নলিনীরঞ্জন সরকার
নলিনীরঞ্জন সরকার | |
|---|---|
নলিনীরঞ্জন সরকার | |
| জন্ম | ১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২ |
| মৃত্যু | ২৫ জানুয়ারি ১৯৫৩ (বয়স ৭১) |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশী |
| পেশা | রাজনীতিবিদ |

নলিনীরঞ্জন সরকার (১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২ - ২৫ জানুয়ারি ১৯৫৩) অর্থনীতিবিদ, শিল্পপতি ও একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলার অর্থনীতি ও রাজনীতি সঙ্গে ব্যাপকভাবে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৪৮-এ পশ্চিম বাংলার অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।[১]
প্রাথমিক ও শিক্ষা জীবন
[সম্পাদনা]নলিনীরঞ্জন ১৮৮২ সালে বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্গত নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার অদূরে সাজিউড়া নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।[১] ১৯৪৭এর দেশভাগের সময় নলিনীরঞ্জন ভারতে চলে যান। নলিনীরঞ্জন ১৯০২ সালে ময়মনসিংহ সিটি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯০২ সালে তখনকার পোগোজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করার পর তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন । পরবর্তীকালে তিনি যোগ দেন কলকাতার সিটি কলেজ, ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আর্থিক কারণে তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি।
রাজনীতি
[সম্পাদনা]
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পরে তিনি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেমে পড়েছিলেন। তিনি নিজেকে কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন, তাঁর বন্ধুদের সাথে মিলেমিশে এক জঞ্জাল মেসের ঘরে থাকতেন। প্রায়শই তাকে অনাহারে দিন কাটাতে হত; সকালের চা ও জলখাবারের জন্য তিনি তার বন্ধুবান্ধব ও পৃষ্ঠপোষকদের বাড়িতে যেতেন। সাহস ও ধৈর্য তাকে ধরে রেখেছিল। সহসাই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নজরে আসেন যিনি তার জন্য হিন্দুস্তান সমবায় বীমা ক্ষেত্রে একটি ক্ষুদ্র চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। এটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠাতা ও সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রধান নির্বাহী ছিলেন।[২] শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯১১ সালে যোগ দেন হিন্দুস্তান কো-অপারেটিভ ইনস্যুরেন্স সোসাইটিতে। ১৯২৩-২৮ সাল পর্যন্ত স্বরাজ পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, কলকাতা করপোরেশনে ও সর্বভারতীয় বণিক সভায় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৭ সালে এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত বঙ্গীয় সরকারের মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৪৯ পর্যন্ত রাজনৈতিক জীবনে বহুবার বিভিন্ন বিভাগের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।[৩]
১৯৩৫ থেকে ১৯৫৩ সাল
[সম্পাদনা]১৯৩৬ সালে তিনি এ. কে. ফজলুল হক এর সাথে কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠন করেন এবং ১৯৩৭ সালে প্রথম হক মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি পদত্যাগ করেন, তবে পরে পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। ১৯৩৯ সালে, মন্ত্রিসভার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে হতাশ হয়ে তিনি আবার পদত্যাগ করেন। তিনি ভারতের গভর্নর-জেনারেল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে (১৯৪১–৪২) প্রথমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি বিভাগের সদস্য এবং পরে বাণিজ্য, শিল্প ও খাদ্য বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ১৯৪৩ সালে, গান্ধীজিকে আটকের প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী হন এবং ১৯৪৯ সালে কয়েক মাসের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৫২ সালে রাজনীতি থেকে অবসর নেন। ভারতের স্বাধীনতার পর, সরকার ভারতীয় সংবিধানের আর্থিক বিভাগের খসড়া প্রণয়নের জন্য একটি ৩-সদস্যবিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতিত্ব করেন।

অরাজনৈতিক জীবন
[সম্পাদনা]
