বিষয়বস্তুতে চলুন

নারী ও শিশু পাচার দমন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

নারী ও শিশু পাচার দমন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন হলো ১৯২১ সালে স্বাক্ষরিত লীগ অফ নেশনস-এর একটি বহুপাক্ষিক চুক্তি, যা আন্তর্জাতিকভাবে নারী ও শিশু পাচার সমস্যা মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল।

পটভূমি

[সম্পাদনা]

উনিশ শতকের শেষের দিকে সামাজিক সংস্কার আন্দোলন-এর বিকাশের ফলে নারী অধিকার গোষ্ঠী, সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি কর্মী এবং অন্যান্যদের পক্ষ থেকে নারী ও শিশু পাচার এবং বেশ্যাবৃত্তি ও শ্রম শোষণে এর ভূমিকা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় গতি সঞ্চার হয়। এর আগে ১৯০১ এবং ১৯০৪ সালে ৩৪টি দেশ কর্তৃক আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলো অনুসমর্থিত হয়েছিল,[] এবং ১৯১০ সালে শ্বেত দাস বাণিজ্য দমন সংক্রান্ত কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়। ১৯১৯ সালে গঠিত লীগ অফ নেশনস দ্রুত এই প্রথাটি অধ্যয়ন এবং শেষ করার প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়কারী সংস্থা হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে লীগের কাজকে তার অন্যতম সাফল্য হিসেবে গণ্য করা হয়,[] যদিও সামগ্রিকভাবে লীগ যুদ্ধ প্রতিরোধে অক্ষমতার কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। ১৯২৮ সালে প্রকাশিত ইভলিন ওয়াহ-এর উপন্যাস ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল-এ লীগের এই কাজের একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল।

লীগ অফ নেশনস

[সম্পাদনা]

প্রতিষ্ঠার সময় লীগ অফ নেশনস প্রথমে নারী অধিকার গোষ্ঠীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেনি, যারা তাদের এই বর্জনের প্রতিবাদ জানিয়েছিল এবং সমর্থনের জন্য রাজনীতিকদের কাছে আবেদন করেছিল। শেষ পর্যন্ত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এবং ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্ল্যামেনসো নারী অধিকার গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণকে সমর্থন করেন। তারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে নারী সংক্রান্ত সমস্যাগুলোতে সোচ্চার হওয়ার জন্য এই গোষ্ঠীগুলোই সবচেয়ে উপযুক্ত। লীগ ১৯২১ সালে শ্বেত দাস বাণিজ্য সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে এবং ১৯২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নারী ও শিশু পাচার দমন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে একমত হয়।[]

১৯৩৩ সালে লীগ প্রাপ্তবয়স্ক নারী পাচার দমন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন পাস করে।

প্রধান বিষয়বস্তু

[সম্পাদনা]

১৯২১ সালের কনভেনশন আন্তর্জাতিক স্তরে পাচার এবং যৌন শোষণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এর ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, "উচ্চ চুক্তিবদ্ধ পক্ষসমূহ একমত যে, যদি তারা ইতিমধ্যে কর্মসংস্থান সংস্থা ও অফিসগুলোর লাইসেন্স প্রদান এবং তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে থাকে, তবে অন্য দেশে কর্মসংস্থান খুঁজছেন এমন নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রবিধান জারি করবে।" এবং ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে "অভিবাসন ও বহির্গমন সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়েছে যা নারী ও শিশু পাচার রোধে প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে, তারা অভিবাসী জাহাজে ভ্রমণকারী নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রবিধান তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয়, যা কেবল যাত্রা শুরু এবং পৌঁছানোর স্থানেই নয়, যাত্রাপকালীন সময়েও কার্যকর থাকবে। এছাড়া রেলওয়ে স্টেশন এবং বন্দরে নারী ও শিশুদের পাচার সম্পর্কে সতর্ক করে এবং তাদের আবাসন ও সহায়তা প্রাপ্তির স্থান নির্দেশ করে বিজ্ঞপ্তি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।"

প্রভাব

[সম্পাদনা]

১৯২১ সালের কনভেনশন মানব পাচার রোধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করে। এটি মূলত পাচার বিরোধী আন্দোলনকে আরও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি এই সমস্যাটি গবেষণা ও মোকাবিলার জন্য একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো প্রদান করে। নারী ও শিশু পাচার সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি ছিল লীগের একটি স্থায়ী উপদেষ্টা কমিটি। এর সদস্য ছিল নয়টি দেশ এবং বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা (NGO)। একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ছিল সদস্য দেশগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল পদ্ধতি বাস্তবায়ন। সদস্য দেশগুলো নারী ও শিশু পাচার শনাক্ত ও প্রতিবেদন করার জন্য তাদের নিজস্ব কেন্দ্রীয় অফিস গঠন করে।[]

উপদেষ্টা কমিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বাইরেও তার গবেষণা ও হস্তক্ষেপ কর্মসূচি সম্প্রসারণের জন্য কাজ করেছিল। ১৯২৯ সালে নিকট প্রাচ্য (এশিয়া মাইনর), মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ায় এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়। ১৯৩৭ সালের জন্য এশিয়ার কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষগুলোর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।[]

সংরক্ষণসমূহ

[সম্পাদনা]

এই ১৯২১ সালের কনভেনশনে কিছু দেশ সংরক্ষণ ঘোষণা করে; অন্যদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, জাপান, স্পেন এবং নিউজিল্যান্ড কলোনি বা উপনিবেশ, সংরক্ষিত রাজ্য (protectorate) এবং ম্যান্ডেটভুক্ত অঞ্চলে এর প্রয়োগ সংরক্ষণ করে। ভারত, জাপান এবং থাইল্যান্ড ২১ বছরের কম বয়সীদের সীমাবদ্ধতা সংক্রান্ত ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সংরক্ষণ বজায় রাখে।

পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইন

[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-এর ফলে লীগ অফ নেশনস বিলুপ্ত হয় এবং এর স্থলাভিষিক্ত হয় জাতিসংঘ। ফলে ১৯২১ সালের কনভেনশনটি ১৯৪৭ সালের প্রটোকল দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়, যা ১৯২১ সালের নারী ও শিশু পাচার দমন সংক্রান্ত কনভেনশন সংশোধনের জন্য ১৯৪৭ সালের ১২ নভেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক উত্থাপিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের প্রটোকলটি শেষ পর্যন্ত ৪৬টি দেশ দ্বারা অনুসমর্থিত হয়। এই প্রটোকলটি পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালের 'ব্যক্তি পাচার এবং অন্যের বেশ্যাবৃত্তি থেকে শোষণ দমন সংক্রান্ত কনভেনশন' দ্বারা স্থলাভিষিক্ত হয়, যার প্রস্তাবনায় ১৯১০ সালের শ্বেত দাস বাণিজ্য দমন সংক্রান্ত কনভেনশন এবং ১৯৩৩ সালের প্রাপ্তবয়স্ক নারী পাচার দমন সংক্রান্ত কনভেনশনের পাশাপাশি ১৯২১ সালের এই কনভেনশনের কথা স্মরণ করা হয়েছে।[]

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

মানব পাচার

শিশু বেশ্যাবৃত্তি

লীগ অফ নেশনস

সংস্কার আন্দোলন

বেশ্যাবৃত্তি সংক্রান্ত আইন

সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি

যৌন দাসত্ব

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Berkovitch 1999, পৃ. 75–6।
  2. Kershaw, Ian (২০১৫)। To Hell and Back, Europe 1914-1949। London: Penguin। পৃ. ২৪৯আইএসবিএন ৯৭৮০১৪১৯৮০৪৩০
  3. Berkovitch 1999, পৃ. 75।
  4. Berkovitch 1999, পৃ. 76।
  5. Berkovitch 1999, পৃ. 77।
  6. "1921 International Convention for the Suppression of the Traffic in Women and Children, as amended by the 1947 Protocol"। Centre for International Law, National University of Singapore। ১০ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১২ মে ২০১২

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]

Berkovitch, Nitzka (১৯৯৯)। "Chapter 3: "For the Protection of Women and Children" – The Interwar Era Discourse on Women"। From Motherhood to Citizenship: Women's Rights and International Organizations। JHU Press। আইএসবিএন ৯৭৮০৮০১৮৬০২৮৭

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]

১৯২১ সালের চুক্তির অনুসমর্থনসমূহ