পীর পাঞ্জাল পর্বতমালা
পীর পাঞ্জাল পর্বতমালা, উত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলের নিম্ন হিমালয়ের অন্তর্গত একটি পর্বতশ্রেণি।[১][২] এটি বিয়াস ও নীলাম/কিষণগঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে বিস্তৃত। এর বিস্তৃতি ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্য এবং ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পর্যন্ত, আর এর উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত পাকিস্তান-শাসিত অঞ্চলে প্রসারিত হয়েছে।[১] হিমালয় পর্বতমালায় ধৌলাধর ও পীর পাঞ্জাল পর্বতমালার দিকে উচ্চতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পীর পাঞ্জাল হল ক্ষুদ্র হিমালয়ের বৃহত্তম এবং পশ্চিমতম পর্বতশ্রেণি। সতলুজ নদির তীরের কাছে এটি মূল হিমালয় পর্বতমালা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একদিকে বেয়াস ও রবি এবং অন্যদিকে চেনাব নদীর মধ্যে জলবিভাজিকা গঠন করেছে। আরও পশ্চিমে, পীর পাঞ্জাল পর্বতমালা কাশ্মীর উপত্যকার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানা গঠন করে এবং এটিকে জম্মু অঞ্চলের পাহাড় থেকে পৃথক করেছে; একইসঙ্গে এটি ঝিলম নদী ও চেনাব নদীর মধ্যে জলবিভাজিকা হিসেবে কাজ করেছে।
নামের উৎপত্তি
[সম্পাদনা]পীর পাঞ্জাল পর্বতমালার নামকরণ করা হয়েছে পীর পাঞ্জাল গিরিপথের নাম অনুসারে। রাজতরঙ্গিণীতে শ্রীভারের নথিভুক্ত মূল নাম ছিল পঞ্চালদেব (IAST: Pāñcāladeva, অর্থাৎ পঞ্চালের দেবতা)। পাঞ্চাল হল উত্তর-পশ্চিম উত্তর প্রদেশে অবস্থিত একটি দেশ, যার উল্লেখ মহাভারতে রয়েছে। তবে এমন কিছু ঐতিহ্যও রয়েছে, যেখানে মহাভারতে বর্ণিত অঞ্চলগুলিকে পশ্চিম পাঞ্জাব ও দক্ষিণ কাশ্মীরে অবস্থিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পণ্ডিত দীনেশচন্দ্র সরকারশক্তি-সংগম তন্ত্র-এ বর্ণিত ভূগোল বিশ্লেষণ করেছেন, যেখানে এই ধারণাটিই প্রতিফলিত হয়েছে।[৩] পণ্ডিত এম. এ. স্টাইন মনে করেন, অঞ্চলটি ইসলামীকরণের হওয়ার পর দেবতা ধারণাটি পীর ধারণায় রূপান্তরিত হয়ে থাকতে পারে।[৪]
পর্বতমালার শৃঙ্গসমূহ
[সম্পাদনা]দেও তিব্বা ( ৬,০০১ মি (১৯,৬৮৮ ফু) ) এবং ইন্দ্রাসন ( ৬,২২১ মি (২০,৪১০ ফু)এই পর্বতশ্রেণীর পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ শৃঙ্গ হলো । হিমাচল প্রদেশের পার্বতী -বিয়াস উপত্যকা (কুলু জেলা), চম্বার উচ্চাঞ্চল এবং চন্দ্র (উচ্চ চেনাব) উপত্যকা ( লাহুল এবং স্পিতি জেলা) উভয় স্থান থেকেই এখানে পৌঁছানো যায়। কাশ্মীরের গুলমার্গ শৈলশহরটি এই পর্বতমালায় অবস্থিত।
গিরিপথ
[সম্পাদনা]
পশ্চিম পীর পাঞ্জাল পর্বতমালায় পুঞ্চ ও উরি-র মধ্যবর্তী সড়কে অবস্থিত হাজি পীর গিরিপথের উচ্চতা ২,৬৩৭ মি (৮,৬৫২ ফু)। সামরিক অভিযানে (১৯৪৮ এবং ১৯৬৫ সালে) ভারত দুবার এই গিরিপথ দখল করলেও পরবর্তীতে গিরিপথটি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রেখে দেয়।
পীর পাঞ্জাল গিরিপথ (পীর কি গলি নামেও পরিচিত) মুঘল সড়কের মাধ্যমে কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে রাজৌরি ও পুঞ্চকে সংযুক্ত করেছে। এটি ৩,৪৯০ মি (১১,৪৫০ ফু) উচ্চতায় মুঘল সড়কের সর্বোচ্চ বিন্দু এবং কাশ্মীর উপত্যকার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।[৫] কাশ্মীর উপত্যকায় এই গিরিপথের নিকটতম শহর হল শোপিয়ান।
মুনাওয়ার গিরিপথ (উচ্চতা ৩,৬০০ মি (১১,৮০০ ফু)) পীর কি গলির উত্তরে অবস্থিত এবং রাজৌরির ওপর নজর রাখে।[৬]
বানিহাল গিরিপথ (২,৮৩২ মি (৯,২৯১ ফু)) কাশ্মীর উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তে ঝিলাম নদির উৎসস্থলের কাছে অবস্থিত। গিরিপথটির দুই পাশে বানিহাল ও কাজিগুন্ড অবস্থিত।[৭]
সিনথান গিরিপথ কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে জম্মু অঞ্চলের কিস্তওয়ারকে সংযুক্ত করেছে। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
সাচ গিরিপথ, যা চাম্বা জেলায় ৪,৪১৪ মিটার (১৪,৪৮২ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত, ভারতের হিমাচল প্রদেশের চাম্বাকে পাঙ্গি উপত্যকার সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।[৮]
পূর্ব পীর পাঞ্জাল পর্বতমালায় অবস্থিত রোহতাং লা (উচ্চতা ৩,৯৭৮ মি (১৩,০৫১ ফু)) কুল্লু উপত্যকার মানালিকে লাহৌল উপত্যকার কেলং-এর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। [তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
সুড়ঙ্গ
[সম্পাদনা]জওহর সুড়ঙ্গ
[সম্পাদনা]জওহর সুড়ঙ্গ হল পীর পাঞ্জাল পর্বতমালার মধ্য দিয়ে বানিহাল গিরিপথের নীচে নির্মিত ২.৮৫ কিমি (১.৭৭ মা) দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গ।[৯] এটি বানিহালকে পর্বতের অপর প্রান্তে অবস্থিত কাজিগুন্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নামে নামাঙ্কিত এই সুড়ঙ্গটি ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে নির্মিত হয় এবং সারা বছর তুষারমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে চালু করা হয়। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,১৯৪ মি (৭,১৯৮ ফু) উচ্চতায় অবস্থিত।[৯] সুড়ঙ্গটি মূলত প্রতিদিন ১৫০টি যানবাহন চলাচলের জন্য নকশা করা হলেও বর্তমানে প্রতিদিন ৭,০০০-এরও বেশি যানবাহন এটি ব্যবহার করে।[১০] তাই অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতায় আরও প্রশস্ত ও দীর্ঘ একটি নতুন সুড়ঙ্গ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বানিহাল কাজিগুন্ড সড়ক সুড়ঙ্গ
[সম্পাদনা]নতুন ৮.৪৫ কিমি (৫.২৫ মা) দীর্ঘ দ্বি-নলবিশিষ্ট বানিহাল কাজিগুন্ড সড়ক সুড়ঙ্গ নির্মাণ ২০১১ সালে শুরু হয় এবং ২০২১ সালে এটি চালু করা হয়। নতুন সুড়ঙ্গটি বিদ্যমান জওহর সুড়ঙ্গের তুলনায় কম উচ্চতায় অবস্থিত এবং এটি বানিহাল ও কাজিগুন্ডের মধ্যকার সড়কপথের দূরত্ব ১৬ কিমি (৯.৯ মা) কমিয়েছে। কম উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এই সুড়ঙ্গটি তুষারধসের ঝুঁকিতেও তুলনামূলকভাবে কম আক্রান্ত হয়।[১১]
অটল সুড়ঙ্গ
[সম্পাদনা]অটল সুড়ঙ্গ হিমালয়ের পূর্ব পীর পাঞ্জাল পর্বতমালায় রোহতাং গিরিপথের নীচ দিয়ে লে-মানালি মহাসড়কের উপর নির্মিত হয়েছে। ৮.৮ কিমি (৫.৫ মা) দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গটি ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সড়ক সুড়ঙ্গ এবং এটি মানালি ও কেলং-এর মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৬০ কিমি (৩৭ মা) কমিয়েছে। সুড়ঙ্গটি ৩,১০০ মিটার (১০,১৭১ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত, যেখানে রোহতাং গিরিপথের উচ্চতা ৩,৯৭৮ মিটার (১৩,০৫১ ফুট)। মানালি-লে অক্ষ বরাবর অবস্থিত এই সুড়ঙ্গটি লাদাখে যাওয়ার দুটি পথের অন্যতম।
