দুরন্ত এক্সপ্রেস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
হজরত নিজামুদ্দিন-পুনে দুরন্ত এক্সপ্রেস

দুরন্ত এক্সপ্রেস ট্রেন পরিষেবা রাজধানী বা শতাব্দী এক্সপ্রেসের মতোই ভারতীয় রেলের একটি বিশেষায়িত এক্সপ্রেস ট্রেন পরিষেবা। দুরন্ত একটি বাংলা শব্দ যার অর্থ 'বিরামহীন'। এটি একটি “নন-স্টপ পয়েন্ট টু পয়েন্ট” রেল পরিষেবা। অর্থাৎ, এই পরিষেবায় ট্রেন কেবলমাত্র দুটি নির্দিষ্ট স্টেশনের মধ্যে চলাচল করে; মাঝে কোনো স্টেশনে এর বাণিজ্যিক স্টপ নেই। উল্লেখ্য, এই ধরনের রেল পরিষেবা ভারতের রেল পরিবহণের ইতিহাসে প্রথম।[১]

দুরন্ত রেল পরিষেবা ভারতের মহানগর ও প্রধান প্রধান রাজ্য-রাজধানীগুলিকে সংযুক্ত করেছে। ২০০৯-১০ সালের ভারতের কেন্দ্রীয় রেল বাজেটে এই পরিষেবা চালুর কথা প্রথম ঘোষণা করা হয়। তবে কোনো বাণিজ্যিক স্টপ না থাকলেও এই ট্রেনের কয়েকটি টেকনিক্যাল ও ক্রিউ হল্ট রয়েছে। দুরন্ত এক্সপ্রেস পরিষেবাকে দেশের দ্রুততম রেল পরিষেবায় পরিণত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে।

পটভূমি[সম্পাদনা]

ভারতের দ্রুততম রেল পরিষেবাটি ছিল শতাব্দী এক্সপ্রেস[২] এই ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ১৫০ কিলোমিটার/ঘণ্টা।[৩] কিন্তু ভারতীয় রেল মন্ত্রক দেশে একটি দ্রুতগতির রেল পরিষেবা চালু করার পরিকল্পনা করেন। ২০০৭ সালে দিল্লি ও অমৃতসরের মধ্যবর্তী একটি ৫০০ কিলোমিটার পথ এই সংক্রান্ত পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হয়।[৪] দিল্লি-অমৃতসর করিডোরটি নির্মাণ করতে খরচ হয় ২৫,০০০ কোটি টাকা। ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি, তৎকালীন রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব ঘোষণা করেন যে কয়েকটি রুটে দ্রুতগতির রেল পরিষেবা চালু করার লক্ষ্যে তার মন্ত্রক আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা নিয়োগ করতে চলেছে। দিল্লি-অমৃতসর রুট ছাড়াও অন্যান্য যেসকল রুটে এই দ্রুতগতির রেল চালানোর কথা ছিল সেগুলি হল পুনে-মুম্বই-আহমদাবাদ, হায়দরাবাদ-ডোরনাকল-বিজয়ওয়াড়া-চেন্নাই, চেন্নাই-বেঙ্গালুরু-কোয়েম্বাটোর-এর্নাকুলাম ও হাওড়া-হলদিয়া রুট।[৫] তবে ভারতে সম্পূর্ণ দ্রুতগতির রেল পরিষেবা চালু করা ছিল সময় ও চেষ্টাসাপেক্ষ ব্যাপার। তাই ভারতীয় রেলযাত্রীদের এই ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যে[৬] ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০০৯-১০ সালের কেন্দ্রীয় রেল বাজেটে যথাসাধ্য দ্রুতগতিসম্পন্ন রেল পরিষেবা দুরন্ত চালু করার কথা ঘোষণা করেন।[৭]

যাত্রাপথ[সম্পাদনা]

