প্যালিওজোয়িক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
প্যালিওজোয়িক মহাযুগ
৫৪.১ - ২৫.২১৭ কোটি বছর পূর্বে
প্যালিওজোয়িকের প্রধান ঘটনাবলী
দে •  • 
-৫৬ —
-৫৪ —
-৫২ —
-৫০ —
-৪৮ —
-৪৬ —
-৪৪ —
-৪২ —
-৪০ —
-৩৮ —
-৩৬ —
-৩৪ —
-৩২ —
-৩০ —
-২৮ —
-২৬ —
-২৪ —
প্রধান প্যালিওজোয়িক ঘটনাবলীর আনুমানিক সময়ক্রম।
অক্ষের স্কেল: কোটি বছর আগে

প্যালিওজোয়িক (অথবা প্যালেওজোয়িক) মহাযুগ (উচ্চারণ: /ˌpliəˈzɪk, ˌpæ-/;[১][২] গ্রীক শব্দ palaios- প্যালিওস (παλαιός), “প্রাচীন” এবং zoe- জোয় (ζωή), “জীবন” থেকে এসেছে, অর্থ “প্রাচীন জীবন” [৩]) এবং এটি ফ্যানারোজোয়িক অধিযুগের তিনটি ভূতাত্ত্বিক মহাযুগের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রারম্ভিক মহাযুগ। এটি ফ্যানারোজোয়িক অধিযুগের সর্বাপেক্ষা দীর্ঘ মহাযুগ যার ব্যাপ্তি ছিল ৫৪১ মিলিয়ন বছর পূর্ব হতে ২৫১.৯০২ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত এবং এটি ছয়টি ভূতাত্ত্বিক যুগে বিভক্ত (প্রাচীনতম হতে নবীনতম): ক্যাম্ব্রিয়ান, অর্ডোভিশিয়ান, সিলুরিয়ান, ডেভোনিয়ান, কার্বনিফেরাস এবং পার্মিয়ান। প্যালিওজোয়িক মহাযুগ প্রোটেরোজোয়িক অধিযুগের নিওপ্রোটেরোজোয়িক মহাযুগের পরে আসে যেটা আবার মেসোজোয়িক মহাযুগের পরে আসে।

প্যালিওজোয়িক মহাযুগ ছিল ভূতাত্ত্বিক, জলবায়ু-সংক্রান্ত এবং বিবর্তনীয় নাটকীয় পরিবর্তনের সময়কাল। পৃথিবীর ইতিহাসে ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ জীবনের সর্বাধিক দ্রুত এবং ব্যাপক বৈচিত্র্যের সাক্ষী ছিল যা ক্যাম্ব্রিয়ান বিস্ফোরন নামে পরিচিত এবং এই সময় অধিকাংশ আধুনিক পর্ব আবির্ভূত হয়েছিল। মাছ, আর্থ্রোপোড, উভচর, অ্যানাপসিড, সিন্যাপসিড, ইউরিয়াপসিড এবং ডায়াপসিডসহ আরও অন্যান্য পর্ব প্যালিওজোয়িক মহাযুগে উদ্ভুত হয়েছিল। মহাসাগরে জীবনের সূচনা হয়েছিল যা পরে স্থলে স্থানান্তরিত হয় এবং অন্ত্য প্যালিওজোয়িক মহাযুগে পৃথিবীতে নানা ধরণের জীব আধিপত্য বিস্তার করে। আদিম উদ্ভিদের মাধ্যমে সৃষ্ট বৃহৎ বনভুমি দ্বারা মহাদেশগুলি ঢেকে যায় এবং এর ফলে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের অনেক ভূগর্ভস্থ কয়লার স্তর গঠিত হয়। এই মহাযুগের শেষের দিকে বৃহৎ এবং অপরিণত ডায়াপসিড আধিপত্য বিস্তার করে এবং প্রথম আধুনিক উদ্ভিদ প্রজাতি (কনিফার) আবির্ভূত হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে বৃহৎ বিলুপ্তির ঘটনা পার্মিয়ান-ট্রায়াসিক বিলুপ্তির ঘটনা সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে প্যালিওজোয়িক মহাযুগের সমাপ্তি ঘটে। এই বিপর্যয়কারী ঘটনার প্রভাব এতটাই বিধ্বংসী ছিল যে এর ফলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্থলজ জীবন পুনরুদ্ধার হতে মেসোজোয়িক মহাযুগ পর্যন্ত প্রায় ৩০ মিলিয়ন বছর সময় লাগে। [৪] সাগরে জীবনের পুনরুদ্ধার হওয়ার প্রক্রিয়া অনেক বেশি দ্রুততর। [৫]

