পাকিস্তানে নারী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজের একজন নারী অধ্যাপক পাকিস্তানের জাতীয় পোশাক সালোয়ার কামিজ পরিহিত অবস্থায়

পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, অখণ্ড ভারত থেকে মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র গঠনের জন্য পাকিস্তান আন্দোলন হয়েছিলো[১], মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক হিসেবে পরিচিত তিনি মুসলিম নারীদের শিক্ষা এবং অন্যান্য স্বাধীনতা চাইতেন। স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানে তার বানানো নীতিতে পাকিস্তানি নারীরা জীবন গঠন করা শুরু করে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের একেবারে শুরুর দিকে রা'না লিয়াকত আলি খান (পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের স্ত্রী) পাকিস্তানের নারীদের জন্য অনেক উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের অংশ বলেই মনে করতেন তিনি। শুরুর দিকে পাকিস্তানি নারীরা শাড়ি পড়তেন এবং পাকিস্তানের নারীদের জাতীয় পোশাক কি হবে তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের সময়ই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলে দিয়েছিলেন যে, হিন্দুস্তানি অর্থাৎ ভারতীয় নারীদের মত আমাদের পাকিস্তানি নারীরা পোশাক পরবেনা। পাকিস্তানি নারীদের জন্য সালোয়ার কামিজ পরার প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন যদিও পোশাকটিকে তখনো জাতীয় পোশাকের মর্যাদা দেওয়া হয়নি, পোশাকটি জাতীয় পোশাকের মর্যাদা পায় সত্তরের দশকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর শাসনামলে এবং তা আজ অবধি চলমান।[২] যদিও পাকিস্তানে নারীদের পোশাকের ব্যাপারে কোনো কড়াকড়ি রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা বা কোনো ধরণের নির্দেশ নেই তবে কিছু ব্যতিক্রম বাদে পাকিস্তানের সব নারী সালোয়ার কামিজ পরেন।[৩] রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পাকিস্তান টেলিভিশনে নারীদের সালোয়ার কামিজ পরে খবর পাঠ করা বাধ্যতামূলক।

ইতিহাস এবং নারীসমাজ[সম্পাদনা]

পাকিস্তান আন্দোলনেই অনেক নারী স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের জন্য অংশ নিয়েছিলেন[৪] যারা ভারতকে ভেঙে একটি পৃথক এবং স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন দেখতেন যেটা হবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের সংস্কৃতি হবে মুঘল সাম্রাজ্যের সংস্কৃতির মত, অর্থাৎ পাকিস্তানের সংস্কৃতির শেকড় মুঘলদের মত হবে এটা পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের শুরুতেই চিন্তাভাবনা করা হচ্ছিলো। মুঘল পোশাক পাকিস্তানের মূলে থাকবে এমনটা বলতেন পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, তিনি পাকিস্তানের জন্মের ভিত্তির পেছনে মুঘলদের ভূমিকাকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ করে তুলেছিলেন।[৫]

