পটলাক

পটলাক হলো এমন একটি অনুষ্ঠান, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকে সবার সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার জন্য একটি করে খাবারের পদ নিয়ে আসেন। এসব পদের মধ্যে সালাদ, প্রধান খাবার ও মিষ্টান্ন থাকতে পারে। পটলাক সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায় বা সংস্থার সদস্যদের মধ্যে অথবা ব্যক্তিগতভাবে বাড়িতে আয়োজন করা হয়। অন্যান্য অধিকাংশ ভোজের আয়োজনের তুলনায় এর ধরন আলাদা, কারণ এখানে আয়োজক নিজে সব খাবার প্রস্তুত করেন না; ফলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশার সুযোগও বেশি থাকে। সমাজবিজ্ঞানী অ্যালিস জুলিয়ার মতে, পটলাকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রাচুর্য, কী পরিবেশন করা হবে সে সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এবং বৈচিত্র্য। অতিথি আপ্যায়ন সম্পর্কে ভিন্ন মূল্যবোধসম্পন্ন সংস্কৃতিতে এসব বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে পটলাকের আদলে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রচলন থাকলেও এর প্রধান আধুনিক রূপটি উত্তর আমেরিকায় বিকশিত হয়। এর পূর্ববর্তী রীতিতে অতিথিরা আয়োজকের হাঁড়িতে রান্না করা খাবার থেকে নিজেদের ভাগ্য অনুযায়ী খাবার পেতেন। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে পটলাক বিভিন্ন সংস্থার তহবিল সংগ্রহের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ এটি সামাজিক মেলামেশার একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়।
নাম
[সম্পাদনা]পটলাকের বিভিন্ন নাম প্রচলিত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে এটি “বাস্কেট মিল” এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে “কভারড ডিশ সাপার” নামে পরিচিত। অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছে “পটলাক ডিনার”, “পিচ-ইন”, “শেয়ার্ড লাঞ্চ”, “স্প্রেড”, “ফেইথ সাপার”, “ক্যারি-ইন ডিনার”[১], “ফাডল”, “ডিশ পার্টি”, “জ্যাকবস জয়েন”[২], “ব্রিং-এ-প্লেট”[৩], “পট-প্রোভিডেন্স” এবং “ফেলোশিপ মিল”।
এই শব্দটির প্রথম পরিচিত ব্যবহার ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এটি পট ও লাক এই দুটি শব্দ থেকে গঠিত[৪]। শব্দটির সঙ্গে পটল্যাচ প্রথার কোনো সম্পর্ক নেই; বরং পটল্যাচ শব্দটি পরে প্রচলিত হয়।[৫]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]প্রথমদিকে ‘পটলাক’ বলতে এমন একটি ধারণাকে বোঝাত, যেখানে সম্মিলিত আগুনে রাখা হাঁড়ি-পাতিল এবং সেগুলোর ভেতরে কী ধরনের খাবার রয়েছে, তা না জেনেই খাবার গ্রহণ করাকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হতো। উত্তর আমেরিকায় পরবর্তীতে শব্দটি এমন অনুষ্ঠান বোঝাতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা খাবারের পদ নিয়ে আসতেন[৫]। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছিল, সে সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও একই ধরনের রীতির অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। এর উদাহরণ হিসেবে পিকনিকের প্রাথমিক রূপ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর আগের স্মর্গাসবোর্ডের কথা বলা যায়।[৬][৭] প্রাথমিক আমেরিকান পটলাকগুলো প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জাগুলো আয়োজন করত। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘটকালি, গোষ্ঠীগত সংহতি সৃষ্টি, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ এবং তহবিল সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতো।[৫]