দুরন্ত রেল পরিষেবা চালু হয়েছে ভারতের সর্বাধিক ঘনজনবহুল শহরগুলির মধ্যে। ২০০৯ সালের ৩ জুলাই, ২০০৯-১০ সালের কেন্দ্রীয় রেল বাজেট পেশের সময় এই প্রকল্পের প্রাথমিক ঘোষণাপত্রে ১২টি সাপ্তাহিক, দ্বি-সাপ্তাহিক (সপ্তাহে দুইবার) ও ত্রি-সাপ্তাহিক (সপ্তাহে তিনবার) দুরন্ত ট্রেন চালু করার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল।[৮] এছাড়াও ঘোষণা করা হয়েছিল যে এক বছরের মধ্যেই এই ট্রেনগুলি চালু করা হবে। এই ট্রেনগুলি হল:

বিতর্ক[সম্পাদনা]

অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের সাংসদরা অভিযোগ করেন যে তাদের রাজ্যকে দুরন্ত পরিষেবা প্রদানের ব্যাপারে অবহেলা করা হয়েছে।[১৩] এর পরই কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিম্নোক্ত আরও দুটি দুরন্ত ট্রেনের কথা ঘোষণা করেন:[১৪]

যাত্রী পরিষেবা[সম্পাদনা]

ভারতীয় রেলের যেকোনো ট্রেন পরিষেবার তুলনায় দুরন্ত এক্সপ্রেসে যাত্রী সুযোগ-সুবিধা বেশি। এই ট্রেনে চারটি শ্রেণি রয়েছে। ট্রেনের দেওয়াল নানা রঙে রঞ্জিত।[১৫] ট্রেনে একটি প্যান্ট্রি কারও দেওয়া হয়ে থাকে।[১৬]

ভাড়া[সম্পাদনা]

রাজধানী এক্সপ্রেস ইত্যাদি একই গন্তব্যের ট্রেনগুলি তুলনায় দুরন্ত এক্সপ্রেসে যাত্রীভাড়া অপেক্ষাকৃত কম। গরিব রথ এক্সপ্রেসের মতো নতুন "ইকোনমি" বাতানুকূল থ্রি-টিয়ার শ্রেণির[১৬] ভাড়া রাজধানী এক্সপ্রেসের তুলনায় ২০০ টাকা কম।[১৭] খাবার ও ক্যাটারিং-এর দাম ভাড়ার মধ্যে গণ্য করা হয় না।

গতি ও দক্ষতা[সম্পাদনা]

দুরন্ত এক্সপ্রেস ভারতীয় রেলের অন্যতম দ্রুতগতির রেল পরিষেবা। এই ট্রেনগুলি রাজধানী এক্সপ্রেসের থেকেও দ্রুতগামী।[১৮] উল্লেখ্য, ভারতে দ্রুততম দুরপাল্লার ট্রেনের রেকর্ড ছিল রাজধানী এক্সপ্রেসেরই। রাজধানী এক্সপ্রেস ও দুরন্ত এক্সপ্রেসের গতি মোটামুটি একরকম হলেও, মাঝে কোনো স্টপ না থাকায় দুরন্ত সময়ের দিক থেকে রাজধানীর তুলনায় এগিয়ে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ, নতুন নন-স্টপ নতুন দিল্লি স্টেশন-শিয়ালদহ দুরন্ত এক্সপ্রেস যাত্রা সম্পূর্ণ করতে সময় নিয়েছে ষোলো ঘণ্টা। একই পথে যাত্রা করতে রাজধানীর সময় লাগে সতেরো ঘণ্টা। দুরন্তে যদিও ইঞ্জিন ও কর্মী পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি টেকনিক্যাল স্টপ রয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের কাজ অত্যন্ত দ্রুত করা হয়। ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ১১০ কিলোমিটার/ঘণ্টা।[১৫] চেন্নাই দুরন্ত ট্রেনটি অবশ্য ১৩০ কিলোমিটার/ঘণ্টায় চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।[১৯]

যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য[সম্পাদনা]

