বিষয়বস্তুতে চলুন

তৌফিক আসালিয়া জাবারিন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
তৌফিক আসলিয়া জাবারিন
১৯৭৭ সালে তৌফিক আসলিয়া জাবারিন
জন্ম১৯২৫
মৃত্যু১৯ জুলাই ২০১৫(2015-07-19) (বয়স ৮৯–৯০)
মাতৃশিক্ষায়তনআল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়
পেশাবিচারক, রাজনীতিবিদ
অফিসউম্ম আল-ফাহম স্থানীয় কাউন্সিলের প্রধান

তৌফিক আসলিয়া জাবারিন (১৯২৫ – ১৯ জুলাই ২০১৫) একজন বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি আইনবিদ, কাজি (ইসলামি বিচারক) এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি উম্ম আল-ফাহম স্থানীয় কাউন্সিলের প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কায়রোর মর্যাদাপূর্ণ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী জাবারিন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইসরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর প্রশাসনিক ও বিচারিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষা প্রদান, ১৯৪৮-এর আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে সামরিক পরিষেবা, স্থানীয় শাসন এবং শরিয়া আদালত ব্যবস্থায় দীর্ঘকাল কাজ করার মাধ্যমে তার কর্মজীবন সমৃদ্ধ হয়েছিল। কর্মজীবনের শেষ দিকে তিনি জেরুসালেমের শরিয়া আপিল আদালতের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

[সম্পাদনা]

তৌফিক আসলিয়া জাবারিন ১৯২৫ সালে উম্ম আল-ফাহম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, যা তখন ফিলিস্তিন ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি এক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক পরিবর্তনের সময় বেড়ে ওঠেন। তিনি উম্ম আল-ফাহমের স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তার শিক্ষায় মেধা ও ধর্মীয় প্রবণতা দেখে তার বাবা তাকে একরের ঐতিহাসিক আল-জাজ্জার মসজিদে অবস্থিত আল-আহমাদিয়া স্কুলে পড়াশোনার জন্য পাঠান। তৎকালীন সময়ে উত্তর ফিলিস্তিনে ইসলামি শিক্ষার জন্য আল-আহমাদিয়া স্কুল ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।[১]

একরের স্কুল থেকে স্নাতক হওয়ার পর জাবারিন মিশরে পাড়ি জমান এবং বিশ্বের সুন্নি ইসলামি শিক্ষার প্রধানতম বিদ্যাপীঠ আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি শরিয়া (ইসলামি আইন) অনুষদে বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণ করেন, যেখানে তার মূল মনোযোগ ছিল আইনশাস্ত্র, ফতোয়া এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর। কায়রোতে অবস্থানকালে তিনি আরব বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার সাথে পরিচিত হন, যা তার পরবর্তী কর্মজীবন গঠনে সহায়ক হয়েছিল।[২]

কর্মজীবন ও সামরিক সেবা

[সম্পাদনা]

কায়রোতে পড়াশোনা শেষ করে জাবারিন ফিলিস্তিনে ফিরে আসেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে তিনি জাফার বেসরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষকতা করেন, যা তখন আরব ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক রাজধানী ছিল। তবে ১৯৪৮-এর ফিলিস্তিন যুদ্ধের সূত্রপাত তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে জাফার পতনের পর তিনি তার নিজ শহর উম্ম আল-ফাহমে ফিরে আসেন এবং এর প্রতিরক্ষায় অংশ নেন। এই সময়ে তিনি ইরাকি সেনাবাহিনী দ্বারা গঠিত ফিলিস্তিনি স্বেচ্ছাসেবক রেজিমেন্টের একজন কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হন। এই রেজিমেন্টটি "লিটল ট্রায়াঙ্গল" এলাকা রক্ষার জন্য ওয়াদি আরা অঞ্চলে অবস্থান করছিল।[১][২]

১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর উম্ম আল-ফাহম এবং আশেপাশের গ্রামগুলো ইরাকি নিয়ন্ত্রণ থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অধীনে চলে যায়। জাবারিন তার নিজ শহরেই থেকে যান এবং নতুন প্রশাসনের অধীনে স্থানীয় স্কুল ব্যবস্থায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব

[সম্পাদনা]

১৯৬০ সালে যখন ইসরায়েলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরব শহরগুলোর স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে সাজাতে শুরু করে, তখন উম্ম আল-ফাহমকে স্থানীয় কাউন্সিলের মর্যাদা দেওয়া হয়। তৌফিক আসলিয়া জাবারিনকে উম্ম আল-ফাহম স্থানীয় কাউন্সিলের প্রথম প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তার এই নিযুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কারণ তাকে একটি প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ইসরায়েলের অন্যতম বৃহত্তম আরব শহরে পরিণত হয়। তার মেয়াদকালে তিনি অবকাঠামো উন্নয়নে এবং সামরিক শাসনের যুগে স্থানীয় আরব জনসংখ্যা ও ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে জটিল সম্পর্ক বজায় রাখার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন।[৩]

বিচার বিভাগীয় কর্মজীবন

[সম্পাদনা]

জাবারিন শেষ পর্যন্ত তার মূল পেশা ইসলামি আইনে ফিরে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি জাফার শরিয়া আদালতের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন, যা ছিল বিচার বিভাগে প্রবেশের প্রথম ধাপ। পরবর্তীতে তিনি শরিয়া আদালত ব্যবস্থায় কাজি (বিচারক) পদে উন্নীত হন। ইসরায়েলের এই আদালত ব্যবস্থা মুসলিম সম্প্রদায়ের বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকারের মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলো পরিচালনা করে।

তার বিচার বিভাগীয় কর্মজীবন সাফল্যের শিখরে পৌঁছায় যখন তিনি জেরুসালেমের শরিয়া আপিল আদালতের সভাপতি নিযুক্ত হন। এটি ছিল দেশের শরিয়া আদালত ব্যবস্থার সর্বোচ্চ বিচার বিভাগীয় পদ। তিনি হানাফি ফিকহ বা আইনশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য এবং প্রথাগত আইনি অখণ্ডতা বজায় রেখে আদালতের প্রশাসনিক দিকগুলোকে আধুনিকায়নের প্রচেষ্টার জন্য পরিচিত ছিলেন। ১৯৯৪ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি এই উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন।[৪]

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

[সম্পাদনা]

তৌফিক আসলিয়া জাবারিন ১৯ জুলাই ২০১৫ তারিখে ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। উম্ম আল-ফাহমে তার জানাজায় সারাদেশের হাজার হাজার বাসিন্দা, ধর্মীয় পণ্ডিত এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অংশ নেন, যা সমাজের আধুনিক ইতিহাসে একজন সম্মানিত মুরব্বি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার মর্যাদাকে প্রতিফলিত করে। তাকে ম্যান্ডেট যুগের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষা এবং ১৯৪৮-পরবর্তী সময়ের প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যবর্তী এক সেতুবন্ধন হিসেবে স্মরণ করা হয়।[৫]

বহিঃসংযোগ

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. 1 2 "ডা. মুহাম্মদ আকল শেখ তৌফিক আসলিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে। ওয়াদিনা, ১৯ জুলাই ২০১৫।
  2. 1 2 মাহামিদি, রামজি হুসাইন মুস্তাফা। উম্ম আল-ফাহম: রুটস অ্যান্ড ব্রাঞ্চেস। ২০০৮।
  3. ↑ "উম্ম আল-ফাহম: আল-আজহারের পণ্ডিত এবং স্থানীয় কাউন্সিলের প্রথম প্রধান শেখ তৌফিক আসলিয়া ইন্তেকাল করেছেন" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২১ জুলাই ২০১৫ তারিখে। বলদতনা, ১৯ জুলাই ২০১৫।
  4. ↑ "উম্ম আল-ফাহমের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক শেখ তৌফিক আসলিয়া জাবারিনের মৃত্যু" ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২১ জুলাই ২০১৫ তারিখে। প্যানেট, ১৯ জুলাই ২০১৫।
  5. ↑ "উম্ম আল-ফাহম: আল-আজহার পণ্ডিত এবং স্থানীয় কাউন্সিলের প্রথম প্রধান শেখ তৌফিক আসলিয়া আল্লাহর জিম্মায়"। আল-মাসার, ১৯ জুলাই ২০১৫।