বিষয়বস্তুতে চলুন

দলায়িলুন নুবুয়্যাহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দালায়িলুন নুবুয়্যাহ ও মা’রিফাতু আহওয়াল সাহিবিশ শরীআহ
বইয়ের প্রচ্ছদ
লেখকআল-বায়হাকী
মূল শিরোনামدلائل النبوة ومعرفة أحوال صاحب الشريعة (আরবি ভাষা)
কাজের শিরোনামনবুওয়তের প্রমাণ এবং শরীয়তের মালিকের শর্তাবলী সম্পর্কে জ্ঞান
ভাষাআরবি
বিষয়মুহাম্মাদের জীবনী
ধরননন-ফিকশন
পটভূমিমুহাম্মাদের নবুয়াদের উপর বই
প্রকাশনার তারিখ
১০ম শতক
মিডিয়া ধরনমুদ্রিত গ্রন্থ (শক্তমলাট)

দালায়িলুন নুবুয়্যাহ ও মা’রিফাতু আহওয়াল সাহিবিশ শরীআহ (আরবি: دلائل النبوة ومعرفة أحوال صاحب الشريعة, আক্ষ.'নবুওয়তের প্রমাণ এবং শরীয়তের মালিকের শর্তাবলী সম্পর্কে জ্ঞান') যা সংক্ষেপে দালায়িলুন নুবুয়্যাহ লিল বায়হাকী নামে অধিক পরিচিত, এটি আবু বকর আহমদ ইবনুল হুসাইন আল-বায়হাকির একটি গ্রন্থ। এটি সীরাত বিষয়ক সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থসমূহের অন্যতম। এ গ্রন্থে তিনি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থকারদের বর্ণনার উৎসসহ সনদ সহকারে হাদীসসমূহ উপস্থাপন করেছেন এবং কখনও কখনও বর্ণনাগুলোর বিশ্লেষণ করে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। বইটি সনদবদ্ধ হাদিসগ্রন্থ এবং সীরাত গ্রন্থ এই দুটির মিলিত রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি এতে হাদীসসমূহ সনদসহ বর্ণনা করেন এবং সেগুলোর সহীহ ও দুর্বলতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।[][][][][]

গ্রন্থ পরিচিতি

[সম্পাদনা]

গ্রন্থকার

[সম্পাদনা]

এই গ্নন্থটির লেখকের পুরো নাম আহমদ ইবনুল হুসাইন ইবনে আলী ইবনে মূসা আল-খুসরাওজিরদী আল-খুরাসানী, যিনি আবু বকর আল-বায়হাকি নামে পরিচিত। তিনি হাদীস বিজ্ঞানের একজন বিশিষ্ট ইমাম ছিলেন। তিনি ৩৮৪ হিজরীতে (৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) নিশাপুরের নিকটস্থ বিহক অঞ্চলের খুসরাওজির্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিহকে বেড়ে ওঠেন, পরে বাগদাদ, কুফা, মক্কা ও অন্যান্য শহরে সফর করেন। পরবর্তীতে নিশাপুরে ফিরে যান এবং ৪৫৮ হিজরী (১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন ও মৃত্যুবরণ করেন।[]

গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য

[সম্পাদনা]

দালায়িলুন নুবুয়্যাহ গ্রন্থটি বেশ কিছু বৈশিষ্ট্যে অনন্য, যেমন: এটি সনদবদ্ধ হাদীসগ্রন্থ এবং সীরাত গ্রন্থ এই দুটি ঘরানার মাঝে এক মিলিত রূপে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি এতে হাদীসসমূহ সনদসহ বর্ণনা করেন এবং সেগুলোর সহীহ ও দুর্বলতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। বায়হাকি নিজেই বলেন,

«আমি এই গ্রন্থে যেসব হাদিস বর্ণনা করেছি, তার প্রতিটির সঙ্গে তার সহীহ বা দুর্বলতা সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছি; যা মাবহাম (অস্পষ্ট) রেখেছি, তা এমন পর্যায়ের যা এই ধরনের গ্রন্থে গ্রহণযোগ্য। আর যেটির দুর্বলতা স্পষ্ট, তার প্রতি ইঙ্গিত করে অন্যটি গ্রহণযোগ্যরূপে উপস্থাপন করেছি»

বায়হাকী

গ্রন্থটি সীরাতের বিষয়সমূহ অনুযায়ী জন্ম থেকে ওফাত পর্যন্ত অধ্যায়ে অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে । এটি মূলত মুহাম্মদের নবুওয়াতের প্রমাণাদি উপস্থাপন সম্পর্কিত একটি বিশেষ গ্রন্থ। বইটির তৃতীয় খণ্ডে তিনি বলেন: এই গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য হলো, নবুওয়াতের প্রমাণসমূহ উপস্থাপন করা এবং তাঁর রিসালাতের সত্যতা ঘোষণা করা।

রচনাশৈলী

[সম্পাদনা]

