নিউক্লিয় থার্মাল রকেট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
১ ডিসেম্বর ১৯৬৭, প্রথমবারের মত নিউক্লিয় থার্মাল রকেটের পরীক্ষার ক্ষেত্র

নিউক্লিয় থার্মাল রকেট একটি প্রস্তাবিত স্পেসক্রাফট প্রপালসন প্রযুক্তি যা ১৯৬০ এর দশকে প্রথম পরীক্ষা করা হয়। একে সংক্ষেপে এন টি আর (NTR) বলা হয়। রাসায়নিক রকেটে যেখানে জ্বালানীর রাসায়নিক পদার্থগুলোর ভেতর বিক্রিয়ায় উৎপন্ন রাসায়নিক শক্তি রকেট চালনায় ব্যবহৃত হয়, সেখানে এই রকেটে জ্বালানী পদার্থগুলোর পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন তাপ ব্যবহৃত হয়।

এনটিআর এ কার্যনির্বাহী তরল হিসেবে সাধারণত তরল হাইড্রোজেন ব্যবহৃত হয়, একটি পারমাণবিক চুল্লীতে একে প্রথমে উচ্চ তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয় এবং পরবর্তিতে উর্ধ্বমুখী ধাক্কা প্রযুক্ত করতে রকেট নজল দিয়ে প্রবাহের মাধ্যমে এটি সম্প্রসারিত হয়। পারমাণবিক তাপ উৎপন্নের এই প্রক্রিয়া তাত্ত্বিক দিক দিয়ে একটি উচ্চতর কার্যকর নিষ্ক্রমণ বেগ নিশ্চিত করে যার ফলে এ ধরনের রকেট রাসায়নিক জ্বালানী দিয়ে চালিত রকেটের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ ভার বহনে সক্ষম। এখন পর্যন্ত যদিও এরকম কোন রকেট উডয়ন করা হয় নি, তবে টোপাজ সিরিজ এবং স্ন্যাপ-১০ এ ফিশন চালিত বৈদ্যুতিক জেনারেটর এবং রেডিওআইসোটোপ তাপবিদ্যুত জেনারেটর মহাকাশে উৎক্ষেপিত হয়েছে।

পারমাণবিক জ্বালানীর প্রকারভেদ[সম্পাদনা]


নিউক্লিয় থার্মাল রকেটকে রিএক্টরের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে সাধারণ সলিড রিএক্টর আছে আবার জটিল নকশার অধিকতর কার্যকর গ্যাস কোর রিএক্টরও আছে। অন্যান্য সকল থার্মাল রকেটের মত জ্বালানীর ক্রিয়ায় উৎপন্ন স্পেসিফিক ইমপালস কার্যনির্বাহী তরল যে তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয় সে তাপমাত্রার বর্গমূলের সমানুপাতিক হয়। সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতার জন্য এই তাপমাত্রার মানও যতটা সম্বব বেশি হতে হয়। একটা নির্দিষ্ট নকশার রকেটের জন্য, এই তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমা নির্ভর করে রিএক্টর কোর পদার্থ, নিউক্লিয় জ্বালানীর ধরন, ফুয়েল রডের বহির্ভাগের ধরন এই বিষয়গুলোর উপর। এই অংশগুলোর ক্ষয় হওয়া আরেকটা বড় বিষয় এক্ষেত্রে, বিশেষভাবে জ্বালানী অপচয় ও বিক্রিয়ার ফলে উদ্ভুত তেজস্ক্রিয়তার উপর তাপমাত্রার মান নির্ভর করে।

সলিড কোর[সম্পাদনা]

NASA-NERVA-diagram

উপযুক্ত পরিবেশে সলিড কোর নিউক্লিয় রিএক্টরে কঠিন অবস্থায় প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত হয়। ফ্লাইট রিএক্টরগুলোকে হালকা ও উচ্চ তাপসহ হতে হয়, কেননা এখানে শীতলীকরণ তরল একটিই আর তা হল কার্যনির্বাহী তরল। নিউক্লিয় সলিড কোর রিএক্টরই হল থার্মাল নিউক্লিয় রকেটের সবচেয়ে সাধারণ নকশা যা দ্বারা সকল পরীক্ষামূলক নিউক্লিয় থার্মাল রকেট নকশা ও পরীক্ষা করা হয়েছে।

