পাভো নুরমি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১৯২০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে নুরমি

পাভো জোহাননেস নুরমি (১৩ জুন ১৮৯৭ – ২ অক্টোবর ১৯৭৩) ছিলেন একজন ফিনিশীয় মাঝারি ও লম্বা দূরত্বের দৌড়বিদ। তার ডাক নাম ছিল "উড়ন্ত ফিন" কারণ তিনি ২০ শতকের গোড়ার দিকে দূরবর্তী দৌড়ের খেলায় আধিপত্য করেছেন। নুরমি ১৫০০ মিটার থেকে ২০ কি.মি দূরত্বের দৌড়ের খেলায় ২২টি আনুষ্ঠানিক বিশ্ব রেকর্ড করেন, এবং অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১২টি ইভেন্টে অংশ নিয়ে নয়টি স্বর্ণপদক ও তিনটি রৌপ্য পদক লাভ করেন। ক্যারিয়ারের শিখরে থাকাকালীন, নুরমি ৮০০ মিটার ও তদোর্ধ্ব দৌড়ের ১২১টি প্রতিযোগিতায় ছিলেন অপরাজিত। তার ১৪ বছরের ক্যারিয়ার জুড়ে, তিনি ১০০০ মিটারের মেঠো পথ অতিক্রম করার ইভেন্টগুলোতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন।

শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম নেয়া নুরমি ১২ বছর বয়সে বিদ্যালয় ছেড়ে দেন তার পরিবারকে যোগান দেয়ার জন্য। ১৯১২ সালে তিনি হাননেস কোলেমাইনেনের অলিম্পিক কীর্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত হন এবং একটি কঠোর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গড়ে তুলতে আরম্ভ করেন। নুরমির উন্নতি শুরু হয় সামরিক বাহিনীতে তার চাকরির সময় থেকে, তিনি জাতীয় পর্যায়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেন এবং তারপরেই ১৯২০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে যোগ দেন। ৫০০০ মিটারের দৌড়ে রৌপ্য জেতার পর তিনি যথাক্রমে ১০,০০০ মিটার ও মেঠো পথের দৌড়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ১৯২৩ সালে, নুরমি প্রথম দৌড়বিদ হিসাবে একাধারে মাইল দৌড়, ৫০০০ মি ও ১০,০০০ মি প্রতিযোগিতায় বিশ্ব রেকর্ড করেন, এ এমন এক কীর্তি যার আজ পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি হয়নি। মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনি ১৫০০ মি ও ৫০০০ মি রেসের দুইটি বিশ্ব রেকর্ড গড়েন, এবং দুই ঘণ্টার ব্যবধানে উভয় দৌড়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন ১৯২৪ অলিম্পিকে। আপাতদৃষ্টে প্যারিস তাপ প্রবাহ দ্বারা অনাক্রান্ত, নুরমি তার প্রতিটি রেসে জয়ী হন এবং পাঁচটি স্বর্ণপদক নিয়ে বাড়ি ফেরেন, যদিও তিনি হতাশ ছিলেন কারণ ফিনিশীয় কর্মকর্তারা তাকে ১০,০০০ মি দৌড়াতে দিতে অস্বীকার করে।

১৯২৫ সালে ক্লান্তিকর যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর আঘাত ও অনুপ্রেরণার সঙ্কটের সাথে লড়াই করতে করতে, নুরমি তার দীর্ঘদিনের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ভিল্লে রিতোলা ও এডভিন ওয়াইডকে আবিস্কার করেন আগের চেয়েও গুরুতর চ্যালেঞ্জকারী হিসাবে। ১৯২৮ এর গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে, নুরমি ১০,০০০ মিটারের শিরোপা পুনরুদ্ধার করলেও ৫০০০ মি দৌড় ও ৩০০০ মি স্টিপলচেসে সোনা জিততে ব্যর্থ হন। এরপর তিনি লম্বা দূরত্বের প্রতি মনোযোগ দেন, এক ঘণ্টার দৌড় ও ২৫ মাইল ম্যারাথন প্রভৃতি ইভেন্টে বিশ্ব রেকর্ড ভাঙেন। নুরমি চেয়েছিলেন তার ক্যারিয়ার কোনো ম্যারাথন স্বর্ণপদক জেতার মধ্য দিয়ে শেষ করতে, যেমনটা করেছিলেন তার আদর্শ কোলেমাইনেন। একটি বিতর্কিত ঘটনা যাতে ফিনল্যান্ড-সুইডেন সম্পর্ক শীতল হয় এবং একটি আন্তঃআইএএএফ যুদ্ধ সূচনা করে, তাতে ১৯৩২ সালের ক্রীড়াকে সামনে রেখে নুরমিকে অব্যহতি দেয় একটি আইএএএফ কাউন্সিল যারা নুরমির অপেশাদার অবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে; উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দুই দিন আগে, কাউন্সিল তাকে প্রতিযোগীর তালিকা থেকে বাদ দেয়। যদিও নুরমিকে কখনো পেশাদার ঘোষিত করা হয় না, ১৯৩৪ সালে তার অব্যহতি নিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং তিনি দৌড়ান থেকে অবসর নেন।

