বিষয়বস্তুতে চলুন

দি অ্যানার্কি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দি অ্যানার্কি (The Anarchy)

লিঙ্কনের যুদ্ধের সমসাময়িক একটি চিত্র; স্টিফেন (ডান দিক থেকে চতুর্থ) বল্ডউইন অফ ক্লিয়ার-এর যুদ্ধের ভাষণ (বামে) শুনছেন।
তারিখ১১৩৮ – নভেম্বর ১১৫৩
অবস্থান
ফলাফল ওয়ালিংফোর্ড চুক্তি: স্টিফেন রাজা হিসেবে বহাল থাকেন, তবে এমপ্রেস মাটিল্ডার পুত্র হেনরি প্লান্টাজেনেটকে মনোনীত উত্তরাধিকারী করা হয়।
বিবাদমান পক্ষ
স্টিফেন অফ ব্লয়ের অনুগত বাহিনী এমপ্রেস মাটিল্ডা এবং হেনরি প্লান্টাজেনেটের অনুগত বাহিনী
সেনাধিপতি ও নেতৃত্ব প্রদানকারী

দি অ্যানার্কি (ইংরেজি: The Anarchy) ছিল ১১৩৮ থেকে ১১৫৩ সালের মধ্যে ইংল্যান্ড এবং নরমান্ডিতে সংঘটিত একটি গৃহযুদ্ধ, যার ফলে সেখানে আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ঘটে। এই সংঘাতটি ছিল মূলত একটি উত্তরাধিকার যুদ্ধ, যার সূত্রপাত ঘটেছিল রাজা প্রথম হেনরির একমাত্র বৈধ পুত্র উইলিয়াম অ্যাডেলিন-এর আকস্মিক মৃত্যুর মাধ্যমে। ১১২০ সালে হোয়াইট শিপ নামক জাহাজ ডুবিতে তার মৃত্যু হয়। এরপর হেনরি তার কন্যা এম্প্রেস মাটিল্ডাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করার চেষ্টা করেন, কিন্তু অভিজাতদের সমর্থন আদায়ে তিনি আংশিকভাবে সফল হয়েছিলেন। ১১৩৫ সালে হেনরির মৃত্যুর পর, তার ভাগ্নে স্টিফেন অফ ব্লয় তার ভাই এবং উইনচেস্টারের বিশপ হেনরি অফ ব্লয়-এর সহায়তায় সিংহাসন দখল করেন। রাজা স্টিফেনের শাসনের শুরুর দিকে বিদ্রোহী ইংরেজ ব্যারন, ওয়েলশ নেতা এবং স্কটিশ আক্রমণকারীদের সাথে তীব্র লড়াই হয়। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বড় ধরনের বিদ্রোহের পর, ১১৩৯ সালে মাটিল্ডা তার সৎ ভাই রবার্ট অফ গ্লুচেস্টারের সহায়তায় ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন।

গৃহযুদ্ধের শুরুর বছরগুলোতে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সুবিধা করতে পারেনি; মাটিল্ডা দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ড এবং টেমস ভ্যালি-র বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণে নেন, আর স্টিফেন দক্ষিণ-পূর্বের নিয়ন্ত্রণে থাকেন। অনেক ব্যারন কোনো পক্ষকেই সমর্থন না দিয়ে দেশের বড় একটি অংশ নিজেদের দখলে রাখেন। সেই সময়ে দুর্গগুলো রক্ষা করা সহজ ছিল, তাই যুদ্ধগুলো ছিল মূলত ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ (attrition warfare): অবরোধ, অতর্কিত হামলা এবং ছোটখাটো সংঘর্ষ। সেনাবাহিনী মূলত নাইট এবং পদাতিক বাহিনী নিয়ে গঠিত ছিল, যাদের অনেকেই ছিল ভাড়াটে সৈন্য। ১১৪১ সালে লিঙ্কনের যুদ্ধের পর স্টিফেন বন্দি হন, যার ফলে দেশের বেশিরভাগ অংশে তার কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে। মাটিল্ডা যখন রানি হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন, তখন শত্রুতামূলক জনতার ভিড় তাকে লন্ডন থেকে বিতাড়িত করে। এর অল্প সময় পরেই, স্টিফেনের স্ত্রী মাটিল্ডা অফ বুলোন উইনচেস্টারের যুদ্ধে রবার্ট অফ গ্লুচেস্টারকে বন্দি করেন। পরবর্তীতে দুই পক্ষ বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে স্টিফেন ও রবার্টকে মুক্তি দিতে সম্মত হয়। এরপর ১১৪২ সালে অক্সফোর্ড অবরোধের সময় স্টিফেন প্রায় মাটিল্ডাকে বন্দি করে ফেলেছিলেন, কিন্তু তিনি বরফ জমাট বাঁধা টেমস পাড়ি দিয়ে অক্সফোর্ড দুর্গ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এই যুদ্ধ আরও ১১ বছর ধরে চলে। মাটিল্ডার স্বামী জেফ্রি প্লান্টাগেনেট, আনজুর কাউন্ট, ১১৪৩ সালে তার নামে নরমান্ডি জয় করেন, কিন্তু ইংল্যান্ডে কোনো পক্ষই বিজয় অর্জন করতে পারছিল না। বিদ্রোহী ব্যারনরা উত্তর ইংল্যান্ড এবং পূর্ব অ্যাংলিয়া-তে ব্যাপক ক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করে এবং প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলে। ১১৪৮ সালে মাটিল্ডা নরমান্ডিতে ফিরে যান এবং ইংল্যান্ডের যুদ্ধের দায়িত্ব তার বড় ছেলে হেনরি ফিটজএম্প্রেস (ভবিষ্যৎ রাজা দ্বিতীয় হেনরি)-র ওপর ছেড়ে দেন। ১১৫২ সালে স্টিফেন তার বড় ছেলে ইউস্টেসকে পরবর্তী রাজা হিসেবে ক্যাথলিক চার্চ থেকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু চার্চ তাতে অস্বীকৃতি জানায়। ১১৫০-এর দশকের শুরুর দিকে বেশিরভাগ ব্যারন এবং চার্চ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং একটি স্থায়ী শান্তির আলোচনার পক্ষে মত দেয়।

হেনরি ফিটজএম্প্রেস ১১৫৩ সালে ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন, কিন্তু কোনো পক্ষের সৈন্যরাই লড়াই করতে ইচ্ছুক ছিল না। সংক্ষিপ্ত অভিযানের পর, দুই বাহিনী ওয়ালিংফোর্ড দুর্গ অবরোধের সময় মুখোমুখি হয়, কিন্তু চার্চ সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে একটি যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করে। স্টিফেন ও হেনরি শান্তি আলোচনা শুরু করেন এবং এর মধ্যেই ইউস্টেস অসুস্থ হয়ে মারা যান, যার ফলে স্টিফেনের কোনো উত্তরাধিকারী অবশিষ্ট ছিল না। এর ফলে স্বাক্ষরিত ওয়ালিংফোর্ড চুক্তি অনুযায়ী স্টিফেন সিংহাসনে বহাল থাকেন, তবে হেনরিকে তার উত্তরসূরি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তী এক বছর স্টিফেন পুরো রাজ্যের ওপর পুনরায় তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু ১১৫৪ সালে তিনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হেনরি ইংল্যান্ডের প্রথম অ্যাঞ্জেভিন রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং এরপর পুনর্গঠনের দীর্ঘ এক সময় শুরু হয়।

এই সংঘাতকে বিশেষ করে মধ্যযুগীয় যুদ্ধবিগ্রহের মানদণ্ডেও অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ইতিহাসবিদ বর্ণনা করেছেন যে, সেই সময় "খ্রিস্ট এবং তার সন্তরা ঘুমিয়ে ছিলেন"। ভিক্টোরীয় যুগের ইতিহাসবিদরা এই ব্যাপক বিশৃঙ্খলার কারণে একে "দি অ্যানার্কি" (অরাজকতা) নামে অভিহিত করেন, যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদরা এর যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।[]

পটভূমি

[সম্পাদনা]

হোয়াইট শিপ

[সম্পাদনা]
প্রথম হেনরি এবং একটি ডুবন্ত জাহাজের ছবি
১১২০ সালে নরমান্ডির বারফ্লুর উপকূলে হোয়াইট শিপ ডুবির এবং প্রথম হেনরির ১৪শ শতাব্দীর শুরুর দিকের একটি চিত্র। ব্রিটিশ লাইব্রেরি, লন্ডন।

অ্যানার্কির মূল কারণ ছিল ইংল্যান্ড রাজ্য এবং নরমান্ডি ডাচি-র মধ্যে বিদ্যমান সিংহাসনের উত্তরাধিকার সংকট। ১১শ এবং ১২শ শতাব্দীতে উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্স বেশ কয়েকজন ডিউক এবং কাউন্ট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো, যারা মূল্যবান ভূখণ্ডের জন্য প্রায়ই একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতেন।[] ১০৬৬ সালে তাদেরই একজন, ডিউক দ্বিতীয় উইলিয়াম, ইংল্যান্ড জয়ের জন্য আক্রমণ চালান এবং পরবর্তী বছরগুলোতে দক্ষিণ ওয়েলস ও উত্তর ইংল্যান্ডের দিকে অগ্রসর হন। উইলিয়ামের মৃত্যুর পর এই ভূখণ্ডগুলোর বিভাজন এবং নিয়ন্ত্রণ সমস্যাসংকুল হয়ে পড়ে এবং তার সন্তানরা সম্পদের ভাগ নিয়ে একাধিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়।[] উইলিয়ামের ছেলে প্রথম হেনরি তার বড় ভাই উইলিয়াম রুফাস-এর মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখল করেন এবং পরবর্তীকালে তার বড় ভাই রবার্ট কার্টহোস-এর নিয়ন্ত্রিত নরমান্ডি আক্রমণ ও দখল করেন এবং টিনচেব্রের যুদ্ধে রবার্টের বাহিনীকে পরাজিত করেন।[] হেনরি চেয়েছিলেন তার সমস্ত ভূখণ্ড তার একমাত্র বৈধ পুত্র ১৭ বছর বয়সী উইলিয়াম অ্যাডেলিন উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করুক।[]

১১২০ সালে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয় যখন হোয়াইট শিপ নরমান্ডির বারফ্লুর থেকে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পথে ডুবে যায়; এতে অ্যাডেলিনসহ প্রায় ৩০০ যাত্রী মারা যান।[][nb ১] অ্যাডেলিনের মৃত্যুর পর ইংরেজ সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সেই সময় পশ্চিম ইউরোপে উত্তরাধিকারের নিয়মগুলো অস্পষ্ট ছিল; ফ্রান্সের কিছু অংশে পুরুষ জ্যেষ্ঠাধিকার (primogeniture), যেখানে বড় ছেলে সমস্ত উপাধি লাভ করবে, জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।[] ইউরোপের অন্যান্য অংশে, যার মধ্যে নরমান্ডি এবং ইংল্যান্ডও ছিল, নিয়ম ছিল জমি ভাগ করে দেওয়া, যেখানে বড় ছেলে পৈতৃক জমি (যা সাধারণত সবচেয়ে মূল্যবান বলে বিবেচিত হতো) পাবে এবং ছোট ছেলেরা ছোট বা সম্প্রতি অর্জিত জমি বা এস্টেট পাবে।[] বিগত ৬০ বছরের অস্থির অ্যাংলো-নরমান উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায় সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে: সেখানে কোনো শান্তিপূর্ণ বা প্রশ্নহীন উত্তরাধিকার ছিল না।[]

হেনরির আরও একটি মাত্র বৈধ সন্তান ছিল, মাটিল্ডা, কিন্তু এই যুগে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ছিল অস্পষ্ট।[১০] হেনরি দ্বিতীয় বিয়ে (লুভেনের অ্যাডেলিজা) করা সত্ত্বেও তার আর কোনো বৈধ পুত্র হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছিল, তাই তিনি মাটিল্ডাকেই তার পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতে শুরু করেন।[১১] মাটিল্ডার বিয়ে হয়েছিল পঞ্চম হেনরির সাথে, যেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি 'এম্প্রেস' বা সম্রাজ্ঞী উপাধি দাবি করেন। ১১২৫ সালে তার স্বামী মারা যান এবং ১১২৮ সালে তিনি পুনরায় আনজুর পঞ্চম জেফ্রির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যার কাউন্টি নরমান্ডি ডাচির সীমান্ত সংলগ্ন ছিল।[১২] জেফ্রি অ্যাংলো-নরমান অভিজাতদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন না: একজন অ্যাঞ্জেভিন শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন নরমানদের চিরশত্রু।[১৩] একই সাথে হেনরির অভ্যন্তরীণ নীতি, বিশেষ করে তার বিভিন্ন যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য উচ্চ হারে রাজস্ব সংগ্রহের ফলে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।[১৪] তবে রাজার ব্যক্তিত্ব এবং খ্যাতির কারণে এই সংঘাত তখন অনেকটা অবদমিত ছিল।[১৫]

হেনরি ইংল্যান্ড এবং নরমান্ডি উভয় স্থানেই মাটিল্ডার জন্য একটি রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি ১১২৭ সালে এবং পরবর্তীতে ১১২৮ ও ১১৩১ সালে তার দরবারের সদস্যদের শপথ নিতে বাধ্য করেন যেন তারা মাটিল্ডাকে তার পরবর্তী উত্তরাধিকারী এবং তার সন্তানদের ন্যায়সঙ্গত শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।[১৬] স্টিফেন ১১২৭ সালে এই শপথ গ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।[১৭] তবুও হেনরির জীবনের শেষ দিকে হেনরি, মাটিল্ডা এবং জেফ্রির মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। মাটিল্ডা এবং জেফ্রি সন্দেহ করেছিলেন যে ইংল্যান্ডে তাদের প্রকৃত সমর্থনের অভাব রয়েছে। তারা ১১৩৫ সালে হেনরিকে প্রস্তাব দেন যে, তিনি জীবিত থাকাকালীনই যেন নরমান্ডির রাজকীয় দুর্গগুলো মাটিল্ডার হাতে ছেড়ে দেন এবং নরমান অভিজাতদের অবিলম্বে তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করেন। এতে হেনরির মৃত্যুর পর তাদের অবস্থান শক্তিশালী হতো।[১৮] হেনরি রাগান্বিত হয়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, সম্ভবত তিনি ভয় পেয়েছিলেন যে জেফ্রি হয়তো সময়ের আগেই নরমান্ডির ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবেন।[১৯] দক্ষিণ নরমান্ডিতে নতুন করে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং জেফ্রি ও মাটিল্ডা বিদ্রোহীদের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপ করেন।[] এই সংঘাতের মাঝেই হেনরি আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং লায়ন-লা-ফোরেট-এর কাছে মৃত্যুবরণ করেন।[১৩]

উত্তরাধিকার

[সম্পাদনা]
রাজা স্টিফেনের রাজ্যাভিষেকের একটি মধ্যযুগীয় চিত্র
রাজা স্টিফেনের রাজ্যাভিষেকের একটি ১৩শ শতাব্দীর চিত্র

