নজদা ইবন আমির আল-হানাফি
নজদা ইবন আমির আল-হানাফি (আরবি: نجدة بن عامر الحنفي; আনুমানিক ৬৫৫–৬৯১/৯২) মধ্য ও পূর্ব আরব অঞ্চলে ৬৮৫ সাল থেকে নিজের মৃত্যু পর্যন্ত একটি খারিজি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। তাঁর আবির্ভাব ঘটে দ্বিতীয় মুসলিম গৃহযুদ্ধ চলাকালীন। তিনি যে দলটি পরিচালনা করতেন, তা উমাইয়া খেলাফতের (যারা সিরিয়া ও মিশর নিয়ন্ত্রণ করত) এবং ইবন আল-জুবায়রের খেলাফতের (যারা হেজাজ ও ইরাক শাসন করত) বিরোধী ছিল।
প্রারম্ভিক জীবন ও কর্মজীবন
[সম্পাদনা]নজদা আনুমানিক ৬৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং বনু বকর গোত্রের একটি উপশাখা বনু হানিফার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাঁরা ইয়ামামা (মধ্য আরব উপদ্বীপ) অঞ্চলে বাস করতেন।[১] তরুণ বয়সেই তিনি নিজের এলাকায় বনু হানিফার খারিজিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেন।[১] ৬৮০ সালে তিনি ইয়ামামায় উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, যা প্রায় একই সময়ে ঘটে হুসাইন ইবন আলীর কারবালার যুদ্ধে পরাজয়ের ঘটনার সঙ্গে।[২] ৬৮৩ সালে মক্কার উমাইয়া অবরোধ চলাকালে, যেখানে আবদুল্লাহ ইবন আল-জুবায়র আশ্রয় নিয়েছিলেন, নজদা ও তাঁর অশ্বারোহীরা ইবন আল-জুবায়রের সহায়তায় এগিয়ে যান।[২][৩] অবরোধ প্রত্যাহারের পর, ইবন আল-জুবায়র নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন এবং নজদা ও অন্যান্য খারিজি নেতা বাসরায় চলে যান।[২] সেখানে খারিজি নেতা নাফি ইবন আল-আযরাকের নেতৃত্বে তাঁরা প্রাক্তন মিত্র ইবন আল-জুবায়রের বাহিনীর মুখোমুখি হন, যিনি ৬৮৪ সালে বাসরার দখল নিতে আসেন।[২] শেষ পর্যন্ত বাসরার আরব সেনাদল ইবন আল-জুবায়রের আধিপত্য মেনে নেয় এবং খারিজিরা কাছাকাছি আহওয়াজ অঞ্চলে সরে যায়।[২]
আরবে খারিজিদের নেতা
[সম্পাদনা]নাফির সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ দেখা দেওয়ায় নজদা ইয়ামামায় ফিরে আসেন, যেখানে তখন খারিজিদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আবু তালুত সালিম ইবন মাতার।[২] আবু তালুত ইয়ামামার বিশাল কৃষিভূমি জাউন আল-খাদারিম দখল করেন, যা আগে বনু হানিফার ছিল, কিন্তু উমাইয়া খলিফা মু'আবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান তা কেড়ে নিয়েছিলেন এবং সেখানে প্রেরিত ৪০০০ দাসের সাহায্যে চাষাবাদ করতেন।[২][৪] ৬৮৫ সালে নজদা জাবালায় একটি বাসরামুখী কাফেলাকে বাধা দেন এবং লুণ্ঠিত সম্পদ জাউন আল-খাদারিমের খারিজিদের মধ্যে বিতরণ করেন।[২][৪] তিনি পরামর্শ দেন যেন তারা মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদেরই কৃষিকাজে ব্যবহার করে। তাঁর এ পদক্ষেপ তাঁকে ইয়ামামার খারিজিদের মধ্যে খ্যাতি এনে দেয়। তিনি যখন নেতা হওয়ার প্রস্তাব দেন, সবাই একমত হয়ে তাঁকে সমর্থন করে, এমনকি আবু তালুতও সরে দাঁড়ান।[২][৪] এর পর থেকে আরবে খারিজি আন্দোলন তাঁর নামে নজদাত নামে পরিচিত হয়।[১]
