বিষয়বস্তুতে চলুন

নূতন নিয়মে যীশুর নাম ও উপাধিসমূহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

নূতুন নিয়মে যীশুকে নির্দেশ করতে দুটি নাম এবং বিভিন্ন উপাধি ব্যবহৃত হয়েছে।[] খ্রিস্টধর্মে, নতুন নিয়মে যীশুকে নির্দেশকারী দুটি নাম—যীশু ও ইম্মানুয়েলের সঙ্গে পরিত্রাণমূলক বৈশিষ্ট্য যুক্ত রয়েছে।[][][] যীশুর ক্রুশারোপণের পর প্রারম্ভিক মণ্ডলী কেবল তাঁর বার্তাগুলো পুনরাবৃত্তি করেনি; বরং তাঁর ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে প্রচার করেছে এবং তাঁর বার্তাকে বোঝা ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। যীশুকে বোঝা ও প্রচারের এই প্রক্রিয়ার একটি উপাদান ছিল তাঁর প্রতি বিভিন্ন উপাধি আরোপ।[] প্রারম্ভিক মণ্ডলীতে ধীরে ধীরে ব্যবহৃত এবং পরে নূতন নিয়মে অন্তর্ভুক্ত হওয়া কিছু উপাধি তৎকালীন ইহুদি প্রেক্ষাপট থেকে গৃহীত হয়েছিল; অন্য কিছু উপাধি নির্বাচিত হয়েছিল যীশুর বার্তা, প্রচারাভিযান ও শিক্ষাকে নির্দেশ ও গুরুত্বারোপ করার জন্য।[] সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব উপাধির কিছু খ্রীষ্টতাত্ত্বিক তাৎপর্য অর্জন করে।[]

ফিলিপীয় ২:১০ আয়াতের লাতিন শিলালিপি: “যেন যীশুর নামে স্বর্গ মর্ত্য পাতাল-নিবাসীদের সমুদয় জানু পাতিত হয়”, কিয়েজা দেল জেজু, রোম

খ্রিস্টানরা যীশুর পবিত্র নামের সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক গুরুত্ব সংযুক্ত করেছেন।[][] প্রার্থনায় যীশুর নাম ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে যোহন ১৬:২৩-এ, যেখানে যীশু বলেন: “পিতার নিকটে যদি তোমরা কিছু যাচ্ঞা কর, তিনি আমার নামে তোমাদিগকে তাহা দিবেন।”[] খ্রিস্টানদের মধ্যে ব্যাপক বিশ্বাস রয়েছে যে ‘যীশু’ নামটি কেবল পরিচয়সূচক প্রতীকের একটি ধারাবাহিকতা নয়; বরং এর মধ্যে অন্তর্নিহিত ঐশী শক্তি বিদ্যমান।[][][১০]

নামসমূহ

[সম্পাদনা]

ইম্মানূয়েল

[সম্পাদনা]

উপাধিসমূহ

[সম্পাদনা]

খ্রীষ্ট

[সম্পাদনা]
মোজাইকে আঁকা খ্রিস্ত পান্তক্রাতর এবং খ্রীষ্টগ্রাম IC XC

ইংরেজি ভাষায় ব্যবহৃত “Christ” উপাধিটি এসেছে গ্রীক Χριστός (খ্রিস্তোস) শব্দ থেকে, যা লাতিন Christus–এর মাধ্যমে ইংরেজিতে প্রবেশ করেছে। এর অর্থ হল “অভিষিক্ত ব্যক্তি”[১১] গ্রিক শব্দটি হিব্রু মশিয়াহ (מָשִׁיחַ) অথবা আরামীয় মশীহ (מְשִׁיחָא)–এর একটি অনুবাদধর্মী ধার, যেখান থেকে ইংরেজি শব্দ মশীহ উদ্ভূত হয়েছে। “Christ” বর্তমানে একটি নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়—“Jesus Christ” নামের একটি অংশ—কিন্তু মূলত এটি ছিল একটি উপাধি (“মশীহ”), নাম নয়; তবে “Christ Jesus” বাক্যাংশে এর ব্যবহার একটি উপাধিগত অর্থ বহন করে।[১২][১৩][১৪]

