নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান
| নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান | |||||||
|---|---|---|---|---|---|---|---|
| শীতল যুদ্ধ ও নকশাল–মাওবাদী বিদ্রোহের অংশ | |||||||
দক্ষিণ এশীয় সাম্যবাদী ব্যানার | |||||||
| |||||||
| বিবাদমান পক্ষ | |||||||
|
সমর্থিত: |
| ||||||
| সেনাধিপতি ও নেতৃত্ব প্রদানকারী | |||||||
|
|
| ||||||
| জড়িত ইউনিট | |||||||
|
ভারতীয় পুলিশ সেবা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ |
| ||||||
| হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি | |||||||
| ১ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত | ১১ জন বিদ্রোহী নিহত | ||||||
নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান ছিল একটি সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ, যা ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি ব্লকে সংঘটিত হয়েছিল।[১] এটি মূলত আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও বাংলার উগ্রপন্থী সাম্যবাদী নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল এবং পরে ১৯৬৯ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)'র গঠনে ভূমিকা রাখে। এই সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে নকশালবাদের উদ্ভব ঘটে এবং নকশাল–মাওবাদী বিদ্রোহের সূচনা হয়, যা দ্রুত পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে; যা আজও চলমান।[২]
স্বাধীনত্তর সময়ে ভূমি-বণ্টনের অসাম্য, কৃষকের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও গ্রামীণ সমাজে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ নকশালবাড়ি অঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনার ভিত্তি তৈরি করেছিল। ভূমী-সংস্কারের বাস্তবায়ন ব্যর্থ হওয়ায় এবং মহাজনী প্রথা, দমন-পীড়ন ও শোষণের অভিজ্ঞতা তীব্র হওয়ায় কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সংগঠিত প্রতিরোধের মানসিকতা গড়ে ওঠে।[৩] এই আন্দোলন একদিকে গ্রামীণ মানুষকে জমি ও অধিকারের প্রশ্নে নতুনভাবে সংগঠিত হতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদিকে বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়, কারণ এটি গ্রামীণ জীবনের সংকট, প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতার নতুন আলোচনার সূত্রপাত ঘটায়।[৩]
উৎপত্তি
[সম্পাদনা]নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের এক সংকটপূর্ণ সময়ে, যখন চীন–সোভিয়েত বিভক্তি ভারতসহ বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ সৃষ্টি করেছিল। আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও প্রধান তাত্ত্বিক চারু মজুমদার মনে করেছিলেন যে চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লব, ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও কিউবা বিপ্লব-পরবর্তী বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতে সশস্ত্র গণযুদ্ধ শুরু করার জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। নকশাল আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি গঠনে চারু মজুমদারের রচিত ঐতিহাসিক আটটি দলিল বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, যা ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ি আন্দোলনের আদর্শগত মূল নথি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।[২][৪]
সময়রেখা
