নেপাল মণ্ডল



নেপাল মণ্ডল (নেপালি: नेपाल मण्डल) হল বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত নেপালের প্রাচীন ভৌগোলিক বিভাজন। এটি তিনটি প্রধান বিভাগ দ্বারা চিহ্নিত ছিল: পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং পশ্চিমাঞ্চল। এই বিভাগগুলিকে আরও ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছিল যা "মণ্ডল" নামে পরিচিত। নেপাল মণ্ডলের ধারণার ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে, যা পূর্ববর্তী সময়ে এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে প্রতিফলিত করে। এটি বর্তমান মধ্য নেপালে অবস্থিত সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সীমানা দ্বারা চিহ্নিত।[১] এটি কাঠমান্ডু উপত্যকা এবং আশেপাশের অঞ্চল নিয়ে গঠিত।[২][৩] ১৭৬৮ সালে গোর্খা রাজ্যের বিজয় এবং শাহ রাজবংশের উত্থানের মাধ্যমে নেপাল মণ্ডলে আদিবাসী নেওয়ারদের শাসনের অবসান ঘটে।[৪] নেপালের রূপরেখা ইতিহাস অনুসারে, মধ্যযুগের প্রথম দিকে নেপাল তিনটি রাজ্য নিয়ে গঠিত ছিল: পশ্চিমে খাস, দক্ষিণে কর্ণাট এবং কেন্দ্রে নেপাল মণ্ডল।[৫] পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভক্তপুর নেপাল মণ্ডলের রাজধানী ছিল, এরপর কাঠমান্ডু এবং ললিতপুর সহ তিনটি রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়।[৬]
সাংস্কৃতিক এলাকা
[সম্পাদনা]নেপাল মণ্ডলের বিস্তৃতি ঐতিহ্যগতভাবে ৬৪টি হিন্দু এবং ২৪টি বৌদ্ধ তীর্থস্থানের অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। হিন্দু মন্দিরগুলিতে পশ্চিমে নুওয়াকোট জেলার ব্রহ্মেশ্বর থেকে পূর্বে দোলখা জেলার ভীমেশ্বর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৬৪টি শিবলিঙ্গ রয়েছে।
পশ্চিমে ত্রিশুলি নদী থেকে পূর্বে দোলালঘাট পর্যন্ত ২৪টি বৌদ্ধ তীর্থস্থান বিস্তৃত। যখন এগুলিকে একটি সুশৃঙ্খল নকশা হিসেবে দেখা হয়, তখন এগুলি বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের প্রধান দেবতা চক্রসম্ভারের মণ্ডল গঠন করে। নেপাল মণ্ডল চক্রসম্ভার মণ্ডলের ভিত্তিতেই কল্পনা করা হয়েছিল।[৭]
ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিল্টন ১৮১৯ সালে প্রকাশিত "অ্যান অ্যাকাউন্ট অফ দ্য কিংডম অফ নেপাল" বইয়ে লিখেছেন যে চারটি তীর্থস্থান নেপালের সীমানা চিহ্নিত করেছিল: নীলকণ্ঠ (কাঠমান্ডু থেকে উত্তরে আট দিনের যাত্রা), নাটেশ্বর (দক্ষিণে তিন দিন), কালেশ্বর (পশ্চিমে দুই দিন), এবং ভীমেশ্বর (পূর্বে চার দিন)।[৮]
রাজনৈতিক এলাকা
[সম্পাদনা]মণ্ডল শব্দটির অর্থ দেশও হয়,[৯] এবং এটি রাজ্যের ফেডারেশনের মতো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক গঠনের প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যবহৃত হয়েছে। মল্ল আমলে কাঠমান্ডু, ললিতপুর, ভক্তপুর এবং দোলখা নিয়ে গঠিত অঞ্চলটি সাধারণত নেপাল মণ্ডল নামে পরিচিত।
নেপালের রূপরেখা ইতিহাস অনুসারে, নেপাল মণ্ডল খাস এবং সিমরৌনগড় রাজ্যের মধ্যে অবস্থিত ছিল। খাস রাজ্য পশ্চিমে গাড়োয়াল থেকে পূর্বে ত্রিশুলি নদী পর্যন্ত এবং উত্তরে মানস সরোবর হ্রদ থেকে দক্ষিণে তরাই পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কর্ণাট, যাকে সিমরৌনগড়ও বলা হয়, তরাইতে অবস্থিত ছিল।[১০]
