নরত্তোম দাস ঠাকুর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নরোত্তম দাস ঠাকুর ( বৈষ্ণ কবি).jpeg

নরত্তোম দাস ঠাকুর (আনুমানকি ১৪৬৬; মৃত্যু ১৫৩১), এছাড়াও ঠাকুর মহাশয় নামে পরিচিত, ছিলেন একজন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সন্ত, যিনি ওড়িশা ও ভারতের বঙ্গে বৈষ্ণব ভক্তি প্রচার করেছিলেন।[১]

তিনি ছিলেন রাজা কৃষ্ণানন্দ দত্ত ও নারায়ণী দেবীর পুত্র, এবং মুঘল সাম্রাজ্যের (বর্তমান বাংলাদেশ) রাজশাহী জেলার গোপালপুর পরগনায় বেড়ে ওঠেন। ১৫৩১ বঙ্গাব্দ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে বর্তমানে খেতুরি ধাম জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতা বিশাল ভূসম্পত্তিরর মালিক ছিলেন কিন্তু, পিতার এই বিশাল সম্পত্তির প্রতি তার বিন্দু মাত্র লোভ ছিলনা। তার পিতা জাতে কায়স্থ ছিল, সে হিসেবে তিনি কায়স্থের সন্তান,মাত্র ১৬ বছর বয়সে পিতার এই অগাধ সম্পত্তি ত্যাগ করে চলে যান বিন্দাবনে। তার পিতার ইচ্ছা ছিল নরোত্তম সংসারী হইয়া জীবন যাপন করিবে। কিন্তু সংসারে প্রতি তার বিন্দুমাত্র টান ছিলনা।[২]

বাল্যকাল[সম্পাদনা]

বাল্যকালের কিছু সময় নিজ গ্রাম গোপালপুরে অতিবাহিত করার পর বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষালাভ করার জন্য ভারতের অন্যতম তীর্থস্থান বৃন্দাবন গমন করেন এবং বৈষ্ণবকূল শিরমনি লোকনাথ গোস্বামীর নিকট বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষালাভ করেন।[৩]

কিংবদন্তি[সম্পাদনা]

প্রেম বিলাস (নিত্যানন্দ প্রভু রচিত) গৃন্থে উল্লেখ অাছে,নরোত্তম দাস দীক্ষা লাভ করার জন্য লোকনাথ গোস্বামীর নিকট উপস্হিত হন এবং দীক্ষালাভ করার জন্য প্রার্থনা জানান,কিন্তু লোকনাথ গোস্বামী তাকে নিরাশ করেন এবং বলেন অামি শিষ্য করবোনা এই বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধগুরুর এই বাণী শুনে নরোত্তম হতাশা হয়ে পড়লে কিন্তু হাল ছাড়লেন না। নরোত্তম ভাবলেন যে কোন উপায়ে হোক তাকে দীক্ষা লাভ করতে হবে। প্রতিদিন প্রাতকালে লোকনাথ গোস্বামী মলত্যাগ করতেন,কিন্তু পরের দিন সকালে তার কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেতনা,তার মনে প্রশ্নের উদয় হল,কে তার এই বিষ্ঠা পরিষ্কার করে,যে আমার এই বিষ্ঠা পরিষ্কার করে সে অবশ্যই আমার পরম ভক্ত,তাকে অবলোকন করতে হবে। একদিন প্রাতকালে তিনি বিষ্ঠা ত্যাগ করে আসলেন এবং নজরে রাখলেন কার পদাচারন এখানে পড়ে,দেখলেন সে কেউ নয় নরোত্তম। লোকনাথ তাকে বুকে টেনে নিলেন এবং বললেন তুই আমার পরম ভক্ত হওয়ার যোগ্য এই বলে তিনি নরোত্তমকে শিষ্য করে নিলেন। এই ধরাধামে লোকনাথ গোস্বামীর একজনই শিষ্য ছিলেন।

ধর্মপ্রচার[সম্পাদনা]