গ্রিক ভাষায় রচিত সপ্ততিতে (যা যীশুর সময়ের এক শতাব্দীরও বেশি আগে হিব্রু বাইবেল অনুবাদ হিসেবে প্রস্তুত হয়েছিল) হিব্রু শব্দ মশিয়াহকে গ্রিকে প্রকাশ করতে Christos শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ “অভিষিক্ত”।[১৫][১৬] (আরেকটি গ্রিক শব্দ, Messias, দানিয়েল ৯:২৬ এবং গীতসংহিতা ২:২–এ দেখা যায়।)[১৭][১৮] নতুন নিয়ম ঘোষণা করে যে দীর্ঘদিন প্রতীক্ষিত মেসায়াহ এসে গেছেন এবং এই ত্রাণকর্তাকে ‘‘খ্রিস্ট’’ হিসেবে বর্ণনা করে। মথি ১৬:১৬–এ প্রেরিত পিতর—যা প্রথম শতাব্দী থেকেই খ্রিস্টানদের মধ্যে বিশ্বাসের এক প্রসিদ্ধ ঘোষণা হয়ে উঠেছে—বলেছিলেন, “আপনি খ্রিস্ট, জীবন্ত ঈশ্বরের পুত্র।”[১৯] আবার যোহন ১১:২৭–এ মার্থা লাসারকে জীবিত করার ঠিক আগে যিশুকে বলেন, “আপনি খ্রিস্ট।”[২০]

পৌলীয় পত্রসমূহে ‘‘খ্রিস্ট’’ শব্দটি যিশুর সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত যে, প্রারম্ভিক খ্রিস্টানদের কাছে যিশুই যে খ্রিস্ট—এ কথা আলাদা করে প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল না; বিষয়টি তাঁদের মধ্যে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ছিল। তাই পাউল ‘‘Christos’’ শব্দটি ব্যবহার করতে পারেন কোনো বিভ্রান্তি ছাড়াই, এবং প্রথম করিন্থীয় ৪:১৫রোমীয় ১২:৫–এর মতো স্থানে “খ্রিস্টের মধ্যে” (in Christ) ইত্যাদি অভিব্যক্তি ব্যবহার করে যিশুর অনুসারীদের বোঝাতে পারেন।[২১]

কানুনীয় বাইবেলীয় গ্রন্থসমূহে ঐতিহ্যগত তেল (বা ক্রিসম) দিয়ে যিশুকে আনুষ্ঠানিকভাবে “খ্রিস্ট” হিসেবে অভিষিক্ত করার কোনো সরাসরি বিবরণ নেই। খ্রিস্টতাত্ত্বিক চিন্তাধারা যিশুর বাপ্তিস্ম—যা যোহন বাপ্তিস্মদাতা দ্বারা জলে সম্পন্ন হয়েছিল (মথি ৩:১৬)—কে যিশাইয় ৬১:১–এর আলোকে একটি রূপক অভিষেক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে—“প্রভু আমাকে সুসমাচার প্রচারের জন্য অভিষিক্ত করেছেন।”[২২]

যিশুর প্রারম্ভিক অনুসারীরা—যারা শিগগিরই ‘‘খ্রিস্টান’’ (গ্রিক: Χρῑστῐᾱνοί ) নামে পরিচিত হন—‘‘Christos’’ উপাধি থেকেই খ্রিস্টকে উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন প্রতীক (অর্থাৎ খ্রিস্টোগ্রাম) বিকাশ করেন; উদাহরণস্বরূপ, খি–রো প্রতীক, যা “খ্রিস্ট” (গ্রিক: “Χριστός”) শব্দের প্রথম দুটি গ্রিক অক্ষরকে একটির ওপর আরেকটি বসিয়ে গঠিত: খি = ch (গ্রিক: Χ) এবং রো = r (গ্রিক: Ρ), ফলে গঠিত হয় [২৩]

প্রভু

[সম্পাদনা]
প্রার্থনাসহ বৃত্তাকারে অঙ্কিত খি–রো: “প্রভু যিশু খ্রিস্ট, ঈশ্বরের পুত্র, আমার প্রতি দয়া করুন।”

