বিষয়বস্তুতে চলুন

দয়াবীরসিংহ কংসকার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
দয়াবীর সিংহ কংসকার
পরোপকার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠিত ১৯৫২
প্রসূতি গৃহ মাতৃসদন, প্রতিষ্ঠিত ১৯৫৯

দয়াবীরসিংহ কংসকার (নেপালি: दयावीरसिंह कंसकार; ১৯১১ – ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০১, কাঠমান্ডু, নেপাল) ছিলেন একজন নেপালি সমাজকর্মী এবং নেপালের প্রথম রক্তদাতা। তিনি দেশের প্রাচীনতম সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরোপকার সংগঠনের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও পরিচিত।[][]

প্রারম্ভিক জীবন

[সম্পাদনা]

কংসকার জন্মগ্রহণ করেন কাঠমান্ডুতে। তার পিতা ভবানীবীরওসিংহ কংসকার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মাতার নাম ছিল লক্ষ্মী দেবী। তিনি কাঠমান্ডুর দরবার উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি গৃহে স্বশিক্ষার মাধ্যমে পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। ১৯২৭ সালে তিনি ন্যোখা এলাকার চন্দ্রলক্ষ্মী তুলাধারকে বিবাহ করেন।[][]

সামাজিক কর্মকাণ্ড

[সম্পাদনা]

১৯৪৪ সালে কংসকার কাঠমান্ডুর বীর হাসপাতালে সংকটাপন্ন এক রোগীর জন্য রক্তদান করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি নেপালের প্রথম রক্তদাতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।[] ১৯৪৫-১৯৪৬ সালে কাঠমান্ডুতে কলেরা ও ডায়রিয়া রোগের একটি গুরুতর মহামারি দেখা দেয়, যার ফলে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তখন বীর হাসপাতাল ব্যতীত কার্যকর কোনো আধুনিক স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান ছিল না এবং নেপালে রক্তদানের কোনো প্রচলনও গড়ে ওঠেনি। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কংসকার ব্যক্তিগতভাবে অসুস্থ ও সংকটাপন্ন রোগীদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং নিজের রক্ত দান করেন। এর মাধ্যমেই নেপালে সংগঠিত রক্তদানের সূচনা ঘটে।[] পরবর্তীতে তিনি নিয়মিতভাবে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকেন এবং দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করেন। ১৯৪৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তার নেতৃত্বে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে পরোপকার সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়।[]

১৯৫১ সালের বিপ্লব ও নেপালে গণতন্ত্রের সূচনার পর পরোপকার সংগঠনের কার্যক্রমের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। ১৯৫২ সালের ২৩ জুন পরোপকার অনাথালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং একই বছর পরোপকার অনাথালয় মধ্য বিদ্যালয় চালু করা হয়।[][] সমাজের অনাথ, অসহায় ও অতিদরিদ্র শিশুদের আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে কংসকার ১৯৫২ সালে একটি অনাথালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে পরোপকার অনাথালয় নামে পরিচিতি লাভ করে। নেপালে প্রসূতি সেবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে কংসকার ১৯৫৯ সালে পরোপকার ইন্দ্র রাজ্য লক্ষ্মী দেবী প্রসূতি গৃহ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে "প্রসূতি গৃহ" নামে পরিচিত হয় এবং ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।[১০]

কংসকার স্বদেশি বস্ত্র ব্যবহারের একজন প্রবক্তা ছিলেন এবং ঐতিহ্যবাহী নেপালি কাপড় উৎপাদনের লক্ষ্যে তিনি করুণা কাপড় কারখানা স্থাপন করেন। তিনি একজন লেখকও ছিলেন এবং নেপাল ভাষায় বহু সাহিত্য রচনা করেন।[১১]

সম্মাননা

[সম্পাদনা]

আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস উপলক্ষে ও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক বর্ষ ২০০১-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে কংসকারকে একজন আদর্শ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।[১২] ২০০২ সালে নেপাল সরকারের ডাক বিভাগ তার প্রতিকৃতিসংবলিত একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।[১৩]

তিনি নেপালের গোর্খা দক্ষিণ বাহু (দ্বিতীয় শ্রেণি; পূর্বে চতুর্থ শ্রেণি) ও ত্রি শক্তি পট্ট উপাধিতে ভূষিত হন।[১৪] ১৯৬৩ সালে তাকে প্রিভি কাউন্সিল (রাজসভা)'র সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়।[১৫]

নেপালের রাষ্ট্রপতি রামবরণ য়াদব তার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রদত্ত এক বার্তায় কংসকারের মানবকল্যাণমূলক অবদানকে চিরস্মরণীয় বলে উল্লেখ করেন।[১৬]

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

দয়াবীর সিং কংসকার ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাঠমান্ডুতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. Shakya, Utsav (অক্টোবর ২০১১)। "The legacy of Daya Bir Singh Kansakar"ECS Nepal। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১২
  2. Limbu, Ramyata (৬–১২ জুলাই ২০০১)। "It is better to give" (পিডিএফ)Nepali Times। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মার্চ ২০১২ পৃষ্ঠা ৪।
  3. "Biography of Mr. Dayabir Singh Kansakar"। Paropakar Sanstha (Organisation)। ২০১১। ১৯ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১২
  4. Shrestha, Vinod K. and Aditya, Anand (2002). Volunteerism in Nepal. National Planning Commission, National Volunteers Service. আইএসবিএন ৯৯৯৩৩৭০১৩৪। পৃষ্ঠা ১৪১।
  5. Institute for Integrated Development Studies (2003). Nepal Yearbook. Kathmandu: IIDS. পৃষ্ঠা ৯৬–৯৭।
  6. धमला, जीवनाथ (२१ असार २०७६)। "समाजसेवी साधकहरू"नागरीक। সংগ্রহের তারিখ २१ जेष्ठ २०७९ {{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: |সংগ্রহের-তারিখ= এবং |তারিখ= এর মান পরীক্ষা করুন (সাহায্য)
  7. Uprety, Prem (২০০০)। "The Spirit of 1950: A Social Analysis"Voice of History১৫ (1)। Nepal Journals Online: ২১। সংগ্রহের তারিখ ১৭ আগস্ট ২০১৩
  8. Yadama, Gautam N.; Messerschmidt, Don (২০০২)। "Rise and Fall of National Service in Nepal"। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১২ পৃষ্ঠা ৩।
  9. Limbu, Ramyata (১৬–২২ ফেব্রুয়ারি ২০০১)। "Bahadur Nepali"Nepali Times। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১২
  10. "Prasuti Griha"Nepali Times। ২–৮ মার্চ ২০০১। ১৮ এপ্রিল ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  11. Shakya, Utsav (অক্টোবর ২০১১)। "The legacy of Daya Bir Singh Kansakar"ECS Nepal। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১২
  12. "IVD/IYV 2001 Celebration Programme" (পিডিএফ)। UN Volunteers। ২০০১। সংগ্রহের তারিখ ২২ মার্চ ২০১২
  13. "NP017.02"। Universal Postal Union। সংগ্রহের তারিখ ১৬ মার্চ ২০১২
  14. "Biography of Mr. Dayabir Singh Kansakar"। Paropakar Sanstha। ১৯ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
  15. Shakya, Utsav (অক্টোবর ২০১১)। "The legacy of Daya Bir Singh Kansakar"। ECS Nepal {{সংবাদ উদ্ধৃতি}}: |সংগ্রহের-তারিখ= এর জন্য |ইউআরএল= প্রয়োজন (সাহায্য)
  16. RSS (৫ মে ২০১১)। "Golden jubilee celebration of philanthropist Kansakar begins"The Himalayan Times[অকার্যকর সংযোগ]