সনাতন হিন্দু বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে সমাজে সম অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানব সেবার কাজ করতেন। তিনি বাল্যকাল থেকে ধর্মপরায়ণ, সংসার বৈরাগী ও উদাসীন প্রকৃতির লোক ছিলেন। বৃহত্তর হিন্দু সমাজে চৈতন্যদেবের প্রভাব বিচার করলে তার দান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করতে হয়। ঠাকুর নরোত্তম দাসের বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার, সমাজ সংস্কার ও মানব সেবার কাছে হার মেনে সমাজের ধনী, ভূস্বামী, দুর্দামত্ম নরঘাতক, ডাকাত, বিদ্যা মদোদ্ধত ব্রাহ্মণ-সকলেই তার পদপ্রামেত্ম লুটিয়ে পড়েছিলেন। অথচ এ চিরকর্মের চরিত্রে স্ফটিকশুভ্র চরিত্রে বিন্দুমাত্র মলিনতার ছাপ পড়েনি। নরোত্তম ঠাকুরকে স্মরণ করতে গোদাগাড়ীর ঐতিহ্যমন্ডিত গৌরাঙ্গবাড়িতে প্রতিবছর পালিত হয় তীরভাব তিথি। এ অনুষ্ঠানে লাখ লাখ নরোত্তম ভক্তের সমাগম ঘটে। ইতিহাসে পাওয়া যায় লালন শাহও নরোত্তম দাসের তীরোভাব তিথিতে যোগ দিয়েছিলেন। নরোত্তম দাসের অনুসারী ছিলেন, মহাত্মা গান্ধী। কিন্তু তিনি কখনো গৌরাঙ্গবাড়িতে আসেনি। বৈষ্ণব ধর্মই পালন করে গেছেন মহাত্মা গান্ধী। নরোত্তম নিজ গ্রাম গোপালপুরের সন্নিকটে খেতুরীতে আশ্রম নির্মাণ করে ধর্মসাধনায় ব্যবপৃত হলেন। এখানে তিনি প্রায় সাধারণ বেশে অবস্থায় করতে লাগলেন। পিতৃ অনুরোধ উপক্ষো করে, বিলাস পরিত্যাগ করে তিনি স্থানীয় কৃষ্ণমন্দিরে প্রায় সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করতে লাগলেন।এই অবস্থায় একদিন বিষ্ণুপুর থেকে প্রাপ্ত শ্রীনিবাসের পত্রে তিনি জানতে পারলেন যে হৃত গ্রন্থসমূহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি হৃতয় মনে স্বর্গীয় আনন্দ অনুভব করলেন। নতুন উৎসাহ উদ্দীপনায় ধর্ম সাধনায় গভীরভাবে নিমজ্জিত হলেন। এখন থেকেই জীবন সাধনার নবতর পর্যায় শুরু হল। তিনি গৃহে ঘুরে ফিরে ধর্ম প্রচার করতেন না। বরং খেতুরীর আশ্রমে বসেই তিনি অবাক হয়ে দেখলেন ক্রমেই তিনি এক রসিক প্রেমভিক্ষু ভক্তমন্ডলীর দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়েছেন। সে-যাই হোক, ধর্ম সাধনার এই পর্যায়ে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্য সমাধা করলেন, যার প্রভাবে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের মধ্যে তার খ্যাতি ও সাধনার দুশ্চর ফল পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ল। নরোত্তমের দ্বিতীয় প্রধান অবদান বৈষ্ণব সমাজ পদাবলী কীর্তন বা লীলা রসকীর্তনের প্রবর্তনা। বাংলার সঙ্গীত জগতের বিবর্তনের ইতিহাসে পদাবলী কীর্তন প্রায় চারশত বৎসর ধরে জনপ্রিয় হয়ে রয়েছে এবং শুরু বৈষ্ণব সম্প্রদায়েই নয় বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের সর্বত্রই জাতি