বিষয়বস্তুতে চলুন

হিল্লা বিয়ে

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(নিকাহ হালালা থেকে পুনর্নির্দেশিত)

হিল্লা বিয়ে বা নিকাহ হালালা বা তাহলিল বিবাহ (আরবি: زواج التحليل: যাওজ আল-তাহলিল ) হলো এমন একটি বিবাহ-প্রথা, যেখানে কোনো নারী নিজের স্বামীর দ্বারা তিন তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করেন এবং তাদের সেই বিবাহ দাম্পত্যভাবে সম্পন্ন হয়; এরপর কোনো কারণবশত দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে বা তিনি মারা যান এবং তারপর ওই নারী তার প্রথম স্বামীকে পুনরায় বিয়ে করতে পারেন।[][] তিন তালাকপ্রাপ্ত নারীর তার প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার এটিই শরিয়া অনুমোদিত একমাত্র পদ্ধতি। তবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বা চুক্তি করে কেবলমাত্র প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এ ধরনের বিবাহ সম্পাদন করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম (নিষিদ্ধ) ও গর্হিত কাজ বলে গণ্য করা হয়। হাদিসে এই ধরনের বিয়ে নিন্দা করা হয়েছে এবং এভাবে চুক্তি করে বিবাহকারীকে ভাড়াটে পাঁঠা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। [][][]

বর্তমানে কিছু মুসলিম সমাজে সাধারণত চুক্তিভিত্তিক হিল্লা বিবাহের অধিক প্রচলন হওয়ার কারণে হিল্লা বিবাহকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। মূলত এটি একটি অনুমোদিত ও আইনি পদ্ধতিকে নির্দেশ করে। যদিও বর্তমান কিছু মুসলিম অঞ্চলে এর অবৈধ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।[][]

ব্যুৎপত্তি

[সম্পাদনা]

নিকাহ অর্থ বিবাহ ও তাহলিল অর্থ কোনো কিছুকে হালাল বা বৈধ করে তোলা।[] কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে:

"তালাক দু'বার (হয়)। এরপর হয় বিধিসম্মতভাবে রেখে দেবে অথবা সদ্ব্যবহারের সঙ্গে বিদায় দেবে। অতঃপর যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। তারপর যদি দ্বিতীয় স্বামীও তাকে তালাক দেয়, তবে তারা উভয়ে পুনরায় একত্রিত হতে পারবে, যদি তারা মনে করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে"।— সূরা বাকারা: ২২৯/৩০

একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে,

"রিফাআর স্ত্রী আল্লাহর রাসুলের কাছে এসে বললেন যে, রিফাআ তাকে চূড়ান্ত তালাক দিয়েছেন। এরপর তিনি অন্য একজনকে বিয়ে করেছেন; কিন্তু সেই স্বামী তার সঙ্গে পূর্ণ দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হননি। তিনি জানতে চাইলেন, তিনি কি রিফাআর কাছে ফিরে যেতে পারবেন? তখন রাসুল বললেন: "না, যতক্ষণ না তুমি তার (দ্বিতীয় স্বামীর) মধু আস্বাদন কর এবং সে তোমার মধু আস্বাদন করে (সহবাস করে)।"[]

ইসলামি আইন

[সম্পাদনা]

ধ্রুপদী ইসলামি আইনে, কেবল একজন স্বামীই তার স্ত্রীকে কারণবশত এই ঘোষণা দিয়ে তালাক দিতে পারেন যে, তিনি আর তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চান না।[১০] তালাকের প্রথম ঘোষণা (এক তালাক) একটি প্রত্যাহারযোগ্য বিচ্ছেদ (তালাকে রাজঈ) হিসেবে গণ্য হয়, যা সঙ্গে সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে শেষ করে না। স্বামী অপেক্ষাকালীন সময়ে (ইদ্দত) যেকোনো সময় এই তালাক প্রত্যাহার করতে পারে। ইদ্দতের মেয়াদ সাধারণত তিনটি পূর্ণ ঋতুচক্র পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরায় স্থাপিত হলে তালাক স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহৃত বলে গণ্য হয়। যদি ইদ্দতের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং তালাক প্রত্যাহার না করা হয়, তবে তালাক চূড়ান্ত কার্যকারিতা লাভ করে। এটিকে “ছোট বিচ্ছেদ” (আল-বায়নুনাহ আস-সুগরা) বলা হয়। এ অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী চাইলে নতুন আকদ ও মহরের মাধ্যমে পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন। কিন্তু স্বামী যদি একই স্ত্রীকে তৃতীয়বার তালাক দেন, তাহলে “বড় বিচ্ছেদ” (আল-বায়নুনাহ আল-কুবরা) সংঘটিত হয়। এরপর স্ত্রী তার পূর্ববর্তী স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহ করতে পারেন না, যতক্ষণ না সেই স্ত্রী অন্য একজন পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করেন এবং তাদের সেই বিবাহ বাস্তবে দাম্পত্য সম্পর্কে পরিণত হয়।[১১][১২] মূলত এই প্রক্রিয়াকে তাহলিল বিবাহ বা নিকাহ হালালা বলা হয়।[১৩]