[সম্পাদনা]১৯৬৫–৬৬ সালেই নকশালবাড়ি অঞ্চলের বেশ কিছু এলাকা সাম্যবাদীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তথাকথিত "শিলিগুড়ি গ্রুপ" সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার আহ্বান জানায়, যার ফলেই অভ্যুত্থানের সূচনা ঘটে। এলাকাজুড়ে একাধিক কৃষক পক্ষ গঠিত হয়। ১৯৬৭ সালের ৩রা মার্চ, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীদের শপথ নেওয়ার মাত্র এক দিন পর, প্রায় ১৫০ জন কৃষক ধনুক-বর্শা নিয়ে প্রায় ৩০০ মণ (প্রায় ১১,০০০ কেজি) ধান সহ জমি দখলের কর্মসূচি শুরু করে। কৃষকদের ক্ষোভ ছিল যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) শ্রমিকদের দলে ধরে রাখেনি। ১৮ মার্চের মধ্যে কৃষকেরা জোতদারদের জমি দখল করতে শুরু করে।[২] চার মাসের মধ্যে সমগ্র অঞ্চলে কৃষক কমিটি গঠিত হয়। প্রথম সংঘর্ষ ঘটে যখন বিগুল কিসান নামক এক বর্গাচাষি, জমিদারপক্ষের লোকদের হাতে মারধরের শিকার হন।[৫] এই ঘটনার পর কৃষক কমিটিগুলি জমিদার শ্রেণির কাছ থেকে জমি, খাদ্যশস্য ও অস্ত্র হাতিয়ে নেয়, যার ফলে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সরকার অভ্যুত্থান দমনের লক্ষ্যে পুলিশ মোতায়েন শুরু করে।
ঝাড়ুগাঁও গ্রামের একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর কৃষক কমিটির হাতে নিহত হন। পাল্টা অভিযানে পুলিশ গুলি চালালে ২৫শে মে ১৯৬৭ তারিখে নয়জন নারী ও এক শিশুর মৃত্যু ঘটে।[২] জুন মাস নাগাদ নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি ও ফাঁসিদেওয়া অঞ্চলে কৃষক কমিটিগুলো জমি, গোলাবারুদ ও খাদ্যশস্য দখল করে কার্যত এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। দার্জিলিং সংলগ্ন অঞ্চলের চা বাগানের শ্রমিকরাও কৃষক কমিটিদের সমর্থনে ধর্মঘটে অংশ নেয়। আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে ১৯শে জুলাই পর্যন্ত, তখন সরকার প্যারামিলিটারির বাহিনী পাঠায় দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। নেতৃবৃন্দের মধ্যে জঙ্গল সাঁওতাল গ্রেপ্তার হন; চারু মজুমদার সহ অনেকে আত্মগোপনে চলে যান, আর ত্রিবেণী কানু, সোভাম, অলি গোর্খা মাজি ও তিলকা মাজির মতো নেতারা নিহত হন।[১][২]
স্বীকৃতি ও পরবর্তী পরিস্থিতি
[সম্পাদনা]চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)'র সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে।[৬] নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানকে সমর্থনকারী সিপিআই(এম)'র বহু নেতা দল থেকে বহিষ্কৃত হন, যাদের মধ্যে ছিলেন চারু মজুমদার, সৌরেন বসু, মহাদেব মুখার্জী এবং দিলীপ বাগচী। বহিষ্কৃত সাম্যবাদী পরবর্তীতে নিজেদের সংগঠিত করে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সর্বভারতীয় সমন্বয় কমিটি (AICCCR) নামক সংগঠন গঠন করেন, যা পরবর্তীতে বিকশিত হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) নামে আত্মপ্রকাশ করে।
সিপিআই(এমএল) ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত নকশাল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে এবং বিপুল সংখ্যক উদ্দীপ্ত যুবক এতে যোগ দেয়। অভ্যুত্থানটি শেষ পর্যন্ত দমন করা গেলেও, এটি ভারতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে থেকে যায় এবং বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুরূপ আন্দোলনের জন্ম দেয়। সেইসঙ্গে এর ধারাবাহিক প্রভাব হিসেবেই পরবর্তীতে চলমান নকশাল–মাওবাদী বিদ্রোহের সূচনা ঘটে।[২]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 "History of Naxalism"। হিন্দুস্তান টাইমস (ইংরেজি ভাষায়)। ১৫ ডিসেম্বর ২০০৫। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫।
- 1 2 3 4 5 6 "The Naxalbari Uprising"। 30 years of Naxalbari (ইংরেজি ভাষায়)। ৩১ অক্টোবর ২০১০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫।
- 1 2 "নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান: বাংলা উপন্যাসে প্রতিফলন"। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ নাদীম আহমেদ। "Naxalite Ideology: Charu's Eight Documents"। দ্য হিন্দুস্তান টাইমস (ইংরেজি ভাষায়)। ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ "Naxalbari Movement (1967) - IAS Site" (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ১৮ ডিসেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ "Spring Thunder Over India" (ইংরেজি ভাষায়)। marxists.org। সংগ্রহের তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫।