বিষয়বস্তুতে চলুন

নাইট্রো যৌগ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
একটি জৈব নাইট্রো যৌগের গঠন

নাইট্রো যৌগ হলো এমন এক ধরণের জৈব যৌগ যাতে এক বা একাধিক নাইট্রো কার্যকরী মূলক (−NO2) বিদ্যমান থাকে। নাইট্রো গ্রুপ হলো বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে সাধারণ এক্সপ্লোসোফোর (বিস্ফোরক তৈরিকারী কার্যকরী মূলক) গুলোর মধ্যে একটি। এই গ্রুপটি অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রন-আকর্ষী গ্রুপ (electron-withdrawing group)। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে, নাইট্রো গ্রুপের ঠিক পাশের (আলফা) কার্বন-হাইড্রোজেন (C−H) বন্ধনগুলো অম্লীয় হতে পারে। একইভাবে, অ্যারোমেটিক যৌগে নাইট্রো গ্রুপের উপস্থিতি ইলেক্ট্রোফিলিক অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার গতি কমিয়ে দেয় কিন্তু নিউক্লিওফিলিক অ্যারোমেটিক প্রতিস্থাপন বিক্রিয়াকে সহজতর করে। প্রকৃতিতে নাইট্রো যৌগ খুব কমই পাওয়া যায়। এগুলো প্রায় সবক্ষেত্রেই নাইট্রিক অ্যাসিড ব্যবহার করে নাইট্রেশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়।[]

সংশ্লেষণ

[সম্পাদনা]

অ্যারোমেটিক নাইট্রো যৌগ প্রস্তুতি

[সম্পাদনা]
নাইট্রোবেনজিন-এর গাঠনিক বিবরণ (দূরত্ব পিকোমিটারে)।

অ্যারোমেটিক নাইট্রো যৌগগুলো সাধারণত নাইট্রেশনের মাধ্যমে সংশ্লেষণ করা হয়। নাইট্রিক অ্যাসিড এবং সালফিউরিক অ্যাসিড-এর মিশ্রণ ব্যবহার করে এই বিক্রিয়া ঘটানো হয়, যা নাইট্রোনিয়াম আয়ন (NO+2) তৈরি করে। এই আয়নটি এখানে ইলেকট্রোফাইল হিসেবে কাজ করে:

 Benzene + Nitronium ion
 
H+
টেমপ্লেট:Biochem reaction arrow alt text
Nitrobenzene

সবচেয়ে বেশি পরিমাণে উৎপাদিত নাইট্রো যৌগ হলো নাইট্রোবেনজিন। অনেক বিস্ফোরক যেমন ট্রাইনাইট্রোফেনল (পিকরিক অ্যাসিড), ট্রাইনাইট্রোটলুইন (TNT), এবং ট্রাইনাইট্রোরিসোরসিনল নাইট্রেশনের মাধ্যমেই তৈরি করা হয়।[]

অ্যালিফ্যাটিক নাইট্রো যৌগ প্রস্তুতি

[সম্পাদনা]

অ্যালিফ্যাটিক নাইট্রো যৌগগুলো বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংশ্লেষণ করা যায়; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • অ্যালকেনের মুক্ত মূলক (Free radical) নাইট্রেশন: ৩৫০–৪৫০ °সে তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় প্রোপেনকে নাইট্রিক অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করালে নাইট্রোমিথেন, নাইট্রোইথেন, এবং নাইট্রোপ্রোপেন উৎপন্ন হয়।
  • মেয়ার সংশ্লেষণ (Meyer synthesis): অ্যালকাইল হ্যালাইড বা অর্গানোসালফেটের সাথে সিলভার নাইট্রাইট-এর নিউক্লিওফিলিক প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া।
  • টের মীর বিক্রিয়া (Ter Meer Reaction): ১৮৭৬ সালে এডমন্ড টের মীর এই পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেন। এতে ১,১-হ্যালো-নাইট্রোঅ্যালকেনের সাথে সোডিয়াম নাইট্রাইটের বিক্রিয়া ঘটানো হয়।
টের মীর বিক্রিয়ার সমীকরণ
টের মীর বিক্রিয়ার সমীকরণ

প্রকৃতিতে উপস্থিতি

[সম্পাদনা]

প্রকৃতিতে নাইট্রো যৌগ বিরল। ক্লোরামফেনিকল (Chloramphenicol) একটি বিরল প্রাকৃতিক নাইট্রো যৌগের উদাহরণ। কিছু কিছু ছত্রাক এবং উদ্ভিদে (যেমন: Indigofera) ৩-নাইট্রোপ্রোপায়োনিক অ্যাসিড পাওয়া যায়। উইপোকার আত্মরক্ষামূলক নিঃসরণে নাইট্রোপেন্টাডিসিন (Nitropentadecene) নামক যৌগ থাকে।

রাসায়নিক বিক্রিয়া

[সম্পাদনা]

নাইট্রো যৌগগুলো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জৈব বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে:

১. অ্যামিনে রূপান্তর: নাইট্রো যৌগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়া হলো বিজারণের মাধ্যমে অ্যামিন তৈরি করা।

RNO2 + 3 H2 → RNH2 + 2 H2O

প্রায় সব অ্যারোমেটিক অ্যামিন (যেমন: অ্যানিলিন) এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট নাইট্রো যৌগ থেকে তৈরি করা হয়।

২. অ্যাসিডিটি: নাইট্রোঅ্যালকেনের আলফা-কার্বন কিছুটা অম্লীয় হয়। নাইট্রোমিথেনের pKa মান প্রায় ১১। জলীয় দ্রবণে এগুলো প্রোটন বর্জন করে নাইট্রোনেট (nitronate) আয়ন গঠন করতে পারে।

৩. নেফ বিক্রিয়া (Nef reaction): অ্যাসিড বা জারকের উপস্থিতিতে নাইট্রোনেট লবণ আর্দ্রবিশ্লেষিত হয়ে কার্বনিল যৌগ (অ্যালডিহাইড বা কিটোন) উৎপন্ন করে।

বিস্ফোরণ

[সম্পাদনা]

নাইট্রো যৌগগুলোর বিস্ফোরক পচনের কারণ হলো এদের অণুর ভেতরেই জারক (নাইট্রো গ্রুপ) এবং জ্বালানি (হাইড্রোকার্বন অংশ) উভয়ই বিদ্যমান থাকে। বিস্ফোরণের ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় এবং অত্যন্ত স্থিতিশীল গ্যাস যেমন নাইট্রোজেন (N2), কার্বন ডাই অক্সাইড এবং জলীয় বাষ্প তৈরি হয়। এই স্থিতিশীল গ্যাসগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে প্রচণ্ড শক্তির সৃষ্টি করে।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Henry Feuer, সম্পাদক (১৯৭০)। Nitro and Nitroso Groups: Part 2, Volume 2। PATAI'S Chemistry of Functional Groups। খণ্ড ২। John Wiley & Sons Ltd.। ডিওআই:10.1002/9780470771174আইএসবিএন ৯৭৮-০-৪৭০-৭৭১১৭-৪
  2. Gerald, Booth। "Nitro Compounds, Aromatic"। উলম্যানস এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিস্ট্রি। ওয়েইনহেইম: উইলি-ভিসিএইচ। ডিওআই:10.1002/14356007.a17_411 {{বিশ্বকোষ উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতিতে খালি অজানা প্যারামিটার রয়েছে: |authors= (সাহায্য)

টেমপ্লেট:Functional groups