হেনরির মৃত্যুর পর ইংরেজ সিংহাসন তার কন্যা মাটিল্ডা নয়, বরং স্টিফেন অফ ব্লয় দখল করেন, যার ফলে শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। স্টিফেন ছিলেন উত্তর ফ্রান্সের অন্যতম শক্তিশালী কাউন্ট স্টিফেন-হেনরি অফ ব্লয় এবং উইলিয়াম দ্য কনকারারের কন্যা অ্যাডেলা অফ নরমান্ডি-র পুত্র। সেই হিসেবে স্টিফেন এবং মাটিল্ডা ছিলেন একে অপরের খালাতো/ফুপাতো ভাইবোন। তার বাবা-মা হেনরির সাথে মিত্রতা করেছিলেন এবং স্টিফেন ভূখণ্ডহীন ছোট ছেলে হিসেবে হেনরির অনুগ্রহভাজন হয়ে তার দরবারের অংশ হিসেবে ভ্রমণ করতেন এবং সামরিক অভিযানে অংশ নিতেন।[২০] এর বিনিময়ে তিনি ভূমি লাভ করেন এবং ১১২৫ সালে মাটিল্ডা অফ বুলোন-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। মাটিল্ডা ছিলেন বুলোন কাউন্টের একমাত্র উত্তরাধিকারী, যার অধীনে ছিল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বুলোন-সুর-মের এবং ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিশাল এস্টেট।[২১] ১১৩৫ সাল নাগাদ স্টিফেন অ্যাংলো-নরমান সমাজে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন, অন্যদিকে তার ছোট ভাই হেনরিও যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন এবং উইনচেস্টারের বিশপ হিসেবে রাজার পর ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন।[২২] উইনচেস্টারের হেনরি গির্জার অধিকারের ওপর নরমান রাজাদের হস্তক্ষেপের ইতি টানতে আগ্রহী ছিলেন।[২৩]

প্রথম হেনরির মৃত্যুর খবর যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন সিংহাসনের দাবিদারদের অনেকেই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। জেফ্রি এবং মাটিল্ডা তখন আনজুতে ছিলেন এবং রাজকীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিচ্ছিলেন, যাদের মধ্যে মাটিল্ডার সমর্থক রবার্ট অফ গ্লুচেস্টারও ছিলেন।[] অনেক ব্যারন শপথ নিয়েছিলেন যে প্রয়াত রাজার যথাযথ সমাধিস্থ হওয়া পর্যন্ত তারা নরমান্ডিতে অবস্থান করবেন, যা তাদের ইংল্যান্ডে ফিরতে বাধা দেয়।[২৪] তবুও জেফ্রি এবং মাটিল্ডা দক্ষিণ নরমান্ডিতে প্রবেশ করে কয়েকটি প্রধান দুর্গ দখল করেন; কিন্তু এরপর আর অগ্রসর হতে পারেননি।[২৫] স্টিফেনের বড় ভাই থিবল্ড, যিনি তার বাবার উত্তরাধিকারী হিসেবে কাউন্ট হয়েছিলেন, আরও দক্ষিণে ব্লয়তে ছিলেন।[২৬] স্টিফেন সুবিধাজনকভাবে বুলোনে অবস্থান করছিলেন এবং হেনরির মৃত্যুর খবর পাওয়ামাত্রই তিনি তার সামরিক সদস্যদের নিয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হন। রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার ডোভার এবং ক্যান্টারবেরি বন্দরগুলোতে সৈন্য মোতায়েন করেছিলেন এবং কিছু বর্ণনা অনুযায়ী তারা স্টিফেনকে শুরুতে প্রবেশ করতে দেয়নি।[২৭] তাসত্ত্বেও স্টিফেন সম্ভবত ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে লন্ডনের উপকণ্ঠে তার নিজস্ব এস্টেটে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং পরবর্তী এক সপ্তাহ জুড়ে ইংল্যান্ডে ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া শুরু করেন।[২৮]

লন্ডনের অধিবাসীরা ঐতিহাসিকভাবে ইংল্যান্ডের রাজা নির্বাচনের অধিকার দাবি করত এবং তারা স্টিফেনকে নতুন রাজা হিসেবে ঘোষণা করে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে বিনিময়ে তিনি শহরটিকে নতুন সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দান করবেন।[২৯] হেনরি অফ ব্লয় স্টিফেনের প্রতি গির্জার সমর্থন নিশ্চিত করেন: স্টিফেন উইনচেস্টারে অগ্রসর হতে সক্ষম হন, যেখানে স্যালসবুরির বিশপ এবং লর্ড চ্যান্সেলর রজার রাজকীয় কোষাগার স্টিফেনের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন।[৩০] ১৫ ডিসেম্বর হেনরি একটি চুক্তিতে উপনীত হন যার অধীনে স্টিফেন গির্জাকে ব্যাপক স্বাধীনতা এবং সুযোগ-সুবিধা দেবেন, যার বিনিময়ে ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ এবং পোপের প্রতিনিধি তার সিংহাসন আরোহণকে সমর্থন করবেন।[৩১] এমপ্রেস মাটিল্ডাকে সমর্থন করার জন্য স্টিফেন যে ধর্মীয় শপথ নিয়েছিলেন সেটি একটি ছোট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু হেনরি যুক্তি দেন যে প্রয়াত রাজা তার দরবারকে শপথ নিতে বাধ্য করে ভুল করেছিলেন।[৩২] অধিকন্তু, প্রথম হেনরি শুধুমাত্র রাজ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যই সেই শপথে জোর দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে তা বিবেচনা করলে স্টিফেনের জন্য সেই শপথ উপেক্ষা করা ন্যায়সঙ্গত হবে।[৩২] হেনরি আরও প্ররোচিত করতে সক্ষম হন প্রথম হেনরির রাজকীয় স্টুয়ার্ড হিউ বিগড-কে, যিনি শপথ করে বলেন যে রাজা মৃত্যুর আগে উত্তরাধিকার নিয়ে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন এবং স্টিফেনকে মনোনীত করেছিলেন।[৩২][nb ২] ২৬ ডিসেম্বর ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে-তে স্টিফেনের রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়।[৩৪][nb ৩]

ইতিমধ্যে নরমান অভিজাতরা থিবল্ডকে রাজা ঘোষণা করার বিষয়ে আলোচনার জন্য লে নিউবর্গ-এ সমবেত হন, সম্ভবত ইংল্যান্ডে স্টিফেনের সমর্থন পাওয়ার খবর শোনার পর।[৩৬] নরমানরা যুক্তি দেয় যে কাউন্ট থিবল্ড, উইলিয়াম দ্য কনকারারের জ্যেষ্ঠ নাতি হিসেবে রাজ্য এবং ডাচির ওপর সবচেয়ে বৈধ দাবিদার এবং তিনি অবশ্যই মাটিল্ডার চেয়ে গ্রহণযোগ্য।[২৬] থিবল্ড ২১ ডিসেম্বর লিসিও-তে নরমান ব্যারন এবং রবার্ট অফ গ্লুচেস্টারের সাথে দেখা করেন, কিন্তু তাদের আলোচনা হঠাৎ ইংল্যান্ড থেকে আসা খবরে বাধাগ্রস্ত হয় যে পরের দিনই স্টিফেনের রাজ্যাভিষেক হতে যাচ্ছে।[৩৭] থিবল্ড তখন তাকে রাজা করার নরমানদের প্রস্তাবে রাজি হন, কিন্তু দেখতে পান যে তার পূর্বের সমর্থন দ্রুত হ্রাস পেয়েছে: ব্যারনরা স্টিফেনের বিরোধিতা করে ইংল্যান্ড এবং নরমান্ডিকে বিভক্ত করতে প্রস্তুত ছিলেন না।[৩৮] স্টিফেন পরবর্তীতে থিবল্ডকে আর্থিকভাবে ক্ষতিপূরণ দেন, যার বিনিময়ে তিনি ব্লয়তে অবস্থান করেন এবং তার ভাইয়ের উত্তরাধিকারকে সমর্থন করেন।[৩৯][nb ৪]

পটভূমি

[সম্পাদনা]

নতুন শাসনকাল (১১৩৫–১১৩৮)

[সম্পাদনা]

রাজ্যাভিষেকের পরপরই স্টিফেনকে ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে হস্তক্ষেপ করতে হয়।[৩৩] প্রথম হেনরির প্রথম রানির ভাই এবং মাটিল্ডার মামা, স্কটল্যান্ডের প্রথম ডেভিড, হেনরির মৃত্যুর খবর পেয়ে উত্তর ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন এবং কার্লাইল, নিউক্যাসেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করে নেন।[৩৩] সেই সময়ে উত্তর ইংল্যান্ড ছিল একটি বিতর্কিত অঞ্চল; স্কটিশ রাজারা ঐতিহাসিকভাবেই কাম্বারল্যান্ড দাবি করে আসছিলেন এবং ডেভিড তার স্ত্রী (সাবেক অ্যাংলো-স্যাক্সন আর্ল ওয়ালথিওফ-এর কন্যা) সূত্রে নর্থাম্ব্রিয়া-ও দাবি করেন।[৪১] স্টিফেন দ্রুত সেনাবাহিনী নিয়ে উত্তরে অগ্রসর হন এবং ডারহামে ডেভিডের সাথে মিলিত হন।[৪২] তাদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যার অধীনে ডেভিড কার্লাইল বাদে দখল করা বাকি সব অঞ্চল ফেরত দিতে রাজি হন। বিনিময়ে স্টিফেন ইংল্যান্ডে ডেভিডের পুত্র প্রিন্স হেনরির অধিকারভুক্ত এলাকাগুলো, যার মধ্যে হান্টিংডনের আর্লডম অন্তর্ভুক্ত ছিল, তা বহাল রাখার স্বীকৃতি দেন।[৪২]

দক্ষিণে ফিরে এসে স্টিফেন ১১৩৬ সালের ইস্টার উৎসবে তার প্রথম রাজকীয় দরবার (Royal Court) আয়োজন করেন।[৪৩] এই অনুষ্ঠানে অনেক অ্যাংলো-নরমান ব্যারন এবং গির্জার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ অসংখ্য অভিজাত ব্যক্তি ওয়েস্টমিনিস্টারে সমবেত হন।[৪৪] স্টিফেন একটি নতুন রাজকীয় চার্টার ইস্যু করেন, যেখানে তিনি গির্জাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পুনরায় নিশ্চিত করেন এবং হেনরির রাজকীয় বন (royal forests) সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তনের ও বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন।[৪৫] স্টিফেন নিজেকে প্রথম হেনরির নীতির স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং রাজ্যের বিদ্যমান সাতটি আর্লডম তাদের বর্তমান অধিকারীদের হাতেই বহাল রাখেন।[৪৬] ইস্টারের এই রাজদরবার ছিল অত্যন্ত জমকালো এবং পোশাক ও উপহারের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল।[৪৭] স্টিফেন উপস্থিতদের ভূমি ও আনুকূল্য দান করেন এবং অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে জমি ও বিশেষ সুবিধা প্রদান করেন।[৪৮] স্টিফেনের সিংহাসন আরোহণ তখনও পোপ কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। হেনরি অফ ব্লয় সম্ভবত থিবল্ড এবং ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ লুইয়ের কাছ থেকে সমর্থনের প্রমাণপত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। লুইয়ের কাছে স্টিফেন ছিলেন উত্তর ফ্রান্সে অ্যাঞ্জেভিনদের ক্রমবর্ধমান শক্তি নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর মাধ্যম।[৪৯] সেই বছরের শেষের দিকে পোপ ইনোসেন্ট দ্বিতীয় চিঠির মাধ্যমে স্টিফেনকে রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং স্টিফেনের উপদেষ্টারা তার বৈধতা প্রদর্শনের জন্য সেই চিঠির অনুলিপি পুরো ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে দেন।[৫০]

রাজা স্টিফেনের একটি মধ্যযুগীয় চিত্র যেখানে তিনি একটি শিকারি পাখি ধরে আছেন
১৪শ শতাব্দীর একটি চিত্রে রাজা স্টিফেন একটি শিকারি পাখির সাথে।

স্টিফেনের নতুন রাজ্যে অশান্তি চলতেই থাকে। ১১৩৬ সালের জানুয়ারিতে লুচরের যুদ্ধে ওয়েলশদের বিজয় এবং এপ্রিলে রিচার্ড ফিটজ গিলবার্ট ডি ক্লিয়ার-এর ওপর সফল অতর্কিত হামলার পর দক্ষিণ ওয়েলসে বিদ্রোহ শুরু হয়। এটি পূর্ব গ্ল্যামারগান থেকে শুরু হয়ে ১১৩৭ সালের মধ্যে দ্রুত পুরো দক্ষিণ ওয়েলসে ছড়িয়ে পড়ে।[৫১] ওয়াইন গুইনেড এবং গ্রুফিড আপ রিস কারমার্থেন দুর্গ-সহ বিশাল এলাকা দখল করে নেন।[৪১] স্টিফেন এই অঞ্চল শান্ত করতে রিচার্ডের ভাই বল্ডউইন এবং 'মার্চার লর্ড' রবার্ট ফিটজ হ্যারল্ডকে ওয়েলসে পাঠান। কোনো অভিযানই বিশেষ সফল হয়নি এবং ১১৩৭ সালের শেষ নাগাদ স্টিফেন বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা সম্ভবত ছেড়ে দেন। ইতিহাসবিদ ডেভিড ক্রাউচ মনে করেন, স্টিফেন তার অন্যান্য সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার জন্য এই সময়ে কার্যত "ওয়েলস থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন"।[৫২] এদিকে স্টিফেন দক্ষিণ-পশ্চিমে বল্ডউইন ডি রেডভার্স এবং ব্যাম্পটনের রবার্টের নেতৃত্বে পরিচালিত দুটি বিদ্রোহ দমন করেন; বল্ডউইন বন্দি হওয়ার পর মুক্তি পেয়ে নরমান্ডিতে চলে যান এবং সেখানে রাজার একজন কড়া সমালোচকে পরিণত হন।[৫৩]

আনজুর জেফ্রি ১১৩৬ সালের শুরুর দিকে নরমান্ডি আক্রমণ করেন এবং একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর একই বছরের শেষের দিকে আবার আক্রমণ চালান। এবার তিনি অঞ্চল দখলের চেয়ে লুটপাট এবং জমি পুড়িয়ে দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেন।[৫৪] ইংল্যান্ডের পরিস্থিতির কারণে স্টিফেন নরমান্ডি ভ্রমণ করতে পারেননি, তাই স্টিফেন কর্তৃক নরমান্ডির লেফটেন্যান্ট নিযুক্ত ওয়ালরান ডি বিউমন্ট এবং থিবল্ড ডাচি রক্ষার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন।[৫৫] স্টিফেন ১১৩৭ সালে ডাচিতে ফিরে আসেন এবং সেখানে ষষ্ঠ লুই ও থিবল্ডের সাথে দেখা করে একটি অনানুষ্ঠানিক আঞ্চলিক জোট গঠন করেন। এটি সম্ভবত হেনরির মধ্যস্থতায় হয়েছিল যেন এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অ্যাঞ্জেভিন শক্তিকে প্রতিহত করা যায়।[৫৬] এই চুক্তির অংশ হিসেবে, লুই স্টিফেনের পুত্র ইউস্টেসকে নরমান্ডির ডিউক হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং বিনিময়ে ইউস্টেস লুইয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।[৫৭] তবে স্টিফেন নরমান্ডি এবং আনজু সীমান্তের আর্জেন্টান প্রদেশটি পুনরুদ্ধারে কম সফল হন, যা ১১৩৫ সালের শেষে জেফ্রি দখল করেছিলেন।[৫৮] স্টিফেন এটি উদ্ধারের জন্য একটি বাহিনী গঠন করেন, কিন্তু উইলিয়াম অফ ইপ্রেস-এর নেতৃত্বে তার ফ্লেমিশ ভাড়াটে সৈন্য এবং স্থানীয় নরমান ব্যারনদের মধ্যে ঘর্ষণের ফলে তার নিজের সেনাবাহিনীর দুই অংশের মধ্যেই যুদ্ধ লেগে যায়।[৫৯] এর ফলে নরমান সৈন্যরা স্টিফেনকে ত্যাগ করে চলে যায় এবং তিনি অভিযান ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।[৬০] স্টিফেন জেফ্রির সাথে আরেকটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন, যেখানে নরমান সীমান্তে শান্তির বিনিময়ে তাকে বছরে ২,০০০ মার্ক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।[৫৪][nb ৫]

রাজা হিসেবে স্টিফেনের প্রথম বছরগুলোকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ইতিবাচকভাবে দেখলে, স্টিফেন স্কটল্যান্ডের সাথে উত্তর সীমান্ত স্থিতিশীল করেছিলেন, নরমান্ডিতে জেফ্রির আক্রমণ সামলেছিলেন, ষষ্ঠ লুইয়ের সাথে শান্তিতে ছিলেন, গির্জার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং ব্যারনদের ব্যাপক সমর্থন ছিল।[৬৩] তাসত্ত্বেও কিছু গভীর সমস্যা থেকে গিয়েছিল। উত্তর ইংল্যান্ড ডেভিড এবং প্রিন্স হেনরির নিয়ন্ত্রণে ছিল; স্টিফেন ওয়েলস ছেড়ে দিয়েছিলেন, নরমান্ডির লড়াই ডাচিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল এবং অনেক ব্যারন মনে করতে শুরু করেছিলেন যে স্টিফেন তাদের প্রাপ্য জমি বা উপাধি দেননি।[৬৪] এছাড়াও স্টিফেনের অর্থ দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল: হেনরির জমানো বিশাল রাজকোষ ১১৩৮ সালের মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। কারণ ছিল স্টিফেনের জাঁকজমকপূর্ণ রাজদরবার পরিচালনা এবং ইংল্যান্ড ও নরমান্ডিতে লড়াইরত ভাড়াটে বাহিনীর খরচ মেটানো।[৬৫]

প্রাথমিক লড়াই (১১৩৮–১১৩৯)

[সম্পাদনা]

১১৩৮ সালে বেশ কয়েকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমত, রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার স্টিফেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, যার ফলে ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের সূচনা ঘটে।[৬৫] প্রথম হেনরির অবৈধ পুত্র এবং এমপ্রেস মাটিল্ডার সৎ ভাই রবার্ট ছিলেন অন্যতম শক্তিশালী অ্যাংলো-নরমান ব্যারন, যার নিয়ন্ত্রণে নরমান্ডির পাশাপাশি গ্লুচেস্টারের আর্লডম ছিল।[৬৬] ১১৩৮ সালে রবার্ট স্টিফেনের প্রতি তার আনুগত্য ত্যাগ করেন এবং মাটিল্ডার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। এর ফলে কেন্ট এবং ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি বড় আঞ্চলিক বিদ্রোহ শুরু হয়, যদিও রবার্ট নিজে তখন নরমান্ডিতে অবস্থান করছিলেন।[৬৭] মাটিল্ডা ১১৩৫ সাল থেকে সিংহাসনের দাবিতে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না, তাই ১১৩৮ সালে যুদ্ধ ঘোষণার মূল উদ্যোগটি রবার্টই নিয়েছিলেন।[৬৮] ফ্রান্সে জেফ্রি এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নরমান্ডি আক্রমণ করেন। স্কটল্যান্ডের ডেভিডও আবারও উত্তর ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন এবং ঘোষণা করেন যে তিনি তার ভাগ্নি এমপ্রেস মাটিল্ডার সিংহাসনের দাবিকে সমর্থন করছেন। তিনি দক্ষিণ দিকে ইয়র্কশায়ার পর্যন্ত অগ্রসর হন।[৬৯][nb ৬]

স্টিফেন দ্রুত এই বিদ্রোহ ও আক্রমণের জবাব দেন এবং নরমান্ডির চেয়ে ইংল্যান্ডের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। তার স্ত্রী মাটিল্ডাকে বুলোন থেকে জাহাজ এবং সম্পদসহ কেন্টে পাঠানো হয় রবার্টের নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ডোভার পুনরুদ্ধারের জন্য।[৬৬] স্টিফেনের অল্প কিছু নাইটকে স্কটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করার জন্য উত্তরে পাঠানো হয়। সেখানে আগস্ট মাসে ইয়র্কের আর্চবিশপ থারস্টান-এর বাহিনীর কাছে ডেভিডের বাহিনী ব্যাটল অফ দ্য স্ট্যান্ডার্ডে পরাজিত হয়।[৬৯] এই বিজয় সত্ত্বেও ডেভিড উত্তর ইংল্যান্ডের বেশিরভাগ অংশ দখল করে রেখেছিলেন।[৬৯] স্টিফেন গ্লুচেস্টারশায়ার-এর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পশ্চিমে যান; প্রথমে উত্তরে ওয়েলশ মার্চেস-এ আঘাত হেনে হেয়ারফোর্ড এবং শ্রুসবেরি দখল করেন, তারপর দক্ষিণে বাথ-এর দিকে যান।[৬৬] ব্রিস্টল তার জন্য জয় করা খুব কঠিন প্রমাণিত হয়, তাই স্টিফেন এর আশেপাশের এলাকায় লুটপাট চালিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন।[৬৬] বিদ্রোহীরা আশা করেছিল রবার্ট তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসবেন, কিন্তু তিনি সারা বছর নরমান্ডিতেই অবস্থান করেন এবং এমপ্রেস মাটিল্ডাকে ইংল্যান্ড আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করার চেষ্টা করেন।[৭০] বছরের শেষের দিকে ডোভার অবশেষে রানির বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।[৭১]

ইংল্যান্ডে স্টিফেনের সামরিক অভিযান বেশ সফলভাবে এগিয়েছিল এবং ক্রাউচ একে "প্রথম সারির একটি সামরিক কৃতিত্ব" হিসেবে বর্ণনা করেছেন।[৭১] সামরিক সুবিধার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজা স্কটল্যান্ডের সাথে একটি শান্তি চুক্তি করেন।[৭১] স্টিফেনের স্ত্রী মাটিল্ডাকে স্টিফেন ও ডেভিডের মধ্যে আরেকটি চুক্তির আলোচনার জন্য পাঠানো হয়, যা ডারহাম চুক্তি নামে পরিচিত; এর মাধ্যমে নর্থাম্ব্রিয়া এবং কাম্বারল্যান্ড কার্যকরভাবে ডেভিড এবং তার ছেলে হেনরি-র হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিনিময়ে তারা আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।[৬৯] শক্তিশালী চেস্টারের আর্ল রেনালফ কার্লাইল এবং কাম্বারল্যান্ডের ওপর নিজের ঐতিহ্যগত অধিকার মনে করতেন এবং সেগুলো স্কটিশদের হাতে ছেড়ে দেওয়ায় তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন—এই সমস্যাটি যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলেছিল।[৭২]

যুদ্ধের প্রস্তুতি (১১৩৯)

[সম্পাদনা]
২১শ শতাব্দীতে গুডরিচ কাসলের কিপ-এর ছবি
হেয়ারফোর্ডশায়ার-এর ওয়েলশ মার্চেস-এ অবস্থিত গুডরিচ দুর্গের 'কিপ' (keep); এটি সেই স্থাপত্যশৈলীর উদাহরণ যা ১১৩০-এর দশকের শেষের দিকে কাঠের তৈরি মট-অ্যান্ড-বেলি দুর্গের নকশার পরিবর্তে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

১১৩৯ সাল নাগাদ রবার্ট এবং মাটিল্ডা কর্তৃক ইংল্যান্ড আক্রমণ আসন্ন বলে মনে হতে থাকে। জেফ্রি এবং মাটিল্ডা নরমান্ডির বেশিরভাগ অংশ সুরক্ষিত করেছিলেন এবং রবার্টের সাথে মিলে বছরের শুরুটা তারা প্রণালী পারাপার অভিযানের জন্য সৈন্য জড়ো করতে ব্যয় করেন।[৭৩] মাটিল্ডা বছরের শুরুতে পোপের কাছেও আপিল করেন এবং ইংরেজ সিংহাসনের ওপর তার আইনি দাবি তুলে ধরেন; পোপ স্টিফেনের প্রতি তার পূর্বের সমর্থন প্রত্যাহার করতে রাজি হননি, কিন্তু মাটিল্ডার দৃষ্টিকোণ থেকে এই মামলাটি অন্তত এটি প্রতিষ্ঠা করেছিল যে স্টিফেনের দাবি প্রশ্নাতীত নয়।[৭৪]

ইতিমধ্যে স্টিফেন অতিরিক্ত কিছু আর্লডম তৈরির মাধ্যমে আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন।[৭৫] প্রথম হেনরির আমলে মাত্র অল্প কিছু আর্লডম ছিল এবং সেগুলো মূলত প্রতীকী ছিল। স্টিফেন আরও অনেক আর্লডম তৈরি করেন এবং সেখানে তার অনুগত ও দক্ষ সামরিক কমান্ডারদের নিয়োগ দেন। দেশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে তিনি তাদের নতুন জমি এবং অতিরিক্ত নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করেন।[৭৬][nb ৭] স্টিফেনের মাথায় সম্ভবত বেশ কিছু উদ্দেশ্য ছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল অনুগত সমর্থকদের সম্মান প্রদান করে তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং রাজ্যের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করা। স্টিফেন তার প্রধান উপদেষ্টা ওয়ালরান ডি বিউমন্ট এবং তার যমজ ভাই রবার্ট অফ লিসেস্টার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলেন। এই বিউমন্ট যমজ ভাই এবং তাদের ছোট ভাই ও আত্মীয়রাই বেশিরভাগ নতুন আর্লডম লাভ করেছিলেন।[৭৮] ১১৩৮ সাল থেকে স্টিফেন তাদের ওরচেস্টার, লিসেস্টার, হার্টফোর্ড, ওয়ারউইক এবং পেমব্রোক-এর আর্লডম প্রদান করেন। কাম্বারল্যান্ড এবং নর্থাম্ব্রিয়ায় স্টিফেনের নতুন মিত্র প্রিন্স হেনরির ভূখণ্ডসহ এই আর্লডমগুলো মিলে একটি বিশাল অঞ্চল তৈরি করেছিল যা সমস্যাসংকুল দক্ষিণ-পশ্চিম, চেস্টার এবং রাজ্যের বাকি অংশের মধ্যে একটি 'বাফার জোন' বা সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করত।[৭৯]

স্টিফেন এমন একদল বিশপকে সরিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেন যাদেরকে তিনি তার শাসনের জন্য হুমকি মনে করতেন। প্রথম হেনরির অধীনে রাজকীয় প্রশাসন পরিচালিত হতো স্যালসবুরির রজারের মাধ্যমে, যাকে সমর্থন করতেন রজারের দুই ভাগ্নে—লিঙ্কন এবং এলির বিশপ যথাক্রমে আলেকজান্ডার ও নাইজেল এবং রজারের পুত্র লর্ড চ্যান্সেলর রজার লে পোর।[৮০] এই বিশপরা একদিকে যেমন ধর্মীয় নেতা ছিলেন, অন্যদিকে ছিলেন শক্তিশালী ভূস্বামী। তারা নতুন দুর্গ নির্মাণ এবং তাদের সামরিক শক্তির আকার বাড়াতে শুরু করেছিলেন, যা দেখে স্টিফেনের সন্দেহ হয় যে তারা হয়তো এমপ্রেস মাটিল্ডার পক্ষে চলে যাবেন। রজার এবং তার পরিবারও ওয়ালরানের শত্রু ছিলেন, যিনি রাজকীয় প্রশাসনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ পছন্দ করতেন না।[৮১]

১১৩৯ সালের জুনে স্টিফেন অক্সফোর্ডে তার দরবার আয়োজন করেন, যেখানে ব্রিটানির অ্যালান এবং স্যালসবুরির রজারের লোকদের মধ্যে একটি লড়াই বেধে যায়। এই ঘটনাটি সম্ভবত স্টিফেন নিজেই পরিকল্পিতভাবে ঘটিয়েছিলেন।[৮১] এর জবাবে স্টিফেন দাবি করেন যে রজার এবং অন্য বিশপরা যেন ইংল্যান্ডে তাদের সমস্ত দুর্গ সমর্পণ করেন। বিশপদের গ্রেফতার করার মাধ্যমে এই হুমকি কার্যকর করা হয়; তবে নাইজেল পালিয়ে ডিভাইজেস দুর্গে আশ্রয় নেন। স্টিফেন সেই দুর্গ অবরোধ করেন এবং রজার লে পোরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হুমকি দিলে নাইজেল আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।[৮২] অবশিষ্ট দুর্গগুলো এরপর রাজার হাতে তুলে দেওয়া হয়।[৮১][nb ৮] এই ঘটনা বিশপদের কাছ থেকে যেকোনো সামরিক হুমকির অবসান ঘটায়, কিন্তু এটি জ্যেষ্ঠ যাজক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে তার ভাই হেনরির সাথে স্টিফেনের সম্পর্কের ক্ষতি করে থাকতে পারে।[৮৪][nb ৯]

সূচনা

[সম্পাদনা]

প্রযুক্তি এবং রণকৌশল

[সম্পাদনা]
১১৪০-এর দশকের নাইটরা তখনও অনেকটা পূর্ববর্তী শতাব্দীর নাইটদের মতোই ছিল, এখানে বায়েউ তাপ্পি-তে যেমন দেখানো হয়েছে।

গৃহযুদ্ধের সময়কার অ্যাংলো-নরমান যুদ্ধবিগ্রহের বৈশিষ্ট্য ছিল 'অ্যাট্রিশনাল' বা ক্ষয়িষ্ণু সামরিক অভিযান। এখানে কমান্ডাররা শত্রুর এলাকায় হামলা চালাতেন এবং দুর্গ দখল করার চেষ্টা করতেন যেন প্রতিপক্ষের ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়, যা শেষ পর্যন্ত ধীরগতির কৌশলগত বিজয় এনে দিত।[৮৬] মাঝে মাঝে দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি যুদ্ধ বা পিচড ব্যাটল (pitched battle) হতো, কিন্তু এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হতো এবং বিচক্ষণ কমান্ডাররা সাধারণত তা এড়িয়ে চলতেন।[৮৬] সামন্ততান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা (feudal levies) থাকা সত্ত্বেও, নরমান যুদ্ধবিগ্রহ ঐতিহ্যগতভাবেই শাসকদের বড় অংকের নগদ অর্থ খরচ করার ওপর নির্ভরশীল ছিল।[৮৭] ১২শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যুদ্ধের খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং অভিযানের সাফল্যের জন্য পর্যাপ্ত নগদ অর্থের জোগান দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল।[৮৮]

