নাফিসা আল-বাইদা
নাফিসা আল-বায়দা (সক্রিয় ১৭৬৮ - ১৮১৬) মিশরের মামলুক নেতা আলি বে আল-কবির এবং মুরাদ বে-এর স্ত্রী ছিলেন। তাকে ১৮শ শতাব্দীর মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত মামলুক নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি একজন সফল ব্যবসায়িক অর্থদাতা এবং জনহিতৈষী ছিলেন। তবে ১৭৯৮-১৮০১ সালে মুরাদ বে এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ফরাসি দখলদার বাহিনীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার কূটনৈতিক সেবার জন্য তিনি সর্বাধিক পরিচিত।[১]
জীবন
[সম্পাদনা]নাফিসা আল-বায়দা কোথা থেকে এসেছে তা জানা যায়নি। তবে তাকে "শ্বেত দাসী" হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এটি মিশরের মামলুক অভিজাতদের দাসী-উপপত্নী এবং স্ত্রীদের জন্য একটি সাধারণ ছিল।[২] মামলুক অভিজাতরা, যারা নিজেরা শ্বেতাঙ্গ বংশোদ্ভূত (প্রায়শই সার্কাসিয়ান বা জর্জিয়া থেকে) ছিলেন, একই জাতিগত বৈশিষ্ট্যের নারীদের বিয়ে করতে পছন্দ করতেন। কৃষ্ণাঙ্গ দাসী নারীদের ঘরোয়া কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো। শ্বেতাঙ্গ দাসী নারীদের যারা মামলুকদের উপপত্নী ও স্ত্রী হিসেবে কেনা হতো। দাসীদের প্রায়ই ককেশাস, সার্কাসিয়ান বা জর্জিয়ান অঞ্চল থেকে আনা হতো। তাদের দরিদ্র পিতামাতারা কৃষ্ণ সাগরের দাস ব্যবসার মাধ্যমে দাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিতেন। ধারণা করা হয়, নাফিসা আল-বায়দার সাথেও এমনই একই ঘটনা ঘটেছিল।[৩]
আলী বে আল-কবীর
[সম্পাদনা]নাফিসা আল-বাইদাকে কায়রোতে মামলুক নেতা আলী বে আল-কবীরের হারেমে কিনে নেওয়া হয়েছিল। সে আলী বে-এর প্রিয় উপপত্নী ছিল। আলী বে অবশেষে তাকে মুক্ত করে বিয়ে করেছিলেন। এটি একজন মামলুকের স্ত্রীর জন্য স্বাভাবিক ঘটনা ছিল।তারা সাধারণত নিজেদের দাসী বা সমমর্যাদার মানুষের মেয়েদের বিয়ে করতেন। এটি ইসলামী বিশ্বের অভিজাত পুরুষদের মধ্যে একটি সাধারণ প্রথা ছিল। ১৭৬৮ সালে, আলী বে আল-কবীর অস্থায়ীভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের কাছ থেকে মিশর কেড়ে নেন এবং এর শাসক হন। ১৭৭৩ সালে তিনি বিধবা হন।
মুরাদ বে
[সম্পাদনা]বিধবা হওয়ার পর নাফিসা আল-বায়দা মামলুক নেতা মুরাদ বে-কে বিয়ে করেন। মিশরের মামলুক অভিজাতদের মধ্যে অন্য মামলুকদের বিধবা বা উপপত্নীদের বিয়ে করে মূল্যবান জোট ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রথা প্রচলিত ছিল। মুরাদ বে এবং আলী বে-এর বিধবা স্ত্রী নাফিসা আল-বাইদার বিবাহ ছিল এই বিবাহ নীতির একটি উদাহরণ। শাওয়িকার কাদিন উসমান কাটখুদার (মৃ. ১৭৩৬) উপপত্নী ছিলেন। উসমানের মৃত্যুর পর আব্দুর রহমান জইশ তাকে ইব্রাহিম কাটখুদা (মৃ. ১৭৫৪)-এর সাথে বিয়ে দেন। নাফিসা আল-বায়দার দ্বিতীয় স্বামী মুরাদ বে ১৭৮৪-১৭৮৫ সালে মিশরের অটোমান গভর্নর এবং ১৭৯১ থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত মিশরের প্রকৃত শাসক ছিলেন।[৪]
