পাবনা রেলওয়ে স্টেশন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

নির্মাণাধীন দীর্ঘ শত বছরের স্বপ্নের পাবনা-ঈশ্বরদী রেলপথে প্রথম পরীক্ষামুলক ট্রেন আসলো পাবনা স্টেশনে। পাবনা জেলায় ১৯১৬ সালে ট্রেন চালু হওয়ার ১০১ বছর পর জেলা শহরে ট্রেন আসার জন্য ২৫ কিলোমিটার রেলপথ তৈরী করা হয়। আর এই পথ বেয়ে গত ১৪ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় ঈশ্বরদী স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা পরীক্ষামুলক ট্রেন। ট্রেনটি সকাল পৌনে ১১টায় পাবনা স্টেশনে পৌঁছায়। এসময় সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক রেখা রাণী বালো ট্রেনে আসা রেল কর্মকর্তাদের স্বাগত জানান।

রেল কর্মকর্তারা জানান, ঘন্টায় ৯৬ কিলোমিটার গতিতে ঈশ্বরদী থেকে পাবনা আসতে পরীক্ষামূলক ট্রেনেটির সময় লেগেছে ৪০ মিনিটের কিছু বেশী। এদিকে ট্রেন পাবনার বাইপাসে এসে পৌঁছার পর সাধারন মানুষের উচ্ছাসে এক আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তবে মানুষের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। রেললাইন নির্মানে মন্থর গতিতে পাবনা বাসীর মধ্যে হতাশা তৈরী হয়। কাজ শুরু হবার প্রায় ৫ বছর পর পরীক্ষা মূলক ট্রেন পাবনা স্টেশনে আসলেও কবে নাগাদ যাত্রীরা এই সেবা পাবে তা কেউ বলতে পারে নাই।

১০১ বছর পর পাবনায় রেল লাইন সম্প্রসারিত হলো। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঘটে যাচ্ছে বিপ্লব। জেলায় দৃশ্যমান উন্নয়নের মধ্যে এই রেলপথ একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। এটাই প্রমাণ করে পাবনা বাসীর চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে দুস্তর ফারাক ছিল না। পাট রপ্তানিকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ ৫৫ মাইল রেলপথ চালু করা হয় ১৯১৬ সালে। স্টেশন রয়েছে ১৫টি। পাবনায় রেললাইন বাস্তবায়নের দাবীতে ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে ৫ দিন ব্যাপী লাগাতার ভাবে হরতাল পালন করা হয়েছিল। ঈশ্বরদী-পাবনা ২৫ কিলোমিটার রেল লাইন নির্মাণ চুক্তির প্রায় ৫ বছর অতিক্রান্ত হলো। কাজও প্রায় শেষের দিকে। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল মাত্র দেড় বছর। গতিপথ নির্ণয়ে নকশা পরিবর্তন করায় অনেক সময় কেটে যায়। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১২ সালের ৬ নভেম্বরে।

ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালার চর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের অবস্থান লালপুর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া, পাবনা সদর, সুজানগর, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলা। ঈশ্বরদী মাজগ্রাম থেকে পাবনা সদর পর্যন্ত ২৫ কিমি লাইন নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয় ৩৮৯.৫৫ একর। পাবনা থেকে ঢালারচর পর্যন্ত ৬২৪.৬ একর মোট ১০১৪.২১ একর। মাজগ্রাম থেকে দাশুড়িয়া, টেবুনিয়া, পাবনা সদর, রাঘবপুর দুবলিয়া, তাতীবন্ধ, চিনাখরা, কাশিনাথপুর ও ঢালারচর। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৮২৮৬.৫৬ লাখ টাকা। অনুমোদিত ১৪৩৬০২.৬৭ লাখ টাকা।

অর্থায়নে রয়েছে জিওবি। ২০১০ সালের ৫ অকটোবরে একনেকে এ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এ প্রকল্পে ৭৮.৮০ কি.মি নতুন রেলপথ (মেইন লাইন) নির্মাণ লুপ লাইন থাকবে ১০.৮২ কি.মি। এই রেলপথে ৪০ ফুটেরও বেশি মেজর ব্রিজ থাকছে ১১টি। মাইনর ব্রিজ ১০৬টি। লেভেল ক্রসিং গেট ৫০টি। ৯টি বি ক্লাস এবং ২টি থার্ড ক্লাসসহ স্টেশন বিল্ডিং হবে ১১টি। প্লাটফরম ১২ হাজার ৯৬০ বর্গ মিটার। প্লাট ফরম শেড ২৪৩০ বর্গ মিটার। চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে কারার লাইট সিগন্যালিংসহ টেলি কমিউনিকেশন সিস্টেম ৮টি স্টেশন। কম্পিউটার বেজড ইন্টারলকিং কালার লাইট সিগন্যালযুক্ত ১টি স্টেশন। এ ছাড়া কার পার্কিং এরিয়া থাকবে ৫৬৮০ বর্গমিটার। ওভার ব্রিজ ১টি। এপ্রোচ রোড ২৬ হাজার ৪শ বর্গমিটার।

ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর ৭৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার রেলপথ নিমার্ণ প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ কাজ শেষ হয়েছে ২০১৩ সালে। পাবনা সদর এলাকায় জমি নেয়া হয় ১১ কিলোমিটার। ২০১০-২০১১ অর্থ বছরের এই প্রকল্পের কাজের গতি একটুখানি থেমে যায় ফিজিবিলিটি স্টাডি করার জন্যে। তিনবার স্টাডি করা হয়। প্রস্তাবিত রেললাইনের সঠিক গতি পথ নির্ণয়ে তিন দফা পরিবর্তন করা হয় নকশা। একারণে কেটে যায় এক বছর। প্রথমবার প্রস্তাবিত রেলপথ ছিল পাবনা-ঢাকা ভায়া আতাইকুলা-বনগ্রাম বাজারের দক্ষিণ দিক হয়ে ঢালারচর। এ পথ বাতিল করে আতাইকুলার কাছে মহাসড়ক ক্রস করা হয়। রাখা হয় ক্রসিং ব্যবস্থা। তৃতীয় বারে আর একটু পরিবর্তন আনা হয়। মহেন্দ্রপুর ও টেবুনিয়াবাসীর কয়েকজন পাবনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন রেলপথ সামান্য পরিবর্তনের জন্যে।

রেল পথঃ আগের কথা ১৮৭১ এর প্রথম দিন ৭৫ কিমি দীর্ঘ গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেল লাইন উদ্বোধন করা হয়। এসময় এ অঞ্চলে নীল বিদ্রোহের দাবানল স্তিমিত হয়ে আসে। রেলের কাজ চলতে থাকে অবিরাম। সাড়া ঘাট থেকে চিলহাটি হয়ে ভারতের শিলিগুড়ি পর্যন্ত আড়াই শ কিলোমিটার দীর্ঘ মিটার গেজ রেল লাইন স্থাপন সম্পন্ন হয় ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। তখন দামুকদিয়া থেকে পোড়াদহ পর্যন্ত ব্রডগেজ রেল লাইন সংযোজন করে। সে সময় ব্রড গেজ, মিটার গেজ ও ন্যারো গেজ এই তিন রকমের রেলপথ প্রবর্তন করা হয়।

১৯১৫ সালে চালু করা হয় ঈশ্বরদী-পাকশী রেলপথ। মিটার গেজ লাইন সাড়াঘাট হতে রাজশাহীর আত্রাই পর্যন্ত খোলা হয়। এর কিছু অংশ পাবনার মধ্যে পড়েছে। অপর দিকে খুলনা হতে পার্বতীপুর পর্যন্ত শাখা রেলপথটির ঈশ্বরদী-পাকশীর মধ্যে ৮.৩৫ কিলো বা ৫ মাইল দীর্ঘ। এ অংশটুকু পাবনার প্রধান ব্রডগেজ রেলপথ। হার্ডিঙ্গ সেতুর ওপর দিয়ে রেলপথটি পদ্মা নদী অতিক্রম করে পাবনা জেলাকে কুষ্টিয়া জেলার সাথে সংযুক্ত করেছে। এছাড়া উত্তর পূর্ব দিকে ৫৬ মাইল দীর্ঘ একটি শাখা রেলপথ ঈশ্বরদীকে সংযুক্ত করেছে সিরাজগঞ্জকে।

এ জেলায় প্রায় একশ বছর পর রেলপথ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ব্যবসায়ীদের মনে জেগে উঠবে আশার আলো। দূর হয়ে যাবে পরিবহন স্বার্থস্রোত। দেশের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার অঙ্গ হলো রেলপথ। এর নির্মাণ গতি ত্বরান্বিত করা দরকার। বর্তমানে এ জেলায় ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রুটে ১৬টি রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যে মুলাডুলি, চাটমোহর, গুয়াখরা, ভাঙ্গুড়া, বড়াল ব্রিজ ও শরৎনগর স্টেশন পর্যন্ত পাবনার মধ্যে। ঈশ্বরদী হতে পাকশী পর্যন্ত পাঁচ মাইল মেইন লাইন পাবনায় পড়ে। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের পর পাবনায় রেলপথ নির্মিত হয়নি।