নেতা হওয়ার কিছুদিন পর নজদা বাহরাইনে বনু আমির গোত্রের একটি শাখা বনু কা'ব-এর বিরুদ্ধে অভিযান চালান এবং যুল-মাজাজের যুদ্ধে তাদের উপর বড় আঘাত হানেন।[১] তিনি বাজার থেকে লুট করা শস্য ও খেজুর পুনরুদ্ধার করেন।[৫] এই বিজয়ের মাধ্যমে তাঁর ধারাবাহিক সাফল্যের সূচনা ঘটে, যার ফলে তিনি ধীরে ধীরে আরবের অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেন। ইবন আল-জুবায়র তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কিছু করতে পারেননি।[৫] ৬৮৬ সালে নজদা আবার বাহরাইনে অভিযান চালান, এবার বনু আব্দ আল-কয়স গোত্রের বিরুদ্ধে, যারা খারিজিদের বিরোধিতা করছিল।[১] আজদ গোত্রের সহায়তায় তিনি কাতিফ এলাকায় বহু শত্রুকে হত্যা বা বন্দি করেন এবং সেখানেই নিজের সদর দফতর স্থাপন করেন।[১]
এই অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণের ফলে ইবন আল-জুবায়রের হেজাজ ও বাসরার মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। ইবন আল-জুবায়রের পুত্র বাসরার গভর্নর হামজা খারিজিদের রুখতে আবদুল্লাহ ইবন উমায়ের আল-লায়থির নেতৃত্বে ১৪,০০০ সেনার একটি বাহিনী প্রেরণ করেন, কিন্তু নজদা তাঁদের ওপর অতর্কিতে হামলা করে ছত্রভঙ্গ করে দেন।[৬][৭]
এরপর নজদা তাঁর উপ-নেতা আতিয়্যাহ ইবন আল-আসওয়াদ আল-হানাফিকে ওমান দখলের জন্য পাঠান।[৭] তিনি সেখানে কিছুদিন সফলভাবে শাসন করেন, কিন্তু তাঁর ডেপুটি আবুল কাসিম স্থানীয় নেতাদের হাতে নিহত হন এবং সাঈদ ও সুলাইমান অঞ্চল পুনর্দখল করেন।[৭] এরপর নজদা ও আতিয়্যার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়, সম্ভবত নজদার পক্ষপাতদুষ্ট বেতনবন্টন এবং উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে।[৭]
৬৮৭ সালের মধ্যে নজদা উত্তর বাহরাইন জয় করেন এবং কাজিমার বনু তামিম গোত্রকে কর প্রদানে বাধ্য করেন।[৮] এরপর তিনি সানআ শহর দখল করেন এবং উপ-নেতা আবু ফুদাইককে হাদরামাউত প্রেরণ করেন; উভয় অঞ্চলই তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে কর প্রদান শুরু করে।[৮] এই সাফল্যের ফলে আরবে তাঁর প্রভাব ইবন আল-জুবায়রের চেয়েও বেশি হয়ে ওঠে।[৮][৯]
উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক, যিনি বিভিন্ন সংকটে ব্যস্ত ছিলেন, নজদার সমর্থন চেয়ে তাঁকে ইয়ামামার গভর্নর পদ এবং পূর্ববর্তী ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষমার প্রস্তাব দেন, যদি তিনি খলিফার স্বীকৃতি দেন।[৮] নজদা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও খলিফার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখেন।[৫]
৬৮৭ সালে হজের সময় নজদা তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মক্কা আসেন, যেখানে ইবন আল-জুবায়র ও আবদুল মালিকের অনুসারীরাও ছিলেন।[১০] ইতিহাসবিদ ডিকসনের মতে, এটা প্রমাণ করে যে নজদা সে সময় উভয় খলিফার সমকক্ষ শক্তিধর ছিলেন।[১০] হজ শেষে তিনি মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনা করলেও ধর্মীয় কারণে তা বাতিল করেন। বরং তিনি তায়েফ শহরে গমন করেন, যার নেতা আমির ইবন উরওয়া তাঁকে আনুগত্য দেন।[১০] নজদা পাশের তাবালা শহরে অবস্থান নেন এবং তায়েফ, সারাত ও তাবালার গভর্নর করেন আল-হারুক আল-হানাফিকে। নাজরান অঞ্চলের বনু হিলাল গোত্র থেকে কর সংগ্রহের দায়িত্ব দেন সা'দ আল-তালায়িকে। এরপর তিনি বাহরাইনে ফিরে যান।[১১]
সেখানে ফিরে নজদা মক্কা ও মদিনার জন্য রওনা দেওয়া খাদ্যবহরের পথ রুদ্ধ করার নির্দেশ দেন, যাতে ইবন আল-জুবায়রের উপর চাপ সৃষ্টি হয়। তবে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের আহ্বানে তিনি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন, বিশেষ করে ইবন আব্বাসের অনুরোধে।[১২]
নজদার ক্ষমতার শীর্ষে থাকাকালীন, তাঁর দলে মতবিরোধ দেখা দেয়। খলিফা আবদুল মালিকের সঙ্গে সখ্য, সৈনিকদের মজুরিতে বৈষম্য এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের ধর্মীয় অপরাধ উপেক্ষা করায় অসন্তোষ দেখা দেয়। শেষপর্যন্ত আবু ফুদাইক ৬৯১/৯২ সালে বাহরাইনে তাঁকে হত্যা করেন।[৫][১৩]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 4 5 6 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Dixon298নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - 1 2 3 4 5 6 7 8 9 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Rubinacci858নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Wellhausen 1927, পৃ. 165.
- 1 2 3 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Dixon297নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - 1 2 3 4 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Rubinacci859নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Dixon 1969, পৃ. 298–299.
- 1 2 3 4 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Dixon299নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - 1 2 3 4 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Dixon300নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Wellhausen 1927, পৃ. 200.
- 1 2 3 উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়;Dixon301নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি - ↑ Dixon 1969, পৃ. 301–302.
- ↑ Dixon 1969, পৃ. 302.
- ↑ Dixon 1969, পৃ. 302–303.
গ্রন্থপঞ্জি
[সম্পাদনা]- ডিকসন, আবদুল আমীর আবদ (১৯৬৯)। উমাইয়া খেলাফত, ৬৫–৮৬/৬৮৪–৭০৫: একটি রাজনৈতিক অধ্যয়ন (পিএইচডি গবেষণাপত্র)। লন্ডন: লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS)। ওসিএলসি 652842483।
- ডিকসন, আবদুল আমীর আবদ (১৯৭১)। উমাইয়া খেলাফত: ৬৫–৮৬/৬৮৪–৭০৫ (একটি রাজনৈতিক অধ্যয়ন)। লন্ডন: লুজাক অ্যান্ড কোম্পানি। আইএসবিএন ৯৭৮০৭১৮৯০১৪৯৩। ওসিএলসি 833121104। (ডিকসন ১৯৬৯-এর সংশোধিত সংস্করণ)
- রুবিনাচ্চি, আর. (১৯৬০–২০০৫)। "নজদাত"। The Encyclopaedia of Islam, New Edition। Leiden: E. J. Brill। পৃ. ৮৫৮–৮৫৯। ডিওআই:10.1163/1573-3912_islam_COM_0831।
{{বিশ্বকোষ উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার|lastauthoramp=উপেক্ষা করা হয়েছে (|name-list-style=প্রস্তাবিত) (সাহায্য); অবৈধ|ref=harv(সাহায্য) - Wellhausen, Julius (১৯২৭)। The Arab Kingdom and its Fall। Margaret Graham Weir কর্তৃক অনূদিত। Calcutta: University of Calcutta। ওসিএলসি 752790641।