জ্বালানী ও রিএক্টরের প্রেশার ভেসেল নির্মানে ব্যবহৃত পদার্থের বৈশিষ্ট্যের কারণে, বিশেষত গলনাংকের কারণে সলিড কোর নিউক্লিয় রিএক্টরের কর্মদক্ষতা সীমাবদ্ধ হতে পারে। পারমাণবিক বিক্রিয়ায় যে তাপ নির্গত হয়, তাতে খুব কম পদার্থই সেখানে তাপসহ হতে পারে, অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রিএক্টরের প্রকৃত কর্মদক্ষতা সঠিকভাবে অনুধাবন কর যায়না। আরো বলতে গেলে, তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে উৎপন্ন তাপশক্তিকে শীতলীকরণ তরলের সাহায্যে বাইরে বিকিরণ বা অবমুক্ত করে দেয়া যায়। এটা ফুয়েল রডকে ধীরে ধীরে তাপীয় পীড়ন বা থার্মাল স্ট্রেসের সামনে ধীরে ধীরে অবমুক্ত করার একটি পদ্ধতি। অপারেশন চলার সময় জ্বালানী নিউক্লিয় রিএক্টরে প্রবেশ থেকে এক্সজস্ট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রার সীমা থাকে ২২ কেলভিন থেকে ৩ হাজার কেলভিন। ফুয়েল রডগুলি ১.৩ মিটার লম্বা। রিএক্টরের অন্যান্য অংশের পদার্থের প্রসারণ সূচক যদি না মিলে, তবে ফুয়েল রডগুলির বহিরাংশ ভেঙে পড়তে পারে।

রকেটের প্রপেল্যান্ট হিসেবে হাইড্রোজেন ব্যবহার করলে সলিড কোর রকেটের নকশা ৮৫০ থেকে ১০০০ সেকেন্ডের ক্রমে একটা নির্দিষ্ট ইমপালস দেয়, যা প্রচলিত স্পেস শাটলের মেইন ইঞ্জিনের মত তরল হাইড্রোজেন-অক্সিজেনের মিশ্রণ ব্যবহারে পাওয়া ইমপালসের প্রায় দ্বিগুণ। অন্যান্য প্রপেল্যান্ট ব্যবহারের প্রস্তাবনাও রয়েছে সলিড কোরের নকশায় যেমন- অ্যামোনিয়া , পানি ও এলওএক্স। কিন্তু এসব প্রপেল্যান্ট সামান্য জ্বালানী খরচ হ্রাসের পাশাপাশি নির্গমণ বেগও উল্ল্যেখযোগ্য হারে হ্রাস করে। হাইড্রোজেনকে প্রপেল্যান্ট হিসেবে ব্যবহারের আরেকটি সুবিধা হল ১৫০০ কেলভিনের মত উচ্চ তাপমাত্রায় ও ৩০০০ কিলোপ্যাসকেলের মত উচ্চচাপে ভেঙে যেতে শুরু করে। নির্গমন হওয়া পদার্থের ভর যত কমে আসবে স্পেসিফিক ইমপালসের মাত্রা তত বাড়বে।

এখন পর্যন্ত মহাকাশে নিউক্লিয় ইঞ্জিন ব্যবহার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রকাশিত গবেষণাতেই সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। কেউই এ ব্যাপারে সুস্পষ্টরূপে নিশ্চিত নন। ১৯৪৭ সালে একটা সলিড কোর নিউক্লিয় রিএক্টর এতটা ভারী ছিল যে সেটা নিউক্লিয় ইঞ্জিনে ব্যবহার উপযুক্ত ছিলনা। পৃথিবীর মহাকর্ষের টান অতিক্রম করতে একটা ইঞ্জিনের থ্রাস্ট-ওয়েট রেশিও অন্ততপক্ষে ১ঃ১ হতে হয়, যা এই নিউক্লিয় রিএক্টরে অর্জন সম্ভব ছিলনা। পরবর্তী ২৫ বছরে ইউএস থার্মাল রকেটের ডিজাইন থ্রাস্ট-ওয়েট রেশিও ৭ঃ১ এ উন্নীত করতে সক্ষম হয় কিন্তু এটি এখনো প্রচলিত রাসায়নিক রকেটেত থ্রাস্ট-ওয়েট রেশিও থেকে বহুগুণে কম। প্রচলিত একটি রাস্যনিক রকেট ইঞ্জিনের থ্রাস্ট-ওয়েট রেশিও ৭০ঃ১। তরল হাইড্রোজেন সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ট্যাংক যুক্ত করে এই নিউক্লিয় ইঞ্জিনকে পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের বাইরে কক্ষপথে স্থাপন করে এর সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যবহার হতে পারে। বলা বাহুল্য, অবশ্যই তেজস্ক্রিয় দূষণ থেকে বায়ুমন্ডলকে রক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে এক্ষেত্রে।