নির্বিশেষে এর আবেদন সমান বহমান। আর সেজন্যই এই রসকীর্তন ধারার প্রবর্তক নরোত্তম দাস বিপুল যশের অধিকারী হয়েছেন। তিনি নিজেও সৃকন্ঠ গায়ক ছিলেন, একথা পূর্বেই বলা হয়েছে। পরবর্তীকালে তার প্রদর্শিন পন্থানুসরণ করে আরো কয়েকটি পদকীর্তন ঘরানার সৃষ্টি হয়েছিল। সেগুলিণ হচ্ছে ‘রেনেটি’ (রাণীহাটি), ‘মনোহরশাহী’ মান্দারনী’ এবং ঝাড়খন্ডী’। নরোত্তমের স্বীয় সঙ্গীতরীতিটি ‘গড়ানহাটি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। অন্যান্য পদ্ধতিগুলির স্রষ্টা শ্রীনিবাস আচার্য-মনোহরশাহী। এর কীর্তনীয়া ছিলান বিখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা জ্ঞানদাস, বলরাম দাস প্রমুখ। রাণীহাটি রীতির উদ্ভাবক বিপ্রদাস ঘোষ। কীর্তনিয়াগণ ছিলাম গোকুলানন্দ সেন, উদ্ধব দাস। এঁরাও বৈষ্ণব পদকার ছিলেন। অজ্ঞাত পরিচয় মান্দারনবাসী কীর্তনিয়া কর্তৃক প্রবর্তিত হয় ‘মান্দারনী’ রীতির পদকীর্তন। ‘ঝাড়খন্ডী’ রীতির প্রচলনকারীর নামও জানা যায় নি। সম্ভবত, তিনি মেদিনীপুর জেলার ঝাড়খন্ড নিবাসী ছিলেন। সে যা-ই হোক, নরোত্তমের ‘গড়ান হাটি’ রীতিউ সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়েছিল। নরোত্তম প্রেমধর্মের আদর্শে যে সমাজ সংস্কারব্রত গ্রহণ করেছিল তার যথার্থ প্রভাব পড়েছিল গৌড়দ্বারে। রাজমহলের নিকটবর্তী এই গৌড়দ্বারের প্রবল প্রতাপান্বিত রাজার দুইপত্র চাঁদরাই ও সমেত্মাষ রায় দস্যু প্রকৃতিসম্পন্ন ছিলাম। তাদের ঔদ্ধত্য এসনই ছিল যে তারা পাঠান মোগল যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে বাদশাহর খাজনা দেওয়াও বদ্ধ করে দিয়েছিল। এই চাঁদ রায় একটি নির্দোষ ব্রাহ্মণ বালককে হত্যা করে বায়ু রোগগ্রস্থ হয়ে পড়েন এবং তার অবস্থা শাষ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। দৈবনালা শ্রবণে শেষপর্যমত্ম খেতুরীর সন্ন্যাসী রাজকুমারের (নরোত্তমের) শরণাপন্ন হয়ে আরোগ্য লাভ করেন। পরে তিনি এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গো অনেক ব্রাহ্মণ সমত্মান নরোত্তমের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। নরোত্তম সমাজের নিকট আকৃষ্ট হয়ে বৈষ্ণবেরা এক বিশাল সমাবেশে নরোত্তমকে খাঁটি ব্রাহ্মণ বলে ঘোষণা দিয়েছিলাম। এই অবস্থায় ব্রাহ্মণ সমাজের ক্রোধ সকল সীমা অতিক্রম করে নরোত্তমকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার ফন্দি আঁটতে লাগলে। পক্কপল্লীর রাজা নৃসিংহ রায় একজন গোঁড়া ব্রাহ্মণ ভক্ত হিন্দুব্রাহ্মণ সমাজের প্রতিনিধিগণ এই রাজার শরণাপন্ন হয়ে সাহায্যপ্রার্থী হলেন। যাতে নরোত্তমকে ব্রাহ্মণ শিষ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখা যায়। তারা সেরা ব্রাহ্মণ শাস্ত্রজ্ঞপন্ডিত পাঠিয়ে নরোত্তমকে তর্কযুদ্ধে হারিয়ে হেয় প্রতিপন্ন করারও ফন্দি আঁটলেন। কিমত্মু