দুরন্তে চারটি শ্রেণি রয়েছে।[১৭] এগুলি হল: বাতানুকূল প্রথম শ্রেণী, বাতানুকূল টু-টিয়ার শ্রেণি, বাতানুকূল থ্রি-টিয়ার শ্রেণি এবং বাতানুকূল ইকোনমি শ্রেণি (গরিব রথ এক্সপ্রেসের সমরূপ[১৬])। এর আগে রাজধানী ও গরিব রথে ব্যবহৃত আইসিএফ কোচ নিয়ে দুরন্তের রেকগুলি গঠিত। প্রতিটি দুরন্ত কোচের দৈর্ঘ্য ২৪ মিটার।[১৫] উল্লেখ্য, সাধারণ কোচের দৈর্ঘ্য হয় ২২.৩ মিটার। দুটি কোচের মধ্যে দুরত্বও কম – মাত্র ৪৬০ মিলিমিটার। সাধারণত দুটি কোচের মধ্যে ৯৬০ মিলিমিটার দুরত্ব থাকে।

এছাড়াও রয়েছে ডাস্টবিন ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার মতো স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সুবিধা। কোচগুলিতে রয়েছে বটল হোল্ডার, সুইচ, মোবাইল চার্জিং পয়েন্ট, দুই কোচের মধ্যে স্বচ্ছ স্লাইডিং দরজা, সাধারণ ফ্লুরোসেন্ট বাতির বদলে এলইডি নাইট ল্যাম্পের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা।[১৫]

সাধারণ রেল কোচ নির্মিত “কটন স্টিল”-এ। কিন্তু দুরন্ত তৈরি হয়েছে স্টেনলেস স্টিলে। এর ফলে প্রতিটি কোচের ওজন দুই টনের মতো কম হয়।[১০] কোচ আরও টেকসই হয় এবং দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও কম থাকে। এই ট্রেনের অপর একটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হল সেন্ট্রাল বাফার কাপলার। এর পরিবর্তিত ভারবহণ ক্ষমতা ট্রেনকে লাইনচ্যুত হওয়া থেকে রক্ষা করে।[১৫]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. "First ever non-stop train service 'Duronto' introduced"EconomictimesTimes of India। ৩ জুলাই ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  2. "India's fastest train, the Delhi-Bhopal Shatabdi"Times of India। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৬। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  3. "The speed of Bhopal Shatabdi at 150km/hr"The Hindu। Feb 09 2006। সংগ্রহের তারিখ 22 September 2009  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  4. "Bullet Trains Expected in India"Rediff। মে ৩, ২০০৭। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  5. "India plans High Speed rail Service for Railways"Rediff। জানুয়ারি ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  6. "Duronto' trains to fulfil need for speed"Times of India। ৪ জুলাই ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  7. "Non-stop point-to-point long-distance trains introduced in the Budget"Rediff। জুলাই ৩, ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  8. "Duronto' trains for metros"Deccan Chronicle। ৩ জুলাই ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  9. "Mamata flags off Sealdah-New Delhi Duronto train"। Indian express। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  10. "Chidambaram flags off bi-weekly Chennai-Delhi Duronto Express"The Hindu। ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  11. "Pune Duronto from 29 September"। Indian Express.com। ২৭ অক্টোবর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০০৯ 
  12. "Howrah-Mumbai Duronto Express flagged off"Yahoo News। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২৮ অক্টোবর ২০০৯ [স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  13. "Railway Minister announces 5 new trains for A.P."The Hindu। ১০ জুলাই ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  14. "Two more 'Duronto' trains"The Hindu। ১০ জুলাই ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  15. "Kolkata-New Delhi Duronto Express!"। My News.in। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৯। ৬ নভেম্বর ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 
  16. "Details of Duronto Express"। ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯। সংগ্রহের তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯  অজানা প্যারামিটার |news paper= উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)
  17. "Accommodation classes in Duronto Trains"The Hindu। Sep 16 2009। সংগ্রহের তারিখ 22 September 2009In the last before para before subheading-Passenger amenities  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  18. "Duronto Trains Will Be Faster Than Rajdhani"India TV। 03 Jul 2009। ১৩ জুলাই ২০১১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ 23 September 2009  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  19. "Duronto blazing new tracks"The Hindu। ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৯। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]