বায়হাকি যখন সহীহ বা দুর্বল হাদীস বর্ণনা করেন, তখন তার অবস্থান স্পষ্ট করে দেন। দুর্বল হাদীস যদি খুবই দুর্বল না হয়, তবে তা মাবহাম রেখেও বর্ণনা করেন, বিশেষ করে ফজীলতের মতো ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা গ্রহণযোগ্য। তিনি নিজের সনদে হাদীস বর্ণনা করেন, এটি তার রচনাসমূহে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তিনি কখনো কখনো হাদীসের ব্যাখ্যা করেন, যদি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। তিনি হাদীসের একাধিক সূত্র ও শাওয়াহিদ (অনুরূপ বর্ণনা) উল্লেখ করেন এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিভ্রান্তি বা জটিলতা ব্যাখ্যা করেন। তবে পুরো গ্রন্থজুড়ে এ পদ্ধতি অনুসরণ করেন নাই।

তিনি তার শায়খ আবু আবদুল্লাহ আল-হাকিম (সাহিবুল মুসতাদরাক) থেকে ব্যাপক পরিমাণে বর্ণনা করেছেন। তিনিও ইবনে ইসহাকের সীরাত এবং মূসা ইবন উক্বার মাগাজি থেকে ব্যাপকভাবে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। শায়খদের থেকে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাধারণত “আমাদের বলুন” শব্দটি ব্যবহার করেন এবং কখনো “তিনি আমাদের জানান” শব্দটিও ব্যবহার করেন। হাদীস বর্ণনার পর, হাদিসটির সূত্র উল্লেখ করেন, তবে কেবল সহীহ বুখারীসহীহ মুসলিম এই দুই গ্রন্থের ক্ষেত্রে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। অন্য গ্রন্থের ক্ষেত্রে সূত্র উল্লেখ করেন না।

গ্রন্থের স্বীকৃতি

[সম্পাদনা]

বইটি সম্পর্কে বহু আলেম-উলামা প্রশংসা করেছেন। বইটি সীরাত ও হাদিস গ্রন্থের মিশ্রণে তৈরি হওয়ায় বইটি অন্যন্য উচ্চতায় পৌছে গিয়েছে। বইটি সম্পর্কে কয়েকজন আলেমের প্রতিক্রিয়া:

  • তাজউদ্দীন আস-সুবকী বলেন, “ইমাম বায়হাকির দালায়িলুন নুবুয়্যাহ, শু'আবুল ঈমান এবং মানাকিবুশ শাফি'ই—এই তিনটি গ্রন্থের একটি তুলনীয় কোনো গ্রন্থ নেই।”[]
  • ইবন কাসীর বলেন, “তিনি সুচারু ও উপকারী ফিকহ ও হাদীসগ্রন্থসমূহ রচনা করেছেন… তার দালায়িলুন নুবুয়্যাহ গ্রন্থটি উপকারী ও মর্যাদাপূর্ণ গ্রন্থসমূহের অন্তর্ভুক্ত।”[] তিনি অন্য স্থানে আরও বলেন, “তিনি এমন বহু উপকারী বিষয় একত্র করেছেন, যার পূর্বে কোনো দৃষ্টান্ত নেই এবং যা ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন; যেমনঃ আস-সুনানুল কবীর, দালায়িলুন নুবুয়্যাহ, আল-বাি'থ ওয়ান-নুশূর এবং ছোট-বড় আরও বহু উপকারী গ্রন্থ যেগুলোর সমকক্ষ নেই।”[]

গ্রন্থের পান্ডুলিপি

[সম্পাদনা]

বইটি জনপ্রিয়তা লাভের পরে বহু গবেষক ও লেখক বইটির মূল পাণ্ডুলিপি খুজেছেন এবং এই মূল সংস্করণ নিয়ে কাজ করেছেন। যেসব পান্ডুলিপির ওপর নির্ভর করে গবেষক তাঁর কাজ সম্পন্ন করেছেন, সেগুলো হলো:[১১]

  • হালবের উসমানীয় লাইব্রেরি ও আহমাদিয়া লাইব্রেরির পান্ডুলিপি। ৬৬৬ হিজরীর একটি পান্ডুলিপি, যাতে গ্রন্থের বর্ণনার সনদ রয়েছে, বিশেষত ইমাম আবু হাফস আল-মুনযিরী (মৃ. ৬৫৬ হি.)-এর বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত।
  • কূপ্রিল্লি সংগ্রহের পান্ডুলিপি (নং ৪৭১)।
  • হায়থামীর একটি পান্ডুলিপি, যা দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহতে ৭০১ নম্বরে রয়েছে।
  • দারুল কুতুবের হাদীস বিভাগে ২১৫ নম্বর পান্ডুলিপি।
  • মদিনা মুনাওয়ারা পাবলিক লাইব্রেরির আল-মাহমুদিয়া সংগ্রহে (৯) নম্বর সীরাতুন্নবী বিষয়ক পান্ডুলিপি।
  • দারুল কুতুবের ২১৩ নম্বর হাদীস সংরক্ষিত পান্ডুলিপি, ১০১২ নম্বর হাদীস বিষয়ক একটি পান্ডুলিপি।