স্টিফেন এবং মাটিল্ডার পরিবার বা হাউসহোল্ডগুলো নাইটদের ছোট ছোট দল নিয়ে গঠিত ছিল যাকে 'ফ্যামিলিয়া রেজিস' (familia regis) বলা হতো; যেকোনো সামরিক অভিযানে এই অভ্যন্তরীণ চক্রটিই সদর দপ্তর হিসেবে কাজ করত।[৮৯] এই সময়ের সেনাবাহিনীগুলো পূর্ববর্তী শতাব্দীর মতোই ছিল, যেখানে বর্মধারী অশ্বারোহী নাইট এবং তাদের সহায়তাকারী পদাতিক বাহিনী থাকত।[৯০] এদের অনেকেই লম্বা চেইনমেলের তৈরি হবার্ক (hauberk), শিরস্ত্রাণ এবং পা ও হাতের সুরক্ষা বর্ম পরতেন।[৯০] তলোয়ার ছিল সাধারণ অস্ত্র, আর অশ্বারোহীদের জন্য ছিল ল্যান্স (lance); ক্রসবো-চালকদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল এবং পুরনো ছোট ধনুকের পাশাপাশি যুদ্ধে মাঝে মাঝে লংবো-ও ব্যবহার করা হতো।[৯০] এই বাহিনীগুলো হয় স্থানীয় অভিজাতদের দ্বারা সাময়িকভাবে সংগৃহীত 'ফিউডাল লেভি' ছিল অথবা ভাড়াটে সৈন্য, যারা ছিল ব্যয়বহুল কিন্তু সেবার মেয়াদের ক্ষেত্রে বেশি নমনীয় এবং প্রায়ই বেশি দক্ষ।[৯১]

নরমানরা ১০ম এবং ১১শ শতাব্দীতে প্রথম দুর্গ বা কাসল তৈরি শুরু করে এবং ১০৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড দখলে তারা এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার করে। বেশিরভাগ দুর্গ ছিল মাটি ও কাঠের তৈরি মট-অ্যান্ড-বেলি বা 'রিংওয়ার্ক' ঘরানার; স্থানীয় শ্রমিক এবং সম্পদ দিয়ে এগুলো সহজে তৈরি করা যেত এবং এগুলো বেশ টেকসই ও রক্ষা করা সহজ ছিল। অ্যাংলো-নরমান এলিটরা জনসংখ্যা, বাণিজ্য এবং অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের জন্য নদী ও উপত্যকাগুলোর ধারে কৌশলগতভাবে এই দুর্গগুলো নির্মাণে দক্ষ হয়ে ওঠেন।[৯২] গৃহযুদ্ধের কয়েক দশক আগে থেকে পাথরের তৈরি কিছু নতুন 'কিপ' (keep) বা মূল টাওয়ারের প্রচলন শুরু হয়। প্রথাগত নকশার চেয়ে এগুলোর জন্য দামী দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হতো এবং অনেকগুলো ঋতু মিলিয়ে এগুলো ধীরে ধীরে তৈরি করতে হতো। যদিও এই চারকোনা কিপগুলোরও কিছু দুর্বলতা ছিল, কিন্তু ১১৪০-এর দশকে ব্যবহৃত ব্যালিস্টা এবং ম্যাঙ্গোনেল (এক ধরণের গুলতি) ছিল পরবর্তীকালের 'ট্রেবুশে'-র তুলনায় অনেক কম শক্তিশালী। ফলে আক্রমণকারীদের চেয়ে রক্ষনভাগের সৈন্যরা অনেক বেশি সুবিধা পেতেন।[৯৩] এর ফলে সরাসরি আক্রমণের চেয়ে রক্ষনভাগের লোকদের না খাইয়ে আত্মসমর্পণ করানো বা দেয়ালের নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে (mining) তা ধসিয়ে দেওয়ার কৌশল কমান্ডারদের কাছে বেশি জনপ্রিয় ছিল।[৮৬]

উত্তর ইয়র্কশায়ার-এ অবস্থিত পিকারিং দুর্গ (ডানে), এবং সম্ভবত অ্যানার্কির সময়ে নির্মিত একটি 'কাউন্টার-কাসল' (পেছনের দিকে ওপরে বামে)।

উভয় পক্ষই নতুন নতুন দুর্গ নির্মাণের মাধ্যমে জবাব দেয়, কখনও কখনও কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে তোলে। দক্ষিণ-পশ্চিমে মাটিল্ডার সমর্থকরা এলাকাটি রক্ষার জন্য এক সারি দুর্গ তৈরি করেন, যা মূলত মট-অ্যান্ড-বেলি নকশার ছিল—যেমন উইঞ্চকম্ব, আপার স্লটার বা ব্যাম্পটন[৯৪] একইভাবে স্টিফেন কেমব্রিজের চারপাশের জমি রক্ষার জন্য বুরওয়েল, লিডগেট, র‍্যাম্পটন, ক্যাক্সটন এবং সোয়াভেসি-তে জলাভূমির কিনারে এক সারি নতুন দুর্গ তৈরি করেন—প্রতিটি একে অপরের থেকে প্রায় ৬ থেকে ৯ মাইল (১০ থেকে ১৫ কিমি) দূরে।[৯৫] এই দুর্গগুলোর অনেকগুলোকে "অ্যাডাল্টারিন কাসল" বা অননুমোদিত দুর্গ বলা হতো, কারণ যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার মধ্যে রাজার অনুমতি ছাড়াই লর্ডরা এগুলো নির্মাণ করেছিলেন।[৯৬] সমসাময়িক ইতিহাসবিদরা বিষয়টিকে উদ্বেগের সাথে দেখেছিলেন; রবার্ট অফ টোরিগনি দাবি করেছেন যে যুদ্ধের সময় ১,১১৫টি এমন দুর্গ তৈরি হয়েছিল, যদিও এটি সম্ভবত অতিরঞ্জিত ছিল কারণ অন্য জায়গায় তিনি ১২৬টি দুর্গের কথা উল্লেখ করেছেন।[৯৭]

এই যুদ্ধের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচুর "কাউন্টার-কাসল" বা "অবরোধ দুর্গ" (siege castles) নির্মাণ।[৯৮] নথিপত্র এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে অন্তত ১৭টি এমন স্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে, তবে যুদ্ধের সময় নির্মিত প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত এর চেয়ে বেশি।[৯৯] গৃহযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ইংরেজ সংঘাতগুলোতে এগুলোর ব্যবহার ছিল। এতে কোনো প্রধান দুর্গ অবরোধ করার সময় তার পাশেই একটি সাধারণ দুর্গ তৈরি করা হতো।[১০০] সাধারণত এগুলো রিংওয়ার্ক বা মট-অ্যান্ড-বেলি নকশায় মূল লক্ষ্যবস্তু থেকে ২০০ থেকে ৩০০ গজ (১৮০ থেকে ২৭০ মিটার) দূরে ধনুকের সীমানার ঠিক বাইরে তৈরি করা হতো।[১০০] কাউন্টার-কাসলগুলো অবরোধের অস্ত্র রাখার মঞ্চ হিসেবে অথবা ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।[১০১] বেশিরভাগ অবরোধ দুর্গ সাময়িক ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং পরে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হতো। যদিও এগুলোর বেশিরভাগই এখন টিকে নেই, ডরসেটের কোর্ফ দুর্গের কাছে 'দ্য রিংস' (the Rings) নামক মাটির স্থাপনাটি একটি অসাধারণ সংরক্ষিত উদাহরণ।[১০২]

নেতাগণ

[সম্পাদনা]

রাজা স্টিফেন ছিলেন অত্যন্ত ধনী, মার্জিত, নম্র এবং সমসাময়িকদের কাছে প্রিয়; তাকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে সক্ষম একজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।[১০৩] সামরিক নেতা হিসেবে তার ব্যক্তিগত দক্ষতা ছিল মল্লযুদ্ধ, অবরোধ যুদ্ধ এবং অত্যন্ত দ্রুত গতিতে দীর্ঘ দূরত্বে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতায়।[১০৪] প্রথম ক্রুসেডের সময় তার বাবার ভীরুতা নিয়ে প্রচলিত গুজবগুলো তখনও শোনা যেত এবং একই দুর্নাম এড়ানোর ইচ্ছা হয়তো স্টিফেনের কিছু দুঃসাহসী সামরিক পদক্ষেপকে প্রভাবিত করেছিল।[১০৫] যুদ্ধের সময় স্টিফেন তার স্ত্রী কুইন মাটিল্ডা অফ বুলোন-এর ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিলেন (তাকে এমপ্রেস মাটিল্ডার সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না)। ১১৪১ সালে স্টিফেন যখন বন্দি ছিলেন, তখন কুইন মাটিল্ডাই আলোচনা পরিচালনা এবং সেনাবাহিনী ও তার লক্ষ্য ধরে রেখেছিলেন; কুইন মাটিল্ডা স্টিফেনের ভাড়াটে বাহিনীর নেতা উইলিয়াম অফ ইপ্রেস-এর সাথে মিলে রাজকীয় পরিবারের নেতৃত্ব দেন।[১০৬]

এমপ্রেস মাটিল্ডার পক্ষে স্টিফেনের সমকক্ষ কোনো একক যুদ্ধ নেতা ছিল না। সম্রাজ্ঞী হিসেবে তার সময়কাল থেকে শাসনকাজে তার ভালো অভিজ্ঞতা ছিল, যেখানে তিনি বিচার কাজ পরিচালনা করেছিলেন এবং ইতালিতে ইম্পেরিয়াল আর্মির সাথে থাকাকালীন রাজপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছিলেন।[১০৭] তবুও একজন নারী হিসেবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে পারতেন না।[১০৮] সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের কাছে মাটিল্ডা স্টিফেনের তুলনায় কম জনপ্রিয় ছিলেন; অনেক ক্ষেত্রে তিনি তার বাবার স্বভাব পেয়েছিলেন—দরবারে উচ্চকণ্ঠে আনুগত্য দাবি করা, প্রয়োজনে হুমকি দেওয়া এবং সাধারণত অহংকারী আচরণ করা।[১০৯] সেই সময়ে একজন নারীর জন্য এ ধরণের আচরণ অনুপযুক্ত বলে মনে করা হতো।[১১০] মাটিল্ডার স্বামী আনজুর জেফ্রি যুদ্ধের সময় নরমান্ডি দখলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তিনি ইংল্যান্ডে আসেননি। জেফ্রি এবং মাটিল্ডার বিবাহিত জীবন সহজ ছিল না; ১১৩০ সালে এটি প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।[১১১]

ফলস্বরূপ, যুদ্ধের বেশিরভাগ সময় অ্যাঞ্জেভিন বাহিনীগুলো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ অভিজাত ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন সম্রাজ্ঞীর সৎ ভাই রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার। তিনি একজন ঝানু রাষ্ট্রনায়ক, অভিজ্ঞ সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্বের গুণের জন্য পরিচিত ছিলেন।[৬৬] রবার্ট ১১৩৫ সালে থিবল্ডকে সিংহাসন গ্রহণের জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন; তিনি ১১৩৬ সালে স্টিফেনের প্রথম রাজদরবারে উপস্থিত ছিলেন না এবং সেই বছরের শেষে অক্সফোর্ডের দরবারে তাকে আনতে বেশ কয়েকবার তলব করতে হয়েছিল।[১১২] ১১৪৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গ্লুচেস্টারের মাইলস ছিলেন আরেকজন দক্ষ সামরিক নেতা; তার সাথে রবার্টের কিছু রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও তারা অভিযানে একে অপরকে সাহায্য করতেন।[১১৩] মাটিল্ডার সবচেয়ে অনুগত অনুসারীদের একজন ছিলেন ব্রায়ান ফিটজ কাউন্ট, যিনি মাইলস-এর মতোই ওয়েলসের একজন মার্চার লর্ড ছিলেন। ফিটজ কাউন্ট মূলত মাটিল্ডার প্রতি তার শপথ বজায় রাখার নৈতিক তাগিদ থেকে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং টেমস করিডোর রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।[১১৪]

গৃহযুদ্ধ

[সম্পাদনা]

প্রাথমিক পর্যায় (১১৩৯–১১৪০)

[সম্পাদনা]
১১৪০ সালের রাজনৈতিক দলগুলোর একটি মানচিত্র
১১৪০ সালে ওয়েলস এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক মানচিত্র; লাল = স্টিফেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা, নীল = মাটিল্ডা, ধূসর = স্থানীয় ওয়েলশ।

১১৪৯ সালের আগস্টে অ্যাঞ্জেভিনদের আক্রমণ শুরু হয়। বল্ডউইন ডি রেডভার্স নরমান্ডি থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওয়্যারহ্যাম-এ আসেন এবং এমপ্রেস মাটিল্ডার আক্রমণকারী বাহিনীকে স্বাগত জানানোর জন্য একটি বন্দর দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু স্টিফেনের বাহিনী তাকে দক্ষিণ-পশ্চিমে পিছু হটতে বাধ্য করে।[১১৫] পরের মাসে রাজমাতা অ্যাডেলিজা এমপ্রেসকে অ্যারুন্ডেল-এ নামার আমন্ত্রণ জানান এবং ৩০ সেপ্টেম্বর রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার ও এমপ্রেস ১৪০ জন নাইট নিয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছান।[১১৫][nb ১০] মাটিল্ডা অ্যারুন্ডেল দুর্গ-এ অবস্থান করেন, আর রবার্ট উত্তর-পশ্চিমে ওয়ালিংফোর্ড এবং ব্রিস্টলের দিকে অগ্রসর হন। তার লক্ষ্য ছিল বিদ্রোহের পক্ষে সমর্থন জোগাড় করা এবং গ্লুচেস্টারের মাইলসের সাথে যোগ দেওয়া, যিনি সেই সুযোগে রাজার প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করেন।[১১৭]

স্টিফেন দ্রুত দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে অ্যারুন্ডেল অবরোধ করেন এবং মাটিল্ডাকে দুর্গের ভেতর আটকা ফেলেন।[১১৮] এরপর স্টিফেন তার ভাই হেনরি অফ ব্লয়ের প্রস্তাবিত একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। এই চুক্তির পূর্ণ বিবরণ জানা না গেলেও ফলাফল ছিল এই যে, স্টিফেন মাটিল্ডাকে অবরোধ মুক্ত করেন এবং তাকে ও তার নাইটদের দক্ষিণ-পশ্চিমে রবার্ট অফ গ্লুচেস্টারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাহারার ব্যবস্থা করেন।[১১৮] নিজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে মুক্তি দেওয়ার পেছনে স্টিফেনের কারণ আজও অস্পষ্ট। সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের মতে, হেনরি যুক্তি দিয়েছিলেন যে এমপ্রেসকে মুক্তি দিয়ে রবার্টকে আক্রমণ করাই হবে স্টিফেনের জন্য লাভজনক, কারণ তখন রবার্টকেই মূল শত্রু মনে করা হতো।[১১৮] এছাড়াও অ্যারুন্ডেল দুর্গ ছিল প্রায় অপরাজেয়; স্টিফেন হয়তো ভয় পেয়েছিলেন যে পশ্চিমে রবার্ট যখন মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তখন দক্ষিণে একটি দীর্ঘ অবরোধে সেনাবাহিনী আটকে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।[১১৯] অন্য একটি তত্ত্ব হলো স্টিফেন তার 'নাইটলি' সৌজন্য বা শৌর্যবোধ (chivalry) থেকে মাটিল্ডাকে মুক্তি দিয়েছিলেন; স্টিফেন তার উদার ও মার্জিত ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত ছিলেন এবং অ্যাংলো-নরমান যুদ্ধে নারীদের সাধারণত লক্ষ্যবস্তু করা হতো না।[১২০][nb ১১]

