নেপালের যুবরাজ বাহাদুর শাহ
| বাহাদুর শাহ बहादुर शाह | |
|---|---|
| নেপালের যুবরাজ | |
| জন্ম | ১৬ জুন ১৭৫৭ গোর্খা রাজপ্রাসাদ, গোর্খা রাজ্য |
| মৃত্যু | ২৪ জুন ১৭৯৭ (৪০ বছর বয়সে) আর্যঘাট, পশুপতিনাথ, রাজ্য |
| দাম্পত্য সঙ্গী | বিদ্যা লক্ষ্মী দেবী |
| বংশধর | রিপু মর্দান শাহ শত্রু ভঞ্জন শাহ |
| পিতা | পৃথ্বীনারায়ণ শাহ |
| মাতা | নরেন্দ্র রাজ্য লক্ষ্মী দেবী |
| ধর্ম | হিন্দুধর্ম |
| প্রধান চৌতারিয়া এবং নেপাল রাজ্যের রাজপ্রতিনিধি [১] | |
| কাজের মেয়াদ ৩১ আগস্ট ১৭৭৮ – ২০ জুন ১৭৭৯ | |
| পূর্বসূরী | প্রতিষ্ঠিত |
| উত্তরসূরী | পদচ্যুত |
| কাজের মেয়াদ ১৩ জুলাই ১৭৮৫ – ৬ জুন ১৭৯৪ | |
| পূর্বসূরী | প্রধান চৌতারিয়া হিসেবে পুনর্বহাল |
| উত্তরসূরী | প্রধান কাজী হিসাবে কির্তিমান সিং বাসন্যাত |
যুবরাজ বাহাদুর শাহ (নেপালি: बहादुर शाह) ছিলেন নেপালের রাজা পৃথ্বী নারায়ণ শাহের কনিষ্ঠ পুত্র। রাজেন্দ্র রাজ্য লক্ষ্মী দেবীর মৃত্যুর পর তিনি অল্পকিছু সময়ের জন্য নেপালের রাজপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময়ে তিনি হিমালয় থেকে আধুনিক নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছোট ও বিক্ষিপ্ত হিন্দু রাষ্ট্রসমূহ দখলে তার পিতার অভিযানে সাহায্য করেন। বহু রাষ্ট্র বিজয় সত্ত্বেও তিনি তার পিতার পরামর্শ অমান্য করে সহ-সভাসদদের শিরশ্ছেদ করার প্রথা শুরু করেন এবং অবশেষে তারও একই পরিণতি হয়। তার মৃত্যুর পর নেপালে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত ভীমসেন থাপার উত্থান এবং ইংরেজ-নেপাল যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শৈশব
[সম্পাদনা]বাহাদুর শাহ গোর্খার রাজপ্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন রাজা পৃথ্বী নারায়ণ শাহের দ্বিতীয় পুত্র। তিনি 'ফতেহ বাহাদুর শাহ' নামে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীকালে 'বাহাদুর শাহ' নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তিনি গোর্খা ও নুয়াকোটের রাজপ্রাসাদে শিক্ষা লাভ করেন এবং কিছু যুদ্ধক্ষেত্রে তার পিতার সঙ্গীও হয়েছিলেন। তার ভাই প্রতাপ সিং শাহ ১৭৭৫ সালে পিতার মৃত্যুর পর থেকে ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত নেপাল শাসন করেছিলেন। প্রতাপ সিং শাহ ছিলেন একজন ভোগবিলাসী রাজা, যিনি তন্ত্রবাদে বেশি আগ্রহী ছিলেন। অপরদিকে বাহাদুর তার বেশিরভাগ সময় নুয়াকোটের রাজসভাসদদের কাছ থেকে কূটনীতি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণে ব্যয় করতেন।[২]
ভারতে নির্বাসন
[সম্পাদনা]রাজা পৃথ্বী নারায়ণ শাহের মৃত্যুর পর, তার জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রতাপ সিং শাহ নেপালের রাজা হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হন। প্রতাপ সিং শাহ নেপালের সিংহাসনে আরোহণের পর তার শীর্ষ উপদেষ্টা বজরনাথ পণ্ডিতের পরামর্শে অবিলম্বে বাহাদুর শাহকে আটক করেন এবং নুয়াকোটে তাকে গৃহবন্দী করে রাখেন।[৩] তাৎক্ষণিক কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বাহাদুর শাহ তার বেশিরভাগ সময় পাল্পা এবং তনহুঁতে কাটান। উভয় জেলাই তখন স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। তার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এই দেশগুলির সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা এবং পরে নেপালের একত্রীকরণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের মিত্রতা অর্জন করা। এর পাশাপাশি তার ভাইয়ের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করাও তার লক্ষ্য ছিল। তিনি রাজধানীতে প্রতাপ সিংকে চিঠি পাঠালেও তাকে নেপালে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়নি।[৪] অবশেষে বাহাদুর শাহ ভারতের বিহারের বেতিয়া জেলায় চলে যান এবং সেখানে নির্বাসনে জীবনযাপন করেন।
নেপালে প্রত্যাবর্তন এবং দ্বিতীয় নির্বাসন
