পূর্ব পাকিস্তানে বৈষম্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

ক) সামাজিক বৈষম্য :

১. ধর্মীয় ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য : পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামী সামাজিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও ইসলাম সম্পর্কে দুই অংশের জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির বেশ পার্থক্য ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের ধর্মীয় জীবন ছিল অনেকটা উদারনৈতিক ও মানবতাবাদী । কিন্তুুু পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল অনেকটা রক্ষণশীল ও গোড়া ।

২. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানী পুঁজিপতিদের প্রাধান্য :

বাঙালি বুর্জোয়া ও পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প উদ্যোক্তা পূর্ব পাকিস্তানে আইনগতভাবে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমঅধিকারী হলেও সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ ছিল অসম। বাঙালি শিল্পোদ্যোক্তাদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থাথার কারণ ছিল ঋণ পাওয়া ও শেয়ার বিক্রয় প্রশ্নে বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিনিয়োগকারী সংস্থার উপর নির্ভরশীলতা । স্যার এসব প্রতিষ্ঠান ছিল ও বাঙালি পুঁজিপতিদের কর্তৃত্বাধীন ।

৩. সামাজিক অবকাঠামো গত বৈষম্য :

পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের দিক থেকেও পিছিয়ে ছিল । গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে , কৃষি , চিকিৎসা , বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রের ১৬টির মধ্যে ১৩টিরই অবস্থান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের।

খ) সাংস্কৃতিক বৈষম্য :

১. সাংস্কৃতিক দূরত্বের ব্যাপকতা : পাকিস্তানের দুটি অংশ শুধু যে ভৌগলিক দিক থেকে ভিন্ন অবস্থানের ছিল তা নয় , দুই অংশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ছিল ব্যাপক সাংস্কৃতিক দূরত্ব । তাঁদের ভাষা ছিল স্বতন্ত্রত্র , পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল ভিন্ন । তাদের আহার্যও ছিল ভিন্ন । এমনকি তারা দেখতেও এক রকম ছিল না ।

২. ভাষাগত দ্বন্দ্ব : পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে যোগাযোগের কোন সাধাারণ ভাষা ছিল না । সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালীদের ভাষা পশ্চিম পাকিস্তানে অপরিচিত ছিল । অপরপক্ষে , পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানের এলিট ভাষা উর্দুুতে কথা বলার মতো মানুষ ছিল খুবই নগণ্য ।

৩. বাঙালির সংস্কৃতি চর্চাই প্রতিবন্ধকতা : স্বৈরাচারী আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে রোমান হরফে বাংলা লেখার জন্য 'ভাষা সংস্কার কমিটি' গঠন করেন এবং এর অব্যবহিত পরে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান পালনে বাধা দেন । ১৯৬৭ সালে বেতার রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয় ।

৪. উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা : দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা কে উপেক্ষা করে ২১ মার্চ ১৯৪৮ সালের জনসভায় এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংসের অপপ্রয়াস চালান ।

গ) অর্থনৈতিক বৈষম্য :

১. অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত বৈষম্য : পশ্চিম পাকিস্তানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৪৪% জনসমষ্টি বাস করলেও সেখানে জাতীয় সম্পদের ৭৫% বরাদ্দ করার ফলে ওই অঞ্চলে একদিকে যেমন আয় বৃদ্ধি পায় , অন্যদিকে তেমন কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পায় ।

২. আঞ্চলিক বিনিয়োগ বৈষম্য : ১৯৫০ এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মোট বিনিয়োগের ২১% থেকে ২৬% । ১৯৬০ এর দশকে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩২% থেকে ৩৬% । অন্যদিকে , রাজস্ব ও উন্নয়ন খাত মিলে পশ্চিম পাকিস্তানে বিনিয়োগ করা হয় প্রথম দশকে ৭৪%থেকে ৭৯% এবংং দ্বিতীয় দশকে ৬৪%থেকে ৬৮% ।

৩. মাথাপিছু গড় আয়ে বৈষম্য : দেশের দুই অংশের জনগণের মাথাপিছুুু গড় আয়়ে সুস্পষ্টট পার্থক্য বিদ্যমান ছিল । ১৯৬৪-৬৫ অর্থবছরের পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু গড় আয় ছিল ২৮১ টাকা । অন্যদিকে , পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু গড়় আয় ছিল ৪১২ 💰।

৪. শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য : পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৪৯-৫০ সালে শিল্পক্ষেত্রে উপাদানের হার ছিল মোট উপাদানের ৯.৪% এবং ১৯৬৯-৭০ সালে তা উন্নীত হয় ২০% এ । কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়িত খাত ১৯৪৯-৫০ সালে ১৪.৭% থাকলেও সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশে ।

৫. সম্পদ পাচার :পূর্ব পাকিস্তান থেকে নগদ ও পণ্য প্রচুর সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানের স্থানান্তরিত হয় । অর্থনীতির ভাষায়় একে সম্পদ পাচার বলে । এক হিসাবে দেখা যায় , প্রতিবছর প্রায় ৩,০০০ মিলিয়ন রুপি বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হয় ।

৬. আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শোষণ : পাকিস্তানের বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল । অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীভূত দপ্তর থেকে পরিচালিত হতো । ফলের বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা সর্বদা পশ্চিম পাকিস্তানের দখলে ছিল ।

ঘ) পাকিস্তানিদের রাজনৈতিক বৈষম্য : স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের যাত্রা শুরুর পর থেকে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলা ভীষণ রকমের রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হতে থাকে । রাষ্ট্রভাষা কে কেন্দ্র করে সর্বপ্রথম যে রাজনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টির প্রয়াস নেওয়া হয় ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল বানচাল ও ক্ষমতা হস্তান্তরের অনীহার মধ্য দিয়ে তা একটি রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করে ।

ঙ) শিক্ষাখাতে বৈষম্য : পাকিস্তানের জন্মের আগে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল । কিন্তু পাকিস্তানের জন্মের পরের দুই দশকে(১৯৪৭-৬৭) পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায়় পিছিয়ে পড়়ে । কারণ এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে , আর পশ্চিম পাকিস্তানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চার গুণ ! শুধুু যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগত বৈষম্যে ছিল তা নয় ; বরং দুই পাকিস্তানের শিক্ষাখাতে ব্যয় বরাদ্দেও বিপুল বৈষম্য বিদ্যমান ছিল ।