পাবনা কেন্দ্রিক রেলপথের ইতিহাস যোগাযোগের মহিমা উপলদ্ধি করতে পারলে ত্বরান্বিত হয় উন্নয়নের ধারা। এটা দেখিয়ে গেছে বৃটিশ সরকার। এরই রেশ ধরে শেখ হাসিনার সরকার পাবনার ঈশ্বরদী থেকে বেড়া উপজেলার ঢালার চর পর্যন্ত রেল পথ উন্নয়নের কাজ হাতে নেয়। এ প্রকল্পের তিন ভাগের এক ভাগ কাজ শেষ পর্যায়ে।

পাবনা শহরে কোন রেলপথ নেই। ঈশ্বরদী জংশন থেকে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ এবং সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেল যোগাযোগ রয়েছে। যাত্রী চলাচল ও পণ্য দ্রব্য আমদানি-রফতানি সুবিধার জন্যে শহরে একটি আউট এজেন্সি খুলেছিল পাকিস্তান ইস্টার্ণ বেঙ্গল রেলওয়ে। টিকিট ও নানা প্রকার মালামাল বুকিং এবং ডেলিভারির ব্যবস্থা ছিল। এর আগে অবশ্য বৃটিশ সরকারের আমলে অর্থাৎ ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পাবনা বিশ্বাস মটর সার্ভিস লিমিটেডের ওপর এই আউট এজেন্সি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল।

১৯৬৩ সালের জুনে রেলপথের নিয়ন্ত্রণ ভার তৎকালিন প্রাদেশিক সরকারের আওতায় আসে। দ্বিতীয় পাঁচ সালা পরিকল্পনায় এ প্রদেশের জন্য বিয়াল্লিশ কোটি সাতাত্তর লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ সময় ঈশ্বরদী-নগরবাড়ী রেলপথ স্থাপনের কথা বিবেচনা করা হয়। প্রাদেশিক যোগাযোগ মন্ত্রী খাজা হাসান আসকারী ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ৮ জুনে পূর্ব রেলওয়ের বাজেট পেশ করেন। ১৯৬৪-১৯৬৫ অর্থ বছরের বাজেটে তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরদী-নগরবাড়ী (৪৫ মাইল) লাইনে জরিপ কাজ শুরু করা হয়েছে।’ এর পরপরই জমি অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর এ প্রকল্পের ফাইল চাপা পড়ে যায়। কয়েক বছর পরে রেলপথ বাস্তবায়নের দাবি চাঙ্গা হতে থাকে। এক সময় আন্দোলন থেমে যায়।

বৃটিশ সরকার রেলপথ সম্প্রসারণের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি ঈশ্বরদী সাড়াঘাট থেকে রাজশাহীর আত্রাই পর্যন্ত রেললাইন খোলার আদেশ দেন। এ রুটে সাড়াঘাট হতে নাটোরের গোপালপুর স্টেশন পর্যন্ত এই লাইনের দশ মাইল পথ পাবনার মধ্যে ছিল। এ ছাড়া সর্ব প্রথম যে রেলপথ নির্মিত হয় তা কলকাতা হতে ঈশ্বরদী হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত সামান্য অংশ এ জেলায় পড়ে। ইস্টান বেঙ্গল গ্যারান্টেড রেলওয়ে কোম্পানি কলকাতা হতে পদ্মা নদীর দক্ষিণপাড় কুষ্টিয়ার দামুকদিয়া পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন।

উত্তরপাড় সাড়াঘাট হতে শিলিগুড়ি পর্যন্ত মিটার গেজ লাইন খোলা হয়। ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই রেলপথ গুলি তখনকার কোম্পানি সরকার অধিকার ভুক্ত করে। এই ইতিহাসের সঙ্গে এবারে যুক্ত হতে যাচ্ছে ঈশ্বরদী-ঢালার চর রেলপথ। ঢালার চর থেকে আরিচা রুটে সেতু নির্মিত হলে বিপ্লব ঘটে যাবে রেল যোগাযোগের মানচিত্রে।