ধর্মচারী গুরুমা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ধর্মচারী গুরুমা
কিন্দু বহা, কাঠমান্ডু
নির্বাণ মূর্তি বিহার, কাঠমান্ডু

ধর্মচারী গুরুমা (দেবনাগরী: धर्मचारी गुरुमाँ) (জন্ম লক্ষ্মী নানি তুলাধর) (১৪ নভেম্বর ১৮৯৮ – ৭ জানুয়ারি ১৯৭৮) হলেন একজন নেপালি অনাগরিক,[১] যিনি নেপালের থেরোবাদী বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে কাঠমান্ডু থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়েছিল।[২][৩]

ধর্মচারী প্রগতিশীল ছিলেন এবং সন্ন্যাসিনী হওয়ার জন্য তাকে সমাজের রীতিনীতি এবং সরকারি নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের দীক্ষা ও শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন।[৪] ধর্মচারী নেপালের প্রথম সন্ন্যাসিনী নিবাসও প্রতিষ্ঠা করেন।[৫]

প্রাথমিক জীবন[সম্পাদনা]

লক্ষ্মী নানি মধ্য কাঠমান্ডুর ঐতিহাসিক অসনের ধিয়াক্বছেন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার সাতজন ভাই বোনের মাঝে তিনি চতুর্থ ছিলেন। তার পিতা মান কাজি এবং মা রত্ন মায়া তুলাধর। লক্ষ্মী নানির বাল্যকালে শিক্ষা গ্রহণ অত্যন্ত দুরূহ ছিল; আর মেয়েদের জন্য তা অসম্ভব ছিল। তার মা এবং পার্শবর্তী এক দোকান মালিকের অনুপ্রেরণায় লক্ষ্মী নানি পড়তে ও লিখতে শিখেন।

১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে লক্ষ্মী নানি ইতুম বহাল এলাকার সেতে কাজি বনিয়া নামক একজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি পৈতৃকভাবে কবিরাজি পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, যে বাল্যকালেই মৃত্যুবরণ করে। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে তার স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। তখন তিনি সাতমাসের গর্ভে কন্যা সন্তান ধারণ করছিলেন। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে তার কন্যা শিশুও মারা যায়। কয়েক বছরের মধ্যে তার পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যু তাকে ধর্মকর্মে আরও অধিক আকৃষ্ট করে।[৬][৭]

ধর্ম শিক্ষক[সম্পাদনা]

লেখাপড়া জানায় এবং কবিরাজি পেশার অভিজ্ঞতা থাকায় লক্ষ্মী নানি (বিকল্প নাম: লক্ষ্মী নানি উপাসিকা, লক্ষ্মী নানি বনিয়া) সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের সাথে সাথে তিনি একান্নবর্তী পরিবারের দায়িত্বও সম্পূর্ণ করতে থাকেন। তিনি স্বয়ম্ভূনাথের পাদদেশে অবস্থিত কিন্দু বহা নামক সপ্তদশ শতকের একটি দরবার হলে মিলিত হয়ে একদল নারীকে তার শেখা বিষয়গুলো শেখাতেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে বৌদ্ধ পণ্ডিত ধর্মাদিত্য ধর্মাচার্যের প্রচেষ্টায় এবং ধর্ম মান তুলাধরের সহায়তায় জরাজীর্ণ এই বৌদ্ধ মঠটির সংস্কার কাজ করা হয়।[৮]

কিন্দু বহার জমায়েত সন্দেহবাদী সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলশ্রুতিতে এই নারীদের প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাদের এ কথা বলা হয় যে, ধর্মীয় বই পাঠ এবং জমায়েতে সে নিয়ে আলোচনা নারীদের বিষয় নয় এবং তারা যেন ঘরে ফিরে গিয়ে তাদের পরিবারের দেখাশোনা করতে থাকে। তবুও মহিলারা গোপনে পড়াশোনা চালিয়ে যায়।[৬][৭]

এছাড়াও লক্ষ্মী নানি নেপাল ভাষায় স্তুতি সঙ্গীত রচনা করতেন। তার রচিত গান ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা থেকে মুদ্রিত বুদ্ধ ধর্ম ওয়া নেপাল ভাষা নামক সাময়িকীতে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। এই গানগুলোতে তিনি মহিলাদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য এবং সামাজিক কুপ্রথা দূরীকরণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।[৯]