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে আমেরিকান অভিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে গির্জাকেন্দ্রিক পটলাকের প্রচলন ঘটে। ১৯৩০-এর দশকের মধ্যে ১৮৪০-এর দশকে বর্ণিত নরওয়েজীয় কৃষকদের স্ত্রীদের “ভাগ করে নেওয়া এবং একে অপরকে দেওয়ার জন্য” বহু পদের খাবার একত্র করার মতো দৃশ্যগুলো সেকেলে হয়ে পড়ে। এর পরিবর্তে পটলাক প্রায়ই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অতিথিদের আপ্যায়নকারী জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর তহবিল সংগ্রহের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে গির্জা ও অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের জন্য পটলাক ছিল একটি সাধারণ তহবিল সংগ্রহের কার্যক্রম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রেশনিং চালু হলে পটলাক পরিবারগুলোকে প্রত্যেক অতিথির জন্য আলাদাভাবে খাবারের ব্যবস্থা না করেও আপ্যায়নের সুযোগ করে দেয়। ১৯৫০-এর দশকেও পটলাকের জনপ্রিয়তা বজায় থাকে। এ সময় টাপারওয়্যারের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠানে খাবার বহন করা আরও সহজ হয়ে ওঠে। পটলাকে বিন সালাদ ছিল একটি সাধারণ পদ; একইভাবে ক্যাসেরোলও জনপ্রিয় ছিল, কারণ এটি সহজে তৈরি করা যেত এবং বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল। রান্নার বইগুলোতে পটলাকে ভালো অভিজ্ঞতা তৈরির নানা পরামর্শ দেওয়া হতো এবং এ ধরনের অনুষ্ঠানে সামাজিক প্রত্যাশাও বাড়তে থাকে। লেখিকা পেগ ব্র্যাকেন তাঁর ‘দ্য আই হেট টু কুক বুক’ বইয়ে এই প্রবণতাকে ব্যঙ্গ করেন এবং পটলাকে ন্যূনতম সামাজিক প্রত্যাশা কীভাবে পূরণ করা যায়, সে বিষয়ে রসিকতার সঙ্গে পরামর্শ দেন।
ধারণা
[সম্পাদনা]
পটলাক অনুষ্ঠানে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী রান্না করা ও পরিবেশনের উপযোগী একটি খাবারের পদ নিয়ে আসেন এবং খাবার প্রস্তুতের কাজে অংশ নেন। খাবারের মধ্যে সালাদ, প্রধান খাবার ও মিষ্টান্ন থাকতে পারে।[৮][৫] ব্যক্তিগতভাবে খাবার প্রস্তুত করার এই রীতির কারণে পটলাক প্রচলিত ভোজের আয়োজন থেকে আলাদা।
পটলাক বাড়ির ভেতরে ও বাইরে উভয় স্থানেই অনুষ্ঠিত হয়। ঘরের ভেতরের পটলাকগুলো সাধারণত কোনো সম্প্রদায় বা সংগঠনকে একত্র করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং সামাজিক মেলামেশার সুযোগ হিসেবে আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে চপ সুয়ে, স্প্যাগেটি বোলোনেজ এবং টুনা ক্যাসেরোলের মতো বিভিন্ন ক্যাসেরোলজাতীয় খাবার প্রায়ই দেখা যায়।
সামাজিক রীতিনীতি
[সম্পাদনা]পটলাকের একটি প্রধান সামাজিক প্রত্যাশা হলো, প্রতিটি খাবারের পরিমাণ যেন অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের একটি বড় অংশের মধ্যে ভাগ করে খাওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়। অন্যান্য সামাজিক নিয়মের মধ্যে রয়েছে সময়মতো উপস্থিত হওয়া, অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণ না করে হালকা সামাজিক মেলামেশা করা এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি খাবার পরিবেশন করা। সমাজবিজ্ঞানী অ্যালিস জুলিয়ার লিখেছেন, সব ধরনের সামাজিক ভোজনের পেছনেই সাধারণত এই ধারণা কাজ করে যে কেউ কিছু দিলে তার প্রতিদান দেওয়া হবে; তবে পটলাকে এই বিনিময়টি যে এত দ্রুত ঘটে, সেটিই এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য।[৯]
আমেরিকান ভোজনসংস্কৃতিতে পটলাক সবচেয়ে কম আনুষ্ঠানিক ধরনের অনুষ্ঠানগুলোর একটি। এখানে অতিথি ও আয়োজকের জন্য প্রচলিত ভিন্ন সামাজিক প্রত্যাশা থাকে না এবং এটি সাধারণ ভোজের প্রচলিত কাঠামো থেকেও আলাদা। জুলিয়ারের মতে, পটলাকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রাচুর্য, অনিশ্চয়তা ও বৈচিত্র্য। ব্রিটেনে, যেখানে পটলাক সাংস্কৃতিকভাবে তেমন প্রতিষ্ঠিত নয়, এসব বৈশিষ্ট্য কখনো কখনো উদ্বেগের সৃষ্টি করে এবং এমন ধারণার জন্ম দেয় যে আয়োজকেরা কৃপণতা করছেন বা যথেষ্ট আতিথেয়তা দেখাচ্ছেন না।[১০]
সমসাময়িক আমেরিকায় পটলাক সামাজিক মেলামেশার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এখানে প্রতিটি খাবার অংশগ্রহণকারীরাই নিয়ে আসেন, ফলে আয়োজক ও অতিথির প্রচলিত ভূমিকা কিংবা সামাজিক মর্যাদার মতো বিষয়গুলো অনুষ্ঠান পরিচালনায় তেমন প্রভাব ফেলে না। সমাজবিজ্ঞানী জোসেফ গাসফিল্ডের মতে, খাবারই এখানে কথোপকথনের অন্যতম প্রধান বিষয়। এর মাধ্যমে মানুষ নিজেদের পছন্দ, দক্ষতা ও পরিচয় সম্পর্কে পারস্পরিকভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় এবং আলোচনার জন্য একটি অভিন্ন ভিত্তি তৈরি হয়।[১১]