যদিও মাটিল্ডার পক্ষে দলত্যাগ করা ব্যারনের সংখ্যা শুরুতে কম ছিল, তবুও তিনি গ্লুচেস্টার ও ব্রিস্টল থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমে ডেভন ও কর্নওয়াল এবং পশ্চিমে ওয়েলশ মার্চেস থেকে পূর্বে অক্সফোর্ড ও ওয়ালিংফোর্ড পর্যন্ত একটি সুসংহত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হন, যা সরাসরি লন্ডনকে হুমকির মুখে ফেলে।[১২২] তিনি গ্লুচেস্টারে তার দরবার স্থাপন করেন। এলাকাটি রবার্টের ঘাঁটি ব্রিস্টলের কাছে হলেও মাটিল্ডার স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য যথেষ্ট দূরে ছিল।[১২৩] স্টিফেন অঞ্চলটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেন।[১২৪] প্রথমে তিনি টেমস করিডোর নিয়ন্ত্রণকারী ওয়ালিংফোর্ড দুর্গ আক্রমণ করেন; কিন্তু ব্রায়ান ফিটজ কাউন্ট দুর্গটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রক্ষা করছিলেন।[১২৫] স্টিফেন সেখানে কিছু সৈন্য অবরোধের জন্য রেখে পশ্চিমে উইল্টশায়ারের দিকে অগ্রসর হন এবং পথে সাউথ সার্নি ও মামসবারি দুর্গ দখল করে ট্রোব্রিজ দুর্গ আক্রমণ করেন।[১২৬] ইতিমধ্যে মাইলস অফ গ্লুচেস্টার পূর্বে অগ্রসর হয়ে ওয়ালিংফোর্ডে স্টিফেনের পশ্চাৎবর্তী বাহিনীকে আক্রমণ করেন এবং লন্ডনের দিকে এগোনোর হুমকি দেন। স্টিফেন তার পশ্চিমা অভিযান ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং রাজধানী রক্ষায় পূর্বে ফিরে আসেন।[১২৭]

প্রিন্স হেনরির একটি রূপার মুদ্রার ছবি
স্টিফেনের সাথে শান্তি চুক্তির পর নর্থম্বারল্যান্ড-এর করব্রিজ থেকে নিজ নামে জারি করা প্রিন্স হেনরির একটি রূপার পেনি।

১১৪০ সালের শুরুতে বিশপ নাইজেল, যার দুর্গগুলো স্টিফেন আগের বছর বাজেয়াপ্ত করেছিলেন, তিনিও বিদ্রোহ করেন।[১২৭] নাইজেল পূর্ব অ্যাংলিয়া দখলের আশায় আইল অফ ইলি-তে তার ঘাঁটি স্থাপন করেন, যা জলাভূমি দ্বারা সুরক্ষিত ছিল।[১২৭] স্টিফেন দ্রুত সাড়া দেন; তিনি জলাভূমিতে নৌকা বেঁধে এক ধরণের সাঁকো বা 'কজওয়ে' তৈরি করে দ্বীপে অতর্কিত হামলা চালান।[১২৮] নাইজেল গ্লুচেস্টারে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তার লোকবল ও দুর্গ দখল করা হয় এবং পূর্বে সাময়িকভাবে শৃঙ্খলা ফিরে আসে।[১২৮] রবার্ট অফ গ্লুচেস্টারের লোকেরা স্টিফেনের দখল করা কিছু অঞ্চল পুনরুদ্ধার করে।[১২৯] একটি যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে হেনরি অফ ব্লয় বাথে একটি শান্তি সম্মেলনের আয়োজন করেন, যেখানে মাটিল্ডার পক্ষে রবার্ট এবং স্টিফেনের পক্ষে রানি মাটিল্ডা ও আর্চবিশপ থিওবাল্ড উপস্থিত ছিলেন।[১৩০] কিন্তু হেনরি ও যাজক সম্প্রদায় যখন শান্তির শর্তাবলী নির্ধারণে নিজেদের একচ্ছত্র অধিকার দাবি করেন, তখন স্টিফেন তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং আলোচনা ভেঙে যায়।[১৩১]

চেস্টারের রেনালফ তখনও উত্তর ইংল্যান্ডের জমি স্কটিশ রাজকুমার হেনরিকে দেওয়ার কারণে স্টিফেনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।[৭২] তিনি বড়দিনের পর হেনরি যখন স্টিফেনের দরবার থেকে স্কটল্যান্ডে ফিরছিলেন, তখন তাকে অতর্কিত আক্রমণের পরিকল্পনা করেন।[৭২] স্টিফেন এই পরিকল্পনার খবর পেয়ে নিজেই হেনরিকে পাহারা দিয়ে উত্তরে পৌঁছে দেন, যা রেনালফকে আরও ক্ষিপ্ত করে।[৭২] রেনালফ দাবি করতেন যে স্টিফেনের দখলে থাকা লিঙ্কন দুর্গ-এর ওপর তার অধিকার আছে। একটি সামাজিক সফরের ছদ্মবেশে রেনালফ হঠাৎ আক্রমণ করে দুর্গটি দখল করে নেন।[১৩২] স্টিফেন উত্তরে লিঙ্কনে অগ্রসর হন এবং রেনালফকে নিজের পক্ষে রাখতে একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হন যে, রেনালফ দুর্গটি নিজের কাছে রাখতে পারবেন।[১৩৩] স্টিফেন লন্ডনে ফিরে আসেন কিন্তু খবর পান যে রেনালফ ও তার পরিবার খুব কম প্রহরী নিয়ে দুর্গে অবস্থান করছেন—যা আক্রমণের সুবর্ণ সুযোগ।[১৩৩] নিজের করা চুক্তি ভেঙে স্টিফেন আবার সেনাবাহিনী নিয়ে উত্তরে ছোটেন। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই রেনালফ পালিয়ে যান এবং এমপ্রেসের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। স্টিফেন দুর্গটি অবরোধ করতে বাধ্য হন।[১৩৩]

দ্বিতীয় পর্যায় (১১৪১–১১৪২)

[সম্পাদনা]

লিঙ্কনের যুদ্ধ

[সম্পাদনা]
১১৪১ সালের লিঙ্কনের যুদ্ধ; A – ওয়েলশ বাহিনী; B – রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার; C – অ্যালান; D – স্টিফেন; E – উইলিয়াম; F – ফস ডাইক; G – লিঙ্কন দুর্গ; H – লিঙ্কন ক্যাথেড্রাল; I – লিঙ্কন শহর; J – উইথাম নদী

১১৪১ সালের শুরুতে স্টিফেন যখন লিঙ্কন দুর্গ অবরোধ করছিলেন, তখন রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার এবং রেনালফ একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে স্টিফেনের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হন।[১৩৪] খবর পেয়ে স্টিফেন যুদ্ধ করবেন নাকি পিছু হটে আরও সৈন্য সংগ্রহ করবেন তা নিয়ে সভা ডাকেন। তিনি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে ২ ফেব্রুয়ারি ১১৪১ সালে ঐতিহাসিক লিঙ্কনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।[১৩৪] রাজা সেনাবাহিনীর কেন্দ্রে নেতৃত্ব দেন; তার ডানে ছিলেন ব্রিটানির অ্যালান এবং বামে ছিলেন উইলিয়াম অফ আউমালে।[১৩৫] রবার্ট ও রেনালফের অশ্বারোহী বাহিনী শক্তিশালী ছিল, তাই স্টিফেন তার অনেক নাইটকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে পদাতিক বাহিনী হিসেবে মোতায়েন করেন এবং নিজেও তাদের সাথে যোগ দেন।[১৩৫][nb ১২] স্টিফেন ভালো বক্তা ছিলেন না, তাই যুদ্ধের আগে অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দেওয়ার দায়িত্ব দেন বল্ডউইন অফ ক্লিয়ারকে।[১৩৭] শুরুতে উইলিয়ামের বাহিনী ওয়েলশ পদাতিকদের ওপর সফল হামলা চালালেও দ্রুত পরিস্থিতি স্টিফেনের প্রতিকূলে চলে যায়।[১৩৮] রবার্ট ও রেনালফের অশ্বারোহীরা স্টিফেনের মূল বাহিনীকে ঘিরে ফেলে।[১৩৮] ওয়ালরান ডি বিউমন্ট এবং উইলিয়াম অফ ইপ্রেসসহ স্টিফেনের অনেক সমর্থক এসময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু স্টিফেন বীরত্বের সাথে লড়ে যান; প্রথমে তলোয়ার দিয়ে এবং সেটি ভেঙে গেলে একটি যুদ্ধ-কুঠার দিয়ে তিনি নিজেকে রক্ষা করেন।[১৩৯] শেষ পর্যন্ত রবার্টের সৈন্যরা তাকে পরাস্ত করে বন্দি করে নিয়ে যায়।[১৩৯][nb ১৩]

রবার্ট স্টিফেনকে প্রথমে গ্লুচেস্টারে নিয়ে যান, যেখানে রাজার সাথে এমপ্রেস মাটিল্ডার সাক্ষাৎ হয়। এরপর তাকে ব্রিস্টল দুর্গ-এ স্থানান্তরিত করা হয়।[১৪১] শুরুতে তাকে সম্মানজনক অবস্থায় রাখা হলেও পরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।[১৪১] মাটিল্ডা এখন নিজেকে রানি হিসেবে অভিষিক্ত করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন, যার জন্য গির্জার সমর্থন এবং ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে-তে রাজ্যাভিষেক প্রয়োজন ছিল।[১৪২] হেনরি অফ ব্লয় উইনচেস্টারে একটি কাউন্সিল ডাকেন। তিনি মাটিল্ডার সাথে গোপন চুক্তি করেন যে, গির্জা তাকে সমর্থন দেবে যদি মাটিল্ডা ইংল্যান্ডের গির্জা সংক্রান্ত বিষয়ে হেনরিকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেন।[১৪৩] হেনরি রাজকীয় কোষাগার (যেখানে স্টিফেনের মুকুট ছাড়া খুব বেশি কিছু অবশিষ্ট ছিল না) এমপ্রেসের হাতে তুলে দেন এবং যারা দলবদল করতে অস্বীকার করে তাদের গির্জা থেকে বহিষ্কার করেন।[১৪৪] ক্যানটারবেরির আর্চবিশপ থিওবাল্ড এত দ্রুত মাটিল্ডাকে রানি ঘোষণা করতে রাজি ছিলেন না; তাই যাজক ও অভিজাতদের একটি প্রতিনিধি দল ব্রিস্টলে স্টিফেনের সাথে দেখা করতে যান। তারা স্টিফেনকে তাদের নৈতিক সংকটের কথা জানান—তারা রাজার প্রতি করা আনুগত্যের শপথ ভাঙতে পারেন কি না। স্টিফেন বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে তার প্রজাদের সেই শপথ থেকে মুক্তি দেন।[১৪৫]

ইস্টারের পর উইনচেস্টারে যাজকরা সমবেত হয়ে মাটিল্ডাকে "লেডি অফ ইংল্যান্ড অ্যান্ড নরমান্ডি" ঘোষণা করেন।[১৪৫] যদিও মাটিল্ডার অনুসারীরা সেখানে ছিলেন, অন্য অনেক বড় ব্যারন অনুপস্থিত ছিলেন এবং লন্ডনের প্রতিনিধিরা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন।[১৪৬] রানি মাটিল্ডা (স্টিফেনের স্ত্রী) চিঠি লিখে স্টিফেনের মুক্তির দাবি জানান।[১৪৭] এমপ্রেস মাটিল্ডা জুন মাসে রাজ্যাভিষেকের জন্য লন্ডনের দিকে অগ্রসর হন, কিন্তু সেখানে তার অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।[১৪৮] যদিও তিনি টাওয়ার অফ লন্ডন-এর নিয়ন্ত্রণকারী জেফ্রি ডি ম্যান্ডেভিলের সমর্থন পান, স্টিফেন ও রানি মাটিল্ডার অনুগত বাহিনী শহরের খুব কাছেই ছিল এবং লন্ডনের সাধারণ মানুষ এমপ্রেসকে স্বাগত জানাতে ভয় পাচ্ছিল। ২৪ জুন, রাজ্যাভিষেকের ঠিক আগে, লন্ডনের মানুষ এমপ্রেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। মাটিল্ডা ও তার অনুসারীরা কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে বিশৃঙ্খলার মধ্যে অক্সফোর্ডে পালিয়ে যান।[১৪৯]

ইতিমধ্যে আনজুর জেফ্রি আবার নরমান্ডি আক্রমণ করেন। ওয়ালরান অফ বিউমন্ট ইংল্যান্ডে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় জেফ্রি সেইন নদী-র দক্ষিণ এবং রিসলের পূর্বের সমস্ত অঞ্চল দখল করে নেন।[১৫০] স্টিফেনের ভাই থিবল্ডও এবার সাহায্য করতে পারেননি, কারণ তিনি ফ্রান্সের নতুন রাজা সপ্তম লুইয়ের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন। নরমান্ডিতে জেফ্রির সাফল্য এবং ইংল্যান্ডে স্টিফেনের দুর্বলতা দেখে অনেক অ্যাংলো-নরমান ব্যারন শঙ্কিত হয়ে পড়েন যে তারা হয়তো ইংল্যান্ডের জমি বা নরমান্ডির সম্পদ হারাবেন।[১৫১] অনেকেই স্টিফেনের পক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করেন। স্টিফেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়ালরান ১ন ৪১ সালের মাঝামাঝি দলবদল করে অ্যাঞ্জেভিনদের সাথে যোগ দেন। রবার্ট অফ লিসেস্টারও যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজকীয় মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে এবং স্থানীয় ব্যারন ও বিশপরা নিজেদের মুদ্রা তৈরি শুরু করেন।[১৫২]

উইনচেস্টারের বিপর্যয় এবং অক্সফোর্ড অবরোধ

[সম্পাদনা]
অক্সফোর্ড দুর্গের ছবি
অক্সফোর্ড দুর্গের সেন্ট জর্জ টাওয়ার

স্টিফেন বন্দি থাকাকালীন তার আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে রানি মাটিল্ডা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি দক্ষিণ-পূর্বে স্টিফেনের অনুগত কর্মকর্তাদের একত্রিত করেন এবং লন্ডনের মানুষ যখন এমপ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন তিনি শহরে প্রবেশ করেন।[১৫৩] স্টিফেনের অভিজ্ঞ সেনাপতি উইলিয়াম অফ ইপ্রেস লন্ডনে রানির সাথেই ছিলেন। রানির প্রতি স্টিফেনের অনুসারীদের গভীর সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল।[১৫৩] হেনরি অফ ব্লয়ের সাথে এমপ্রেসের মিত্রতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নীতি নিয়ে ঝগড়ার পর হেনরি গিল্ডফোর্ডে রানি মাটিল্ডার সাথে দেখা করেন এবং পুনরায় স্টিফেনের পক্ষে যোগ দেন।[১৫৪]

