বিষয়বস্তুতে চলুন

নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
নব্বই এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন বা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান
ঢাকা অবরোধের গণসমাবেশ, ১০ নভেম্বর ১৯৮৭
তারিখ১০ অক্টোবর – ৪ ডিসেম্বর ১৯৯০
অবস্থান
কারণস্বৈরাচারী শাসন
ফলাফলগণতন্ত্রবাদীদের বিজয়
পক্ষ

গণতন্ত্রবাদী

নেতৃত্ব দানকারী
ক্ষয়ক্ষতি
নিহত~১০০

নব্বই এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন বা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান সূচনা হয় ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ যখন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেঃ জেঃ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অবৈধভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন । সে সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিএনপি মনোনীত ও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। সেনাপ্রধান লেঃ জেঃ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিচারপতি সাত্তারকে হটিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেই সামরিক আইন জারি করেন । সেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করে ছাত্ররা । পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পতন ঘটে স্বৈরাচার এরশাদের।

১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহা সহ অনেক ছাত্র-ছাত্রী নিহত হয়। ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাউফুন বসুনীয়া সরকার সমর্থিতদের গুলিতে নিহত হন। ১৯৮৭ সালে বুকে ও পিঠে 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক' লেখা যুবক নূর হোসেন শহীদ হন। তখন থেকে স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে একটি লাগাতার ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর। ১৯৯০ সালের ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডা. শামসুল আলম খান মিলন শহীদ হন, ১০ই অক্টোবর শহীদ জেহাদ নামে একজন ছাত্র পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হলে সেই মৃত জেহাদের লাশকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে তৎকালীন ক্রিয়াশীল সকল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সেখানে উপস্থিত হয় । ২৪টি ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে গড়ে উঠে 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য'। উল্লেখ্য, এই সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গড়ে উঠার আগে বৃহৎ দুই ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলবাংলাদেশ ছাত্রলীগ আলাদাভাবে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের মাধ্যমে ছাত্র সংগঠনের সকল শক্তি একই জায়গায় মিলিত হয়েছিল। এছারাও আরও কিছু শক্তিশালী বামধারার ছাত্র সংগঠন যথেষ্ট পরিমাণে সাংগঠনিক শক্তির অধিকারী ছিল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্রদল, জাসদ সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী ইত্যাদি। এছাড়া আওয়ামী লীগ এর নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোটের তিন জোটের রূপরেখা আন্দোলনে অনন্য মাত্রা যোগ করে। আন্দোলন দমন করতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের দুই প্রধান নেতৃত্ব খালেদা জিয়াশেখ হাসিনাকে একাধিকবার গ্রেফতার বা গৃহবন্দী বা অন্তরীণ করেও সব কয়টি রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের মিলিত শক্তির আন্দোলনের কাছে সেনাবাহিনী সমর্থিত জেনারেল এরশাদ টিকতে পারে নাই। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত আন্দোলনের সাথে দেশের জনগণ সম্পৃক্ত হলে তা গণ আন্দোলন থেকে গণ অভ্যুত্থানে রুপ নেয় । সেই গণ অভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদ ৪ঠা ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন । দীর্ঘ ৯ বৎসর পরিচালিত আন্দোলন ১৯৯০ এ এসে গণ আন্দোলনের রুপ নেয় । সেই গণ আন্দোলনে এরশাদ পদত্যাগ করেছিল । ইতিহাসে তা ৯০'র আন্দোলন হিসেবে পরিচিত । ১৯৯০ এর আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটেছিল মূলত ছাত্রনেতাদের দৃঢ়তায় । তৎকালীন ছাত্র নেতারা নিজ নিজ রাজনৈতিক পিতৃ সংগঠনের নির্দেশ উপেক্ষা করে , সকল আপোষকামী প্রস্তাবের বিপক্ষে দৃঢ় থাকায় ৯০'র আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটেছিল ।