ভূতত্ত্ব[সম্পাদনা]

প্যালিওজোয়িক মহাযুগের শুরু ও সমাপ্তি ঘটে সুপারমহাদেশের বিস্তৃতির মাধ্যমে এবং এই সময় মহাদেশীয় সীমানা সৃষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন পর্বতমালার সৃষ্টি হয় এবং অগভীর সমুদ্রের মধ্যে বন্যা এবং জলস্রোতের সৃষ্টি হয়। [স্পষ্টকরণ প্রয়োজন] এর শুরুতে সুপারমহাদেশ প্যানোটিয়া ভেঙ্গে যায়। প্যালিওজলবায়ু সংক্রান্ত গবেষণা এবং হিমবাহের চিহ্ন ইঙ্গিত করে যে আদিম প্যালিওজোয়িক মহাযুগে মধ্য আফ্রিকা খুব সম্ভবত মেরু অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। আদিম প্যালিওজোয়িক মহাযুগে, বৃহৎ মহাদেশ গন্ডোয়ানা (৫১০ মিলিয়ন বছর পূর্বে) গঠিত হয়েছিল এবং গঠিত হচ্ছিল। মধ্য প্যালিওজোয়িক মহাযুগে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের সংঘর্ষের ফলে আকাডিয়ান-ক্যালেডোনিয়ানের উত্তোলন উদ্ভুত হয়েছিল এবং পূর্ব অস্ট্রেলিয়াতেও একটি সবডাকশন প্লেট উত্তোলিত হয়েছিল। অন্ত্য প্যালিওজোয়িক মহাযুগে, মহাদেশীয় সংঘর্ষ সুপারমহাদেশ প্যানজিয়া গঠন করেছিল এবং কিছু বৃহৎ পর্বতমালা সৃষ্টি করেছিল যাদের মধ্যে অ্যাপালেচিয়ান পর্বতমালা, উরাল পর্বতমালা এবং তাসমানিয়ার পর্বতমালা অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্যালিওজোয়িক মহাযুগের যুগসমূহ[সম্পাদনা]

প্যালিওজোয়িক মহাযুগে ছয়টি যুগ অন্তর্ভুক্ত: ক্যাম্ব্রিয়ান, অর্ডোভিশিয়ান, সিলুরিয়ান, ডেভোনিয়ান, কার্বনিফেরাস (বিকল্পভাবে মিসিসিপিয়ান যুগ এবং পেনিসিলভানিয়ান যুগে বিভক্ত) এবং পার্মিয়ান[৬]

ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ[সম্পাদনা]

