পঞ্চগব্য

পঞ্চগব্য অথবা পঞ্চকব্যম্ (সংস্কৃত: पञ्चगव्यम् pañcagavya; তামিল: பஞ்சகவ்யம் pañcakavyam) হল হিন্দুধর্মে প্রচলিত এক প্রকার মিশ্রণ যা পাঁচটি উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয় এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। এর তিনটি মূল উপাদান হল দুধ, ঘি, মাখন এবং দই ও পনির। এই উপাদানগুলি একত্রিত করে গেঁজিয়ে এই মিশ্রণ প্রস্তুত করা হয়। সংস্কৃত 'পঞ্চগব্য' শব্দটির অর্থ হল "গোরু থেকে প্রাপ্ত পাঁচটি দ্রব্য"। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় যখন এটি ব্যবহার করা হয়, তখন একে কাওপ্যাথি (Cowpathy)-ও বলা হয়।[১]
ঝুঁকি
[সম্পাদনা]প্রবক্তারা দাবি করেন যে গোমূত্র চিকিৎসা নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারসহ বেশ কিছু রোগ নিরাময়ে সক্ষম, যদিও এই দাবিগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।[২][৩] প্রকৃতপক্ষে, পঞ্চগব্যের একক উপাদানসমূহ যেমন গোমূত্র সেবন সংক্রান্ত গবেষণায় কোনো ইতিবাচক উপকারিতা দেখা যায়নি, বরং খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যুসহ মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।[৪] এ ছাড়া গোমূত্র ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া এবং লেপটোস্পাইরোসিসের মতো সংক্রামক রোগের উৎস হতে পারে।[৫]
চিকিৎসা বহির্ভূত প্রয়োগ
[সম্পাদনা]কৃষিকাজে পঞ্চগব্য সার ও কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।[৬][৭] প্রবক্তাদের দাবি অনুযায়ী, এটি হাঁস-মুরগির খাদ্যে বৃদ্ধিবর্ধক হিসেবে কাজ করে, মাছের খাবারের জন্য প্ল্যাঙ্কটন বৃদ্ধিতে সক্ষম এবং এটি গোরুর দুধ উৎপাদন, শূকরের ওজন ও হাঁস-মুরগির ডিম পাড়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।[৮] কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি প্রসাধনী সামগ্রীর ভিত্তি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।[৯]
ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান
[সম্পাদনা]১৮৯৫ খ্রি. সালের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩০২ ব.) মাসে 'ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি'-তে (পৃষ্ঠা ১৬৮-১৬৯)[১০] জানানো হয়েছিল যে, ব্রাহ্মণদের শুদ্ধিকরণে গোবরের সাধারণ ব্যবহার ছিল এবং হিন্দুরা পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে এটি ভক্ষণ করত:
"পঞ্চগব্য হিসেবে দুধ, দই, পনির, ঘি এবং মাখন, এই পাঁচটি দ্রব্য নিয়ে পঞ্চগব্য গঠিত, যা দক্ষিণ ভারতে পূজা করা হয়। নতুন মাটির পাত্রে এই পাঁচটি দ্রব্য ঢেলে সেগুলি পরিষ্কার করা হয়। পাঁচটি পাত্র দর্ভ ঘাসের ওপর রেখে পূজা করা হয়। এগুলিকে 'পঞ্চগব্য দেবতা' বলা হয় এবং উপাসক এদের গুণ ও মাহাত্ম্য চিন্তা করেন, ফুল অর্পণ করেন এবং মনে মনে একটি স্বর্ণসিংহাসন উৎসর্গ করেন। এরপর জল ছিটিয়ে আরতি করা হয়। পাত্রগুলিকে রঙিন চাল দিয়ে সাজানো হয় এবং মানসিকভাবে অলঙ্কার, মূল্যবান পোশাক ও চন্দন নিবেদন করা হয়। ফুল, ধূপ, প্রদীপ, কলা এবং পান নিবেদনের পর গভীর প্রণাম জানিয়ে নিম্নলিখিত প্রার্থনাটি পাঠ করা হয়:
'হে পঞ্চগব্য, আমাদের পাপ এবং সেই সকল প্রাণীর পাপ ক্ষমা করো যারা তোমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে এবং তোমাকে পান করে। তুমি গোরুর দেহ থেকে উৎপন্ন হয়েছ; তাই আমি প্রার্থনা করি তুমি আমার পাপ ক্ষমা করো এবং আমার শরীর শুদ্ধ করো। আমি, যে তোমার পূজা করছি, আমাকে পাপমুক্ত করো। আমাকে ক্ষমা করো ও রক্ষা করো।'
দ্বিতীয়বার প্রণাম এবং হরি-স্মরণের পর পাঁচটি দ্রব্য একটি পাত্রে মেশানো হয়; পুরোহিত সামান্য পান করেন এবং উপাসকদের অঞ্জলিতে তা ঢেলে দেন ও তাঁরাও তা পান করেন। এই মিশ্রণের মতো শুদ্ধিকরণ আর কিছুতে নেই। সকল ভারতীয় প্রায়ই এটি পান করেন। পাঁচটি অমৃত, দুধ, দই, মাখন, চিনি এবং মধু, উপকারী হলেও এর তুলনায় অনেক কম শক্তিশালী।"
প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির হিন্দু দেবী শ্রীলক্ষ্মী অদৃশ্যভাবে গাভিকে ভালোবাসতেন। [১২][১৩]
গঙ্গোত্রীর পঞ্চ গঙ্গোত্রী মন্দির রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি. (৬ বৈশাখ ১৪৩৩ ব.) থেকে তীর্থযাত্রীদের জন্য পঞ্চগব্য সেবন বাধ্যতামূলক করেছে। [১৪]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Ramachandran, R. (২ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। "Of 'cowpathy' & its miracles"। Frontline। ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ Nelson, Dean (১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯)। "India makes cola from cow urine"। The Daily Telegraph। সংগ্রহের তারিখ ৩০ এপ্রিল ২০১০।
- ↑ Buncombe, Andrew (২১ জুলাই ২০১০)। "A cure for cancer – or just a very political animal?"। The Independent। ২২ জুলাই ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২১ মার্চ ২০১১।
- ↑ Oyebola, D. D.; Elegbe, R. A. (জুন ১৯৭৫)। "Cow's urine poisoning in Nigeria. Experimental observations in mice"। Tropical and Geographical Medicine। ২৭ (2): ১৯৪–২০২। পিএমআইডি 1179485।
Results of the experiments show that both "cow's urine" and nicotine cause excitement in low doses and cause convulsion and/or death in higher doses. Both also depress respiration.
- ↑ Sharma, S.; Vijayachari, P.; Sugunan, A. P.; Sehgal, S. C. (অক্টোবর ২০০৩)। "Leptospiral carrier state and seroprevalence among animal population – a cross-sectional sample survey in Andaman and Nicobar Islands"। Epidemiology & Infection। ১৩১ (2): ৯৮৫–৯৮৯। ডিওআই:10.1017/S095026880300880X। পিএমসি 2870044। পিএমআইডি 14596541।
- ↑ Dhama, K.; Rathore, Rajesh; Chauhan, R. S.; Tomar, Simmi (২০০৫)। "Panchgavya (Cowpathy): An overview"। International Journal of Cow Science। ১ (1): ১–১৫। আইএসএসএন 0973-2241। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ Yadav, Birendra Kumar; Lourduraj, A. Christopher (২০০৫)। "Use of Panchagavya as a Growth Stimulant and Biopesticide in Agriculture"। Kumar, Arvind (সম্পাদক)। Environment & Agriculture। New Delhi: APH Publishing। পৃ. ৬৫–৭০। আইএসবিএন ৮১-৭৬৪৮-৯২১-২। সংগ্রহের তারিখ ২৫ মার্চ ২০১১।
- ↑ Ganesh Kumar, K.; Kumaravelu, N.; Sivakumar, T.; Gajendran, K. (জুন ২০০৬)। "Study on Panchakavya - An indigenous formulation and its effect on the growth promotion of crossbred pigs" (পিডিএফ)। Indian Journal of Animal Research। ৪০ (2): ১৫৮–১৬০। আইএসএসএন 0367-6722। ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত (পিডিএফ)। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ Pandey, Pradeep; Malviya, Sagar (১৬ সেপ্টেম্বর ২০১১)। "Kishore Biyani to launch Panchagavya cosmetics and health remedy products in Big Bazaar"। The Economic Times। সংগ্রহের তারিখ ৫ নভেম্বর ২০২৪।
- ↑ Indian Antiquary। Popular Prakashan। ১৮৯৫।
- ↑ Campbell, J. M. (জুন ১৮৯৫)। "Notes on the Spirit Basis of Belief and Custom"। Indian Antiquary (ইংরেজি ভাষায়)। ২৪: ১৬৮–১৬৯।
{{সাময়িকী উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতিতে খালি অজানা প্যারামিটার রয়েছে:|nopp=(সাহায্য) - ↑ Encyclopaedia_of_Religion_and_Ethics। ১৯১২।
- ↑ The Mahabharata, Book 13: Anusasana Parva, sec. 82। Ganguli English translation of the Mahabharata। ১৮৯৬।
- ↑ "Gangotri temple committee plans 'panchgavya' rule for pilgrims"। ২৩ মার্চ ২০২৬।