প্রারম্ভিক খ্রিস্টানরা যিশুকে “প্রভু” হিসেবে দেখতেন, এবং গ্রিক শব্দ Kyrios (κύριος)—যার অর্থ হতে পারে ঈশ্বর, প্রভু বা অধিপতি—নতুন নিয়মে তাঁকে নির্দেশ করে ৭৭৫ বার ব্যবহৃত হয়েছে।[২৪][২৫] দৈনন্দিন আরামীয় ভাষায় মারি (Mari) ছিল অত্যন্ত সম্মানসূচক সম্বোধনের একটি রূপ—“শিক্ষক”–এর চেয়েও উচ্চতর এবং রব্বির সমতুল্য। গ্রিক ভাষায় এটি অনেক সময় Kyrios হিসেবে অনূদিত হয়েছে। যিশুর পার্থিব জীবনে তাঁর সঙ্গে শিষ্যদের সম্পর্ক বোঝাতে যেখানে মারি শব্দটি ব্যবহৃত হতো, সেখানে গ্রিক Kyrios পরবর্তীতে সারা বিশ্বের উপর তাঁর প্রভুত্বকে নির্দেশ করতে শুরু করে।[২৬]

পৌলীয় পত্রসমূহ প্রারম্ভিক খ্রিস্টানদের মধ্যে “প্রভু/কিরিওস” ধারণার নানাবিধ ধর্মতাত্ত্বিক পরিণতি আরও সুদৃঢ় করে এবং যিশুর বৈশিষ্ট্যসমূহকে এমনভাবে জোর দেয় যে তা কেবল তাঁর শেষকালীন বিজয়কেই নির্দেশ করে না, বরং তাঁকে “ঐশী প্রতিমূর্তি” (গ্রিক εἰκών eikōn) হিসেবেও চিহ্নিত করে—যাঁর মুখমণ্ডলে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশিত হয়।[২৭] রোমীয় ১০:৯–১৩–এ পাউল এই উপাধির পরিত্রাণমূলক মূল্য জোর দিয়ে তুলে ধরেন এবং বলেন যে মুখে স্বীকার করা (homologeo)—যিশু প্রভু (Kyrion Iesoun)—এই বিশ্বাস স্বীকার করা ব্যক্তির পরিত্রাণের নিদর্শন।[২৮]

প্রেরিতদের কার্যাবলি–তে Kyrios শব্দটির ঘন ঘন ব্যবহার ইঙ্গিত করে যে প্রারম্ভিক খ্রিস্টানদের কাছে যিশুকে এইভাবে সম্বোধন করা কতটা স্বাভাবিক ছিল।[২৪] বহু শতাব্দী ধরে খ্রিস্টানদের মধ্যে যিশুকে বোঝার প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে এই উপাধিটি টিকে ছিল।[২৭]

নতুন নিয়মের খ্রিস্টতত্ত্বের বিকাশে যিশুর জন্য কিরিওস উপাধি–র ব্যবহার কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে; কারণ প্রারম্ভিক খ্রিস্টানরা এটিকে তাদের বোঝাপড়ার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন এবং সেই কেন্দ্র থেকেই খ্রিস্টীয় রহস্যসমূহের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।[২৯] নতুন নিয়মে খ্রিস্টের ঐশ্বরিকতার প্রশ্নটি স্বভাবতই প্রারম্ভিক খ্রিস্টীয় রচনায় ব্যবহৃত যিশুর কিরিওস উপাধির সঙ্গে এবং যিশুর পরম প্রভুত্বের তাৎপর্যের সঙ্গে যুক্ত। প্রারম্ভিক খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে Kyrios ধারণার মধ্যে খ্রিস্টের পূর্বঅস্তিত্বও অন্তর্ভুক্ত ছিল; কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, যদি খ্রিস্ট ঈশ্বরের সঙ্গে এক হন, তবে তাঁকে আদিকাল থেকেই ঈশ্বরের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয়েছে।[২৫][২৯]

এই উপাধিটি—গ্রিক রূপেই—আজও খ্রিস্টীয় লিটার্জিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়; যেমন Kyrie eleison, Christe eleison সমন্বয়ে (অর্থাৎ ‘‘প্রভু, দয়া করুন’’, ‘‘খ্রিস্ট, দয়া করুন’’), যেখানে এক ক্ষেত্রে যিশুকে প্রভু হিসেবে এবং পরমুহূর্তেই তাঁকে খ্রিস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়।[৩০]

গ্রীক শব্দ এপিস্তাতেস (সম্বোধনাত্মক কারক এপিস্তাতা) শুধুমাত্র লূকের সুসমাচারেব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে এটি ছয়বার এসেছে। রবার্ট ও'টুল যুক্তি দেন যে এই শব্দটি যীশুর শিক্ষার চেয়ে বস্তুজগতের উপর তাঁর ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত।[৩১] কিছু ভাষ্যকার মনে করেন যে লূক ৫-এ, পিতর যীশুকে “নাথ” (পদ ৫) হিসেবে দেখার থেকে “প্রভু” (পদ ৮) হিসেবে দেখার দিকে অগ্রসর হয়েছেন।[৩২]