পাকিস্তানের নারী সমাজের প্রগতির পথীকৃৎ ছিলেন ফাতেমা জিন্নাহ, তিনি পাকিস্তানি নারীদের শিক্ষা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই - এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনিও প্রথমে ভারতীয়দের মত শাড়ি পরলেও পরে সালোয়ার কামিজ পরা শুরু করেন। পাকিস্তানের রাজনীতি, সরকারী চাকরী, আমলাতন্ত্র সব ধরণের চাকরিতে নারী নিয়োগ মূলত ফাতেমার কথাতেই শুরু হয়েছিলো। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং শক্তি। রা'না লিয়াকত আলি খান অল পাকিস্তান উইমেন অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন পাকিস্তানের নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য। পাকিস্তানের রাজনীতিতে বেনজীর ভুট্টোর প্রধানমন্ত্রীত্ব ছিলো মুসলিম বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত। ২০১১ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত হিনা রব্বানী খারই ছিলেন প্রথম নারী। পাকিস্তানের সমাজে শুরু থেকেই সামাজিক কুসংস্কার দূর করার জন্য নারীদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে, এবং নারীরা সাধারণ শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পর্যন্ত হতে পারেন, অসামরিক প্রায় সব কাজে নারীরা চাকরি পাবার সুযোগ পেলেও সামরিক বাহিনীতে কম পান যদিও সামরিক চিকিৎসা খাতে নারীদের মেজর জেনারেল বা লে. জেনারেলের মত বড় পদবী পেতে দেখা গেছে।[৬] পাকিস্তানে পাকিস্তান জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দল সমাজের বিকাশ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং মেয়েদেরকে ক্রিকেট খেলতে উদ্বুদ্ধ করে।[৭] অন্যান্য ক্রীড়াতেও নারীরা অংশ নেন উদাহরণস্বরূপ সারাহ মাহবুব খান পাকিস্তানের একজন নামকরা টেনিস খেলোয়াড়।[৮]

পাকিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষতা রয়েছে তবে তা সত্তরের দশকের পর থেকে সামরিক শাসক জেনারেল মুহাম্মদ জিয়া-উল-হকের শাসনামল থেকে একটু অন্যরকম হয়ে যায় এবং তখন থেকে পাকিস্তানের সমাজে যৌন বিভাজন শুরু হয় আর প্রেম করে বিয়ে করাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে এবং সম্মান রক্ষার্থে হত্যার মত ঘটনা ঘটতে থাকে।[৯] সমাজে নারী এবং পুরুষ কেউই সহজে প্রেম করে জীবনসঙ্গী বেছে নিতে পারেনা,[১০] পরিবার এবং সমাজ প্রেমযুগলদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে আর নারীহত্যার মত ঘটনাও ঘটে।

উর্দু সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নারীদের অংশগ্রহণ আগে থেকেই রয়েছে এবং পাকিস্তানে এখনো প্রচুর নারী সাহিত্যিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণকারী বুশরা রহমান রাজনীতি করা সহ পাকিস্তানের সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন, তিনি সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সিতারা-ই-ইমতিয়াজ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।[১১]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Samin Ghilaman (১৪ আগস্ট ২০১১)। "Women in and beyond Pakistan Movement"tribune.com.pk 
  2. "Pakistan Ulemas Reject Honor Killings"। ৩১ মে ২০১৪। ১৩ জুলাই ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  3. "Lady wardens to manage Lahore city traffic"। ২৮ মার্চ ২০১৪। ১২ জুলাই ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। 
  4. "Powerful Women of the Pakistan Movement"dawn.com 
  5. Mariam S. Pal (২০০০)। Women in Pakistan: Country Briefing Paper (PDF)। Asian Development Bank। আইএসবিএন 978-971-561-297-5। ৫ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। 
  6. "Pakistan's first female two-star general on what it takes to be successful"geo.tv। ৮ মার্চ ২০১৮। 
  7. Shayan Acharya (১৩ জুন ২০২০)। "Sana Mir: Collective will needed to sustain women's cricket"thehindu.com 
  8. Bora, Saurav (২০১৬-০২-১১)। "'Hard for Pak women to excel in tennis' - Interview - Sarah Mahboob"The Telegraph। ABP। সংগ্রহের তারিখ ২০১৬-১২-১১Sarah, who became the youngest-ever national champion at the age of 14, had come back to Pakistan in May last year after graduating from James Madison University in Virginia (US) where she played for their team for four years. 
  9. "'Honour killings': Pakistan closes loophole allowing killers to go free"। ৬ অক্টোবর ২০১৬ – www.bbc.com-এর মাধ্যমে। 
  10. "Pakistan police defend actions over Lahore honour killing"bbc.com। ৩০ মে ২০১৪। 
  11. "Khalid Maqbool confers civil awards on 46"Daily Times। ২৭ মার্চ ২০১৪। ২৭ মার্চ ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০১৭