ধর্ম
[সম্পাদনা]পটলাক নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি সমালোচনামূলক মনোযোগ পড়েছে গির্জার নৈশভোজে এর প্রচলনের ওপর।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "carry-in dinner"। Dictionary of American Regional English। ১১ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ জানুয়ারি ২০২১।
- ↑ "World Wide Words: Jacob's Join"। www.worldwidewords.org। ৯ আগস্ট ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৬ মে ২০২০।
- ↑ "What does it mean when you're asked to 'bring a plate'?"। Food (ইংরেজি ভাষায়)। ৯ জুলাই ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ১৩ অক্টোবর ২০২২।
- ↑ "potluck, n."। OED Online। Oxford University Press। সংগ্রহের তারিখ ১০ অক্টোবর ২০২৫।
- 1 2 3 4 Jaine 2014, Potluck।
- ↑ Davidson 2014c, picnic।
- ↑ Davidson 2014b, Smörgåsbord।
- ↑ Brown-Micko, Julie (৩০ অক্টোবর ২০১৫)। "Culinary Curiosities: What's the History of the Potluck"। foodservicenews.net (ইংরেজি ভাষায়)। ১৯ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৯ এপ্রিল ২০২৩।
- ↑ Davidson 2014a, Casserole।
- ↑ Julier 2013, পৃ. 149।
- ↑ Julier 2013, পৃ. 147–148।
আরো পড়ুন
[সম্পাদনা]- Aldrich, Elizabeth (২০২৩)। Casseroles, Can Openers, and Jell-O: American Food and the Cold War, 1947–1959। State University of New York Press। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪৩৮-৪৯৩০৬-০।
- Davidson, Alan; Jaine, Tom, সম্পাদকগণ (২০১৪)। The Oxford Companion to Food (3rd সংস্করণ)। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮০১৯১৭৫৬২৭৬।
- Davidson, Alan (2014a)। "Casserole"। Davidson & Jaine (2014)। Harvc ত্রুটি: no target: CITEREFDavidsonJaine2014 (সাহায্য)
- Davidson, Alan (2014b)। "Smörgåsbord"। Davidson & Jaine (2014)। Harvc ত্রুটি: no target: CITEREFDavidsonJaine2014 (সাহায্য)
- Davidson, Jane (2014c)। "Picnic"। Davidson & Jaine (2014)। Harvc ত্রুটি: no target: CITEREFDavidsonJaine2014 (সাহায্য)
- Jaine, Tom। "Potluck"। Davidson & Jaine (2014)। Harvc ত্রুটি: no target: CITEREFDavidsonJaine2014 (সাহায্য)
- Fieldhouse, Paul (১৯৯৫)। Food and Nutrition: Customs and Culture (2nd সংস্করণ)। London: Chapman & Hall। আইএসবিএন ০-৪১২-৫৮১১০-৮।
- Gabaccia, Donna R (১৯৯৮)। We Are What We Eat: Ethnic Food and the Making of Americans। Cambridge, Massachusetts and London: Harvard University Press। আইএসবিএন ০-৬৭৪-০০১৯০-৭।
- Inness, Sherrie A (২০০১)। Dinner Roles: American Women and Culinary Culture। Iowa City: University of Iowa Press। আইএসবিএন ০-৮৭৭৪৫-৭৬৩-৮।
- Lovegren, Sylvia (১৯৯৫)। Fashionable Food: Seven Decades of Food Fads। New York: Macmillan। আইএসবিএন ৯৭৮-০-০২-৫৭৫৭০৫-৯।
- Julier, Alice (২০১৩)। Eating Together: Food, Friendship, and Inequality। University of Illinois Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-২৫২-০৩৭৬৩-৪।
- Kittredge, Katharine (২০২১)। "Dishwater Hands across the Pantry"। Harde, Roxanne; Wesselius, Janet (সম্পাদকগণ)। Consumption and the Literary Cookbook। New York and Abingdon, Oxon: Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৩৬৭-৬৩৫৩০-৫।
- Mosby, Ian (২০১৪)। Food Will Win the War: The Politics, Culture, and Science of Food on Canada’s Home Front। Vancouver: UBC Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৭৪-৮২৭৬৩-৮।