ক্যাম্ব্রিয়ান যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল ৫৪১ মিলিয়ন বছর পূর্ব হতে ৪৮৫ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত এবং এটি ফ্যানারোজোয়িক অধিযুগের অন্তর্ভুক্ত প্যালিওজোয়িক মহাযুগের প্রথম যুগ ছিল। ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ বিবর্তনের ক্ষেত্রে আকস্মিক বৃদ্ধির চিহ্ন রেখে গেসে যা ক্যাম্ব্রিয়ান বিস্ফোরণ নামে পরিচিত এবং এই ঘটনায় পৃথিবীর ইতিহাসে কোন একটি যুগে সর্বোচ্চ সংখ্যায় জীব উদ্ভুত হয়। শৈবালের মত জীব সৃষ্টি হয় কিন্তু এই যুগে সর্বত্র বিস্তৃত প্রাণী ছিল ট্রাইলোবাইটের মত সৃষ্ট আর্থোপোড। প্রায় সকল সামুদ্রিক পর্বের প্রাণী এই যুগে সৃষ্টি হয়েছিল। এই সময় সুপারমহাদেশ প্যানোটিয়া ভাঙতে শুরু করে এবং যার বেশির ভাগ অংশ পরবর্তীতে গন্ডোয়ানা মহাদেশ সৃষ্টি করেছিল। [৭]

অর্ডোভিশিয়ান যুগ[সম্পাদনা]

সেফালাসপিস (একটি চোয়ালবিহীন মাছ)

অর্ডোভিশিয়ান যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল ৪৮৫ মিলিয়ন বছর পূর্ব হতে ৪৪৩ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত। অর্ডোভিশিয়ান পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটা সময় ছিল যখন আদিম মাছ, সেফালোপড (শামুক জাতীয় প্রাণী) এবং প্রবালের মত অনেক জীববিজ্ঞানের শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল যেগুলি বর্তমান সময়েও প্রভাব বিস্তার করছে। সবথেকে প্রচলিত গঠনের প্রাণীর মধ্যে ছিল ট্রাইলোবাইট, শামুক এবং খোলসযুক্ত মাছ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে বলা যায় শূণ্য গন্ডোয়ানা মহাদেশের উপকূলে বসবাস করার জন্যে প্রথম আর্থোপোডা পর্বের প্রাণীরা গিয়েছিল। অর্ডোভিশিয়ান যুগের শেষের দিকে গন্ডোয়ানা দক্ষিণ মেরুতে ছিল, আদি উত্তর আমেরিকা ইউরোপের সাথে সংঘর্ষ করেছিল এবং আটলান্টিক মহাসাগর শুকিয়ে গিয়েছিল। আফ্রিকার হিমবাহের ফলশ্রুতিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ব্যাপকভাবে নেমে যায় এবং গন্ডোয়ানার উপকূলে প্রতিষ্ঠিত প্রানীজগত ধ্বংস হয়ে যায়। হিমবাহের ফলে অর্ডোভিশিয়ান-সিলুরিয়ান বিলুপ্তির ঘটনা ঘটে এবং এর ফলে ৬০% সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং ২৫% প্রাণীর গোত্র বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং একে প্রথম ব্যাপক বিলুপ্তির ঘটনা এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী বিলুপ্তির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। [৮]

সিলুরিয়ান যুগ[সম্পাদনা]

সিলুরিয়ান যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল ৪৪৩ মিলিয়ন বছর পূর্ব হতে ৪১৬ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত। সিলুরিয়ান যুগ পূর্ববর্তী যুগে হিমবাহের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পৃথিবীতে জীবনের নবসঞ্চার দেখায়। এই যুগে মাছের ব্যাপক বিবর্তন দেখা গিয়েছিল, যেমন- চোয়ালবিহীন মাছ সংখ্যায় অনেক বৃদ্ধি পায়, চোয়ালযুক্ত মাছ সৃষ্টি হয় এবং প্রথম মিঠাপানির মাছ সৃষ্টি হয় যদিও সামুদ্রিক বিছার মত আর্থ্রোপোড তখনও শীর্ষ শিকারী ছিল। পূর্ণ স্থলজ জীব সৃষ্টি হয়েছিল এবং এদের মধ্যে আদি মাকড়সা, ছত্রাক এবং সেন্টিপেড অন্তর্ভুক্ত ছিল। সংবাহী উদ্ভিদের (কুকসোনিয়া) বিবর্তন স্থলে উদ্ভিদের প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে সাহায্য করে। এই আদিম উদ্ভিদগুলি স্থলে জন্মানো সকল উদ্ভিদের অগ্রদূত ছিল। এই যুগে চারটি মহাদেশ ছিল: গন্ডোয়ানা (আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এন্টার্কটিকা, সাইবেরিয়া), লউরেনশিয়া (উত্তর আমেরিকা), বাল্টিকা (উত্তর ইউরোপ) এবং আভালোনিয়া (পশ্চিম ইউরোপ)। সমুদ্রপৃষ্ঠের সমসাময়িক উচ্চতা বৃদ্ধি পানিতে অনেক নতুন প্রজাতিকে উন্নতিলাভ করতে সাহায্য করে। [৯]