বার্মায় দীক্ষাগ্রহণ[সম্পাদনা]

চতুর্দশ শতকের পর নেপালের প্রথম হলুদ কাপড় পরা ভিক্ষু প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে নেপালে ফিরে আসার পর থেরবাদী আন্দোলন আরও ব্যাপকতা লাভ করে। লক্ষ্মী নানি এবং আরও পাঁচজন সন্ন্যাসিনী হিসেবে জীবন অতিবাহিত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং দীক্ষা গ্রহণেচ্ছুক হয়ে ওঠেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তার নেতৃত্বে মহিলারা প্রথমে ভারতের কুশীনগরে যান এবং সেখান থেকে বার্মার আরাকানে একটি সন্ন্যাসিনী নিবাসে যান। লক্ষ্মী নানি ধর্ম নাম হিসেবে "ধর্মচারী" গ্রহণ করেন। তারা কাঠমান্ডুতে ফিরে আসেন এবং কিন্দু বহায় তাদের কাজ অব্যাহত রাখেন।[১০][১১]

নির্বাসন[সম্পাদনা]

বিদেশে প্রশিক্ষিত ভিক্ষু ও সন্ন্যাসিনীদের দ্বারা কিন্দু বহা নেপালে থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের কেন্দ্রে পরিণত হয়। তারা নিয়মিত প্রার্থনা জমায়েতে ব্যবস্থা করতেন এবং তাদের ধর্মোপদেশ শোনা ব্যক্তির সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। জমায়েত বৃদ্ধির সাথে সাথে অসহিষ্ণু সরকার আরও প্রতিকূল হয়ে ওঠে। কিন্দু বহায় গুপ্তচর নিযুক্ত করা হয় এবং ভিক্ষুরা বারংবার পুলিশি হয়রানির মুখোমুখি হতে থাকেন। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে সরকার কাঠমান্ডু থেকে সমস্ত ভিক্ষুদের বহিষ্করণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এক বছর পর সন্ন্যাসিনীদেরও বহিষ্কার করা হয়।[১২]

ভিক্ষুদের নেপালের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হলেও, সন্ন্যাসিনীদের কাঠমান্ডুর উত্তরে তিব্বতের দিকে একদিনের পথ পাড়ি দিয়ে ত্রিশুলি নামক স্থানে পাঠানো হয়। এ স্থানেও সন্ন্যাসিনীরা ধর্ম শিক্ষা দিতেন এবং বক্তৃতা করতেন। তাদের কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হলে ত্রিশুলিতে নির্বাসনের এক মাসের মধ্যেই তাদের কাঠমান্ডুতে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের দরবার স্কয়ারের একটি থানায় আটকে রেখে জেরা করা হয়। পরদিন তাদের আবার মুক্তি দেওয়া হয়।[১৩]

১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীলঙ্কা থেকে একদল শুভেচ্ছাদূত নেপাল ভ্রমণ করে এবং নির্বাসিত ভিক্ষুদের পক্ষে নেপাল সরকারের নিকট অনুরোধ জানায়। সে প্রেক্ষিতে ভিক্ষুদের নেপালে প্রত্যাগমনের অনুমতি দেওয়া হয় এবং বাধাহীনভাবে তাদের কাজ করতে সক্ষম হয়।[১৪]

নির্বাণ মূর্তি বিহার[সম্পাদনা]