১১৪১ সালের জুলাই মাসে এমপ্রেস মাটিল্ডা ও রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার উইনচেস্টারে হেনরির দুর্গ অবরোধ করেন।[১৫৫] রানি মাটিল্ডা ও উইলিয়াম অফ ইপ্রেস লন্ডন থেকে আসা নতুন সৈন্য নিয়ে অ্যাঞ্জেভিন বাহিনীকে উল্টো ঘিরে ফেলেন।[১৫৬] পরিস্থিতি খারাপ দেখে এমপ্রেস তার ঘনিষ্ঠ অনুচরদের নিয়ে শহর থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু পরবর্তী যুদ্ধে এমপ্রেসের বাহিনী পরাজিত হয় এবং পিছু হটার সময় রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার বন্দি হন। এমপ্রেস কোনোমতে ডিভাইজেস দুর্গে আশ্রয় নেন।[১৫৭]

স্টিফেন এবং রবার্ট—উভয় পক্ষই যখন তাদের প্রধান নেতাকে হারায়, তখন শান্তি আলোচনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রানি মাটিল্ডা কোনো আপস করতে রাজি ছিলেন না এবং রবার্টও স্টিফেনের পক্ষ নিতে অস্বীকার করেন।[১৫৮] শেষ পর্যন্ত নভেম্বর মাসে দুই পক্ষ বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে স্টিফেন এবং রবার্টকে মুক্তি দেয়।[১৫৯] হেনরি আবার গির্জার সভা ডাকেন এবং স্টিফেনের বৈধতা ঘোষণা করেন। ১১৪১ সালের ক্রিসমাসে স্টিফেন ও মাটিল্ডার পুন-রাজ্যাভিষেক হয়। ১১৪২ সালের শুরুতে স্টিফেন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে।[১৬০] তবে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং উত্তরে গিয়ে সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং রেনালফকে আবার নিজের পক্ষে আনতে সক্ষম হন।[১৬১] এরপর গ্রীষ্মকালে তিনি সায়রেন্সিস্টার, ব্যাম্পটন এবং ওয়্যারহ্যামের মতো নতুন অ্যাঞ্জেভিন দুর্গগুলো আক্রমণ করেন।[১৬২]

১১৪২ সালের মাঝামাঝি রবার্ট নরমান্ডিতে ফিরে যান জেফ্রিকে সাহায্য করতে। এদিকে স্টিফেনের বাহিনী এমপ্রেস মাটিল্ডাকে অক্সফোর্ডে ঘিরে ফেলে।[১৬২] অক্সফোর্ড ছিল দেয়াল এবং আইসিস নদী দ্বারা সুরক্ষিত একটি শহর। কিন্তু স্টিফেন হঠাৎ নদী সাঁতরে পার হয়ে শহরে হামলা চালান এবং এমপ্রেসকে দুর্গের ভেতর বন্দি করেন।[১৬৩] দুর্গটি শক্তিশালী হওয়ায় স্টিফেন সরাসরি আক্রমণের বদলে দীর্ঘ অবরোধের সিদ্ধান্ত নেন। ক্রিসমাসের ঠিক আগে, এমপ্রেস একটি সাদা পোশাক পরে তুষারপাত ও বরফে ঢাকা নদীর ওপর দিয়ে হেঁটে রাজকীয় বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ওয়ালিংফোর্ডে পালিয়ে যান। পরের দিন দুর্গের সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করে।[১৬৪]

অচলাবস্থা (১১৪৩–১১৪৬)

[সম্পাদনা]
১১৪২ সালে নরমান্ডির মানচিত্র
১১৪২–১১৪৩ সালে জেফ্রি অফ আনজুর নরমান্ডি অভিযান।

১১৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ এক ধরণের অচলাবস্থায় পৌঁছায়। অন্যদিকে জেফ্রি অফ আনজু ১১৪৪ সালে রুয়েন দখলের পর নরমান্ডির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেন।[১৬৫] ১১৪৩ সালের শুরুতে স্টিফেন উইল্টন দুর্গে রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার দ্বারা অবরুদ্ধ হন।[১৬৬] পালানোর চেষ্টার সময় উইল্টনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে অ্যাঞ্জেভিন অশ্বারোহীদের কাছে স্টিফেন প্রায় দ্বিতীয়বারের মতো বন্দি হতে যাচ্ছিলেন।[১৬৭] সেনাপতি উইলিয়াম মারটেলের বীরত্বের কারণে স্টিফেন পালিয়ে বাঁচেন। স্টিফেন উইলিয়ামের প্রতি এতটাই কৃতজ্ঞ ছিলেন যে, তাকে মুক্ত করার মুক্তিপণ হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ শারবোর্ন দুর্গটি ছেড়ে দিতে রাজি হন।[১৬৮]

১১৪৩ সালের শেষের দিকে জেফ্রি ডি ম্যান্ডেভিল পূর্ব অ্যাংলিয়ায় স্টিফেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।[১৬৯] স্টিফেন তাকে দরবারে ডেকে গ্রেফতার করেন এবং তার টাওয়ার অফ লন্ডনসহ গুরুত্বপূর্ণ দুর্গগুলো হস্তান্তরের শর্তে মুক্তি দেন।[১৭০] মুক্ত হয়েই জেফ্রি উত্তরে জলাভূমিতে (Fens) বিদ্রোহ শুরু করেন। স্টিফেন অন্য অনেক সমস্যায় ব্যস্ত থাকায় সেখানে নতুন দুর্গ তৈরি করে তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করেন। ১১৪৪ সালে রেনালফ আবার বিদ্রোহ করেন এবং ল্যাঙ্কাস্টারের জমি স্কটিশ প্রিন্স হেনরির সাথে ভাগ করে নেন।[১৭১] পশ্চিমে রবার্টের হামলা চলতেই থাকে এবং ওয়ালিংফোর্ড দুর্গ লন্ডনের জন্য হুমকি হিসেবে থেকে যায়। ১১৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে বুরওয়েল দুর্গ আক্রমণের সময় জেফ্রি ডি ম্যান্ডেভিল মারা গেলে স্টিফেনের চাপ কিছুটা কমে। ১১৪৫ সালে স্টিফেন ফারিনডন দুর্গ পুনর্দখল করেন।[১৭২] ১১৪৬ সালে তিনি রেনালফকেও জেফ্রি ডি ম্যান্ডেভিলের মতো দরবারে ডেকে গ্রেফতার করেন এবং দুর্গ হস্তান্তরে বাধ্য করেন।[১৭১] বারবার ব্যারনদের দরবারে ডেকে গ্রেফতার করার কারণে স্টিফেনের ওপর অভিজাতদের অবিশ্বাস বাড়তে থাকে।[১৭৩]

শেষ পর্যায় (১১৪৭–১১৫২)

[সম্পাদনা]
দ্বিতীয় হেনরি এবং এলিনর অফ অ্যাকুইটেইনের ছবি
১৪শ শতাব্দীর একটি চিত্রে দ্বিতীয় হেনরি এবং তার স্ত্রী এলিনর অফ অ্যাকুইটেইন

১১৪০-এর দশকের শেষের দিকে গৃহযুদ্ধের তীব্রতা কমে আসে। ১১৪৭ সালে রবার্ট অফ গ্লুচেস্টার মারা যান এবং পরের বছর এমপ্রেস মাটিল্ডা নরমান্ডিতে ফিরে যান।[১৭৪] দ্বিতীয় ক্রুসেড শুরু হওয়ায় অনেক সমর্থক যুদ্ধ ছেড়ে চলে যান। অনেক ব্যারন নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত শান্তি চুক্তি (Treaty) করতে শুরু করেন যাতে তাদের জমি সুরক্ষিত থাকে।[১৭৫] ১১৪৭ সালে মাটিল্ডার ছেলে হেনরি ফিটজএম্প্রেস ইংল্যান্ডে একটি ছোট হামলা চালান, কিন্তু টাকার অভাবে তা ব্যর্থ হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্টিফেন নিজেই হেনরিকে নিরাপদে বাড়ি ফেরার টাকা দিয়ে সাহায্য করেন। সম্ভবত তিনি যুদ্ধের একটি শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি চাইছিলেন এবং হেনরির সাথে সুসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছিলেন।[১৭৬]

১১৫০-এর দশকের দিকে ব্যারনদের মধ্যে এমন এক ধরণের চুক্তির নেটওয়ার্ক তৈরি হয় যা স্থানীয় সংঘর্ষ অনেকটা কমিয়ে দেয়।[১৭৭] হেনরি ফিটজএম্প্রেস ১১৪৯ সালে আবার ইংল্যান্ডে এসে রেনালফ ও স্কটিশদের সাথে জোট করার চেষ্টা করেন, কিন্তু স্টিফেন দ্রুত ব্যবস্থা নিলে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। হেনরি নরমান্ডিতে ফিরে যান এবং তার বাবা তাকে ডিউক হিসেবে ঘোষণা করেন।[১৭৮] ১১৫২ সালে হেনরি এলিনর অফ অ্যাকুইটেইন-কে বিয়ে করেন, যা তার শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় কারণ এলিনর ছিলেন বিশাল অ্যাকুইটেইন অঞ্চলের উত্তরাধিকারী।[১৭৯]

যুদ্ধের শেষ বছরগুলোতে স্টিফেন তার ছেলে ইউস্টেস-কে উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন।[১৮০] তিনি চেয়েছিলেন ইউস্টেসকে তার জীবিত অবস্থাতেই রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করতে, যা ফ্রান্সে প্রচলিত ছিল। কিন্তু পোপ এবং আর্চবিশপ থিওবাল্ড এতে বাধা দেন, কারণ তারা মনে করেছিলেন এটি গৃহযুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।[১৮১] স্টিফেন যাজকদের বন্দি করেও তাদের রাজি করাতে পারেননি। আর্চবিশপ থিওবাল্ড পালিয়ে ফ্ল্যান্ডার্সে চলে যান, যা চার্চের সাথে স্টিফেনের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায়।[১৮২]

ফলাফল

[সম্পাদনা]

শান্তি আলোচনা (১১৫৩–১১৫৪)

[সম্পাদনা]
১১৫৩ সালের রাজনৈতিক দলগুলোর একটি রঙিন মানচিত্র
১১৫৩ সালে ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং দক্ষিণ স্কটল্যান্ডের রাজনৈতিক মানচিত্র;
  হেনরির নিয়ন্ত্রণে
  স্টিফেন
  স্থানীয় ওয়েলশ
  চেস্টারের রেনালফ এবং লিসেস্টারের রবার্ট
  স্কটল্যান্ডের প্রথম ডেভিড

১১৫৩ সালের শুরুতে হেনরি ফিটজএম্প্রেস একটি ছোট সেনাবাহিনী নিয়ে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন; উত্তর ও পূর্ব ইংল্যান্ডে তাকে রেনালফ এবং হিউ বিগোড সমর্থন দেন।[১৮৩] হেনরির বাহিনী মালমেসবারি দুর্গ অবরোধ করলে স্টিফেন সেটি উদ্ধারের জন্য পশ্চিমে অগ্রসর হন।[১৮৪] স্টিফেন অ্যাভন নদীর তীরে হেনরির ছোট বাহিনীকে একটি চূড়ান্ত যুদ্ধে বাধ্য করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।[১৮৪] শীতকালীন আবহাওয়ার কারণে স্টিফেন একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়ে লন্ডনে ফিরে যান। এই সুযোগে হেনরি মিডল্যান্ডসের মধ্য দিয়ে উত্তরে যাত্রা করেন, যেখানে প্রভাবশালী রবার্ট ডি বিউমন্ট অ্যাঞ্জেভিনদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন।[১৮৪] যদিও হেনরির সামরিক সাফল্য ছিল সীমিত, তবুও তিনি ও তার মিত্ররা দক্ষিণ-পশ্চিম, মিডল্যান্ডস এবং উত্তর ইংল্যান্ডের বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।[১৮৫] ইস্টারের ঠিক আগে একদল উচ্চপদস্থ ইংরেজ যাজক স্টকব্রিজে হেনরি ও তার উপদেষ্টাদের সাথে দেখা করেন।[১৮৬] তাদের আলোচনার অনেক বিবরণ অস্পষ্ট, তবে মনে হয় যাজকরা জোর দিয়েছিলেন যে—তারা স্টিফেনকে রাজা হিসেবে সমর্থন করলেও একটি সমঝোতামূলক শান্তি চান; হেনরি আশ্বাস দেন যে তিনি গির্জার ক্ষতি এড়িয়ে চলবেন এবং বিশপদের তার দরবারে উপস্থিত হতে বাধ্য করবেন না।[১৮৭]

স্টিফেন অ্যাঞ্জেভিনদের শক্তিশালী ঘাঁটি ওয়ালিংফোর্ড দুর্গ দখলের জন্য তার দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ আরও জোরদার করেন।[১৮৮] ওয়ালিংফোর্ডের পতন আসন্ন দেখে হেনরি দক্ষিণে অগ্রসর হন এবং স্টিফেনের অবরোধকারী বাহিনীকে উল্টো ঘিরে ফেলেন।[১৮৯] স্টিফেন একটি বিশাল বাহিনী সংগ্রহ করে অক্সফোর্ড থেকে যাত্রা করেন এবং জুলাই মাসে দুই পক্ষ ওয়ালিংফোর্ডে টেমস নদীর দুই পাড়ে মুখোমুখি হয়।[১৮৯] যুদ্ধের এই পর্যায়ে উভয় পক্ষের ব্যারনরাই একটি সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে চাইছিলেন।[১৯০] ফলে যুদ্ধের বদলে গির্জার মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়, যা স্টিফেন ও হেনরি উভয়কেই ক্ষুব্ধ করেছিল।[১৯০]


ওয়ালিংফোর্ড ঘটনার পর স্টিফেন এবং হেনরি ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধ সমাপ্তির বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে এই শান্তিপূর্ণ সমাধানে ইউস্টেস অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি তার বাবাকে ছেড়ে নতুন অভিযানের অর্থ সংগ্রহের জন্য কেমব্রিজে ফিরে যান, যেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পরের মাসেই মারা যান।[১৯১] ইউস্টেসের মৃত্যু সিংহাসনের একজন শক্তিশালী দাবিদারকে সরিয়ে দেয়, যা ইংল্যান্ডে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। এটি সম্ভব যে স্টিফেন আগেই ইউস্টেসের দাবি এড়িয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন; ইতিহাসবিদ এডমন্ড কিং লক্ষ্য করেছেন যে ওয়ালিংফোর্ডের আলোচনায় ইউস্টেসের সিংহাসনের দাবির কোনো উল্লেখ ছিল না, যা হয়তো তার ক্রোধের কারণ ছিল।[১৯২]