বাক্য

[সম্পাদনা]
In principio erat verbum, লাতিন ভাষায় ‘‘আরম্ভে বাক্য ছিল’’—ক্লেমেন্তাইন ভালগেট থেকে যোহন ১:১–১৮

যোহন ১:১–১৮–এ যিশুকে লোগোস (গ্রিক λόγος) বলা হয়েছে, যা ইংরেজি অনুবাদে প্রায়ই “the Word” (বাক্য) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।[৩৩] যিশুকে অবতাররূপে আবির্ভূত হওয়া লোগোস হিসেবে চিহ্নিতকরণটি কেবল যোহনের সুসমাচার–এর শুরুতেই দেখা যায়, এবং লোগোস/বাক্য শব্দটি যোহনীয় সাহিত্যের আরও মাত্র দুটি স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে: ১ যোহন ১:১ এবং প্রকাশিত বাক্য ১৯:১৩। নতুন নিয়মের অন্য কোথাও এটি দেখা যায় না।[৩৪][৩৫][৩৬][৩৭]

যোহনের সুসমাচারের একেবারে সূচনায় লোগোস সম্পর্কে যে বক্তব্যসমূহ রয়েছে, সেগুলো পরস্পরের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।[৩৮] লোগোস “আরম্ভে ছিল”—এই বক্তব্যটি ঘোষণা করে যে লোগোস হিসেবে যিশু ঈশ্বরের ন্যায় এক অনন্ত সত্তা। লোগোস “ঈশ্বরের সঙ্গে ছিল”—এই বক্তব্যটি যিশুকে ঈশ্বর থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্দেশ করে। আর লোগোস “ঈশ্বর ছিলেন”—এই বক্তব্যটি যিশু ও পিতা ঈশ্বরের ঐক্যকে ঘোষণা করে; ফলে তাঁকে ঈশ্বরপুত্র হিসেবে তাঁর ঐশ্বরিকতাকে প্রতিষ্ঠা করে।[৩৫][৩৮]

১ যোহন ১:১–এ “জীবনের বাক্য” হিসেবে আদি থেকেই লোগোসের আগমনকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এবং ১ যোহন ৫:৬–এ অবতারগ্রহণের জল ও রক্তের তাৎপর্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।[৩৫] লোগোস উপাধির ব্যবহারের মাধ্যমে যোহনীয় খ্রিস্টতত্ত্ব সচেতনভাবে যিশুর ঐশ্বরিকতায় বিশ্বাসকে নিশ্চিত করে—যে তিনি ঈশ্বর, যিনি অবতার বাক্যরূপে মানুষের মাঝে আগমন করেছেন।[৩৫][৩৭][৩৯]

যদিও দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে লোগোস উপাধির ব্যবহার খ্রিস্টের ব্যক্তিত্ব–এ মানবিক ও ঐশ্বরিক উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলেক্সান্দ্রিয় ও আন্তিয়খীয় চিন্তাধারার মধ্যে বিতর্কের জন্ম দেয়, তবু ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত নাইসিয়ার প্রথম পরিষদ এবং ৪৫১ খ্রিস্টাব্দের কালসেডনের পরিষদ–এর পর লোগোস এবং ত্রিত্ব–এর দ্বিতীয় ব্যক্তি—এই দুইটি পরিভাষা প্রায়ই পরস্পরের পরিবর্তে ব্যবহৃত হতে থাকে।[৩৭][৪০][৪১][৪২]

ঈশ্বরের পুত্র

[সম্পাদনা]
মার্কের সুসমাচার–এর প্রথম পৃষ্ঠা: “যিশু খ্রিস্ট, ঈশ্বরের পুত্রের সুসমাচারের সূচনা”, Sargis Pitsak–এর রচনা, ১৪শ শতাব্দী।

নতুন নিয়মে বহু ক্ষেত্রে যিশুর প্রতি “ঈশ্বরের পুত্র” উপাধিটি প্রয়োগ করা হয়েছে।[৪৩] এটি প্রায়ই তাঁর ঐশ্বরিকতাকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে—ঘোষণালাভ থেকে শুরু করে ক্রুশবিদ্ধতা পর্যন্ত।[৪৩] নতুন নিয়মে বহু ব্যক্তি যিশুকে ঈশ্বরের পুত্র বলে ঘোষণা করেছেন; আবার দুটি পৃথক উপলক্ষে পিতা ঈশ্বর স্বয়ং স্বর্গ থেকে কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেন, এবং যিশু নিজেও এই পরিচয়টি স্বীকার করেন।[৪৩][৪৪][৪৫][৪৬] অধিকাংশ খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়–এর মতে, এই “ঈশ্বরের পুত্র” উপাধিটি বিশ্বাসগতভাবে ত্রিত্ববাদী এবং এটি যিশু ও ঈশ্বরের মধ্যকার সম্পর্ককে নির্দেশ করে—বিশেষত “ঈশ্বরপুত্র” হিসেবে।[৪৪][৪৬]

হাজার হাজার বছর ধরে, চীনের পশ্চিম ঝৌ রাজবংশ (খ্রি.পূ. আনুমানিক ১০০০) থেকে শুরু করে গ্রিসের আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পর্যন্ত বহু সম্রাট ও শাসক দেবতা বা ঐশ্বরিক সত্তা–এর সঙ্গে পিতৃসম্পর্ক প্রতিফলিত করে এমন উপাধি গ্রহণ করেছেন।[৪৭][৪৮] যিশুর সময়ে রোমান সম্রাট অগাস্টাস Divi filius (ঐশ্বরিক সত্তার পুত্র) এবং “Dei filius” (ঈশ্বরের পুত্র) উপাধির সাদৃশ্যকে কাজে লাগান এবং নিজের ঐশ্বরিক ভাবমূর্তিকে জোরদার করতে দ্ব্যর্থবোধক “DF” শিলালিপি ব্যবহার করেন।[৪৯][৫০][৫১][৫২] জে. ডি. ক্রসান যুক্তি দেন যে প্রারম্ভিক খ্রিস্টানরাই এই উপাধিটি গ্রহণ করেছিলেন।[৫৩]

মার্কের সুসমাচার যিশুকে ঈশ্বরের পুত্র বলে সম্বোধন করে শুরু হয় এবং স্বর্গীয় কণ্ঠ যিশুকে “আমার প্রিয় পুত্র” বলে অভিহিত করলে Mark 1:11Mark 9:7—এই দুই স্থানে উপাধিটি পুনরায় নিশ্চিত হয়।[৫৪] যিশুর জলের ওপর দিয়ে হাঁটা–র পর, মথি ১৪:৩৩–এ শিষ্যরা তাঁকে বলেন: “আপনি সত্যিই ঈশ্বরের পুত্র!”[৪৫] মথি ২৭:৪৩–এ যিশু ক্রুশে ঝুলে থাকার সময় ইহুদি নেতারা তাঁকে বিদ্রূপ করে ঈশ্বরের সাহায্য চাইতে বলেন, “কারণ সে বলেছিল, আমি ঈশ্বরের পুত্র”—যিশুর এই দাবিকেই নির্দেশ করে।[৪৬] Matthew 27:54Mark 15:39–এ ক্রুশবিদ্ধতার পর সংঘটিত ভূমিকম্পের পর রোমান সেনাপতি উচ্চারণ করেন: “তিনি নিশ্চয়ই ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন!” আবার Matthew 16:15–16–এ প্রেরিত পিতর যখন বলেন, “আপনি খ্রিস্ট, জীবন্ত ঈশ্বরের পুত্র”, তখন যিশু শুধু উপাধিগুলো গ্রহণই করেন না, বরং পিতরকে “ধন্য” বলে অভিহিত করেন এবং এই স্বীকারোক্তিকে ঐশ্বরিক প্রকাশ বলে ঘোষণা করেন—এভাবে মথি ১৬:১৫–১৬–এ নিজেকে স্পষ্টভাবে খ্রিস্ট ও ঈশ্বরের পুত্র—উভয়ই বলে ঘোষণা করেন।[৪৪]

