পিং পং ডিপলোমেসি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

পিং পং ডিপলোমেসি(চীনা: 乒乓外交 Pīngpāng wàijiāo) তৎকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরলে মূলত নিম্নে বর্ণিত পি পং ডিপলোমেসি ই তার অবসান ঘটিয়ে পুনরায় সম্পর্ক স্হাপনে সহায়তা প্রদান করেছিল। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এই বিষয়টির গুরুত্ব অপরিসীম। পিং পং ডিপলোমেসির ইংরেজি প্রতিশব্দ Shuttle Diplomacy. ১৯৭১ সালে চীনের আমন্ত্রণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেবিল টেনিস (পিং পং) দল চীন সফর করে। এ জন্য এটার নামকরণ হয়েছে পিং পং কূটনীতি। "পিং পংকূটনীতি" চীন-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে। এরপর দু দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিণ্ঞ্জার ১৯৭১ সালেই বেইজিং সফর করেন এবং দুবছর পর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন নিজেই চীন সফর করেন। এতে দু দেশের মধ্যে বৈরিতার অবসান ঘটে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক চীনকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ফলে চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পদ লাভ করে। পক্ষান্তরে তাইওয়ান জাতিসংঘ থেকে বাদ পড়ে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ঘটনার সূত্রপাত সেই ১৯৪৯ সালে, যখন মাও সে তুঙ চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটালেন। পুঁজিবাদে গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না, তা তো বলাই বাহুল্য। এর সাথে যোগ হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ছড়ানো বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা, চীনের উপর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আর কূটনৈতিক নীরবতা। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কোরিয়া যুদ্ধের ময়দানে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল বটে, কিন্তু তাদের মধ্যকার সম্পর্কের এতটাই অবনতি ঘটেছিল যে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি চীনের মাটিতে পা রাখেনি।

তবে সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের এই দূরত্ব ঘুচে যেতে থাকে। ১৯৭১ সাল নাগাদ বিশ্ব রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে। ততদিনে চীনের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। সীমান্তে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলস্বরূপ দুই সমাজতান্ত্রিক দেশ ক্রমশই একে অপরের শত্রুতে পরিণত হচ্ছে। এমন এক অবস্থায় চীনের চেয়ারম্যান মাও ভাবতে শুরু করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করলে বোধহয় রাশিয়ানদেরকে উচিত শিক্ষা দেয়া যাবে।

অপরদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের মনেও অভিন্ন চিন্তা খেলা করছিল। তিনিও তার প্রশাসনে চীনের সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানোকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে এক হাত নিতে চীনের সাথে জোট গঠনের মতো ভালো উপায় যে আর কিছুই হতে পারে না! ১৯৬৭ সালে তো তিনি একবার লিখেছিলেনও, "আমাদের পক্ষে চিরদিন চীনকে রাষ্ট্র-পরিবারের বাইরে রাখা একেবারেই সম্ভব নয়।"

ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই তরফ থেকেই কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে শুরুর তাগিদ অনুভব করা যাচ্ছিল। দুই দেশের কূটনীতিকরা গোপনে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত রকমের কোনো 'মাইলফলক সৃষ্টিকারী' ঘটনা ঘটছিল না, যার মাধ্যমে রাতারাতি সকল ধোঁয়াশা, সকল জটিলতা দূর হয়ে যাবে।

ফলাফল[সম্পাদনা]

  • ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল চীনের উপর ২০ বছর ধরে থাকা ভ্রমণ ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
  • ১৯৭১ সালের অক্টোবরে ভোটের মাধ্যমে জাতিসংঘে বৈধ পদ লাভ করে চীন। পাশাপাশি তারা খুবই অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যান্য দেশগুলোর সাথেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সক্ষম হয়।
  • ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর সমাপ্ত হয় 'সাংহাই কম্যুনিক' এর মাধ্যমে। এটি হলো একটি দালিলিক চুক্তিতে স্বাক্ষর, যেখানে ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। এই চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের সার্বভৌমত্ব ও আভ্যন্তরীণ বিষয়াদির প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগের পথ সুগম এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে সর্বোচ্চ লাভজনক পন্থা বেছে নেয়ার ব্যাপারে উল্লেখ ছিল।
  • ১৯৭৩ সালের মে মাসে উভয় দেশের রাজধানীতে 'লিয়াজোঁ অফিস' স্থাপনের মাধ্যমে পারস্পরিক রাজনৈতিক আলোচনার পথ সুগম করা হয়।
  • ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে পিপলস রিপাবলিক অব চায়নাকে স্বীকৃতি দেয়।
  • সর্বোপরি, চীনের সমর্থন সোভিয়েত ইউনিয়নের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হেলে পড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হওয়ার দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক একটি বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]