শেষ পর্যমত্ম নরোত্তম শিষ্য গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তী এবং সহৃদ রামচন্দ্র কবিরাজ ও তার সহোদর কবি চূড়ামণি গোবিন্দ দাসের বুদ্ধি চাতুর্যে প্রতিপক্ষের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। শেষ পর্যমত্ম রাজা নৃসিংহরায় সপার্ষদ পন্ডিতমন্ডলীসহ নরোত্তমের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে গৌরবান্বিত হন। নরোত্তমের সাহিত্যকর্মও মধ্যযুগের পদাবলী সাহিত্যের ইতিহাসে অতুলনীয় সম্পদ। বৈষ্ণব পদাবলী বৈষ্ণব শাস্ত্রেরই রসভাষ্য। প্রধানত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার বিচিত্র পর্যায় বর্ণনাই এর উদ্দেশ্য; নর-নারীর পার্থিব প্রেমের সকাল ভাবানুভবের মধ্যদিয়ে পারমার্থিক প্রেমতত্ত্বের এক অতুলনীয় মহিমা পদাবলী সাহিত্যে বিধত। পর্ববাগ অনুরাগ অভিসার মান. মান. মিলন. বিরহ. প্রার্থনা, আত্মনিবেদন প্রভৃতি ধারাক্রমের মধ্য দিয়ে [[রাধাকৃষ্ণ প্রেম বৈষ্ণব পদাবলীতে এমন এব তত্ত্বে উপনীত হয়েছে, যেখানে অক্তের সঙ্গে ভগবানের জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার, সীমার সঙ্গে অসীমের এক মহামিলনের, এক অপার্থির পূর্ণতার অভিপ্রায়ই ব্যক্ত হয়েছে। এজন্য পদাবলী সাহিত্যের আবেদন শুরু ভক্ত বেষ্ণব সমাজের মধ্যেই সীমিত থাকেনি, তা দেশকাল থাকেনি, তা দেশকাল নির্বিশেষে সকল মানুষের আত্মিক আকুতিকেই অভিব্যক্ত করেছে। মধ্যযুগের অপরাপর প্রায় কয়েকশত পদকারদের পদচারণায় মুখরিত পদাবলী সাহিত্যের বিশাল ভুবনে, বিদ্যাপিত-চন্ডীদাস- জ্ঞানদাস-গোবিন্দ দাস বলরাম দাস প্রমুখ বিখ্যাত পদকারদের সাথে নরোত্তম দাস ঠাকুরও অমরত্ব লাভ করেছেন। তার কীর্তিরাজি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি মূলত সাধন মার্গের রাগাত্মিক পদ্ধতির পথিক ছিলেন। অর্থাৎ রাধাভাবে নয়, সখীভাবে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার অপার্থিব মাধুর্যের মধ্য ব্যক্ত করেছেন। তিনি একাধারে বৈষ্ণক শাস্ত্র বিষয়ক বহুগ্রন্থ যেমন রচনা করেছিলাম, তেমনি অনেক উৎকৃস্ট পদও রচনা করেছিলেন। [৪][৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Dimock, Jr, E.C. (১৯৬৩)। "Doctrine and Practice among the Vaisnavas of Bengal"। History of Religions3 (1): 106। জেস্টোর 1062079ডিওআই:10.1086/462474 
  2. http://m.banglanews24.com/national/news/bd/330909.details
  3. "সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ১৫ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ আগস্ট ২০১৮ 
  4. রাজশাহীর প্রতিভা ও নরোত্তম দাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী নামের বই থেকে।
  5. প্রেম বিলাস ( নিত্যানন্দ প্রভু) গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত