এক বালিকা যাকে "লা নিয়া দেল রায়ো" (বজ্রকন্যা) বলা হয়। শেষোক্তটির ডাকনামের কারণ হলো, শিখরে থাকার ৫০০ বছরের কোনো এক সময়ে সংরক্ষিত দেহটিতে বজ্রপাত হয়েছিল, যার ফলে দেহটি এবং কিছু আনুষ্ঠানিক সরঞ্জাম আংশিকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। এই তিনটি মমি বর্তমানে আর্জেন্টিনার সালতা শহরে বিশেষভাবে নির্মিত 'মিউজিয়াম অব হাই অল্টিটিউড আর্কিওলজি'-তে পর্যায়ক্রমে প্রদর্শিত হয়।[১৫]

বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় যে, কিছু শিশু বলিকে মৃত্যুর আগে ইথানল এবং কোকো পাতা খাইয়ে নেশাগ্রস্ত করা হয়েছিল।[১৬]

তিমোতো–কুইকা সংস্কৃতি

[সম্পাদনা]

তিমোতো–কুইকা জাতি পাথর ও কাদার তৈরি মূর্তির পূজা করত, মন্দির নির্মাণ করত এবং নরবলি প্রদান করত। ঔপনিবেশিক আমল পর্যন্ত, মেরিদার লাগুনা দে উরাও-তে গোপনে শিশুদের বলি দেওয়া হতো। এটি হুয়ান দে কাস্তেলানোস-এর লেখনীতে নথিভুক্ত রয়েছে, যিনি আন্দিয়ান প্রাক-হিস্পানিক দেবী ইকাকো-র সম্মানে আয়োজিত ভোজ এবং নরবলির বর্ণনা দিয়েছেন।[১৭][১৮]

উত্তর আমেরিকা

[সম্পাদনা]

বর্তমান সেন্ট লুইস, মিজুরি-র ঠিক বিপরীতে মিসিসিপি নদীর ওপারে মিসিসিপিয়ান সংস্কৃতির প্রত্নস্থল কাহোকিয়া-তে অবস্থিত 'মাউন্ড ৭২'-এ "স্পষ্টতই বলি দেওয়া বেশ কয়েকজন নারী অনুচরের" দেহাবশেষ এবং চারটি মস্তকহীন পুরুষ কঙ্কাল পাওয়া গেছে। এর থেকে প্রায় ১০০ মাইল (১৫০ কিমি) উত্তরে অবস্থিত সমসাময়িক প্রত্নস্থল ডিকসন মাউন্ডস-এও চারটি মস্তকহীন পুরুষ কঙ্কালসহ একটি গণকবর পাওয়া গেছে।[১৯] তবে এই চারটি মৃতদেহের উপস্থিতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিতভাবে বলিদান বলা যায় না, কারণ সমাধিস্থ করার সময় তাদের মাথার জায়গায় পাত্র বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

একটি নির্দিষ্ট পনি গ্রামে প্রতি বছর 'মর্নিং স্টার অনুষ্ঠান' পালিত হতো, যাতে একটি ছোট মেয়েকে বলি দেওয়ার প্রথা ছিল। যদিও এই অনুষ্ঠানটি পালিত হতে থাকে, তবে ১৯শ শতাব্দীতে বলিদান প্রথাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]
  1. Ortíz C., Ponciano; Rodríguez, María del Carmen (1999) "Olmec Ritual Behavior at El Manatí: A Sacred Space" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০০৭-০২-২১ তারিখে in Social Patterns in Pre-Classic Mesoamerica, eds. Grove, D. C.; Joyce, R. A., Dumbarton Oaks Research Library and Collection, Washington, D.C., p. 225 - 254 (specifically p. 249).
  2. মারি, কার্লোস (২৭ ডিসেম্বর ২০০৫)। Evidencian sacrificios humanos en Comalcaco: Hallan entierro de menores mayasরিফর্মা
  3. Scherer, Andrew K. (১ জানুয়ারি ২০১৫)। Mortuary Landscapes of the Classic Maya: Rituals of Body and Soul। University of Texas Press। ডিওআই:10.7560/300510আইএসবিএন ৯৭৮১৪৭৭৩০০৫১০জেস্টোর 10.7560/300510
  4. স্টুয়ার্ট, ডেভিড (২০০৩)। "La ideología del sacrificio entre los mayas"। Arqueología Mexicana। XI, ৬৩: ২৪–২৯।
  5. Serrano Sanchez, Carlos (1993). "Funerary Practices and Human Sacrifice in Teotihuacan Burials". Kathleen Berrin, Esther Pasztory, eds., Teotihuacan, Art from the City of the Gods, Thames and Hudson, Fine Arts Museums of San Francisco, আইএসবিএন ০-৫০০-২৭৭৬৭-২, p. 113–114.
  6. মনিকা মেডেল (এপ্রিল ২০০৭)। "Mexico finds bones suggesting Toltec child sacrifice"। রয়টার্স। সংগ্রহের তারিখ ১৭ এপ্রিল ২০০৭
  7. তালাভেরা গঞ্জালেজ, জর্জ আর্তুরো; হুয়ান মার্তিন রোজাস শ্যাভেজ (২০০৩)। "Evidencias de sacrificio humano en restos óseos"। Arqueología Mexicana। XI, ৬৩: ৩০–৩৪।
  8. Bernardino de Sahagún, Historia General de las Cosas de la Nueva España, ed. a cargo de Ángel Ma. Garibay (México: Editorial Porrúa, 2006). p. 97
  9. "Steve Bourget on Sacrifice, Violence, and Ideology Among the Moche"ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস প্রেস। ৭ জুন ২০১৬। সংগ্রহের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০১৯
  10. "Human Sacrifices at the Huaca de la Luna"Las Huacas del Sol y de la Luna। সংগ্রহের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০১৯
  11. "Archaeologists in Peru unearth 227 bodies in the biggest-ever discovery of child sacrifice"অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন। ২৯ আগস্ট ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০১৯
  12. বোরগেট, স্টিভ (২০০১)। "Rituals of Sacrifice: Its Practice at Huaca de la Luna and Its Representation in Moche Iconography"। পিলসবারি, জোয়ান (সম্পাদক)। Moche Art and Archaeology in Ancient Peru। New Haven: Yale University Press। পৃ. ৮৯–১০৯।
  13. রেইনহার্ড, জোহান (নভেম্বর ১৯৯৯)। "A 6,700 metros niños incas sacrificados quedaron congelados en el tiempo"। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, স্প্যানিশ সংস্করণ: ৩৬–৫৫।
  14. "Secretaría de Cultura de Salta Argentina – Mission and Origins". ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১২-০৩-১৬ তারিখে. Maam.culturasalta.gov.ar (2007-12-16). Retrieved on 2010-12-14.
  15. গ্রেডি, ডেনিস (১১ সেপ্টেম্বর ২০০৭)। "Article and slide show on the Llullaillaco mummies"দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
  16. Morelle, Rebecca (২৯ জুলাই ২০১৩)। "Inca mummies: Child sacrifice victims fed drugs and alcohol"BBC News
  17. "De los timoto-cuicas a la invisibilidad del indigena andino y a su diversidad cultural" (পিডিএফ)saber.ula.ve
  18. "Timoto-Cuicas"issuu.com। ১৪ জুন ২০১৪।
  19. Conrad, p. 130.

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]
  • Duverger, Christian (২০০৫, মূল ফরাসি ১৯৭৯)। La flor letal: Economía del sacrificio azteca. মেক্সিকো: Fondo de Cultura Económica।
  • Harner, Michael (১৯৭৭)। "The Enigma of Aztec Sacrifice"Natural History, খণ্ড ৮৬, সংখ্যা ৪, পৃষ্ঠা ৪৬–৫১।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]