নয় বছরের সামরিক শাসনের পর এই অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ১৯৯১ সালে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করে। এরশাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংঘটিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১০ অক্টোবর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট বিক্ষোভে প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়, জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর ২৭ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সহিংস বিক্ষোভ এবং রাস্তার সংঘর্ষে প্রায় পঞ্চাশজন হতাহত হয়। দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্রোহের পরপরই জেনারেল এরশাদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পটভূমি

[সম্পাদনা]

এরশাদের উত্থান

[সম্পাদনা]

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর , উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন । বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ. এম. এরশাদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে সমর্থন জানান। তবে, জেনারেল এরশাদ দ্য গার্ডিয়ানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে ব্যক্ত করেন যে সরকার এবং বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকা উচিত , যা রাষ্ট্রপতি প্রত্যাখ্যান করেন।

ক্ষুব্ধ জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি বিচারপতি সাত্তারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বিচারপতি আ ফ ম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ করেন। ১৯৮৩ সালের ১১ই এপ্রিল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সংবিধান স্থগিত করে নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন।

রাজনৈতিক বিরোধিতা

[সম্পাদনা]

১৯৮৩ সালে মজিদ খান শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয় এরশাদকে । জরুরি অবস্থার মধ্যে, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষায় আরবি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত মজিদ খান শিক্ষানীতির প্রতিবাদে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩) দুই দিনের পথযুদ্ধে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হন, যাদের নাম দিপালী সাহা, কাঞ্চন, জয়নাল, মোজাম্মেল এবং জাফর, সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে স্বৈরাচার বিরোধী দিবস হিসেবে পালিত হয়।

আন্দোলনের পরপরই, আওয়ামী লীগ আরও ১৫টি দলের সাথে জোট গঠন করে এবং বিএনপি আরও ৭টি দলের সাথে জোট গঠন করে এরশাদের শাসনকে প্রতিহত করে ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন শুরু করে। উভয় দল এবং জোটে বিভক্তির কারণে পরবর্তীতে আন্দোলনটি ধীর হয়ে যায়।

গণভোট

[সম্পাদনা]

নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করার লক্ষ্যে এরশাদ ১৯৮৫ সালে গণভোটের(হ্যাঁ/না ভোট) আয়োজন করেন, তার ফলাফল ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ফলাফল ছিল ৯৪.৫% হ্যাঁ এবং মোট ৭২.২% ভোট সংগৃহীত হয়েছিল। বিরোধীরা গণভোটের দিন সাধারণ ধর্মঘটের আয়োজন করেন এবং ফলাফল পূর্বনির্ধারিত বলে ঘোষণা করেন।

সংবিধান সংশোধন

[সম্পাদনা]

সংবিধানের সপ্তম ও অষ্টম সংশোধনী

এরশাদ তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নিজের ইচ্ছামতো সংবিধান সংশোধন করেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে সামরিক শাসন বহাল ছিল। ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে এইচএম এরশাদের ওই সামরিক শাসনে বৈধতা দেওয়া হয়। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত সামরিক আইন বলবৎ থাকাকালীন সময়ে প্রণীত সব ফরমান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, নির্দেশ ও অধ্যাদেশসহ অন্যান্য আইন অনুমোদন দেওয়া হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। এটি ছিল সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী।

১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচন

[সম্পাদনা]

১৯৮৬ সালের মার্চ মাসে, এরশাদ ৭ মে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং নির্বাচন বানচাল করার জন্য দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫-দলীয় জোট প্রাথমিকভাবে ১৭ মার্চ ১৯৮৬ সালে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

১৯ মার্চ চট্টগ্রামের লালদিঘি মাঠে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন :

আসন্ন জরিপে অংশগ্রহণের আমাদের কোনও পরিকল্পনা নেই। যারা এই জরিপে অংশগ্রহণ করবেন তাদের 'জাতীয় বেঈমান' হিসেবে ঘোষণা করা হবে।