[সম্পাদনা]১৭৭৭ সালের ১৭ই নভেম্বর প্রতাপ সিং শাহের মৃত্যুর পর, তার দুই বছর বয়সী পুত্র রণ বাহাদুর শাহ নেপালের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং প্রতাপ সিংয়ের জ্যেষ্ঠ স্ত্রী রাজেন্দ্র রাজ্য লক্ষ্মী দেবী নেপালের রাজপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। সতীদাহ প্রথা অনুসারে একজন নারীর নিজের স্বামীর চিতায় আত্মহত্যা করার রীতি প্রচলিত থাকায় রাজসভার বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সভাসদ রাজেন্দ্র লক্ষ্মীর রাজপ্রতিনিধি হিসেবে থাকার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য তিনি পূর্বে নির্বাসিত বাহাদুর শাহকে নেপালে পুনরায় আমন্ত্রণ জানান। এভাবে বাহাদুর শাহের সমর্থনে তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বজরনাথ পণ্ডিত, যিনি পূর্বে বাহাদুর শাহের নির্বাসনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। পণ্ডিতকে সঙ্গে সঙ্গে মাথা মুণ্ডন করা হয়, যা একজন "পণ্ডিতের" জন্য সর্বোচ্চ অপমান ছিল। এরপর তাকে কাঠমান্ডুতে নির্বাসিত করা হয়। প্রতাপ সিংয়ের অন্য সকল স্ত্রীকে সতী হতে বাধ্য করা হয় এবং রাজেন্দ্র লক্ষ্মী তার ক্ষমতা সুসংহত করেন।[৫] রাজেন্দ্র লক্ষ্মী এবং বাহাদুর শাহ কিছু সময়ের জন্য নেপালে যৌথভাবে রাজপ্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু নেপালের সম্প্রসারণ নিয়ে দুজনের মধ্যে মতবিরোধের কারণে শীঘ্রই তাদের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা যায়। বাহাদুর শাহ নেপালের সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখা উচিত বলে মতামত দেন। অন্যদিকে রাজেন্দ্র লক্ষ্মী চেয়েছিলেন যে তার পুত্র প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর সামরিক অভিযান শুরু করতে। বেশিরভাগ সভাসদ বাহাদুর শাহের সাথে একমত হবেন জেনে রাজেন্দ্র লক্ষ্মী দ্রুত বাহাদুর শাহকে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দী করেন। গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বাহাদুর শাহও ১৭৭৮ সালের শেষের দিকে রাজেন্দ্র লক্ষ্মীকে গৃহবন্দী করেন।[৬] তনহুঁ আক্রমণের একটি সামরিক অভিযানের সময়, রাজধানীতে বাহাদুর শাহের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে রানী রাজেন্দ্র লক্ষ্মী ১৭৭৯ সালের ২০ জুন পুনরায় ক্ষমতা দখল করেন। সেই সময়ে বাহাদুর শাহ আবার বেতিয়ায় স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান।[ তথ্যসূত্র প্রয়োজন ]
রাজপ্রতিনিধিত্ব (১৭৮৫–১৭৯৪)
[সম্পাদনা]১৭৮৫ সালে রানী রাজেন্দ্র লক্ষ্মীর মৃত্যুর পর, বাহাদুর শাহ নেপালে ফিরে আসেন এবং নেপালের সম্প্রসারণ পুনরায় শুরু করেন। তিনি একীকরণের বিষয়ে কঠোর নীতি গ্রহণ করেন এবং রাজা ও রাজপুত্রদের সামনে দুটি বিকল্প পথ রাখেন: হয় তারা গোর্খা সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে নিজেদের শাসন চালিয়ে যাবে অথবা আমৃত্যু যুদ্ধ করবে। তিনি নেপালের সীমান্তবর্তী অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র পাল্পার রাজা পৃথ্বী পাল সেনের বোনকে বিয়ে করেন।
জুম্লা এবং দোতির উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ সত্ত্বেও অনেক ছোট রাজ্য এই একীকরণ মেনে নিয়েছিল। জুম্লার রাজা শোভন শাহী চীনে পালিয়ে যান এবং পরে চীন-নেপাল যুদ্ধে চীনকে সহায়তা করেন। দোতির রাজা ব্রিটিশ ভারতে পালিয়ে যান এবং ইংরেজ-নেপাল যুদ্ধে ইংরেজদের সহায়তা করেন।[৭] এরপর বাহাদুর শাহ তার পূর্ব সীমান্তে লিম্বুয়ান বিদ্রোহ দমন করেন। তিনি দামোদর পান্ডে ও অমর সিং থাপাকে তার সেনাপতি হিসেবে নিয়ে সিকিম দখল করেন। অমর সিং থাপা কুমায়ুন রাজ্যের মন্ত্রী হরি সিং দেবের আমন্ত্রণে রাজ্যটিকে নেপালে একীকরণ করেন। যদিও তাদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় এবং তাদের মধ্যে একটি যুদ্ধ হয়। পরে ক্ষমতাচ্যুত কুমায়ুনির রাজা ইংরেজ-নেপাল যুদ্ধে ইংরেজদের সহায়তা করলেও তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারেননি।
১৭৮৮ সালে নেপাল জালিয়াতির অভিযোগে তিব্বত আক্রমণ করে এবং শমর্প লামাকে আশ্রয় দেয়। তিনি যুদ্ধে মারা যান। লাসায় অবস্থিত চীনা আম্বান (উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা) স্টেশনগুলোর কারণে চীন এই যুদ্ধে যোগ দেয়। যা ১৭৯২ সালে চীন-নেপাল যুদ্ধে পরিণত হয়। নেপাল ব্রিটিশদের কাছে অস্ত্র সাহায্য চাইলে কর্নেল উইলিয়াম কির্কপ্যাট্রিক তাদের সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। নেপাল এই যুদ্ধে পরাজিত হয়। নেপাল ও চীনের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
যুদ্ধের পর, গাড়োয়াল, গোর্খা সার্বভৌমত্বের অধীনে আসে এবং এর রাজা শাসন চালিয়ে যান। তখন থেকেই নেপাল নিজেকে একটি সর্ব-হিমালয়ী সামরিক হিন্দু রাজ্য হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং পার্বত্য হিন্দু রাজাদের আত্মসমর্পণের দাবি জানায়। শিখদের সহায়তায় কাংড়া জেলা প্রতিরোধ গড়ে তুললে ক্ষমতাচ্যুত রাজারা নেপালের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাথে মিত্রতা করতে শুরু করেন।[৮]
পরবর্তী জীবন
[সম্পাদনা]রাজা রণ বাহাদুর শাহ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাথে সাথে রাজপ্রাসাদে বাহাদুর শাহের প্রভাব কমতে থাকে। ১৭৯৪ সালে বাহাদুর শাহকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়। ততদিনে রাজা রণ বাহাদুর শাহের সাথে তার একাধিক মতবিরোধ হয়েছিল। ফলস্বরূপ রাজা রণ বাহাদুর তাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন, ঠিক যেমনটা তার পিতা ও পূর্ববর্তী রাজা প্রতাপ সিং শাহ দেখতেন। অবসর গ্রহনের পর, বাহাদুর শাহ চীনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অনুরোধ প্রত্যাখিত হয়। তাই তিনি পশুপতিনাথ মন্দিরের কাছে চলে যান এবং মন্দিরের সাধুদের সাথে সাধারণ জীবনযাপন ও ধর্মচর্চা শুরু করেন। কিন্তু ১৭৯৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজাকে হত্যার চেষ্টা এবং রাজাকে বন্দী করে রাখার মতো একাধিক মিথ্যা অভিযোগে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে কারারুদ্ধ করা হয়। এছাড়াও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে রানী রাজেন্দ্র লক্ষ্মীকে বিষপ্রয়োগের অভিযোগও আনা হয়েছিল।[৯] ১৭৯৭ সালের ২৪শে জুন তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে মাসের পর মাস নির্যাতন করা হয়েছিল এবং সম্পূর্ণ নির্জনে রাখা হয়েছিল। যদিও নেপালের বেশিরভাগ ঐতিহাসিক একমত পোষণ করেন যে রাজা রণ বাহাদুর শাহ এই হত্যাকাণ্ডে নিশ্চিতভাবে জড়িত ছিলেন। বেশিরভাগ ঐতিহাসিক একমত যে শরীরে গরম তেল ঢেলে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে তাকে জোর করে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।[১০] তবে এ বিষয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Regmi Research Series"; Author:Mahesh Chandra Regmi
- ↑ Subdedi, Rajaram (২০০৮)। Nepal ko Tathya Itihas। Sājhā Prakāśana। পৃ. ১৯২। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৯৩৩-২-৪০৬-৫।
- ↑ Acharya, Baburam (২০১৮)। Aba Yesto Kahile Nahos। FinePrint Books। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৩৭-৬৬৫-৪০-৭।
- ↑ Bajracharya, Dhanabajra (১৯৬৮)। "Purnima" (পিডিএফ)। Sansodhan-Mandala। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ জুন ২০২৬।
- ↑ Subedi, Rajaram (২০০৮)। Nepal ko Tathya Itihas। পৃ. ১৯০। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৯৩৩-২-৪০৬-৫।
- ↑ Bajracharya, Dhanabajra। "Purnima"। Issue 10: ৪৭।
- ↑ Subedi, Rajaram (১৯৮৭)। History of Bajhang।
- ↑ Bajracharya, Bhadra Ratna (১৯৯২)। Bahadur Shah: The Regent of Nepal। South Asia Books। আইএসবিএন ৮১৭০৪১৬৪৩৪।
- ↑ Acharya, Baburam (২০১৮)। Aba Yesto Kahile Nahos। FinePrint Books। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৩৭-৬৬৫-৪০-৭।
- ↑ "बहादुर शाहको मरण : तातो तेल खन्याएर"। Himal Khabar। সংগ্রহের তারিখ ২৫ নভেম্বর ২০২১।