গ্রন্থের সমালোচনা

[সম্পাদনা]

ইমাম বায়হাকির উপর যে সমালোচনা করা হয়েছে, তার একটি দিক হলো: তিনি তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি সবসময় পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করেননি। যেমন, গ্রন্থে কিছু হাদীস রয়েছে যেগুলো স্পষ্টভাবে দুর্বল, কিন্তু তিনি তা স্পষ্ট করেননি। এমনকি কিছু হাদীস রয়েছে যেগুলো জাল, তবুও তিনি তার জাল হওয়া উল্লেখ করেননি। এই বিষয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ তার যাদুল মা’আদ গ্রন্থে ইমাম বায়হাকির সমালোচনা করেছেন। তিনি "নাজরানের ঘটনা" সংক্রান্ত একটি হাদীস প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন:[১২] «এই বর্ণনায় বায়হাকির পক্ষ থেকে একটি ভুল এসেছে। তিনি বলেন, এ ঘটনা আন নামল সূরা অবতীর্ণ হওয়ার আগে ঘটেছে। তবে এটি ভুলের উপর আরেক ভুল কারণ, এই সূরাটি মক্কী সূরা, এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। আর নাজরানবাসীদের নিকট চিঠি লেখা হয়েছিল তাবুক অভিযান থেকে ফিরে আসার পরের ঘটনা।

আরো দেখুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. YAVUZ, YUSUF ŞEVKİ (১৯৮৮–২০১৬)। "DELÂİLÜ'n-NÜBÜVVE"টিডিবি ইসলাম আনসিক্লোপেদিসি (তুর্কি ভাষায়)। ইস্তাম্বুল: তুর্কিয়ে দিয়ানেত ফাউন্ডেশন, সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ।
  2. ALTUNOVA, Mehmet Fatih (২০০৫)। Al-Bayhaqi and the Place of His Work Dala’il al-Nubuwwa in the Science of Hadith (পিডিএফ) (অভিসন্দর্ভ) (তুর্কি ভাষায়)। Turkey: Harran University। পৃ. ১।
  3. Mukoyah; Raharusun, Agus Suyadi; Nur, Saifudin; Ahmed, Ismail Ibrahim el-Sayed (২০২৪)। "A Critical Analysis of al-Bayhaqi Hadith on Tolerance in the Preservation of Houses of Worship in Dalāil al-Nubuwwah"Diroyah : Jurnal Study Ilmu Hadis (1): ১৩৪–১৪৯। ডিওআই:10.15575/diroyah.v9i1.39232আইএসএসএন 2540-9069
  4. Kırış, Şemsettin (২০১৫)। "The Sources of al-Bayhaqi's Work Dala'il al-Nubuwwa"Usul İslam Araştırmaları (তুর্কি ভাষায়)। ২৩ (23): ৯৫–১২৬। ডিওআই:10.56361/usul.173690আইএসএসএন 1305-2632
  5. Iryana, H. Wahyu (২০২৫)। "The Book Dalā'il al-Nubuwwa and the Roots of Islamic Knowledge Traditions in the Pesantren of the Nusantara"NU online (ইন্দোনেশীয় ভাষায়)। Nahdlatul Ulama
  6. "أبو بكر البيهقي • الموقع الرسمي للمكتبة الشاملة"shamela.ws। ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০
  7. তাজউদ্দীন আস-সুবকী। তাবাকাতুশ শাফিয়্যাহ আল-কুবরা। হাজর লিল্‌ত্বাবা'আ। পৃ. ৪/৯।
  8. ইবন কাসীর (২০০৪)। তাবাকাতুশ শাফিয়্যীন (আরবি ভাষায়)। দারুল ওফা, মানসুরা। পৃ. ১/৪৩০।
  9. ইবন কাসীর। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া (আরবি ভাষায়)। দার ইহইয়াউত্তুরাস আল-আরাবী, ১৯৮৮। পৃ. ১২/১১৫–১১৬।
  10. মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল-কত্তানী। আর-রিসালাতুল মুস্তাত্রিফা। দারুল বাশায়ের আল-ইসলামিয়্যাহ, ২০০০। পৃ. ১/১০৫।
  11. আবু বকর আল-বায়হাকি। তাহকীক: আবদুল মু'তী ক্বালাআজী (সম্পাদক)। دلائل النبوة للبيهقي (আরবি ভাষায়)। دار الكتب العلمية - دار الريان للتراث (১৯৮৮)।
  12. আবু বকর আল-বায়হাকি। তাহকীক: আবদুল মু'তী ক্বালাআজী (সম্পাদক)। دلائل النبوة ومعرفة أحوال صاحب الشريعة (আরবি ভাষায়)। دار الكتب العلمية بيروت। পৃ. ৫/৩৮৫।

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]