ওয়ালিংফোর্ডের পর লড়াই চললেও তা ছিল অনেকটা নামমাত্র। স্টিফেন যখন পূর্বে হিউ বিগোডের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, তখন তিনি হেনরির কাছে অক্সফোর্ড ও স্ট্যামফোর্ড হারান; তবে অ্যাঞ্জেভিনরা নটিংহাম দুর্গ দখলে ব্যর্থ হয়।[১৯৩] ইতিমধ্যে হেনরি অফ ব্লয় এবং আর্চবিশপ থিওবাল্ড দুই পক্ষের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হন এবং স্টিফেনকে একটি চুক্তিতে রাজি হতে চাপ দেন।[১৯৪] স্টিফেন এবং হেনরি ফিটজএম্প্রেসের সেনাবাহিনী আবার উইনচেস্টারে মিলিত হয়, যেখানে নভেম্বর মাসে তারা স্থায়ী শান্তির শর্তাবলী অনুমোদন করেন।[১৯৫] স্টিফেন উইনচেস্টার ক্যাথেড্রালে উইনচেস্টার চুক্তির ঘোষণা দেন: তিনি হেনরি ফিটজএম্প্রেসকে তার দত্তক পুত্র ও উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেন, বিনিময়ে হেনরি তাকে আনুগত্যের শপথ প্রদান করেন; স্টিফেন হেনরির পরামর্শ শোনার প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু তার সমস্ত রাজকীয় ক্ষমতা বহাল রাখেন; স্টিফেনের বাকি ছেলে উইলিয়াম হেনরির প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন এবং নিজ ভূসম্পত্তির নিরাপত্তার বিনিময়ে সিংহাসনের দাবি ত্যাগ করেন; গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় দুর্গগুলো গ্যারান্টারদের মাধ্যমে হেনরির পক্ষে রাখা হবে যেখানে স্টিফেনও প্রবেশের সুযোগ পাবেন; এবং অসংখ্য বিদেশি ভাড়াটে সৈন্যকে বিদায় করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।[১৯৬] স্টিফেন ও হেনরি ক্যাথেড্রালে শান্তির চুম্বন বিনিময়ের মাধ্যমে চুক্তিতে সিলমোহর দেন।[১৯৭]

রূপান্তর এবং পুনর্গঠন (১১৫৪–১১৬৫)

[সম্পাদনা]
১১৫৪ সালে ক্যানটারবেরির আর্চবিশপ থিওবাল্ড অফ বেক দ্বিতীয় হেনরিকে মুকুট পরাচ্ছেন

হেনরিকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্টিফেনের স্বীকৃতি দেওয়াটি সেই সময়ে গৃহযুদ্ধের কোনো চূড়ান্ত সমাধান ছিল না।[১৯৮] নতুন মুদ্রা জারি এবং প্রশাসনিক সংস্কার সত্ত্বেও স্টিফেন হয়তো আরও বহু বছর বেঁচে থাকতে পারতেন, আর মূল ভূখণ্ডে হেনরির অবস্থানও তখন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ছিল না।[১৯৮] যদিও স্টিফেনের ছেলে উইলিয়াম ১১৫৩ সালে হেনরিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো প্রস্তুত ছিলেন না, পরবর্তী বছরগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারত—উদাহরণস্বরূপ, ১১৫৪ সালে উইলিয়াম হেনরিকে হত্যার পরিকল্পনা করছেন বলে ব্যাপক গুজব ছড়িয়েছিল।[১৯৯] ইতিহাসবিদ গ্রাহাম হোয়াইট উইনচেস্টার চুক্তিকে একটি "অস্থিতিশীল শান্তি" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে স্টিফেন ১১৫৪ সালের শুরুতে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং রাজ্যজুড়ে সফর করেন।[২০০] তিনি আবার দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের জন্য রাজকীয় রিট জারি করতে শুরু করেন এবং ইয়র্কে গিয়ে একটি বড় আদালত পরিচালনা করেন যাতে উত্তরের ব্যারনদের বোঝানো যায় যে রাজকীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।[১৯৯] ১১৫৪ সালে স্টিফেন ফ্ল্যান্ডার্সের কাউন্ট-এর সাথে দেখা করতে ডোভার যান; কিছু ইতিহাসবিদের মতে স্টিফেন তখন অসুস্থ ছিলেন এবং তার পারিবারিক বিষয়গুলো গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।[২০১] শেষ পর্যন্ত পেটের অসুখে আক্রান্ত হয়ে স্টিফেন ১১৫৪ সালের ২৫ অক্টোবর মারা যান।[২০১]

স্টিফেনের মৃত্যুর খবর পেয়ে হেনরি ১১৫৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। তিনি দ্রুত ব্যারনদের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ নেন এবং তারপর ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে এলিনরের সাথে অভিষিক্ত হন।[২০২] ১১৫৫ সালের এপ্রিলে রাজকীয় দরবারে ব্যারনরা রাজা ও তার সন্তানদের প্রতি আনুগত্যের শপথ দেন।[২০২] হেনরি নিজেকে প্রথম হেনরির বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং তার নিজস্ব ধাঁচে রাজ্য পুনর্গঠন শুরু করেন।[২০৩] যদিও স্টিফেন যুদ্ধের সময় প্রথম হেনরির শাসনপদ্ধতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, নতুন সরকার স্টিফেনের ১৯ বছরের শাসনকালকে একটি বিশৃঙ্খল এবং সমস্যাসংকুল সময় হিসেবে চিহ্নিত করে, যার মূলে ছিল স্টিফেনের সিংহাসন দখল।[২০৪] হেনরি সতর্কতার সাথে দেখিয়েছিলেন যে, তার মা এমপ্রেসের মতো নন, বরং তিনি অন্যের পরামর্শ ও উপদেশ শুনবেন।[২০৫] হেনরি তার শাসনের প্রথম আট বছরের মধ্যে সাড়ে ছয় বছরই ফ্রান্সে কাটিয়েছিলেন, তাই অনেক কাজই দূর থেকে সম্পন্ন করতে হতো।[২০৬]

যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ড ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল অনুসারে, "সেখানে অশান্তি, দুষ্টুমি আর ডাকাতি ছাড়া আর কিছু ছিল না"।[২০৭] দেশের অনেক অংশে, যেমন দক্ষিণ-পশ্চিম, টেমস উপত্যকা এবং পূর্ব অ্যাংলিয়ায় যুদ্ধ ও লুটতরাজ চরম ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল।[২০৮] রাজকীয় মুদ্রা ব্যবস্থা খণ্ডিত হয়ে পড়েছিল এবং স্টিফেন, এমপ্রেস মাটিল্ডা ও স্থানীয় লর্ডরা প্রত্যেকে নিজস্ব মুদ্রা তৈরি করছিলেন।[২০৮] দেশের বড় অংশে রাজকীয় বন আইন ভেঙে পড়েছিল।[২০৯] তবে কিছু অংশ যুদ্ধের স্পর্শ থেকে প্রায় মুক্ত ছিল—যেমন দক্ষিণ-পূর্বে স্টিফেনের জমি এবং গ্লুচেস্টার ও ব্রিস্টলের আশেপাশে অ্যাঞ্জেভিনদের কেন্দ্রস্থল।[২০৮] যুদ্ধের সময় স্টিফেনের সামগ্রিক আয় অনেক কমে গিয়েছিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব অ্যাংলিয়ার বাইরে মুদ্রার ওপর রাজকীয় নিয়ন্ত্রণ সীমিত ছিল।[২১০] স্টিফেন প্রায়শই দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থান করায় প্রাচীন রাজধানী উইনচেস্টারের বদলে ওয়েস্টমিনিস্টারই রাজকীয় প্রশাসনের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়।[২১১]

হেনরির প্রথম পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল বিদেশি ভাড়াটে সৈন্যদের বহিষ্কার করা এবং অনুমোদনহীন দুর্গগুলো ধ্বংস করা।[২১২][nb ১৪] ইতিহাসবিদ রবার্ট অফ টোরিগনি উল্লেখ করেছেন যে ৩৭৫টি দুর্গ ধ্বংস করা হয়েছিল, যদিও তিনি বিস্তারিত তথ্য দেননি। বর্তমানের কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কম এবং অনেক দুর্গ যুদ্ধের শেষে স্রেফ পরিত্যক্ত হয়েছিল।[২১২] হেনরি রাজকীয় অর্থব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে উচ্চ অগ্রাধিকার দেন এবং প্রথম হেনরির আর্থিক পদ্ধতিগুলো পুনরায় চালু করেন। ১১৬০-এর দশকের মধ্যে এই আর্থিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া মূলত সম্পন্ন হয়।[২১৩]

যুদ্ধোত্তর সময়ে ইংল্যান্ডের সীমান্তেও চাঞ্চল্য দেখা দেয়। স্কটল্যান্ডের রাজা এবং স্থানীয় ওয়েলশ শাসকরা ইংল্যান্ডের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে বিরোধপূর্ণ জমিগুলো দখল করেছিলেন; হেনরি তা পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেন।[২১৪] ১১৫৭ সালে হেনরির চাপে স্কটল্যান্ডের চতুর্থ ম্যালকম যুদ্ধের সময় দখল করা উত্তর ইংল্যান্ডের জমিগুলো ফিরিয়ে দেন; হেনরি দ্রুত উত্তর সীমান্ত আবার শক্তিশালী করতে শুরু করেন।[২১৫] ওয়েলশে অ্যাংলো-নরমান আধিপত্য পুনরুদ্ধার করা কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল এবং হেনরিকে ১১৫৭ ও ১১৫৮ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ওয়েলশে দুটি অভিযান চালাতে হয়। শেষ পর্যন্ত ওয়েলশ রাজপুত্র ওয়াইন গুইনেড এবং রিস অ্যাপ গ্রুফিড তার বশ্যতা স্বীকার করেন এবং যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সীমানা অনুযায়ী ভূমি বণ্টনে সম্মত হন।[২১৬]

ঐতিহ্য

[সম্পাদনা]

ইতিহাসতত্ত্ব

[সম্পাদনা]
অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকলের প্রথম পাতার ছবি
১১৫০ সালের দিকে লিখিত অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল-এর পিটারবরো অংশের প্রথম পাতা, যেখানে গৃহযুদ্ধের ঘটনাগুলো বর্ণিত আছে।

"দি অ্যানার্কি" বা নৈরাজ্যময় এই গৃহযুদ্ধের আধুনিক ইতিহাসের বেশিরভাগই ১২ শতকের সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের বিবরণের ওপর ভিত্তি করে রচিত।[২১৭] সমস্ত প্রধান বিবরণগুলোতে আঞ্চলিক পক্ষপাত লক্ষ্য করা যায়। দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থ লেখা হয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে জেস্টা স্টিফানি (স্টিফেনের বীরত্বগাথা) এবং উইলিয়াম অফ মামসবারির হিস্টোরিয়া নভেলা[২১৮] নরমান্ডিতে অর্ডেরিক ভাইটালিস তার একলেসিয়াস্টিক্যাল হিস্ট্রি লিখেছেন ১১৪১ সাল পর্যন্ত এবং রবার্ট অফ টোরিগনি পরবর্তী বছরগুলোর ইতিহাস লিখেছেন।[২১৮] পূর্ব ইংল্যান্ডের হেনরি অফ হান্টিংডন তার হিস্টোরিয়া অ্যাংলোরাম গ্রন্থে সংঘাতের আঞ্চলিক বিবরণ দিয়েছেন।[২১৯] যুদ্ধের সময় অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকল তার জৌলুস হারিয়েছিল, তবে পিটারবরো অ্যাবের সংস্করণটি (যা পিটারবরো ক্রনিকল নামে পরিচিত) সেই সময়ের অবস্থার বর্ণনা দেওয়ার জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে এর এই উক্তিটি স্মরণীয়: "মানুষ প্রকাশ্যে বলত যে খ্রিষ্ট এবং তার সন্তরা ঘুমিয়ে আছেন"।[২২০] বেশিরভাগ ইতিহাস লেখকই কোনো না কোনো নেতার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন।[২২১]

এই গৃহযুদ্ধকে বর্ণনা করতে "অ্যানার্কি" বা "নৈরাজ্য" শব্দটির ব্যবহার নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এই শব্দটির উদ্ভব হয় ভিক্টোরীয় যুগের শেষ দিকে। সেই সময়ের অনেক ইতিহাসবিদ মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশে এক ধরণের প্রগতিশীল ধারা খুঁজে দেখার চেষ্টা করতেন।[২২২] উইলিয়াম স্টাবস ১৮৭৪ সালে তার ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক ইতিহাস গ্রন্থে ১১৪০-এর দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন। তিনি ইংরেজ সংবিধানের বিকাশে একটি বড় ছেদ লক্ষ্য করেন, যা তার ছাত্র জন হোরেস রাউন্ডকে এই সময়টিকে "দি অ্যানার্কি" হিসেবে অভিহিত করতে অনুপ্রাণিত করে।[২২৩] পরবর্তী ইতিহাসবিদরা এই শব্দের সমালোচনা করেছেন, কারণ সেই সময়ের আর্থিক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি যতটা ঢালাওভাবে বলা হয়েছিল, তা আসলে অনেক বেশি আঞ্চলিক এবং সুনির্দিষ্ট ছিল।[২২৪] ১৯৯০-এর দশকের গবেষণাগুলো হেনরির পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় স্টিফেনের যুদ্ধকালীন সরকারের সাথে এক ধরণের ধারাবাহিকতা খুঁজে পেয়েছে।[২২৫] তবে আধুনিক ইতিহাসবিদরা এখনও "দি অ্যানার্কি" শব্দটি ব্যবহার করেন, যদিও তা অনেক সতর্কতার সাথে।[২২৬]

জনপ্রিয় উপস্থাপনা

[সম্পাদনা]

অ্যানার্কি বা নৈরাজ্যের এই গৃহযুদ্ধের বছরগুলো ঐতিহাসিক উপন্যাসে মাঝেমধ্যেই ব্যবহৃত হয়েছে। এলিস পিটার্স-এর ঐতিহাসিক গোয়েন্দা সিরিজ ব্রাদার ক্যাডফায়েল-এ (১১৩৭–১১৪৫ সময়ের প্রেক্ষাপটে) স্টিফেন, মাটিল্ডা ও তাদের সমর্থকদের দেখা যায়।[২২৭] পিটার্সের চিত্রায়ণে গৃহযুদ্ধ মূলত শ্রুসবেরি ও তার আশেপাশের একটি আঞ্চলিক আখ্যান হিসেবে এসেছে।[২২৭] তিনি স্টিফেনকে একজন সহনশীল মানুষ এবং যুক্তিবাদী শাসক হিসেবে এঁকেছেন।[২২৮] এর বিপরীতে, কেন ফোলেট-এর ঐতিহাসিক উপন্যাস দ্য পিলারস অফ দ্য আর্থ এবং এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি টিভি মিনি-সিরিজে স্টিফেনকে একজন অযোগ্য শাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফোলেট তার বই শুরু করেন 'হোয়াইট শিপ'ডুবির ঘটনা দিয়ে, তবে পরবর্তীতে তিনি আধুনিক ব্যক্তিত্ব ও সমস্যাগুলোকে ফুটিয়ে তুলতে এই যুদ্ধকে একটি পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।[২২৯]