১৭৯৮ সালে, নেপোলিয়ন বোনাপার্টের নেতৃত্বে ফ্রান্স মিশর আক্রমণ করে। পিরামিডের যুদ্ধে ফরাসিদের বিজয়ের পর মুরাদ বে ফরাসিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পালিয়ে যান। নাফিসা আল-বায়দা ফরাসি দখলের সময় কায়রোতে থেকে যান। তিনি তাঁর অনুপস্থিত স্বামী এবং কায়রোর ফরাসি বণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি ফরাসি দখলদার বাহিনী এবং মুরাদ বে-এর মধ্যে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করেন।[৫]
১৮০১ সালে মুরাদ বে-এর মৃত্যুতে তিনি আবার বিধবা হন। তিনি ফরাসিদের সাথে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাঁর অবস্থান ব্যবহার করে নিশ্চিত করেন যে তাঁর মৃত স্বামীর সম্পত্তি যাতে ফরাসিরা বাজেয়াপ্ত করতে না পারে। তিনি নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে আলোচনা করেন। নেপোলিয়ন তাকে বড় অঙ্কের কর দিতে বাধ্য করেন।[৬][৭]
ব্যবসায়িক কার্যকলাপ
[সম্পাদনা]ইসলামী আইন অনুসারে, নাফিসা আল-বায়দা বিবাহিত নারী হওয়া সত্ত্বেও নিজের অর্থ নিয়ন্ত্রণের অনুমতি পেয়েছিলেন। মিশরের মামলুক অভিজাত নারীদের জন্য সাধারণ প্রথা অনুসরণ করে হারেমে থেকেও তিনি বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসায়ে অংশ নেন। তিনি একজন সফল এবং ধনী ব্যবসায়ী বিনিয়োগকারী হয়ে ওঠেন।[৮]
তিনি অন্যান্য অনেক মামলুক অভিজাত নারীর উদাহরণ অনুসরণ করে দাতব্য কাজে অংশ নেন। তার সবচেয়ে পরিচিত দানশীল প্রকল্প ছিল একটি ভবন প্রতিষ্ঠা করা। সেখানে পানির বিতরণ কেন্দ্রের সঙ্গে এতিমদের জন্য একটি বিদ্যালয় ছিল। এটি "সাবিল-কুত্তুব নাফিসা আল-বায়দা" নামে পরিচিত। ১৭৯৬ সালে কায়রোর বাব জুওয়াইলার কাছে ভবনটি প্রতিষ্ঠিত হয়।[৯]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Sperling, Jutta; Wray, Shona Kelly (১৬ অক্টোবর ২০০৯)। Gender, Property, and Law in Jewish, Christian, and Muslim Communities in the Wider Mediterranean 1300–1800: Women, Property, and Law in the Wider Mediterranean (ca. 1300-1800) (ইংরেজি ভাষায়)। Routledge। আইএসবিএন ৯৭৮-১-১৩৫-২৩৫০১-৭।
- ↑ Jutta Sperling, Shona Kelly Wray, Gender, Property, and Law in Jewish, Christian, and Muslim Communities in p. 256
- ↑ Fay, Mary Ann (২৭ আগস্ট ২০১২)। Unveiling the Harem: Elite Women and the Paradox of Seclusion in Eighteenth-Century Cairo (ইংরেজি ভাষায়)। Syracuse University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৫৬-৫১৭০-৩।
- ↑ Mary Ann Fay, Unveiling the Harem: Elite Women and the Paradox of Seclusion in Eighteenth
- ↑ Jutta Sperling, Shona Kelly Wray, Gender, Property, and Law in Jewish, Christian, and Muslim Communities in
- ↑ Maria Golia, Cairo: City of Sand
- ↑ Maria Golia, Cairo: City of Sand
- ↑ Golia, Maria (৪ জুন ২০০৪)। Cairo: City of Sand (ইংরেজি ভাষায়)। Reaktion Books। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৬১৮৯-১৮৭-৭।
- ↑ Ghada Hashem Talhami, Historical Dictionary of Women in the Middle East and North Africa