ডেভোনিয়ান যুগ[সম্পাদনা]

কার্বনিফেরাসের ইওগাইরিনাস (একটি উভচর)

ডেভোনিয়ান যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল ৪১৬ মিলিয়ন বছর পূর্ব হতে ৩৫৯ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত। ডেভোনিয়ান "মাছের যুগ" নামেও পরিচিত কারণ এই সময় মৎস্য প্রজাতির ব্যাপক বৈচিত্র্যতা লক্ষ্য করা হয় এবং এদের মধ্যে ডাঙ্কলিওসটিয়াসের মত সাঁজোয়াযুক্ত মাছের প্রজাতি এবং হাড়যুক্ত পাখনা সংবলিত মাছ অন্তর্ভুক্ত ছিল যা পরবর্তীতে প্রথম টেট্রাপড সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল। স্থলভাগে উদ্ভিদ প্রজাতি অবিশ্বাস্যভাবে বিস্তৃত হচ্ছিল ডেভোনিয়ান বিস্ফোরণ এর ঘটনার মাধ্যমে যার ফলে গাছ লিগনিন তৈরি করে আকারে অনেক লম্বা হচ্ছিল এবং সংবহন টিস্যু তৈরি করছিল: প্রথম বৃক্ষ এবং বীজ সৃষ্টি হয়েছিল। এই ঘটনা নতুন আবাসস্থল প্রদান করার মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় আর্থ্রোপোড সৃষ্টি করেছিল। প্রথম উভচর প্রাণী সৃষ্টি হয়েছিল এবং তখন খাদ্য শৃঙ্খলের শীর্ষে মাছ অবস্থান করছিল। ডেভোনিয়ান যুগের শেষের দিকে একটি ঘটনার দ্বারা ৭০% প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায় যা অন্ত্য ডেভোনিয়ান বিলুপ্তি নামে পরিচিত এবং এটা পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় বিধ্বংসী বিলুপ্তির ঘটনা হিসেবে পরিচিত। [১০]

কার্বনিফেরাস যুগ[সম্পাদনা]

কার্বনিফেরাস যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল ৩৫৯ মিলিয়ন বছর পূর্ব হতে ২৯৯ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত। এই সময় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা অতীব বেশি ছিল যদিও আদিম কার্বনিফেরাস যুগে তাপমাত্রার গড় ছিল ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (কিন্তু মধ্য কার্বনিফেরাস যুগে তাপমাত্রা কমে ১০°C হয়েছিল)। [১১] পৃথিবীতে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলাভূমির প্রাধান্য ছিল এবং লিগনিন গাছের দৈর্ঘ্য এবং সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে বলিষ্ঠ অবদান রেখেছিল। যেহেতু লিগনিন ভক্ষণ করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক তখনো সৃষ্টি হয় নি, তাই গাছের লিগনিন মাটির নিচে জমা থাকত যা পরবর্তীতে কার্বন উৎপন্ন করে এবং ভূগর্ভস্থ কয়লার স্তর (এজন্যে এই যুগের নাম কার্বনিফেরাস) সৃষ্টি করে যা বর্তমানেও বিদ্যমান আছে। সম্ভবত এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তনীয় ক্রমবিকাশ ছিল অ্যামনিয়টিক ডিমের বিবর্তন যা উভচরকে অধিকতর দূরবর্তী স্থলাভিমুখে স্থানান্তরিত হতে সাহায্য করেছিল এবং এই যুগের সর্বোচ্চ প্রাধান্য বিস্তারকারী মেরুদণ্ডী প্রাণীতে পরিণত করেছিল। এছাড়াও জলাভূমিতে প্রথম সরিসৃপ এবং সিন্যাপসিড সৃষ্টি হয়েছিল। কার্বনিফেরাস জুড়েই শীতলতা প্রবণতা আব্যাহত ছিল যা পার্মো-কার্বনিফেরাস হিমবাহ এবং কার্বনিফেরাস রেইনফরেস্টের পতন ঘটাতে তরান্বিত করেছিল। গন্ডোয়ানা ব্যাপকভাবে বরফাবৃত হয়ে পড়ে কারণ এর বেশির ভাগ অংশই দক্ষিণ মেরুর চতুর্দিকে অবস্থিত ছিল। [১২]

পার্মিয়ান যুগ[সম্পাদনা]

সিন্যাপসিড: ডিমেট্রডন

পার্মিয়ান যুগের ব্যাপ্তিকাল ছিল ২৯৯ মিলিয়ন বছর পূর্ব হতে ২৫২ মিলিয়ন বছর পূর্ব পর্যন্ত এবং এটি প্যালিওজোয়িক মহাযুগের সর্বশেষ যুগ ছিল। এই যুগের শুরুতে, সকল মহাদেশ পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়ে সুপারমহাদেশ প্যানজিয়া গঠন করে যা প্যানথালাসা নামক মহাসাগর দ্বারা আবৃত ছিল। এই সময় স্থলজ মাটি খুব শুষ্ক ছিল এবং ঋতুগুলিও খুব রুক্ষ ছিল কারণ প্যানজিয়ার অভ্যন্তরের জলবায়ু এর বৃহৎ পানির উৎস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত না। নতুন শুষ্ক জলবায়ুতে ডায়াপসিড এবং সিন্যাপসিড উদ্ভুত হয়। ডিমেট্রডন এবং ইডাফোসরাসের মত প্রাণীগুলি নতুন মহাদেশে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। প্রথম কনিফার উদ্ভিদ সৃষ্টি হয় এবং স্থলজ জমিতে আধিপত্য বিস্তার করে। পার্মিয়ান যুগের শেষের দিকে প্যানজিয়া আরও অধিক শুষ্ক হয়ে যায়। এর অভ্যন্তরে মরুভূমি সৃষ্টি হয় এবং স্কুটোসরাস এবং গোরগনোপসিডের মত নতুন প্রজাতি দ্বারা এটা পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর তারা পৃথিবীর আরও ৯৫% প্রজাতির সাথে সাথে আকস্মিক বিপর্যয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায় যা “দ্যা গ্রেট ডায়িং” নামে পরিচিত এবং তৃতীয় (ক্রমিক অনুসারে) এবং সর্বাধিক বিধ্বংসী বিলুপ্তির ঘটনা ছিল। [১৩] [১৪]

টেকটোনিক কার্যক্রম[সম্পাদনা]

ভূতাত্ত্বিকভাবে সুপারমহাদেশ প্যানোটিয়া ভেঙে পড়ার অল্প সময় পড়েই প্যালিওজোয়িক মাহাযুগ শুরু হয়েছিল। আদিম প্যালিওজোয়িকের পুরো সময় জুড়েই বিভিন্ন ভূখণ্ড ভেঙে গিয়ে অনেক মহাদেশ তৈরি হয়েছিল। এই মহাযুগের শেষের দিকে মহাদেশগুলি একত্রে সংযুক্ত হয়ে সুপারমহাদেশ প্যানজিয়া গঠিত হয়েছিল এবং এরমধ্যে পৃথিবীর স্থলভাগের অধিকাংশ অন্তর্গত ছিল।

জলবায়ু[সম্পাদনা]

পালিওজোয়িক মহাযুগের প্রারম্ভিকভাগের দুইটি যুগ অর্ডোভিশিয়ানসিলুরিয়ান উষ্ণ গ্রিনহাউসের যুগ ছিল এবং এসময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ ছিল (বর্তমানের থেকে ২০০ মিটার উচ্চতায়); উষ্ণ জলবায়ু ৩০ মিলিয়ন বছরের শীতল আদিম পালিওজোয়িক আইসহাউস যুগ দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয় এবং এই যুগ ৪৪৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে অর্ডোভিশিয়ান যুগের শেষের দিকে হুরোনিয়ান হিমবাহের চূড়ান্ত রূপে পৌঁছে দেয়। [১৫]

আদিম ক্যাম্ব্রিয়ান যুগের জলবায়ু সহনীয় ছিল, কিন্তু ফ্যানারোজোয়িক অধিযুগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধির কারণে ক্যাম্ব্রিয়ান যুগের শেষের দিকে জলবায়ু উষ্ণ হতে থাকে। কিন্তু এই প্রবণতা বজায় রাখার জন্যে গন্ডোয়ানা দক্ষিণে সরে যায় যাতে অর্ডোভিশিয়ান যুগে পশ্চিম গন্ডোয়ানার (আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকা) বেশির ভাগ অংশই দক্ষিণ মেরুতে অবস্থান করতে পারে। আদিম পালিওজোয়িক জলবায়ু দৃঢ়ভাবে অঞ্চলভিত্তিক ছিল এবং এর ফলস্বরূপ বলা যায় "জলবায়ু" উষ্ণ হচ্ছিল কিন্তু ঐ সময়ে অধিকাংশ জীবের বসবাসের জায়গা - মহাদেশীয় নিজস্ব সামুদ্রিক পরিবেশ দ্বারা ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে। যদিও বাল্টিকা (উত্তর ইউরোপ এবং রাশিয়া) এবং লউরেনশিয়া (পূর্ব উত্তর আমেরিকা এবং গ্রিনল্যান্ড) গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে অবস্থান করছিল, তবুও চীন এবং অস্ট্রেলিয়া পানি দ্বারা বেষ্টিত ছিল এবং কিছুটা নাতিশীতোষ্ণ ছিল। আকস্মিক এবং সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক মারাত্নক অন্ত্য অর্ডোভিশিয়ান বরফযুগের দ্বারা আদিম পালিওজোয়িকের সমাপ্তি ঘটে। এই শীতল অবস্থা ফ্যানারোজোয়িক অধিযুগে দ্বিতীয় বৃহত্তর এবং ব্যাপক বিলুপ্তির ঘটনা ঘটায়। সময়ের সাথে সাথে পালিওজোয়িক মহাযুগে উষ্ণ আবহাওয়ার স্থানান্তর ঘটে।

মধ্য পালিওজোয়িক মহাযুগ অত্যন্ত স্থিতিশীল সময় ছিল। বরফ যুগের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমে যায়, কিন্তু সিলুরিয়ান এবং ডেভোনিয়ান যুগে ধীরে ধীরে এই উচ্চতা পুনরুদ্ধার হয়। বাল্টিকা এবং লউরেনশিয়ার ধীরগতির সংযোগ এবং গন্ডোয়ানা হতে পৃথকীকৃত ক্ষুদ্র অঞ্চলগুলি উত্তরদিকে সরে আসার কারণে তুলনামূলক উষ্ণ অনেক অঞ্চল সৃষ্টি হয় যাদের অগভীর সামুদ্রিক তলদেশ ছিল। মহাদেশীয় সীমানায় অনেক গাছ জন্মানো শুরু হয় এবং এর ফলে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়তে থাকে এবং কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা কমতে থাকে যদিও এই হার খুব অল্প ছিল। কোন একটি ঘটনার কারণে এন্টার্কটিকা ও পশ্চিম গন্ডোয়ানার দূরবর্তী দক্ষিণ সীমানা কমবর্ধমান হারে অল্প অল্প অনুর্বর হতে থাকে। ডেভোনিয়ান যুগ শেষ হয় টার্নওভার পালসেস তত্ত্বের সিরিজের মাধ্যমে যা মধ্য পালিওজোয়িকের অধিকাংশ মেরুদণ্ডী প্রাণীকে ধ্বংস করে দেয় যদিও মোট প্রজাতির বৈচিত্র্যতায় কোন লক্ষণীয় হ্রাস দেখা যায় নি।

অন্ত্য পালিওজোয়িক মহাযুগ সম্পর্কে অনেক অনুত্তরিত প্রশ্ন রয়েছে। মিসিসিপিয়ান যুগ (আদিম কার্বনিফেরাস যুগ) শুরু হয় বায়ুমণ্ডলীয় অক্সিজেনের ঘনমাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে কিন্তু এসময় কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনমাত্রা নতুন করে কমে যায়। এই ঘটনা কার্বনিফেরাস যুগের জলবায়ুকে অস্থিতিশীল করে তুলে এবং একটি বা দুইটি বরফযুগের জন্ম দেয়। এগুলি অন্ত্য অর্ডোভিশিয়ান বরফযুগের তুলনায় অনেক বেশি মারাত্নক ছিল, কিন্তু এসময় বৈশ্বিক জীবজগতের উপর খুবই তুচ্ছ প্রভাব পড়েছিল। সিজুলারিয়ান উপযুগে অক্সিজেন এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড উভয়েরই সাধারণ ঘনমাত্রা পুনরুদ্ধার হয়। অপরদিকে প্যানজিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগ তাপমাত্রার চরমভাবাপন্ন সাপেক্ষে বিশাল অনুর্বর দ্বীপ অঞ্চল সৃষ্টি করে। এছাড়াও লপিঞ্জিয়াম উপযুগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার হ্রাস, কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর অধঃপতন প্রভৃতির কারণে পার্মিয়ান বিলুপ্তির ঘটনা তার বিধ্বংসী প্রভাবের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়।

উদ্ভিদকুল[সম্পাদনা]

একজন শিল্পীর কল্পনায় আদিম স্থলজ উদ্ভিদসমূহ

পূর্বের অধিযুগের পালিওজোয়িক মহাযুগের প্রারম্ভিকভাগে এবং সম্ভবত নিওপ্রোটেরোজোয়িক মহাযুগের শেষের দিকে ম্যাক্রোস্কোপিক উদ্ভিদ জীবনের সূচনা হয়। প্রায় ৪২০ মিলিয়ন বছর পূর্বে সিলুরিয়ান এবং ডেভোনিয়ান যুগের কিছু সময় পর্যন্ত অধিকাংশ উদ্ভিদই জলজ ছিল কিন্তু এরপর থেকে উদ্ভিদ স্থলে স্থানান্তরিত হতে থাকে। যখন কর্বনিফেরাস যুগে স্থলজ উদ্ভিদকুল এদের চরমসীমায় পৌঁছে, তখন ইউরামেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে লাইকোপসিড রেইনফরেস্ট আধিপত্য বিস্তার করে। অন্ত্য কর্বনিফেরাস এবং পার্মিয়ান যুগে জলবায়ুর পরিবর্তন কর্বনিফেরাস রেইনফরেস্টের পতন ঘটায় যা উদ্ভিদের এই আবাসস্থলকে ভেঙ্গে ফেলে এবং উদ্ভিদের বৈচিত্র্যতার হ্রাস ঘটায়। [১৬]

প্রাণীকুল[সম্পাদনা]

ক্যাম্ব্রিয়ান যুগের শুরুতে প্রায় সকল অমেরুদণ্ডী প্রাণীর পর্ব হঠাৎ করে প্রচুর পরিমাণে আবির্ভুত হওয়া পালিওজোয়িক জীবনের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী আবির্ভুত হয়েছিল আদিম মাছের রূপে যা পরবর্তীতে সিলুরিয়ান এবং ডেভোনিয়ান যুগে ব্যাপক বৈচিত্র্যতা প্রদর্শন করেছিল। প্রথম যেসব প্রাণী স্থলে আবির্ভুত হয়েছিল সেগুলো ছিল আর্থ্রোপোড। ৩৬৭.৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে অন্ত্য ডেভোনিয়ান যুগে কিছু মাছের ফুসফুস ছিল এবং শক্তিশালী হাড়যুক্ত পাখনা ছিল যা তাদেরকে স্থলে হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করতে সাহায্য করে। ৩৯০ মিলিয়ন বছর পূর্বে পাখনার হাড়গুলি থেকে পা উদ্ভুত হয় এবং প্রথম টেট্রাপড সৃষ্টি হয় যাদের ফুসফুসের ক্রমবিকাশ শুরু হয়। অন্ত্য কর্বনিফেরাস যুগ পর্যন্ত উভচর প্রাণীরাই প্রাধান্য বিস্তারকারী টেট্রাপড ছিল এবং তখন জলবায়ুর পরিবর্তন তাদের বৈচিত্র্যতাকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। পরবর্তীতে অন্ত্য পার্মিয়ান যুগে সরিসৃপ প্রাণীর সৃষ্টি হয় এবং তাদের সংখ্যা ও বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। [১৬]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র এবং আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

  1. "Paleozoic". Dictionary.com Unabridged. Random House.
  2. "Paleozoic". Merriam-Webster Dictionary.
  3. "Paleozoic". Online Etymology Dictionary.
  4. Sahney, S. & Benton, M.J. (2008). "Recovery from the most profound mass extinction of all time" (PDF). Proceedings of the Royal Society B: Biological Sciences. 275 (1636): 759–65. doi:10.1098/rspb.2007.1370. PMC 2596898 Freely accessible. PMID 18198148.
  5. http://www.economist.com/node/16524904 The Economist
  6. http://www.ucmp.berkeley.edu/paleozoic/paleozoic.php
  7. University of California. "Cambrian". University of California.
  8. University of California. "Ordovician". University of California.
  9. University of California. "Silurian". University of California.
  10. University of California. "Devonian". University of California.
  11. Monte Hieb. "Carboniferous Era". unknown.
  12. University of California. "Carboniferous". University of California.
  13. Natural History Museum. "The Great Dying". Natural History Museum.
  14. University of California. "Permian Era". University of California.
  15. Munnecke, A.; Calner, M.; Harper, D. A. T.; Servais, T. (2010). "Ordovician and Silurian sea-water chemistry, sea level, and climate: A synopsis". Palaeogeography, Palaeoclimatology, Palaeoecology. 296 (3–4): 389–413. doi:10.1016/j.palaeo.2010.08.001.
  16. Sahney, S.; Benton, M.J. & Falcon-Lang, H.J. (2010). "Rainforest collapse triggered Pennsylvanian tetrapod diversification in Euramerica" (PDF). Geology. 38 (12): 1079–1082. Bibcode:2010Geo....38.1079S. doi:10.1130/G31182.1.


  • ব্রিটিশ প্যালিওজোয়িক জীবাশ্ম, ১৯৭৫, দ্যা ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, লণ্ডন।
  • "আন্তর্জাতিক স্তরবিদ্যা কমিশন (আইসিএস)"Home Page। সংগ্রহের তারিখ সেপ্টেম্বর ১৯, ২০০৫ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]