কিন্দু বহার জনাকীর্ণতা ও স্থান স্বল্পতার কারণে ধর্মচারী সন্ন্যাসিনীদের জন্য পৃথক নিবাস নির্মাণের কথা ভাবতে থাকেন। তিনি নিকটেই এক ফালি জমি ক্রয় করেন এবং একটি প্রার্থনাস্থল ও আবাসিক স্থল নির্মাণের জন্য অনুদান সংগ্রহ করতে থাকেন। ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাণ বুদ্ধের একটি মূর্তিসহ সন্ন্যাসিনী নিবাসের মূল ভবন উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে নিবাসটি নির্বাণ মূর্তি বিহার নামে পরিচিত।[১৫]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Levine, Sarah (২০০১)। "The Fincances of a Twentieth Century Buddhist Mission: Building Support for the Theravāda Nuns' Order of Nepal"Journal of the International Association of Buddhist Studies24 (2): 223। সংগ্রহের তারিখ ২৭ মে ২০১৫ 
  2. LeVine, Sarah; Gellner, David N. (২০০৫)। Rebuilding Buddhism: The Theravada Movement in Twentieth-Century Nepalবিনামূল্যে নিবন্ধন প্রয়োজন। Harvard University Press। আইএসবিএন 0-674-01908-3  Page 47.
  3. Tuladhar, Soongma (২০০৭)। "Following the Footprints of Dharmachari Guruma"। Tuladhar, Lochan Tara। Dharmachari Guruma। Kathmandu: Nirvana Murti Vihara। পৃষ্ঠা 70। আইএসবিএন 978-99946-2-982-4 
  4. LeVine, Sarah (২০০১)। "The Finances of a Twentieth Century Buddhist Mission: Building Support for the Theravada Nuns' Order of Nepal"Journal of the International Association of Buddhist Studies। সংগ্রহের তারিখ ১৮ আগস্ট ২০১২  Page 223.
  5. "A Peep into the life of Dharmachari Guruma, who stood against all odds in promoting Buddhism—2" (PDF)The Dharmakirti। ২৩ অক্টোবর ২০১২। সংগ্রহের তারিখ ১৬ আগস্ট ২০১২ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ] Page 23.
  6. LeVine, Sarah and Gellner, David N. (2005). Rebuilding Buddhism: The Theravada Movement in Twentieth-Century Nepal. Harvard University Press. আইএসবিএন ০-৬৭৪-০১৯০৮-৩, 9780674019089. Page 46.
  7. Tuladhar, Soongma (২০০৭)। "Following the Footprints of Dharmachari Guruma"। Tuladhar, Lochan Tara। Dharmachari Guruma। Kathmandu: Nirvana Murti Vihara। পৃষ্ঠা 67। আইএসবিএন 978-99946-2-982-4 
  8. LeVine, Sarah; Gellner, David N. (২০০৫)। Rebuilding Buddhism: The Theravada Movement in Twentieth-Century Nepalবিনামূল্যে নিবন্ধন প্রয়োজন। Harvard University Press। আইএসবিএন 0-674-01908-3  Page 103.
  9. Tuladhar, Lochan Tara (2007). Dharmachari Guruma. Kathmandu: Nirvana Murti Vihara. আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৯৪৬-২-৯৮২-৪. Page 14.
  10. LeVine, Sarah and Gellner, David N. (2005). Rebuilding Buddhism: The Theravada Movement in Twentieth-Century Nepal. Harvard University Press. আইএসবিএন ০-৬৭৪-০১৯০৮-৩, 9780674019089. Page 47.
  11. LeVine, Sarah (২০০৪)। "Dharma Education for Women in the Theravada Buddhist Community of Nepal"। Tsomo, Karma Lekshe। Buddhist Women and Social Justice: Ideals, Challenges, and Achievementsসীমিত পরীক্ষা সাপেক্ষে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার, সাধারণত সদস্যতা প্রয়োজন। Albany: State University of New York Press। পৃষ্ঠা 138আইএসবিএন 9780791462546 
  12. Dietrich, Angela (১৯৯৬)। "Buddhist Monks and Rana Rulers: A History of Persecution"Buddhist Himalaya: A Journal of Nagarjuna Institute of Exact Methods। ১ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১২ 
  13. Tuladhar, Lochan Tara (2007). Dharmachari Guruma. Kathmandu: Nirvana Murti Vihara. আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৯৪৬-২-৯৮২-৪. Pages 35-36.
  14. LeVine, Sarah (২০০১)। "The Finances of a Twentieth Century Buddhist Mission: Building Support for the Theravada Nuns' Order of Nepal"Journal of the International Association of Buddhist Studies। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১২  Page 224-225.
  15. LeVine, Sarah (২০০১)। "The Finances of a Twentieth Century Buddhist Mission: Building Support for the Theravada Nuns' Order of Nepal"Journal of the International Association of Buddhist Studies। সংগ্রহের তারিখ ১৯ আগস্ট ২০১২  Page 225.