তুসতুর বিজয়
তুসতুর বিজয় বা শুশতার বিজয় ৬৪১ থেকে ৬৪২ সাল পর্যন্ত সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং খিলাফতে রাশিদার আরব মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। তুসতুর খুজেস্তনের একটি প্রাচীন শক্তিশালী দুর্গ ছিল এবং মুসলিম সেনাপতি আবু মুসা আশয়ারীর নেতৃত্বে আরবরা এটি আক্রমণ করেছিল। যদিও শহরটি আরবদের প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিল, পরে সাসানীয়রা ত্যাগের মুখোমুখি হয়, যার ফলে আরবরা শহরটি দখল করে এবং এর সেনাপতি হরমুজানকে বন্দী করে।
পটভূমি
[সম্পাদনা]৬৩৩ সালে খিলাফতে রাশিদার সৈন্যদল বাইজেন্টাইন এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের অঞ্চল আক্রমণ করে। ