পোতিফার
| পোতিফার pꜣ-dj-pꜣ-rꜥ চিত্রলিপিতে |
|---|
পোতিফার (/ˈpɒtɪfər/ POT-if-ər; হিব্রু ভাষায়: פּוֹטִיפַר/פּוֹטִיפָר; Ancient Egyptian: pꜣ-dj-pꜣ-rꜥ[১]) হিব্রু বাইবেল এবং কুরআনের একটি চরিত্র। তার নামটি পোতিফেরা (হিব্রু ভাষায়: פוטיפרע) নামক অন্য একটি ব্যক্তির সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত হতে পারে।
পোতিফার ছিলেন একজন ফারাওয়ের রাজপ্রহরী প্রধান, যিনি যোসেফকে ক্রীতদাস হিসেবে কিনে নিয়েছিলেন।[২][৩] যোসেফের প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে, পোতিফার তাকে তার গৃহের তত্ত্বাবধায়ক করেন। পোতিফারের স্ত্রী,[৪][৫] যিনি পরকীয়ার জন্য কুখ্যাত ছিলেন, যোসেফকে পছন্দ করে ফেলেন এবং তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন। যোসেফ তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে এবং দৌড়ে পালিয়ে গেলে, তার জামাকাপড় পোতিফারের স্ত্রীর হাতে রয়ে যায়। এরপর তিনি মিথ্যা অভিযোগ করেন যে যোসেফ তাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছে। এর ফলে পোতিফার যোসেফকে কারাগারে পাঠান।
পরে পোতিফারের কী হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়; কিছু উৎসে তাকে পোতিফেরা নামক একজন মিশরীয় পুরোহিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার কন্যা আসেনাত যোসেফকে বিয়ে করেছিলেন।[৬] পোতিফারের স্ত্রীর এই মিথ্যা অভিযোগ যোসেফের জীবনের ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কারণ এই কারাবাসের ফলে যোসেফ একজন সহবন্দির সঙ্গে পরিচিত হন, যিনি পরে তাকে ফারাওয়ের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন।
পোতিফারের স্ত্রীর ভাগ্যও অনির্দিষ্ট, তবে কিছু উৎসে বলা হয়েছে যে তিনি অসুস্থতায় ভুগেছিলেন।[৭]
র্যাচেল অ্যাডেলম্যান মনে করেন, পোতিফার ও তার স্ত্রী উভয়েই যোসেফের প্রতি যৌন আকৃষ্ট ছিলেন এবং তাকে নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তালমুদিক কাহিনিতে বলা হয়েছে, পোতিফার নিজেই যোসেফকে ব্যবহার করার চেষ্টা করলে, পরিণতিতে তিনি নপুংসক হয়ে পড়েন। অ্যাডেলম্যানের মতে, এই গল্পটি ইহুদি সংস্কৃতির ভেতর আত্মীকরণের সমালোচনা, যেখানে বিদেশিরা (যেমন পোতিফার ও তার স্ত্রী) ইহুদিদের পাপে প্রলুব্ধ করে।[৮]
মধ্যযুগীয় সেফার হা-যাশার—যা তোরাহর একটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ—এ পোতিফারের স্ত্রীর নাম জুলেখা হিসেবে উল্লেখ আছে। ইসলামিক ঐতিহ্যেও এই নাম ব্যবহৃত হয়েছে। এ থেকেই জামি রচিত ফারসি মহাকাব্য ইউসুফ ও জুলেখা নামক কাব্যটির উৎপত্তি, যা তার হাফ্ত আওরাঙ্গ ("সাত সিংহাসন") গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
এই কাহিনি রেনেসাঁ এবং বারোক যুগে পাশ্চাত্য চিত্রকলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেখানে যোসেফকে প্রায়ই পোতিফারের স্ত্রীর শয্যা থেকে নিজেকে ছিঁড়ে বের করে আনতে দেখা যায়, যিনি অর্ধনগ্ন অবস্থায় চিত্রিত। অপরদিকে ফারসি ক্ষুদ্রচিত্রে জামির হাফ্ত আওরাঙ্গ-এর ইউসুফ ও জুলেখা কাহিনির বিভিন্ন দৃশ্যচিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
ধর্মীয় উল্লেখ