১৯১১ সালে, তিনি হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স সোসাইটি (বর্তমানে লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া; ১৯৫৫ সালে ভারতের সমস্ত বেসরকারি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির জাতীয়করণের পর) যোগদান করেন এবং একটি সাধারণ পদ থেকে শুরু করে এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা ও জেনারেল ম্যানেজারের মতো উচ্চ পদে আরোহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত সভাপতি হন, যা তিনি মৃত্যু পর্যন্ত ধরে রাখেন। তাঁর উদ্যোগে, হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স সোসাইটি কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি আধুনিক আবাসিক স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণে বিনিয়োগ করে। এই অঞ্চলটি আজ নিউ আলিপুর নামে পরিচিত।[৪]
তিনি ১৯৩৩ সালে ভারতীয় বাণিজ্য ও শিল্প পরিষদ (FICCI) এবং বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও, তিনি কোম্পানি আইন সংশোধনের পরামর্শক কমিটি, সেন্ট্রাল ব্যাংকিং এনকোয়ারি কমিটি, ইনকাম ট্যাক্স রেফারি বোর্ড, রেলওয়ে রিট্রেঞ্চমেন্ট কমিটি, সেপারেশন কাউন্সিল, বোর্ড অফ ইকোনমিক এনকোয়ারি, রিসার্চ ইউটিলাইজেশন কমিটি এবং সেন্ট্রাল জুট কমিটি-এর সদস্য ছিলেন। ১৯২৩ সালে ইন্দো-জাপানিজ ট্রেড কনফারেন্স-এ তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়াও, তিনি কলকাতা বন্দরের কমিশনার এবং চিত্তরঞ্জন সেবা সদন-এর ট্রাস্টি ছিলেন।
তিনি জাতীয় শিক্ষা পরিষদ, বঙ্গ-এর সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং ভারতের শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৩৪ সালে তাকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের ফেলো নির্বাচিত করা হয়, ১৯৪০-৪১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্টের সদস্য এবং ১৯৪২ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯৪১-৪২ সময়কালে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রো-চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও, ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি সর্ব ভারতীয় কারিগরি শিক্ষা পরিষদ (AICTE)-এর চেয়ারম্যান ছিলেন।[৫] নলিনী রঞ্জন সরকার কমিটি-ই ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT)-এর আদলে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান (IIT) স্থাপনের সুপারিশ করেছিল।
২৫ জানুয়ারি ১৯৫৩ সালে ৭০ বছর বয়সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।[৬]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 সেলিনা হোসেন ও নুরুল ইসলাম সম্পাদিত; বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান; পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণঃ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৭; পৃষ্ঠা ১০-১১, আইএসবিএন ৯৮৪-০৭-৪৩৫৪-৬
- ↑ My Years with Dr BC Roy by Saroj Chakrabarty (page 123)
- ↑ "Nalini R. Sarkar, 70, Economist in India"। The New York Times (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ২৬ জানুয়ারি ১৯৫৩। আইএসএসএন 0362-4331। সংগ্রহের তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০।
- ↑ My Years with Dr BC Roy by Saroj Chakrabarty (page 124)
- ↑ Biswas, Arabinda; Agrawal, S. P. (১৯৮৬)। Development of Education in India: A Historical Survey of Educational। Concept Publishing। পৃ. ৩১৯–৩২১। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭০২২-০৬৬-৪।
- ↑ "Nalini R. Sarker, 70, Economist in India"। The New York Times। ২৬ জানুয়ারি ১৯৫৩। সংগ্রহের তারিখ ৪ জুন ২০১৩।
- বাঙালি রাজনীতিবিদ
- ১৮৮২-এ জন্ম
- ১৯৫০-এ মৃত্যু
- পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় স্বাধীনতা কর্মী
- ১৯৫৩-এ মৃত্যু
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী
- কলকাতার ব্যবসায়ী
- পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রী
- কলকাতার মহানাগরিক
- নেত্রকোণা জেলার ব্যক্তি
- নেত্রকোণা জেলার রাজনীতিবিদ
- ভারতের গভর্নর জেনারেল পরিষদের সদস্য
- সিটি কলেজ, কলকাতার প্রাক্তন শিক্ষার্থী
- বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য ১৯৩৭-১৯৪৫
- ২০শ শতাব্দীর ভারতের বিভিন্ন স্থানের মেয়র