বেশ কয়েকটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি শুধুমাত্র এ উদ্দেশ্যে হিল্লা বিবাহে আবদ্ধ হন যে, পরবর্তীতে তালাক দিয়ে নারীকে তার প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, তবে তা ইসলামে নিষিদ্ধ (হারাম)। আবু দাউদইবনে মাজাহর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, এই ধরনের ব্যবস্থায় জড়িত প্রথম স্বামী (মুহাল্লাল লাহু) ও অস্থায়ী স্বামী (মুহাল্লিল) উভয়ের ওপর আল্লাহর অভিশাপ রয়েছে। ইবনে মাজাহর একটি বর্ণনায় অস্থায়ী স্বামীকে “ভাড়াটে পাঁঠা” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া হাকিম নিশাপুরি বর্ণনা করেন যে, বিবাহের ভিত্তি হওয়া উচিত প্রকৃত ও আন্তরিক দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, নবির যুগে যারা কেবল তাহলিলের উদ্দেশ্যে এ ধরনের বিবাহ করত, তাদের ব্যভিচারী হিসেবে গণ্য করা হতো।[১৪]

প্রচলন

[সম্পাদনা]

ইসলামি আইনে অবৈধ হলেও বেশ কিছু মুসলিম অঞ্চলে এ চুক্তিভিত্তিক বা পূর্বপরিকল্পিত হিল্লা বিবাহের প্রচলন দেখা যায়। মূলত যেসব মুসলিম সমাজে একেবারে তিন তালাক দেওয়া বৈধ হিসেবে গণ্য হয়, সেখানে এমন অবৈধ হিল্লা বিয়ের প্রচলন দেখা যায়।

যুক্তরাজ্য

বিবিসির একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, যুক্তরাজ্যের কয়েকটি পাকিস্তানি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন বিয়ের অনুশীলন রয়েছে। এই প্রতিবেদনে এমন অনেক নজির উন্মোচন করা হয়, যেখানে স্থানীয় কিছু ধর্মীয় ব্যক্তি এমন বিয়েতে জড়িত ছিল। মূলত তালাকপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদের প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করেন।[১৫]

ভারত

হিল্লা বিবাহের বিরুদ্ধে বহু মুসলিম মহিলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দায়ের করেছে। ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন হলো এমন একজন আবেদনকারী। বিএমএমএ হল ভারতের মুসলিম মহিলাদের একটি জাতীয় আন্দোলন। ২০১৮ সালের মার্চ মাসে সুপ্রীম কোর্ট হিল্লা বিবাহ ও বহু বিবাহের বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারকে নোটিশ জারি করে। বিজেপি- পরিচালিত সরকার হিল্লা বিয়েকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পক্ষে রায় দেয় এবং মুসলিম মহিলা অধিকার সংগঠনগুলি সরকারের এই মনোভাবকে স্বাগত জানিয়ে বলে যে, এই উদ্যোগ অনেক আগে নেওয়া উচিত ছিল।[১৬]

ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ২০১৮ সালের ২০ জুলাই হিল্লা বিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আবেদনের শুনানির তারিখ ধার্য করে। তবে ১৩ সেপ্টেম্বর শবনম রানি নামে একজন মুসলিম মহিলাকে অ্যাসিড দিয়ে আক্রমণ করা হয়, যিনি হিল্লা বিবাহ অনুশীলনের বিরুদ্ধে অন্যতম আবেদনকারী ছিলেন।[১৭][১৮]

অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড হিল্লা বিবাহ ও তিন তালাককে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যদিও তারা মনে করে যে, এর ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা উচিত এবং কেবল বিরল পরিস্থিতিতে এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে।[১৯][২০]

ইরান

ইরানের কুর্দি সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে অবৈধ হিল্লা বিয়ে এবং তিন তালাক প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তবে নারী অধিকারকর্মী, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষ থেকে এসব প্রথার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদ ও সমালোচনা দেখা যায়।[২১]

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

[সম্পাদনা]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

গ্রন্থপঞ্জি

[সম্পাদনা]
  • Salim, Arskal. Contemporary Islamic Law in Indonesia: Sharia and Legal Pluralism. United Kingdom, Edinburgh University Press, 2015.
  • Bakabuang Phenomenon in Minangkabay Society: A Covert Human Trafficking Action ~ Nelmawarni Nelmawarni Kafaah Journal of Gender Studies Volume 11 No. 2 (2021)

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Ali, Shaheen Sardar; Griffiths, Anne (১৫ এপ্রিল ২০১৬)। From Transnational Relations to Transnational Laws: Northern European Laws at the Crossroads (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৩১৭-১৩১৫৮-৮
  2. Singh, Vatsala (২৪ জুলাই ২০১৮)। "What Does Quran Say About Nikah Halala? Will Banning it Help?"The Quint। Bloomberg LP। সংগ্রহের তারিখ ২০ মে ২০১৯
  3. Abdul-Rahman, Muhammad Saed। Tafsir Ibn Kathir Part 2 of 30: Tafsir Ibn Kathir Part 2 of 30 (ইংরেজি ভাষায়)। Muhammad Saed Abdul-Rahman।
  4. "Sunan Abi Dawud 2076 - Marriage (Kitab Al-Nikah) - Sunnah.com - Sayings and Teachings of Prophet Muhammad (صلى الله عليه و سلم)"sunnah.com। সংগ্রহের তারিখ ৪ নভেম্বর ২০২২
  5. Ahmad, Yusuf Al-Hajj। The Book Of Nikkah: Encyclopaedia of Islamic Law (ইংরেজি ভাষায়)। Darussalam Publishers।
  6. Ahmad, Athar (৫ এপ্রিল ২০১৭)। "The women who sleep with a stranger to save their marriage"BBC News (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জুন ২০১৮
  7. "Nikah Halala: A Law That Demands A Woman To Sleep With Stranger To Remarry Her Divorced Husband"Outlook India। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জুন ২০১৮
  8. "Halala in Muslims"Hindustan Times। ২২ আগস্ট ২০১৭।
  9. ইমাম বুখারী। সহিহ বুখারি। পৃ. হা/৫২৬০।
  10. Abed Awad; Hany Mawla (২০১৩)। "Divorce. Legal Foundations"The Oxford Encyclopedia of Islam and Women। Oxford: Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৯৭৬৪৪৬-৪। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
  11. "So if a husband divorces his wife ˹three times˺, then it is not lawful for him to remarry her until after she has married another man and then is divorced. Then it is permissible for them to reunite, as long as they feel they are able to maintain the limits of Allah. These are the limits set by Allah, which He makes clear for people of knowledge."[কুরআন ২:২৩০ (Mustafa Khattab)]
  12. Maaike Voorhoeve (২০১৩)। "Divorce. Modern Practice"The Oxford Encyclopedia of Islam and Women। Oxford: Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৯৭৬৪৪৬-৪। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
  13. Wael B. Hallaq (২০০৯)। Sharī'a: Theory, Practice, Transformations। Cambridge University Press (Kindle edition)। পৃ. Loc. ৭৯২১–৭৯৫০।
  14. Ali, Shaheen Sardar; Griffiths, Anne (১৫ এপ্রিল ২০১৬)। From Transnational Relations to Transnational Laws: Northern European Laws at the Crossroads। Routledege। পৃ. ১৩০। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৩১৫-৫৮৩৫৮-৭। সংগ্রহের তারিখ ১০ নভেম্বর ২০১৯
  15. Ahmad, Athar (৫ এপ্রিল ২০১৭)। "The women who sleep with a stranger to save their marriage"BBC News (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জুন ২০১৮
  16. "Centre to oppose nikah halala in Supreme Court - Times of India"The Times of India। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জুন ২০১৮
  17. "Supreme Court To Begin Nikah Halala and Polygamy Hearing From July 20"www.news18.com (ইংরেজি ভাষায়)। ১২ জুলাই ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০২১
  18. Bansal, Aanchal। "Modi Government | Triple Talaq: Before SC hearing, Modi govt builds case against Nikah Halala, polygamy"The Economic Times। সংগ্রহের তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০২১
  19. "AIMPLB against outlawing of 'nikah halala', but wants it to be discouraged | India News - Times of India"The Times of India (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০২১
  20. Parvez, Behzad। "Declaring Triple Talaq Illegal Would Be Like Rewriting Quran: Personal Law Board" (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ২৬ এপ্রিল ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০২১
  21. Alikarami, Leila। "Instant verbal divorce rips families apart in Iran's Kurdish region"Al-Monitor
  22. Warraich, Faizan Ali (২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। "Hatheli, based on Halala, on air from today"The Nation