নতুন নিয়মে যিশু “আমার পিতা” শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন—যা তাঁর পুত্রত্বের সরাসরি ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা এবং অন্যদের দ্বারা আরোপিত যেকোনো উপাধির বাইরে পিতার সঙ্গে তাঁর অনন্য সম্পর্ককে নির্দেশ করে; যেমন মথি ১১:২৭, যোহন ৫:২৩যোহন ৫:২৬[৪৬][৫৫][৫৬] আরও কিছু ঘটনায় যিশু পিতাকে উল্লেখ করে নিজের পুত্রত্ব দাবি করেন; যেমন লূক ২:৪৯–এ, মন্দিরে পাওয়া গেলে, কিশোর যিশু মন্দিরকে “আমার পিতার গৃহ” বলেন—যেমনটি তিনি পরে মন্দির শুদ্ধিকরণ–এর ঘটনায় John 2:16–এও করেন।[৪৬] আবার Matthew 1:11Luke 3:22–এ যিশু উপর থেকে আগত কণ্ঠস্বরের দ্বারা “ঈশ্বরের পুত্র” বলে সম্বোধিত হওয়াকে বিনা আপত্তিতে গ্রহণ করেন।[৪৬]

নতুন নিয়মে ব্যবহৃত সব খ্রিস্টতাত্ত্বিক উপাধির মধ্যে “ঈশ্বরের পুত্র” খ্রিস্টীয় ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবগুলোর একটি রেখেছে এবং বহু খ্রিস্টানের বিশ্বাসঘোষণার অংশে পরিণত হয়েছে।[৫৭] প্রচলিত ত্রিত্ববাদী প্রেক্ষাপটে এই উপাধিটি পবিত্র ত্রিত্বপিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা—এর অংশ হিসেবে যিশুর পূর্ণ ঐশ্বরিকতাকে নির্দেশ করে।[৫৭] তবে যিশুর পিতা হিসেবে ঈশ্বর এবং যিশুকে একমাত্র ঈশ্বরের পুত্র হিসেবে বোঝার ধারণাটি—ঈশ্বরকে সকল মানুষের স্রষ্টা ও পিতা হিসেবে বোঝার ধারণা থেকে পৃথক—যা প্রেরিতদের বিশ্বাসঘোষণা–য় স্পষ্ট করা হয়েছে।[৫৮] এই বিশ্বাসঘোষণা শুরু হয় “সর্বশক্তিমান পিতা, স্বর্গ ও পৃথিবীর স্রষ্টা”—এই বিশ্বাস প্রকাশের মাধ্যমে; এরপর অবিলম্বে কিন্তু পৃথকভাবে বলা হয়, “যিশু খ্রিস্ট, তাঁর একমাত্র পুত্র, আমাদের প্রভু”—এভাবে বিশ্বাসঘোষণার মধ্যেই পিতৃত্বের উভয় অর্থকে প্রকাশ করা হয়।[৫৮]

মনুষ্যপুত্র

[সম্পাদনা]

দায়ূদ-সন্তান

[সম্পাদনা]

যোষেফের পুত্র

[সম্পাদনা]

ঈশ্বরের মেষশাবক

[সম্পাদনা]

শেষ আদম

[সম্পাদনা]

জগতের জ্যোতি

[সম্পাদনা]

যিহূদীদের রাজা

[সম্পাদনা]

রব্বূণি ও রব্বি

[সম্পাদনা]

অন্যান্য নাম ও উপাধি

[সম্পাদনা]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

পাদটীকা

[সম্পাদনা]

    তথ্যসূত্র

    [সম্পাদনা]
    1. Names and Titles of the Lord Jesus Christ. by Charles Spear 2003 আইএসবিএন ০-৭৬৬১-৭৪৬৭-০ pages ix-x
    2. Bible explorer's guide by John Phillips 2002 আইএসবিএন ০-৮২৫৪-৩৪৮৩-১ page 147
    3. All the Doctrines of the Bible by Herbert Lockyer 1988 আইএসবিএন ০-৩১০-২৮০৫১-৬ page 159
    4. 1 2 Theology of the New Testament by Georg Strecker, Friedrich Wilhelm Horn 2000 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২২৩৩৬-২ page 89
    5. 1 2 Jesus: a Gospel portrait by Donald Senior 1992 আইএসবিএন ০-৮০৯১-৩৩৩৮-৫ pages 145-147
    6. The Titles of Jesus in Christology: Their History in Early Christianity by Ferdinand Hahn, Harold Knight, George Ogg 2002 আইএসবিএন ০-২২৭-১৭০৮৫-৭ pages 11-12
    7. Outlines of dogmatic theology, Volume 2 by Sylvester Hunter 2010 আইএসবিএন ১-১৪৬-৯৮৬৩৩-৫ page 443
    8. Jesus: the complete guide by Leslie Houlden 2006 আইএসবিএন ০-৮২৬৪-৮০১১-X page 426
    9. 1 2 উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; CathHoly নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
    10. Spiritual theology by Jordan Aumann 1980 আইএসবিএন ০-৭২২০-৮৫১৮-৪ page 411
    11. Blue Letter Bible, G5547
    12. Jesus God and Man by Wolfhart Pannenberg 1968 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২৪৪৬৮-৮ pages 30-31
    13. Merriam-Webster's Encyclopedia of World Religions by Wendy Doniger 2000 আইএসবিএন ০-৮৭৭৭৯-০৪৪-২ page 212
    14. Theology of the New Testament by Rudolf Karl Bultmann 2007 আইএসবিএন ১-৯৩২৭৯২-৯৩-৭ page 80
    15. Jesus of history, Christ of faith by Thomas Zanzig 2000 আইএসবিএন ০-৮৮৪৮৯-৫৩০-০ page 314
    16. "Etymology Online: messiah"। Etymonline.com। সংগ্রহের তারিখ ১৯ নভেম্বর ২০১০
    17. "CATHOLIC ENCYCLOPEDIA: Messiah"www.newadvent.org
    18. Jesus the Christ by Walter Kasper 1976 আইএসবিএন ০-৮০৯১-২০৮১-X pages 104-105
    19. Christianity by Donald W. Ekstrand 2008 আইএসবিএন ১-৬০৪৭৭-৯২৯-২ pages 147-150
    20. Christianity by Donald W. Ekstrand 2008 আইএসবিএন ১-৬০৪৭৭-৯২৯-২ page 81
    21. Lord Jesus Christ: Devotion to Jesus in Earliest Christianity by Larry W. Hurtado 2005 আইএসবিএন ০-৮০২৮-৩১৬৭-২ page 99
    22. Barackman, Floyd H. (২৫ অক্টোবর ২০০১) [1981]। "Christology: The Doctrine of the Lord Jesus Christ"। Practical Christian Theology: Examining the Great Doctrines of the Faith (4 সংস্করণ)। Grand Rapids, Michigan: Kregel Academic। পৃ. ১৭৭। আইএসবিএন ৯৭৮০৮২৫৪৯৭২৫৪। সংগ্রহের তারিখ ২০ ডিসেম্বর ২০২২The Medium of Jesus' Anointing [...] Jesus gave Himself not to anointing oil but to baptismal water, another symbol of the Holy Spirit (John 7:37-39). The mass of water in which he was immersed (Matt. 3:16) portrayed the unlimited fullness of the Holy Spirit [...]. Thus the Father was the Anointer of Jesus (John 3:34; Acts 10:38); Jesus was the Anointed One; and the Holy Spirit was the Anointing Agent, in whose power Jesus would forever carry out all His messianic functions as man.
    23. Symbols of the Christian faith by Alva William Steffler, 2002 আইএসবিএন ০-৮০২৮-৪৬৭৬-৯, page 66.
    24. 1 2 Mercer dictionary of the Bible by Watson E. Mills, Roger Aubrey Bullard 1998 আইএসবিএন ০-৮৬৫৫৪-৩৭৩-৯ pages 520-525
    25. 1 2 The Christology of the New Testament by Oscar Cullmann 1959 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২৪৩৫১-৭ pages 234-237
    26. The Christology of the New Testament by Oscar Cullmann 1959 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২৪৩৫১-৭ page 202
    27. 1 2 Lord Jesus Christ: Devotion to Jesus in Earliest Christianity by Larry W. Hurtado 2005 আইএসবিএন ০-৮০২৮-৩১৬৭-২ pages 113 and 179
    28. Lord Jesus Christ by Larry W. Hurtado 2005 আইএসবিএন ০-৮০২৮-৩১৬৭-২ page 142