[সম্পাদনা]পোতিফার বা যোসেফকে নির্দিষ্ট কোনো ফারাও বা ঐতিহাসিক সময়ের সঙ্গে নির্ভুলভাবে সম্পৃক্ত করা কঠিন। ইহুদি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, যোসেফ ২২১৬ সালে (খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৪৪), অর্থাৎ দ্বিতীয় মধ্যবর্তী যুগের শেষ ভাগে বা নব রাজবংশের সূচনাকালে ক্রয় করা হয়। যোসেফের কাহিনী যে তোরাতে রয়েছে (তুলনায় বাইবেল ও কুরআন), সেটিই তিনটির মধ্যে সর্বপ্রাচীন লিখিত রূপ—যা খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৬০০ সালে বাবিলন বন্দিত্ব চলাকালীন রচিত হয়। ডকুমেন্টারি হাইপোথেসিস অনুযায়ী, পোতিফার ও তার স্ত্রীর কাহিনী ইয়াহউইস্ট উৎসভুক্ত, যেখানে মদ পরিবেশক ও রাঁধুনির গল্প ও ফারাওয়ের স্বপ্ন সংক্রান্ত কাহিনী এলোহিস্ট উৎসে অন্তর্ভুক্ত।
একই ধরনের একটি কাহিনী দুই ভাইয়ের কাহিনিতেও পাওয়া যায়, যেখানে অনপুর স্ত্রী তার ভাই বাতাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে।
ইসলাম
[সম্পাদনা]এই কাহিনী প্রথম উল্লিখিত হয়েছে কুরআনের ১২:২১–৩৫ আয়াতে। এক মিশরীয় ব্যক্তি যোসেফকে ক্রয় করেন এবং তাকে সন্তানস্নেহে গ্রহণ করতে চান। মিশরীয়ের স্ত্রী যোসেফকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু আল্লাহ তাকে সেই প্রলোভন থেকে রক্ষা করেন। পরে স্ত্রী যোসেফের বিরুদ্ধে নিজেকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তোলেন। যোসেফের পোশাক ছিঁড়ে যাওয়া তার নির্দোষিতার প্রমাণ হয়। 'আজিজ' যোসেফের ওপর বিশ্বাস রাখেন এবং তার স্ত্রীকে ধিক্কার দেন। পরে শহরে তার স্ত্রীর পাপের কথা ছড়িয়ে পড়ে (সূরা ইউসুফ ১২:৩০ অনুযায়ী)। যোসেফের সৌন্দর্য দেখে অন্যান্য সম্ভ্রান্ত নারীরা তাকে দেবদূতের মতো মনে করেন। 'আজিজ'-এর স্ত্রী ঘোষণা করেন, যোসেফ যদি তার প্রস্তাবে রাজি না হয়, তবে তাকে কারাবরণ করতে হবে। যোসেফ আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান এবং আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন, তবুও তাকে কারাগারে পাঠানো হয়, যদিও তিনি নির্দোষ ছিলেন।[৯]
সাংস্কৃতিক উল্লেখ
[সম্পাদনা]
- চিত্রকলায় এই বিষয়টি প্রায়ই নারীর ক্ষমতার থিমে চিত্রিত হয়েছে।
- জামির হাফ্ত আওরাঙ্গ ("সাত সিংহাসন") গ্রন্থে ইউসুফ ও জুলেখা নামে একটি ফারসি কবিতা রয়েছে।
- দান্তের ডিভাইন কমেডি গ্রন্থে, পোতিফারের স্ত্রীর আত্মাকে নরকের অষ্টম বৃত্তে দেখা যায়। তিনি কথা বলেন না, তবে অন্য একটি আত্মা জানায় যে, তিনি ও অন্যান্য মিথ্যা সাক্ষীরা চিরকাল জ্বালাময় জ্বরে ভুগতে থাকবেন।
- জন সেলসের চলচ্চিত্র মেইটওয়ান-এ উইল ওল্ডহ্যাম এক কিশোর ধর্মপ্রচারকের ভূমিকায় পোতিফারের কাহিনী প্রচার করেন।
- অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবার ও টিম রাইস-এর মিউজিক্যাল Joseph and the Amazing Technicolor Dreamcoat-এ পোতিফার প্রাচীন মিশরের একজন ধনকুবের, যিনি পিরামিডে শেয়ার কিনে ধনী হন ("Potiphar had made a huge pile, owned a large percentage of the Nile")। তার স্ত্রী একজন প্রলোভনসঙ্কুল ফেম ফাটাল চরিত্রে চিত্রিত। উভয়েই "Potiphar" শিরোনামের গানে উপস্থিত।
- জন কিটসের "On Fame" কবিতায়, ফেমকে বলা হয়েছে "হিংসুটে পোতিফারের ভগ্নী";
- অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র Joseph: King of Dreams-এ, পোতিফার যোসেফের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে তাকে তার গৃহদাস হিসেবে নিযুক্ত করেন। পরে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগে যোসেফকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চান; কিন্তু স্ত্রীর অনুরোধে তা বাতিল করেন এবং সমাজের সম্মান রক্ষার্থে তাকে কারাবন্দী করেন। পরে তিনি যোসেফকে ফারাওয়ের কাছে নিয়ে যান ও দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য সহায়তা করেন। ফারাও যোসেফের ওপর ভরসা রাখতে চান কিনা জানতে চাইলে পোতিফার বলেন, "আমি তার উপর জীবন দিয়ে ভরসা করি"। তিনি যোসেফের ভাইদের সঙ্গে পুনর্মিলনের সময়ও উপস্থিত ছিলেন।
- থমাস মানের Joseph and his Brothers-এ, পোতিফারের স্ত্রী যৌন অখুশির কারণ হিসেবে পোতিফারকে নপুংসক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
- মার্গারেট অ্যাটউডের The Testaments গ্রন্থে, পোতিফারের স্ত্রীর উল্লেখ রয়েছে আরডুয়া হল হলোগ্রাফ অংশের ৪৬ অধ্যায়ে, যা লিডিয়া আন্টি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ডঃ গ্রোভ পোতিফারের গল্প ব্যবহার করে নিজেকে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে রক্ষা করেন।
- চেকোস্লোভাক লেখক ভ্যালডেমার ভিনার এসপেরান্তো ভাষায় La skandalo pro Jozefo নামে একটি মৌলিক কাহিনী লেখেন, যেখানে ঘটনাগুলি পাঁচজন সাক্ষীর দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
চিত্রশালা
[সম্পাদনা]- চিত্রকলায় যোসেফ ও পোতিফারের স্ত্রীর কাহিনী
- ১৪৯৩ সালের নুরেমবার্গ ক্রনিকল থেকে
- লুডোভিকো চিগোলির চিত্রে যোসেফ ও পোতিফারের স্ত্রী
- গুয়েরচিনোর যোসেফ ও পোতিফারের স্ত্রী, ১৬৪৯
- বার্তোলোমে এস্তেবান মুরিলোর চিত্রে যোসেফ ও পোতিফারের স্ত্রী
- জঁ-বাতিস্ত নাটিয়ের চিত্রে যোসেফ ও পোতিফারের স্ত্রী
- গুইডো রেনির ১৬৩১ সালের চিত্রে যোসেফ ও পোতিফারের স্ত্রী
- রেমব্রান্টের চিত্রে যোসেফ ও পোতিফারের স্ত্রী, ১৬৩৪
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Ulmer, Rivka (১৫ ডিসেম্বর ২০০৯)। Egyptian Cultural Icons in Midrash (ইংরেজি ভাষায়)। Walter de Gruyter। আইএসবিএন ৯৭৮৩১১০২২৩৯৩৪।
- ↑ “The Egyptian Sun-God Ra in the Joseph Story.” Vetus Testamentum 36, no. 4 (1986): 417–418.
- ↑ Genesis 16–50 (Word Biblical Commentary; Grand Rapids: Zondervan, 1994).
- ↑ Gordon J. Wenham, Genesis 16–50 (Word Biblical Commentary; Grand Rapids: Zondervan, 1994).
- ↑ Victor P. Hamilton, The Book of Genesis: Chapters 18–50 (New International Commentary on the Old Testament; Grand Rapids: Eerdmans, 1995).
- ↑ "Potiphar – JewishEncyclopedia.com"। www.jewishencyclopedia.com।
- ↑ "Joseph"। Jewish Encyclopedia। ১৯০১। সংগ্রহের তারিখ ২৪ অক্টোবর ২০১৮।
- ↑ Adelman, Rachel (২০২২)। "Potiphar and His Wife Desire Joseph"। TheTorah.com। ১৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- ↑ Wherry, Elwood Morris (১৮৯৬)। A Complete Index to Sale's Text, Preliminary Discourse, and Notes। London: Kegan Paul, Trench, Trubner, and Co।
এই উৎস থেকে এই নিবন্ধে লেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা পাবলিক ডোমেইনে রয়েছে।
গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- ওসমান, এ. (১৯৮৭)। The Hebrew Pharaohs of Egypt। বেয়ার অ্যান্ড কো., রোচেস্টার, ভারমন্ট। আইএসবিএন ৯৭৮১৫৯১৪৩০২২৩