কিন্তু পরবর্তীতে, ১৯৮৬ সালের ২১শে মার্চ রাতে, শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যে আওয়ামী লীগ এবং ১৫-দলীয় জোট নির্বাচনে যোগ দেবে। এই সিদ্ধান্তের পর, ১৫-দলীয় জোটের ওয়ার্কার্স পার্টি , জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সহ পাঁচটি বামপন্থী দল জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় এবং ৭-দলীয় জোটের সাথে নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং তার সাতটি মিত্র দলের ও জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণ পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য এরশাদ শাসনকে একটি পথ দেখিয়ে দেয়, যারা ইতিমধ্যেই একটি নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি তৈরি করেছিল এবং দেশে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করে দিয়েছিল।

খালেদা জিয়া-র নেতৃত্বে বিএনপি সহ সাত দলীয় জোট ও বামপন্থী ৫ দলীয় জোট এ নির্বাচন বর্জন করেন এবং খালেদা জিয়া আপোষহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

আন্দোলনের পুনরুজ্জীবন

[সম্পাদনা]

১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের পর, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট আবারও রাস্তায় নেমে আসে যা ১৯৮৭ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫-দলীয় জোটের শুরু করা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।

১৯৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর মহাখালীতে এক বৈঠকের পর বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৮৭ সালে যুবলীগের সমাবেশে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হওয়ার পর আন্দোলন এক নতুন শিখরে পৌঁছে । পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য সকল দল দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৮৭-৮৮ সালে সরকারের দমনমূলক পদক্ষেপের কারণে আন্দোলন খুব বেশি সফল হয়নি, যেমন বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার ঘন ঘন গৃহবন্দীত্ব ।

১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন

[সম্পাদনা]

ব্যাপক আন্দোলন ও বিরোধীদল গুলোর পদত্যাগের মুখে এরশাদ সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন এবং নতুন নির্বাচনের আয়োজন করেন। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচন বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জামায়াতে ইসলামী সহ প্রায় সকল রাজনৈতিক দল বর্জন করে। একতরফাভাবে নির্বাচিত এই সংসদও বেশিদিন টেকেনি।

ছাত্র আন্দোলন

[সম্পাদনা]

রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি, ছাত্র এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা এই উত্থানে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ডাকসু) সর্বদাই সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে । কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে ডাকসু নেতাদের কিছু দূরদর্শিতার অভাব এবং বিশ্বাসঘাতকতার কারণে, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ছাত্রদের মধ্যে তার আবেদন হারিয়ে ফেলে।

১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ , বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ-এর অধীনে একটি যৌথ প্যানেল গঠন করে এবং সুলতান মনসুর আহমেদ ডাকসুর সহ-সভাপতি হন। কিন্তু এই কমিটি সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ব্যর্থ প্রমাণিত হয় এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে খুব বেশি অবদান রাখতে পারেনি।

১৯৯০ সালের জুন মাসে, ছাত্রদল সমর্থিত আমানউল্লাহ আমান -খায়রুল কবির খোকন প্যানেল ডাকসু নির্বাচনে পূর্ণ প্যানেলের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল হল ইউনিয়নে জয়লাভ করে। আমানউল্লাহ আমান ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হন এবং খায়রুল কবির খোকন সাধারণ সম্পাদক হন।

ডাকসু নির্বাচনে সমস্ত সংগঠনকে পরাজিত করে, ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।

ডাকসু নেতারা এবং তাদের অনুসারীরা, যাদের বেশিরভাগই ছাত্রদলের কর্মী, ১৯৯০ সালে এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ক্যাম্পাস এলাকায় সমাবেশ এবং অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ছাত্রদলের বিশাল কর্মী গোষ্ঠী তিনটি জোট কর্তৃক ঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ শুরু করে।

ছাত্রদলের নেতৃত্বাধীন ডাকসু কমিটি ক্যাম্পাসের সকল বিদ্যমান ছাত্র সংগঠন, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদ এর সাথে একটি জোট গঠন করে এবং ১ অক্টোবর ১৯৯০ সালে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ করে। ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মঞ্জুর রশিদ খানের মতে,

(…) বিবাদমান রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং অবিশ্বাস উপেক্ষা করে, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদ (সর্বদলীয় ছাত্র পরিষদ) গণঅভ্যুত্থানের চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে।

১০ অক্টোবর ছাত্রদলের সমাবেশে পুলিশের গুলিবর্ষণের পর বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। এতে সিরাজগঞ্জের ছাত্রদল নেতা নাজির উদ্দিন জেহাদ নিহত হন। নাজিরউদ্দিন জেহাদ এরশাদের বিরুদ্ধে তিন জোটের ডাকা দেশব্যাপী ধর্মঘটে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন।

৪ নভেম্বর, ছাত্র পরিষদ রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় সমাবেশ করে যেখানে তারা পুলিশের অত্যাচারের মুখোমুখি হয়। ছাত্র জোট ১৯৯০ সালের ১৭ নভেম্বর মন্ত্রীদের কলোনি ঘেরাও করার ঘোষণা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শত শত ছাত্র পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে কর্মসূচিটি সহিংস হয়ে ওঠে এবং শত শত ছাত্র আহত হয়। ২১ নভেম্বর ছাত্র সংগঠন আরেকটি মিছিল করে এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

২৭ নভেম্বর, ছাত্র পরিষদের একটি কর্মসূচি চলাকালীন, জাতীয় পার্টির সশস্ত্র ক্যাডাররা ছাত্রদের উপর গুলি চালায়, যার ফলে ছাত্রদলের সশস্ত্র ক্যাডারদের সাথে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র কেন্দ্র-টিএসসি মোড় অতিক্রম করার সময়, জাতীয় পার্টির ক্যাডাররা চিকিৎসক শামসুল আলম খান মিলন-কে গুলি করে এবং পরে তিনি মারা যান। এই ঘটনা ছাত্রদের ক্ষুব্ধ করে এবং কাউন্সিল ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মন্ত্রিসভার সকল মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে এবং ঘোষণা করে যে তাদের দাবি পূরণ না হলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।

পরের দিন, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে আসে, যা পুলিশ ও বিডিআর সদস্যদের আক্রমণের শিকার হয়। ২৮ নভেম্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাঠি-ঝালাইকারী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের আশেপাশের এলাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। শিক্ষার্থীরা রাজধানীর মালিবাগে রেলপথ অবরোধ করে এবং চালককে ট্রেন থামিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

ছাত্র বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা এরশাদ সরকারকে নিরাপদ প্রস্থানের কথা ভাবতে বাধ্য করে।

আন্দোলনে কবি ও কবিতা

[সম্পাদনা]

অন্যদিকে এরশাদের রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের বিরোদ্ধে ও মানবিক অধিকারের প্রতিষ্ঠার দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহদের মত কবিরা।

"খোলা কবিতা" নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষক কবি মোহাম্মদ রফিক একটি নিষিদ্ধ কবিতা লিখেন। নিষিদ্ধ কবিতাটির কয়েকটি পঙ্‌ক্তি এরকম: "সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই, দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।"

পুরো কবিতাটি ছিল অনেক দীর্ঘ, প্রায় ১৬ পৃষ্ঠা। এটি গোপনে ছাপানো হয় এক ছাপাখানায়। নিউজপ্রিন্টে এক ফর্মায় ছাপানো সেই কবিতা গোপনে বিলি করেন মোহাম্মদ রফিকের ছাত্র-ছাত্রীরা। হাতে হাতে সেই কবিতা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।