  1. হোয়াইট শিপ ডুবির কারণ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। কিছু তত্ত্ব অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইকে দায়ী করে, আবার অন্যগুলো জাহাজের চালক এবং ক্রুদের অতিরিক্ত মদ্যপানকে দায়ী করে।[]
  2. আধুনিক ইতিহাসবিদরা, যেমন এডমন্ড কিং, হিউ বিগডের এই বর্ণনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।[৩৩]
  3. স্টিফেনের ক্ষমতা দখলকে ক্যু বা অভ্যুত্থান বলা যায় কি না তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ফ্রাঙ্ক বার্লো এটিকে সরাসরি একটি ক্যু ডি'ট্যাট (coup d'état) হিসেবে বর্ণনা করেছেন; তবে কিং এই বর্ণনার যথার্থতা নিয়ে অতটা নিশ্চিত নন।[৩৫]
  4. অন্যান্য স্থানের তুলনায় নরমান্ডির ঘটনাগুলো ততটা বিস্তারিত নথিবদ্ধ নয় এবং ঘটনার সঠিক ক্রম কিছুটা অনিশ্চিত। ইতিহাসবিদ রবার্ট হেলমেরিচস এই বর্ণনাগুলোর কিছু অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। ডেভিড ক্রাউচ এবং হেলমেরিচসসহ কিছু ইতিহাসবিদের মতে, হেনরি মারা গেলে সিংহাসন দখল করার জন্য থিবল্ড এবং স্টিফেন সম্ভবত আগেই একটি ব্যক্তিগত চুক্তি করেছিলেন।[৪০]
  5. আনজুর জেফ্রি এই চুক্তিতে অন্তত আংশিকভাবে রাজি হয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে গঠিত অ্যাংলো-নরমান-ফরাসি আঞ্চলিক জোটের চাপের কারণে।[৬১] মধ্যযুগীয় আর্থিক অংককে আধুনিক মুদ্রায় রূপান্তর করা অত্যন্ত কঠিন; তুলনামূলকভাবে বলা যায়, ২,০০০ মার্ক ছিল প্রায় ১,৩৩৩ পাউন্ডের সমান—সেই সময়ে একটি বড় দুর্গ পুনর্নির্মাণের খরচ ছিল প্রায় ১,১১৫ পাউন্ড।[৬২]
  6. প্রথম ডেভিড তার মা রানি মার্গারেট-এর মাধ্যমে এমপ্রেস মাটিল্ডা এবং মাটিল্ডা অফ বুলোন—উভয়ের সাথেই আত্মীয়তার সূত্রে যুক্ত ছিলেন।
  7. আর. ডেভিস এবং ডব্লিউ. এল. ওয়ারেন যুক্তি দেন যে সাধারণ আর্লডমগুলোতে উল্লেখযোগ্য রাজকীয় ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল; কেইথ স্ট্রিংগার এবং জুডিথ গ্রিন বর্তমানে একমত যে ক্ষমতার পরিমাণ নির্ভর করত হুমকির মাত্রার ওপর এবং সম্ভবত আগের ধারণার চেয়ে কম ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল।[৭৭]
  8. পরবর্তী রাজকীয় প্রশাসন এবং ইংরেজ গির্জার আনুগত্যের ওপর এই গ্রেফতারের প্রভাব নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কেঞ্জি ইয়োশিতাকে আধুনিক একাডেমিক ঐকমত্য তুলে ধরে বলেন যে এই গ্রেফতারের প্রভাব "ততটা গুরুতর ছিল না" এবং রাজকীয় সরকারের পতনের শুরু মূলত পরবর্তী লিঙ্কনের যুদ্ধের সময় থেকে।[৮৩]
  9. কেইথ স্ট্রিংগার যুক্তি দেন যে দুর্গগুলো দখল করা স্টিফেনের জন্য "অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত" ছিল এবং এটি ছিল রাজকীয় কর্তৃত্বের একটি "পরিকল্পিত প্রদর্শন"; জিম ব্র্যাডবারি এবং ফ্রাঙ্ক বার্লো এই কৌশলের সামরিক বিচক্ষণতার প্রশংসা করেন। তবে ডেভিড কার্পেন্টার এবং আর. ডেভিস লক্ষ্য করেছেন যে স্টিফেন শেষ পর্যন্ত গির্জাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিলেন, তাকে গির্জার আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছিল এবং হেনরি অফ ব্লয়-এর সাথে তার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার ভয়াবহ প্রভাব ১১৪১ সালে দেখা যায়।[৮৫]
  10. এডমন্ড কিং এই আমন্ত্রণের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন; তার মতে এমপ্রেস আকস্মিকভাবে উপস্থিত হয়েছিলেন।[১১৬]
  11. স্টিফেনের সময়ে অ্যাংলো-নরমান যুদ্ধে "শিভালরি" বা বীরধর্ম একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি ছিল; উচ্চপদস্থ বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া তখন স্বাভাবিক ছিল না। ইতিহাসবিদ জন গিলিংহ্যামের মতে, স্টিফেন বা এমপ্রেস কেউই তেমনটা করেননি।[১২১]
  12. ডেভিড ক্রাউচের মতে, স্টিফেনের বাহিনীর পরাজয়ের কারণ ছিল পদাতিকদের দুর্বলতা; শহরের মিলিশিয়া বাহিনী রবার্টের ওয়েলশ পদাতিকদের তুলনায় দক্ষ ছিল না।[১৩৬]
  13. লিঙ্কনের যুদ্ধে স্টিফেনের সমর্থকরা স্রেফ পালিয়ে গিয়েছিল নাকি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে।[১৪০]
  14. সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে স্টিফেন তার মৃত্যুর আগেই দুর্গ ধ্বংসের কর্মসূচি শুরু করেছিলেন এবং হেনরির অবদান যতটা ভাবা হয় ততটা বিশাল নয়।[২১২]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Bradbury, p. 215.
  2. Barlow, p.111; Koziol, p.17; Thompson, p.3.
  3. Carpenter, p.137.
  4. Huscroft, p.69.
  5. Carpenter, pp.142–143.
  6. Bradbury, pp.1–3.
  7. Bradbury, p.2.
  8. 1 2 3 4 Barlow, p.162.
  9. Huscroft, pp.65, 69–71; Carpenter, p.125.
  10. Bradbury, p.3; Chibnall, p.64.
  11. Bradbury, pp.6–7.
  12. Barlow, p.160; Chibnall, p.33.
  13. 1 2 Barlow, p.161.
  14. Carpenter, p.160.
  15. Carpenter, p.161; Stringer, p.8.
  16. Bradbury, p.9; Barlow, p.161.
  17. King (2010), pp.30–31; Barlow, p.161.
  18. King (2010), pp.38–39.
  19. King (2010), p.38; Crouch (2008a), p.162.
  20. King (2010), p.13.
  21. Davis, p.8.
  22. King (2010), p.29.
  23. Stringer, p.66.
  24. Crouch (2002), p.246.
  25. Chibnall, pp.66–67.
  26. 1 2 Barlow, pp.163–164.
  27. Barlow, p.163; King (2010), p.43.
  28. King (2010), p.43.
  29. King (2010), p.45.
  30. King (2010), pp.45–46.
  31. King (2010), p.46.
  32. 1 2 3 Crouch (2002), p.247.
  33. 1 2 3 King (2010), p.52.
  34. King (2010), p.47.
  35. Barlow, p.165; King (2010), p.46.
  36. King (2010), pp.46–47.
  37. King (2010), p.47; Barlow, p.163.
  38. Barlow, p.163.
  39. Barlow, p.163; Carpenter, p.168.
  40. Helmerichs, pp.136–137; Crouch (2002), p.245.
  41. 1 2 Carpenter, p.165.
  42. 1 2 King (2010), p.53.
  43. King (2010), p.57.
  44. King (2010), pp.57–60; Davis, p.22.
  45. Carpenter, p.167.
  46. White (2000), p.78.
  47. Crouch (2002), p.250.
  48. Crouch (2008a), p.29; King (2010), pp.54–55.
  49. Crouch (2008b), pp.46–47.
  50. Crouch (2002), pp.248–249.
  51. Carpenter, pp.164–165; Crouch (1998), p.258.
  52. Crouch (1998), pp.260, 262.
  53. Bradbury, pp.27–32.
  54. 1 2 Barlow, p.168.
  55. Crouch (2008b), pp.46–47; Crouch (2002), p.252.
  56. Crouch (2008b), p.47.
  57. Barlow, p.168;
  58. Davis, p.27.
  59. Davis, p.27; Bennett, p.102.
  60. Davis, p.28.
  61. Crouch (2008b), p.50; Barlow, p.168.
  62. Pettifer, p.257.
  63. Barlow, pp.165, 167; Stringer, pp.17–18.
  64. Barlow, p.168; Crouch (1998), p.264; Carpenter, p.168.
  65. 1 2 Carpenter, p.169.
  66. 1 2 3 4 5 Barlow, p.169.
  67. Stringer, p.18.
  68. Chibnall, pp.70–71; Bradbury, p.25.
  69. 1 2 3 4 Carpenter, p.166.
  70. Bradbury, p.67.
  71. 1 2 3 Crouch (2002), p.256.
  72. 1 2 3 4 Davis, p.50.
  73. Chibnall, p.74.
  74. Chibnall, pp.75–76.
  75. Bradbury, p.52.
  76. Bradbury, p.70.
  77. White (2000), pp.76–77.
  78. Barlow, pp.171–172; Crouch (2008a), p.29.
  79. Barlow, p.172.
  80. Davis, p.31.
  81. 1 2 3 Davis, p.32.
  82. Yoshitake, p.98.
  83. Yoshitake, pp.97–98; 108–109.
  84. Davis, p.34; Barlow, p.173.
  85. Stringer, p.20; Bradbury, p.61; Davis, p.35; Barlow, p.173; Carpenter, p.170.
  86. 1 2 3 Bradbury, p.71.
  87. Morillo, pp.16–17.
  88. Stringer, pp.24–25.
  89. Morillo, pp.51–52.
  90. 1 2 3 Bradbury, p.74.
  91. Morillo, p.52.
  92. Prior ref.
  93. Bradbury, p.73.
  94. Walker, p.15.
  95. Creighton, p.59.
  96. Coulson, p.69.
  97. Coulson, p.69; Bradbury, p.191.
  98. Bradbury, p.28.
  99. Creighton and Wright, p.53.
  100. 1 2 Creighton, p.56.
  101. Creighton, p.57.
  102. Creighton and Wright, pp.56–57, 59.
  103. King (2010), p.301.
  104. Stringer, pp.15–16; Davis, p.127.
  105. Barlow, p.167.
  106. Carpenter, p.172.
  107. Chibnall, pp.26, 33.
  108. Chibnall, p.97.
  109. Chibnall, pp.62–63.
  110. Chibnall, p.63.
  111. Chibnall, pp.58–59.
  112. King (2010), pp.61–62.
  113. Davis, p.40; Chibnall, p.82.
  114. Chibnall, pp.85–87; Bradbury, p.50.
  115. 1 2 Davis, p.39.
  116. King (2010), p.116.
  117. Davis, p.40.
  118. 1 2 3 Bradbury, p.78.
  119. Bradbury, p.79.
  120. Gillingham (1994), p.31.
  121. Gillingham (1994), pp.49–50.
  122. Bradbury, p.81.
  123. Chibnall, p.83-84
  124. Bradbury, p.82; Davis, p.47.
  125. Bradbury, p.83.
  126. Bradbury, pp.82–83.
  127. 1 2 3 Davis, p.43.
  128. 1 2 Bradbury, p.88.
  129. Bradbury, p.90.
  130. Chibnall, p.92.
  131. Bradbury, p.91.
  132. Davis, pp.50–51.
  133. 1 2 3 Davis, p.51.
  134. 1 2 Davis, p.52.
  135. 1 2 Bradbury, p.105.
  136. Crouch (2002), p.260.
  137. Bradbury, p.104.
  138. 1 2 Bradbury, p.108.
  139. 1 2 Bradbury, pp.108–109.
  140. Bennett, p.105.
  141. 1 2 King (2010), p.154.
  142. King (2010), p.155.
  143. King (2010), p.156.
  144. King (2010), p.175; Davis, p.57.
  145. 1 2 King (2010), p.158; Carpenter, p.171.
  146. Chibnall, pp.98–99.
  147. Chibnall, p.98.
  148. Chibnall, p.102.
  149. King (2010), p.163; Chibnall, p.104-105.
  150. Carpenter, p.173; Davis, p.68; Crouch (2008b), p.47.
  151. Davis, p.67.
  152. Blackburn, p.199.
  153. 1 2 Crouch (2002), p.261.
  154. Barlow, p.176.
  155. Bradbury, p.121.
  156. Barlow, p.176; Chibnall, p.113.
  157. Barlow, p.177; Chibnall, p.114.
  158. Barlow, p.177.
  159. Barlow, p.177; Chibnall, p.115.
  160. Bradbury, pp.134, 136.
  161. Barlow, p.178.
  162. 1 2 Bradbury, p.136.
  163. Bradbury, p.137.
  164. Chibnall, p.117.
  165. Davis, p.78.
  166. Bradbury, p.139.
  167. Bradbury, p.140.
  168. Bradbury, pp.140–141.
  169. Bradbury, p.141.
  170. Bradbury, p.143.
  171. 1 2 Barlow, p.179.
  172. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; BradburyP146 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  173. Davis, p.97.
  174. Barlow, p.180; Chibnall, pp.148–149.
  175. Davis, pp.111–112.
  176. King (2010), p.243; Barlow, p.180.
  177. Davis, p.113.
  178. উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ বৈধ নয়; DavidKingP255 নামের সূত্রটির জন্য কোন লেখা প্রদান করা হয়নি
  179. Carpenter, p.188.
  180. King (2010), p.237.
  181. Davis,. p.105; Stringer, p.68.
  182. King (2010), p.264.
  183. Bradbury, pp.178–179.
  184. 1 2 3 Bradbury, p.180.
  185. Bradbury, p.181.
  186. King (2007), pp.25–26.
  187. King (2007), p.26.
  188. Bradbury, p.182.
  189. 1 2 Bradbury, p.183.
  190. 1 2 Bradbury, p.183; King (2010), p.277; Crouch (2002), p.276.
  191. King (2010), pp.278–279; Crouch (2002), p.276.
  192. King (2010), p.278.
  193. Bradbury, p.184.
  194. King (2010), pp.279–280; Bradbury, p.187.
  195. King (2010), p.280.
  196. King (2010), pp.280–283; Bradbury pp.189–190; Barlow, pp.187–188.
  197. King (2010), p.281.
  198. 1 2 Bradbury, p.211; Holt, p.306.
  199. 1 2 Crouch (2002), p.277.
  200. Amt, p.19.
  201. 1 2 King (2010), p.300.
  202. 1 2 White (2000), p.5.
  203. White (2000), p.2.
  204. White (2000), pp.2–3.
  205. King (2007), pp.42–43.
  206. White (2000), p.8.
  207. Huscroft, p.76.
  208. 1 2 3 Barlow, p.181.
  209. Carpenter, p.197.
  210. White (1998), p.43; Blackburn, p.199.
  211. Green, pp.110–111, cited White (2008), p.132.
  212. 1 2 3 Amt, p.44.
  213. Barratt, p.249.
  214. Warren (2000), p.161.
  215. White (2000), p.7; Carpenter, p.211.
  216. White (2000), p.7; Huscroft, p.140; Carpenter, p.214.
  217. King (2006), p.195.
  218. 1 2 Davis, p.146.
  219. Davis, pp.147, 150.
  220. Davis, p.151; Bradbury, p.215.
  221. Davis, pp.146–152.
  222. Dyer, p.4; Coss, p.81.
  223. David Crouch, Reviews in History, accessed 12 May 2011; Kadish, p.40; Round (1888).
  224. White (2000), pp.14–15; Hollister, pp.51–54.
  225. White (2000), pp.75–76.
  226. White (2000), p.12; Carpenter, p.176; King (1994), p.1.
  227. 1 2 Rielly, p.62.
  228. Rielly, p.68.
  229. Turner, p.122; Ramet, p.108; Mike Hale, The New York Times, 22 July 2010.

উৎসনির্দেশ

[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন

[সম্পাদনা]