    29. 1 2 Christology: Biblical And Historical by Mini S. Johnson, 2005 আইএসবিএন ৮১-৮৩২৪-০০৭-০ pages 229-235
    30. The Science of the Sacraments by Charles Webster Leadbeater 2007 আইএসবিএন ১-৬০২০৬-২৪০-৪ pages 101-102
    31. O'Toole, Robert F. (২০০৪)। Luke's Presentation of Jesus: A Christology। Editrice Pontificio Istituto biblico। পৃ. ২০। আইএসবিএন ৯৭৮৮৮৭৬৫৩৬২৫০। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুলাই ২০১৫
    32. Stein, Robert H. (১৯৯২)। Luke। B&H Publishing। পৃ. ১৭১। আইএসবিএন ৯৭৮০৮০৫৪০১২৪০। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুলাই ২০১৫
    33. Henry George Liddell and Robert Scott, An Intermediate Greek-English Lexicon: logos, 1889.
    34. The Christology of the New Testament by Oscar Cullmann 1959 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২৪৩৫১-৭ page 258
    35. 1 2 3 4 The International Standard Bible Encyclopedia by Geoffrey W. Bromiley 1988 আইএসবিএন ০-৮০২৮-৩৭৮৫-৯ page 106
    36. Mercer dictionary of the Bible by Watson E. Mills, Roger Aubrey Bullard 1998 আইএসবিএন ০-৮৬৫৫৪-৩৭৩-৯ page 520
    37. 1 2 3 A concise dictionary of theology by Gerald O'Collins 2004 আইএসবিএন ০-৫৬৭-০৮৩৫৪-৩ pages 144-145
    38. 1 2 A Complete Introduction to the Bible by Christopher Gilbert 2009 আইএসবিএন ০-৮০৯১-৪৫৫২-৯ page 216
    39. Introduction to theology by Owen C. Thomas, Ellen K. Wondra 2002 আইএসবিএন ০-৮১৯২-১৮৯৭-৯ page 173
    40. Fahlbusch, Erwin; এবং অন্যান্য, সম্পাদকগণ (১৯৯৯)। The encyclopedia of Christianity। Leiden, Netherland: Brill। পৃ. ৪৬৩। আইএসবিএন ০-৮০২৮-২৪১৩-৭
    41. Rausch, Thomas P. (২০০৩), Who is Jesus? : an introduction to Christology, Collegeville, Minn.: Liturgical Press, পৃ. ১৪৯, আইএসবিএন ০-৮১৪৬-৫০৭৮-৩
    42. Mercer dictionary of the Bible by Watson E. Mills, Roger Aubrey Bullard 1998 আইএসবিএন ০-৮৬৫৫৪-৩৭৩-৯ page 146
    43. 1 2 3 "CATHOLIC ENCYCLOPEDIA: Son of God"www.newadvent.org
    44. 1 2 3 One teacher: Jesus' teaching role in Matthew's gospel by John Yueh-Han Yieh 2004 আইএসবিএন ৩-১১-০১৮১৫১-৭ pages 240–241
    45. 1 2 Dwight Pentecost The words and works of Jesus Christ 2000 আইএসবিএন ০-৩১০-৩০৯৪০-৯ page 234
    46. 1 2 3 4 5 6 The International Standard Bible Encyclopedia by Geoffrey W. Bromiley 1988 আইএসবিএন ০-৮০২৮-৩৭৮৫-৯ page 571–572
    47. Introduction to the Science of Religion by Friedrich Muller 2004 আইএসবিএন ১-৪১৭৯-৭৪০১-X page 136
    48. China : a cultural and historical dictionary by Michael Dillon 1998 আইএসবিএন ০-৭০০৭-০৪৩৯-৬ page 293
    49. Early Christian literature by Helen Rhee 2005 আইএসবিএন ০-৪১৫-৩৫৪৮৮-৯ pages 159-161
    50. Augustus by Pat Southern 1998 আইএসবিএন ০-৪১৫-১৬৬৩১-৪ page 60
    51. The world that shaped the New Testament by Calvin J. Roetzel 2002 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২২৪১৫-৬ page 73
    52. A companion to Roman religion edited by Jörg Rüpke 2007 আইএসবিএন ১-৪০৫১-২৯৪৩-৩ page 80
    53. Crossan, John Dominic, God and Empire, 2007, p. 28
    54. Who do you say that I am?: essays on Christology by Jack Dean Dean Kingsbury, Mark Allan Powell, David R. Bauer 1999 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২৫৭৫২-৬ pages 246-251
    55. The Person of Christ by Gerrit Cornelis Berkouwer 1954 আইএসবিএন ০-৮০২৮-৪৮১৬-৮ page 163
    56. The Wiersbe Bible Commentary by Warren W. Wiersbe 2007 আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৮১৪-৪৫৩৯-৯ page 245
    57. 1 2 Christology and the New Testament Christopher Mark Tuckett 2001 আইএসবিএন ০-৬৬৪-২২৪৩১-৮ page 22
    58. 1 2 Symbols of Jesus: A Christology of Symbolic Engagement by Robert C. Neville 2002 আইএসবিএন ০-৫২১-০০৩৫৩-৯ page 26

    বহিঃসংযোগ

    [সম্পাদনা]