তরুণ কবিরাও কলম ধরেন। সোচ্চার হন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে তরুণ কবি মু. নজরুল ইসলাম তামিজীর ‘মুক্তিপণ’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। এ কাব্যগ্রন্থ ১৯৮০’র দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একজন কিশোর কবির সাহসী ভূমিকার নিদর্শন। মু. নজরুল ইসলাম তামিজী কিশোর-তরুণদের বীরত্ব, প্রতিবাদী চেতনা ও মানবিক বোধকে কবিতার ভাষায় তুলে ধরেন। তাঁর লেখায় আন্দোলনের বাস্তব চিত্র—কারফিউ, গুলি, নিখোঁজ, শহীদদের রক্ত—জীবন্ত হয়ে উঠে। ছোট ছড়া-কবিতায় তিনি নির্মমতার বিপরীতে আশার বার্তা দেন। শিশুদের কণ্ঠেও প্রতিবাদের সুর তুলে ধরে সাহসিকতার প্রমাণ রাখেন। শিক্ষক, মাতা, সংখ্যালঘু—সবার অবস্থানও তিনি মানবিকতার দৃষ্টিতে তুলে ধরেন। ‘মুক্তিপণ’ কাব্যগ্রন্থ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা, যা তখনকার সময়ের রাজনৈতিক দুঃসহ সত্যকে উন্মোচিত করে। এ কবি শুধু কবিতা লেখেননি, বরং তা আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করেছেন। কবি এই কাব্যগ্রন্থে কিশোরদের চোখে গণতন্ত্রের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলেন এবং নিজেই হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের দলিল।

যৌথ ঘোষণাপত্র

[সম্পাদনা]

১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর বিএনপি সাত দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের আট দলীয় জোট এবং বামপন্থী পাঁচ দলীয় জোট "তিন দলীয় জোটের যৌথ ঘোষণাপত্র" বা তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন করে।

এই ঘোষণাপত্রটি মূলত একটি বেসামরিক সরকারের কাছে এরশাদের রাষ্ট্রপতিত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার রূপরেখা তুলে ধরেছিল। ঘোষণাপত্রে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার-এর ধারণা অন্তর্ভুক্ত ছিল যা এরশাদের পতনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করবে এবং ক্ষমতায় আসার ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করবে।

এরশাদকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রতিস্থাপনের সূত্রটি ছিল:

  • এরশাদকে পদত্যাগ করতে এবং তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করতে বাধ্য করা
  • রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর উপ-রাষ্ট্রপতি এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ করবেন যার নাম তিনটি জোট দ্বারা উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রস্তাবিত হবে।
  • উপ-রাষ্ট্রপতি যিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছেন তিনি তার পদ থেকে পদত্যাগ করবেন এবং নবনিযুক্ত উপ-রাষ্ট্রপতিকে তার স্থলাভিষিক্ত করবেন।
  • নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন এবং দশ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবেন।
  • রাষ্ট্রপতি এবং তার উপদেষ্টা পরিষদকে ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে।


ঘটনাপ্রবাহ

[সম্পাদনা]
  • ১০ অক্টোবর ১৯৯০

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোট দেশব্যাপী হরতাল পালন করেছে।

এই ধর্মঘটে ৫ জন নিহত হন, যার মধ্যে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশকারী তিনজন বিএনপি কর্মীও ছিলেন এবং জাতীয় পার্টির ক্যাডাররা জনতার উপর গুলি চালালে তারা মারা যান।

১৪ অক্টোবর ১৯৯০ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোট কর্তৃক কর্ম দিবস পালন করা হয়েছে।

  • ১৬ অক্টোবর ১৯৯০

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোটের আধা-দিবস দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। আওয়ামী লীগ এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করে।

  • ২৭ অক্টোবর ১৯৯০

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোটের দেশব্যাপী বাস-রেল অবরোধ

  • ৪ নভেম্বর ১৯৯০

রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় ছাত্র সমাবেশে পুলিশের হামলা , পঞ্চাশেরও বেশি শিক্ষার্থী আহত

  • ৫ নভেম্বর ১৯৯০

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫-দলীয় জোট কর্তৃক পালিত রেডিও-টেলিভিশন ভবন কর্মসূচি অবরোধ

  • ১০ নভেম্বর ১৯৯০

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫ দলীয় জোটের ২৪ ঘণ্টার দেশব্যাপী হরতাল পালিত, আরও ৪৮ ঘণ্টার দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা

  • ১৭ নভেম্বর ১৯৯০

মিনিস্টারস কলোনি অবরোধ করে রাখা হয়েছে। মিন্টু রোড এলাকায় মিনিস্টারস কলোনির দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শত শত শিক্ষার্থী পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রায় একশ জন শিক্ষার্থী আহত হয়।

  • ১৯ নভেম্বর ১৯৯০

তিনটি জোট একটি যৌথ ঘোষণায় ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি রোড-ম্যাপ প্রদান করে

  • ২০ নভেম্বর ১৯৯০

তিন জোটের ২৪ ঘন্টাব্যাপী দেশব্যাপী হরতাল, দুজনের মৃত্যু, শত শত আহত ধর্মঘট চলাকালীন বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনে হামলা

  • ২১ নভেম্বর ১৯৯০

২১ নভেম্বর ছাত্র সংগঠনটি আরেকটি মিছিল করে এবং পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়

  • ২৭ নভেম্বর ১৯৯০

খালেদা জিয়ার মইনুল রোড বাসভবনে হামলা

[সম্পাদনা]

আন্দোলনর চূড়ান্ত পর্যায়ে ২৭ নভেম্বর তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ঢাকা সেনানিবাসস্থ ৬ মইনুল রোডের বাসভবনে এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে যে, ফ্রিডম পার্টির নেতা কর্নেল (অব.) আবদুর রশিদের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ক্যাডার এই হামলা চালায়। হামলার সময় বাসভবনে ব্যাপক ভাঙচুর ও গুলিবর্ষণ করা হয়।

এই আক্রমণ চলাকালীন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান তার মাকে রক্ষা করতে এবং হামলাকারীদের বাধা দিতে গেলে গুরুতর আহত হন। হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে আঘাত করলে তিনি মাথায় ও শরীরে মারাত্মক আঘাত পান। একই দিনে চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলনের হত্যাকাণ্ড এবং খালেদা জিয়ার বাসভবনে এই হামলার ঘটনায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। []

জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ক্যাডারদের হাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ড. শামসুল আলম খান মিলন নিহত হন। সংবাদপত্রের উপর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়, কঠোর নজরদারি জোরদার করা হয়, সংবাদপত্র মালিক এবং সাংবাদিকরা পরের দিন থেকে সংবাদপত্র প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেন।

এরশাদের জরুরি অবস্থা ঘোষণা, কারফিউ জারি

  • ২৮ নভেম্বর ১৯৯০

শিক্ষার্থীরা কারফিউ অমান্য করে, লাঠি দিয়ে ঝালাই করে রাজধানী জুড়ে উত্তাল মিছিল করে শিক্ষার্থীরা

শহীদ মিনারে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিরোধী নেতারা

মালিবাগে রেলপথ অবরোধ, ট্রেন লাইনে রেখে পালিয়ে যায় চালক

  • ২৯ নভেম্বর ১৯৯০

উপাচার্য এম. মনিরুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক তাদের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং এরশাদের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে ফিরে যাবেন না।

  • ১ ডিসেম্বর ১৯৯০

রাজধানীর মিরপুর এলাকায়, বিডিআর (বর্তমানে বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ ) বিরোধী দলগুলির ডাকা দেশব্যাপী হরতালকে সমর্থন জানিয়ে সমাবেশরত জনতার উপর গুলি চালায়, যাতে পাঁচজন নিহত হয়। রাজধানীর কাজীপাড়ায়, পুলিশি নির্যাতনে দুজন নিহত হয়।

বন্দর নগরী চট্টগ্রামে , শ্রমিক সংগঠনগুলির একটি উত্তাল মিছিলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে একজন শ্রমিক নেতা নিহত হন।