রিএক্টরের কার্যনির্বাহী তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য একটি উপায় হল নিউক্লিয় জ্বালানী উপাদানগুলো পরিবর্তন করা। পার্টিকেল-বেড রিএক্টরের ক্ষেত্রে এটিই মূল, যেখানে এই জ্বালানী উপাদানগুলো কার্যনির্বাহী তরল হাইড্রোজেনের মধ্যে ভেসে থাকে। পুরো ইঞ্জিনকে ঘূর্ণনের মাধ্যমে নজল দিয়ে এই জ্বালানী উপাদানসমূহের বেরিয়ে যাওয়া রোধ করা হয়। বিদ্যমান নকশা থেকে জটিলতর এই নকশায় ৯.৮ কিলোনিউটন.সেকেন্ড/কেজি মানে (১০০০ সেকেন্ডের ক্রমে) স্পেসিফিক ইম্পালস পাওয়া সম্ভব বলে ধরা হয়। এই ধরনের নকশা বর্তমানে পিবল-বেড রিএক্টরে বিদ্যমান, যা কয়েকটি বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রে প্রচলিত। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাটেজিক ডিফেন্সিভ ইনিশিয়েটিভ দপ্তর ঘূর্ণায়মান ইঞ্জিন নয় এমন নিউক্লিয় থার্মাল রকেট তৈরির জন্য প্রজেক্ট টিম্বারউইন্ডে অর্থায়ন করেছিল। পরবর্তীতে এই প্রকল্প পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগেই বাতিল করা হয়।

পালসড নিউক্লিয় থার্মাল রকেট[সম্পাদনা]

PulsedrocketAri

পালসড নিউক্লিয় থার্মাল রকেট হল থ্রাস্ট বা ধাক্কা এবং স্পেসিফিক ইম্পালস বৃদ্ধি করার জন্য একধরনের সলিড নিউক্লিয় থার্মাল রকেট। এই ধরনের রকেটের ধারণায় প্রচলিত সলিড এন টি আর খানিকটা ট্রিগা রিএক্টরের মত পালস মোডে স্থিরাবস্থায় কাজ করে। জ্বালানী চেম্বারে প্রপেল্যান্ট অবস্থান করে খুব কম সময়ের জন্য। এর ফলে নিউক্লিয় কোরের পালসিং এর মাধ্যমে অধিক শক্তি উৎপন্ন হয় যা প্রপেল্যান্ট পদার্থে প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে ধাক্কা বা থ্রাস্টের মান বৃদ্ধি করে। এই রকেটের সবচেয়ে মজার দিক হল, এর মাধ্যমে প্রপেল্যান্টের উচ্চ তাপমাত্রা অর্জন করা যায় এবং এর ফলে উচ্চ নির্গমন বেগ পাওয়া যায়। এর কারণ হিসেবে সলিড কোরের সাথে তুলনা করে বলা যায়, পালসেশন থেকে আসা নিউট্রন কোরের মাধ্যমে প্রপেল্যান্ট তীব্রভাবে উত্তপ্ত হয়, যা সরআসরি জ্বালানী থেকে প্রপেল্যান্টে গতিশক্তি হিসাবে সরবরাহ হয়। কোরকে পালসিং করার মাধ্যমে মূল জ্বালানী থেকে উত্তপ্ত প্রপেল্যান্ট পাওয়া যায়।

প্রপেল্যান্টের তাৎক্ষণিক উচ্চ তাপমাত্রা সলিড কোরকে পালসিং করার মাধ্যমে তাত্ত্বিকভাবে পাওয়া সম্ভব। তবে পালসেশনের পর বিকিরণগত ঠান্ডা হবার প্রক্রিয়ার কারণে এটা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

লিকুইড কোর[সম্পাদনা]

লিকুইড কোর ইঞ্জিনের জ্বালানী হিসেবে বিভিন্ন ফিশনযোগ্য পদার্থের তরল মিশ্রণ ব্যবহৃত হয়। লিকুইড কোর নিউক্লিয় থারমাল রকেটের প্রস্তাবিত অপারেটিং তাপমাত্রা সলিড নিউক্লিয় জ্বালানী ও আবরণের চেয়ে বেশি।