বানিহাল রেলওয়ে সুড়ঙ্গ
[সম্পাদনা]পীর পাঞ্জাল রেলওয়ে সুড়ঙ্গ হল ১১.২১৫ কিলোমিটার (৬.৯৬৯ মাইল) দীর্ঘ একটি রেলওয়ে সুড়ঙ্গ, যা জম্মু ও কাশ্মীরে পীর পাঞ্জাল পর্বতমালার মধ্য দিয়ে গেছে। এটি কাজিগুন্ড ও বানিহালকে সংযুক্ত করেছে এবং উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল প্রকল্পের একটি অংশ। নিয়মিত পরিষেবার জন্য সুড়ঙ্গটি ২৬ জুন ২০১৩ সালে চালু করা হয়। এটি ভারতের দীর্ঘতম রেলওয়ে সুড়ঙ্গ।[১২]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 "Pir Panjal Range | Location, Himalayas, & Tunnel | Britannica"। www.britannica.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০২৩।
- ↑ "Home ministry chalks out plan to settle Kashmiri Pandits"। জুন ২০১৪।
- ↑ Sircar, Dineschandra (১৯৭১), Studies in the Geography of Ancient and Medieval India, Motilal Banarsidass, পৃ. ২০৪–২০৫, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-০৬৯০-০
- ↑ Stein, M. A. (১৯০০), Kalhana's Rajatarangini: A chronicle of the kings of Kasmir, Volume 2, Westminster: Archibald Constable and Co., পৃ. ৩৯৭–৩৯৮, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-০৩৭০-১
{{citation}}: আইএসবিএন / তারিখের অসামঞ্জস্যতা (সাহায্য) - ↑ Kapadia, Harish (১৯৯৯), Across Peaks & Passes in Ladakh, Zanskar & East Karakoram, Indus Publishing, পৃ. ২৩, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৩৮৭-১০০-৯
- ↑ "Pir Panjal Range"। Tourist Link। ২১ এপ্রিল ২০১৩।
- ↑ উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়; "britannica2" নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Himachal Tourism"". Himachal Tourism. Accessed 6 December 2019.
- 1 2 "Old tunnel on Kashmir highway to be transformed as tourist destination"। Deccan Herald। ২ নভেম্বর ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ৫ জানুয়ারি ২০২৬।
- ↑ Beacon Light in the Tunnel ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে
- ↑ "Passages of employment to Srinagar's denizens"। The Hindu। ৮ এপ্রিল ২০১২।
- ↑ "India's longest railway tunnel unveiled in Jammu & Kashmir"। The Times of India। ১৪ অক্টোবর ২০১১। ২৯ জুন ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
আরও পড়ুন
[সম্পাদনা]- Jreat, Manoj (২০০৪), Tourism in Himachal Pradesh, Indus Publishing, পৃ. ১৫–, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৩৮৭-১৫৭-৩
- Minhas, Poonam (১৯৯৮), Traditional Trade & Trading Centres in Himachal Pradesh: With Trade-routes and Trading Communities, Indus Publishing, পৃ. ২৮–, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭৩৮৭-০৮০-৪