পরবর্তীতে নুরমি ফিনিশীয় দৌড়বিদদের প্রশিক্ষণ দেন, শীতকালীন যুদ্ধের সময় ফিনল্যান্ডের হয়ে তহবিল গঠন করেন, এবং জীবিকা নির্বাহ করেন হরেক মাল বিক্রেতা, ভবন নির্মাণ ঠিকাদার ও শেয়ারের দালাল হিসাবে, অবশেষে পরিণত হন ফিনল্যান্ডের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে। ১৯৫২ সালে, হেলসিঙ্কিতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে তিনি অলিম্পিক মশাল প্রজ্বলন করেন। নুরমির দৌড়ের গতি ও অধরা ব্যক্তিত্ব "ভূতুড়ে ফিন" প্রভৃতি ডাকনামের জন্ম দেয়, যখন তার অর্জন, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ও দৌড়ের স্টাইল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য- এ লম্বা-দূরত্বের দৌড়বিদদের অনুপ্রাণিত করে। নুরমি, যিনি কিনা হাতে থামা ঘড়ি ছাড়া দৌড়াতেন না বললেই চলে, তাকে "জোড় পদক্ষেপ" কৌশল ও দৌড়ের বিশ্লেষণী ধারা উদ্ভাবনের কৃতিত্ব দেয়া হয়, এবং কৃতিত্ব দেয়া হয় দৌড় প্রতিযোগিতাকে একটি মূখ্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

জীবন সূচনা[সম্পাদনা]

নুরমির জন্ম হয় ফিনল্যান্ডের টুরকুতে, কাঠমিস্ত্রি জোহান ফ্রেডরিক নুরমি ও তার স্ত্রী মাতিলদা উইলহেলমিনা লাইনের ঘরে। নুরমির ভাইবোন সিরি, সারা, মারতি ও লাহজার জন্ম হয় যথাক্রমে ১৮৯৮, ১৯০২, ১৯০৫ ও ১৯০৮ সালে। ১৯০৩ সালে, নুরমি পরিবার রাউনিসটুলা থেকে মধ্য টুরকুর একটি ৪০ বর্গমিটারের বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে পাভো নুরমি বাস করেছেন ১৯৩২ সাল পর্যন্ত। শিশু নুরমি ও তার বন্ধুরা লম্বা-দূরত্বের ইংরেজ দৌড়বিদ আলফ্রেড শ্রাব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়। তারা নিয়মিত ছয় কিলোমিটার (চার মাইল) দৌড়ে অথবা হেঁটে রুইসালোতে যেত সাঁতার কাঁটার জন্য, এবং ফিরে আসত, কখনো কখনো দিনে দুইবার। এগার বছর বয়সে, নুরমি ৫:০২ মিনিটে ১৫০০ মিটার দৌড়াত। নুরমি বাবা জোহান মারা যান ১৯১০ সালে এবং তার এক বছর মারা যান বোন লাহজা। পরিবারটি আর্থিক দুর্ভোগের মধ্যে পড়ায়, তাদের রান্নাঘর অপর একটি পরিবারকে ভাড়া দেয় আর নিজেরা একটিমাত্র ঘরে বাস করতে থাকে। মেধাবী ছাত্র নুরমি একটি বেকারিতে বাহকের কাজ নেয়ার জন্য বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। যদিও তার সক্রিয়ভাবে দৌড়াদৌড়ি বন্ধ হয়ে যায়, তবু টুরকুর খাড়া ঢালে ভারী ভারী মালবাহী গাড়ি ঠেলতে গিয়ে তার প্রচুর ব্যায়াম হয়। পরবর্তীতে সেই চড়াইগুলোকে তিনি তার পিঠ ও পায়ের পেশিকে শক্ত করার কৃতিত্ব দিয়েছেন।

১৫ বছর বয়সে, নুরমি খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহকে পুনরুজ্জীবিত করেন হাননেস কোলেহমাইনেনের ক্রীড়াকৌশলের দ্বারা, যার সম্বন্ধে বলা হোত তিনি ১৯১২ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে "ফিনল্যান্ডকে পৃথিবীর মানচিত্রে দৌড় করিয়েছেন"। কিছুদিন পর তিনি তার প্রথম জোড়া স্নিকার ক্রয় করেন। নুরমি প্রাথমিকভাবে গরমকালে ময়দানে দৌড়ে ও শীতকালে বরফের ওপর দৌড়ে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯১৪ সালে, নুরমি তুরুন আরহেইলুলিটো ক্রীড়া সঙ্ঘে যোগ দেন এবং ৩০০ মিটারে তার প্রথম রেস জেতেন। দুই বছর পর, তিনি হাঁটা, দৌড় ও ব্যায়ামের মধ্য দিয়ে তার প্রশিক্ষণকে ঝালিয়ে নেন। টুরকুতে এবি এইচ আহলবার্গ এন্ড কো কর্মশালায় নতুন চাকরির মাধ্যমে তিনি তার পরিবারের জন্য জোগান দেন, সেখানে তিনি কাজ করেন ১৯১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যতদিন না সেনাবাহিনীতে যোগ দেন পরি ব্রিগেডে একটি মেশিনগান কোম্পানিতে। ১৯১৮ সালের ফিনিশীয় গৃহযুদ্ধে, নুরমি রাজনৈতিকভাবে নিস্ক্রিয় থাকেন এবং তার কাজকর্ম ও অলিম্পিকের লক্ষ্য অর্জনে মনোনিবেশ করেন। যুদ্ধের পর, তিনি নবগঠিত ফিনিশীয় শ্রমিক ক্রীড়া ফেডারেশনে যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, বরং ফেডারেশনের প্রধানের উদ্দেশ্যে নিবন্ধ লেখেন এবং তার বহু সহকর্মী ও ক্রীড়াবিদদের মাঝে বিদ্যমান বৈষম্যের সমালোচনা করেন।