সেদিন নারায়ণগঞ্জে সংঘর্ষের সময় একজন রিকশাচালক মারা যান।

রাতে মিরপুরে একজন ছাত্র এবং দুই শ্রমিকসহ পাঁচজন মারা যান।

রাতে রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় আহত একজনের মৃত্যু হয।

  • ২ ডিসেম্বর ১৯৯০

জেনারেল এরশাদ এক জনসভায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংসদীয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আহ্বান জানান।

  • ৩ ডিসেম্বর ১৯৯০

মতিঝিলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত সেনা কল্যাণ সংস্থা ভবনে বোমা নিক্ষেপ করা হয়।

  • ৪ ডিসেম্বর ১৯৯০

রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

  • ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষ সমাবেশ করে, যা অচল হয়ে পড়ে।

দলগুলোর দাবি মেনে নিয়ে এরশাদ পদত্যাগপত্র জমা দেন।

পরিণতি

[সম্পাদনা]

৫ ডিসেম্বর ১৯৯০, মওদুদ আহমেদ উপ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ উপ রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হবার পর, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শূন্য রাষ্ট্রপতির পদে এবং নির্বাচন হবার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানরূপে কে আসীন হবেন তা নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছিল না। এক দল অন্য দলের প্রার্থীর প্রতি অনাস্থা পোষণ করছিল। অবশেষে যখন বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নাম এলো,তখন দুটি দলই ঐকমত্য পোষণ করল যে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন-ই একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারেন। ফলে তিনিই বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-র পর তিনি আবার তার মূল পদ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন। শাহাবুদ্দিন আহমেদের সরকার ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সাল থেকে ২০ মার্চ ১৯৯১ সাল পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিল। এই নির্বাচন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্বচ্ছ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি জয়লাভ করে এবং বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন, শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা হন। বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় অধিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ গ্রেফতার হন এবং ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত কারারুদ্ধ থাকেন। বিএনপি সরকার তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে এবং কোনো কোনোটিতে দোষী প্রমাণিত হয়ে তিনি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। পরবর্তীতে নতুন সংসদে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ যারা:

[সম্পাদনা]
  • ১৯৮৩ : ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে নিহত হন কাঞ্চন, জাফর, জয়নাল, আইয়ুব, দিপালী ও ফারুক। ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
  • ১৯৮৪ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল চলাকালে নিহত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র দেলোয়ার হোসেন ও ইব্রাহিম সেলিম। ১ মার্চ সেলিম ও ইব্রাহিম হত্যার প্রতিবাদে সাত দল ও ১৫ দল হরতাল ডাকে। সেই হরতালে নিহত হন শ্রমিক তাজুল ইসলাম। ২৭ সেপ্টেম্বরের হরতালে ঢাকার কালিগঞ্জে নিহত হন রাজনৈতিক নেতা ময়েজ উদ্দিন। এদিন স্বপন কুমার, নেত্রকোনার তিতাস ও আরেকজন নিহত হন। ঢাকায় পুলিশের গুলিতে একজন রিকশাওয়ালা ও একজন ফুটপাতের দোকানদার এবং ঢাকার বাইরে আরো দুজন নিহত হন। ২৪ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গায় ফজলুর রহমান নামে একজন নিহত হন। ২২ ডিসেম্বর রাজশাহীতে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের বাবুর্চি আশরাফ, ছাত্র শাজাহান সিরাজ ও পত্রিকার হকার আব্দুল আজিজ।
  • ১৯৮৫ : ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া। ১৯ মার্চ হরতাল চলাকালে এক কিশোরের মৃত্যু হয়। ২২ এপ্রিল মিছিলে বোমা হামলায় একজন, ৯ অক্টোবর তেজগাঁও পলিটেকনিকে চারজন, ৩০ অক্টোবর ছাত্রনেতা তিতাস, ৩১ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে বিডিআরের গুলিতে ছাত্র স্বপন ও রমিজ নিহত হন। ৭ নভেম্বর আদমজী জুট মিলে ধর্মঘটে হামলায় ১৭ শ্রমিক এবং বিডিআরের গুলিতে তিন শ্রমিক নিহত হন।
  • ১৯৮৬ : ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাঁচজন, ১৪ মে হরতালে আটজন, ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনে ১১ জন, ১০ নভেম্বর হরতাল চলাকালে ঢাকার কাঁটাবন এলাকায় সাহাদত নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়।
  • ১৯৮৭ : ৯ই মার্চ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের বীর সেনানি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল হক বাবলু। ২২ জুলাই জেলা পরিষদ বিল প্রতিরোধ ও স্কপের হরতালে তিনজন, ২৪ অক্টোবর শ্রমিক নেতা শামসুল আলম, ২৬অক্টোবর সিরাজগঞ্জের লক্ষ্মীপুরে কৃষক জয়নাল, ১ নভেম্বর কৃষক নেতা হাফিজুর রহমান মোল্লা,১০ নভেম্বর নুর হোসেন,১১ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আবুল ফাত্তাহ, ছাত্র বাবলু, যুবনেতা টিটো, শেরপুরের আমিন বাজারে পুলিশের গুলিতে উমেছা খাতুন, গোলাম মোহাম্মদ আসলাম, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খোকন ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনজন, ৫ ডিসেম্বর কক্সবাজারের চকোরিয়ায় ছাত্রনেতা দৌলত খান নিহত হন।
  • ১৯৮৮ : ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে নিহত হন ২২ জন। তাঁরা হলেন ক্ষেতমজুর নেতা রমেশ বৈদ্য, হোটেল কর্মচারী জি কে চৌধুরী, ছাত্র মহিউদ্দিন শামীম, বদরুল, শেখ মোহাম্মদ, সাজ্জাদ হোসেন, মোহাম্মদ হোসেন ও আলবার্ট গোমেজ, আবদুল মান্নান, কাশেম, ডি কে দাস, কুদ্দুস, পংকজ বৈদ্য, চান মিঞা, হাসান, সমর দত্ত, পলাশ, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, সাহাদাত হোসেন। ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় হামলায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়।
  • ১৯৯০ : ১০ অক্টোবর সচিবালয়ে অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিতে ছাত্র জেহাদ ও মনোয়ার, হকার জাকির, ভিক্ষুক দুলাল, ১৩ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের ছাত্র মনিরুজ্জামান ও সাধন চন্দ্র শীল, ২৭ অক্টোবর হরতাল চলাকালে ঢাকার বাইরে দুজন, ১৪ নভেম্বর আদমজীতে ১১ জন, ২৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়ের দোকানদার নিমাই, ২৭ নভেম্বর ডা. শামসুল আলম মিলন, ২৮ নভেম্বর মালিবাগ রেলপথ অবরোধে দুজন, ৩০ নভেম্বর রামপুরায় বিডিআরের গুলিতে একজন, ১ ডিসেম্বর মিরপুরে ছাত্র জাফর, ইটভাঙা শ্রমিক আব্দুল খালেক, মহিলা গার্মেন্টস কর্মী, নুরুল হুদাসহ সাতজন, আট মাসের শিশু ইমন, নীলক্ষেতে একজন, কাজীপাড়ায় দুজন এবং ডেমরা যাত্রাবাড়ীতে দুজন, চট্টগ্রামের কালুরঘাটে একজন, খুলনার খালিশপুরে মহাব্রজ, নারায়ণগঞ্জের মণ্ডলপাড়ায় এক কিশোর, ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরে পুলিশের গুলিতে দুজন, ২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ময়মনসিংহে দুজন, রাজশাহীতে দুজন, ধানমণ্ডিতে একজন ও জিগাতলায় একজন নিহত হন।

আরও দেখুন

[সম্পাদনা]


তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. "তারেক রহমানের ৫৯তম জন্মদিন আজ"। ঢাকা টাইমস। ৬ এপ্রিল ২০২৬। সংগ্রহের তারিখ ৮ এপ্রিল ২০২৬