১৮ শতকের শেষের দিকের পশ্চিমা ভ্রমণকারীরা লিখেছেন যে নেপালের সীমানার উত্তরে তিব্বত, পূর্বে কিরাট জাতির অঞ্চল, দক্ষিণে মকওয়ানপুর রাজ্য[১১] এবং পশ্চিমে ত্রিশুলি নদী ছিল। নদীটি এটিকে গোর্খা রাজ্য থেকে পৃথক করেছিল।[১২]
১৬৬১ সালে, জেসুইট ফাদার জোহান গ্রুবার এবং অ্যালবার্ট ডি'অরভিল তিব্বত থেকে নেপাল হয়ে ভারতে ভ্রমণ করেছিলেন। তারা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে তারা "নেকবাল" (নেপাল) রাজ্যের প্রথম শহর "কুথি" পেরিয়ে "নেকবালের রাজধানী" কাদমেন্ডু (কাঠমান্ডু) তে পৌঁছেছিলেন। "কাদমেন্ডু" থেকে পাঁচ দিনের যাত্রা করলে "মারাঙ্গা" রাজ্যের একটি বাজার শহর "হেদৌদা"তে পৌঁছোনো যায়।[১৩] হেদৌদা শহরটি আজ হেতাউদা নামে পরিচিত।
বাসিন্দা
[সম্পাদনা]নেপাল মণ্ডলের প্রাচীনতম বাসিন্দা হলেন নেওয়ার, যাদের একাধিক জাতিগত বংশধারা রয়েছে, বহু সহস্রাব্দ ধরে এরা একত্রিত হয়েছে। নেওয়ার সভ্যতা হল নেপাল মণ্ডলে মিশ্রিত হওয়া বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্রণ।[১৪] সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কাঠমান্ডুর প্রতাপ মল্লের রাজত্বকালে পঞ্চদশ শতাব্দীতে নেপালের জনগণ ধীরে ধীরে নেওয়ার নামে পরিচিতি লাভ করে।[১৫]
ইতিহাস
[সম্পাদনা]বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ মঞ্জুশ্রীমূল কল্পে মানদেব (রাজত্বকাল ৪৬৪-৫০৬ খ্রিস্টাব্দ) কে নেপাল মণ্ডলের রাজা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জনপ্রিয় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ স্বয়ম্ভু পুরাণেও নেপাল মণ্ডল শব্দটির উল্লেখ রয়েছে। কাঠমান্ডুর জ্ঞানেশ্বরে পাওয়া অষ্টম শতাব্দীর লিচ্ছবি রাজা দ্বিতীয় জয়দেবের রাজত্বকালের একটি পাথরের শিলালিপি থেকে এটির উল্লেখ পাওয়া যায়।[১৬] কিংবদন্তিগুলিতে আরও বলা হয়েছে যে প্রাচীন কিরাতি রাজারা শাক্য বংশকে মণ্ডলের সিংহাসন অর্পণ করেছিলেন, যা বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তির সাথে সম্পর্কিত।
পাথর ও তামার শিলালিপি এবং পাণ্ডুলিপির শেষে লেখকের দ্বারা যুক্ত টীকা, যেখানে উৎসর্গকারীকে সম্বোধন করা হয়েছে, এই সমস্ত স্থানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নেপাল মণ্ডল শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ অনুষ্ঠানগুলিতেও এটির উল্লেখ করা হয়।[১৭]
আরো দেখুন
[সম্পাদনা]- মান্দালা (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ইতিহাস)
- মল্ল রাজবংশ
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Prajapati, Subhash Ram (২০০৬)। "Nepal Mandal"। The Masked Dances of Nepal Mandal। Thimi: Madhyapur Art Council। আইএসবিএন ৯৯৯৪৬-৭০৭-০-০।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: প্রকাশকের অবস্থান (লিঙ্ক) Pages 9-11. - ↑ Dhungel, Ramesh K. (জানুয়ারি ২০০৭)। "Anguished Cry of a Defeated Ruler: A Raga Song Composed by Ranajit Malla"। Contributions to Nepalese Studies। সংগ্রহের তারিখ ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩। Pages 95-102.
- ↑ Slusser, Mary (1982). Nepal Mandala: A Cultural Study of the Kathmandu Valley. Princeton University. আইএসবিএন ৯৭৮-০-৬৯১-০৩১২৮-৬. Page vii.
- ↑ Waller, Derek J. (২০০৪)। The Pundits: British Exploration Of Tibet And Central Asia। University Press of Kentucky। পৃ. ১৭১। আইএসবিএন ৯৭৮০৮১৩১৯১০০৩।
- ↑ "Outline History of Nepal" (পিডিএফ)। Higher Secondary Education Board। ১২ মে ২০১২ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৫ এপ্রিল ২০১২। Page 2.
- ↑ Michael, Thomas and Cuhaj, George (2009). Standard Catalog of World Gold Coins. Krause Publications. আইএসবিএন ৯৭৮১৪৪০২০৪২৪১. Page 1062.
- ↑ Vajracharya, Naresh Man। "Buddhism in Nepal and Nepal Mandala"। ২১ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২ মার্চ ২০১২।
- ↑ Hamilton, Francis Buchanan (১৮১৯)। An Account of the Kingdom Of Nepal and of the Territories Annexed to This Dominion by the House of Gorkha। Edinburgh: Longman। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুন ২০১২।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: প্রকাশকের অবস্থান (লিঙ্ক) Page 192. - ↑ Subedi, Abhi (জানুয়ারি ২০০২)। "Travel as Theatre in Nepal Mandala" (পিডিএফ)। Contributions to Nepalese Studies। ৮ জুন ২০১৯ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ এপ্রিল ২০১২। Page 173.
- ↑ "Outline History of Nepal" (পিডিএফ)। Higher Secondary Education Board। ১২ মে ২০১২ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৬ এপ্রিল ২০১২। Page 2.
- ↑ Giuseppe, Father (১৭৯৯)। "Account of the Kingdom of Nepal"। Asiatick Researches। London: Vernor and Hood। সংগ্রহের তারিখ ৯ মার্চ ২০১২। Page 308.
- ↑ Kirkpatrick, Colonel (১৮১১)। An Account of the Kingdom of Nepaul। London: William Miller। সংগ্রহের তারিখ ৯ মার্চ ২০১২।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: প্রকাশকের অবস্থান (লিঙ্ক) Page 123. - ↑ Levi, Sylvain। Nepal। সংগ্রহের তারিখ ১৪ মার্চ ২০১২। Page 50.
- ↑ Tamot, Kashinath (2006). Nepal Mandala. Lalitpur: Nepal Mandala Research Guthi. আইএসবিএন ৯৯৯৪৬-৯৮৭-৫-৩. Page 11.
- ↑ Bista, Dor Bahadur (১৯৯১)। Fatalism and Development: Nepal's Struggle for Modernization। Orient Blackswan। পৃ. ৪০। আইএসবিএন ৯৭৮৮১২৫০০১৮৮১। সংগ্রহের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০১৩।
- ↑ Shrestha, Rajendra (৭ নভেম্বর ২০১০)। "Various Communities of Historical Nepal Mandala and Newa: Autonomous State"। Jheegu Swanigah (Special Issue)। Page 60.
- ↑ Gutschow, Niels (1997). "The Kathmandu Valley, Nepal Mandala: Definition of time and space" in The Nepalese caitya: 1500 years of Buddhist votive architecture in the Kathmandu Valley. Edition Axel Menges. আইএসবিএন ৯৭৮৩৯৩০৬৯৮৭৫২. Page 15.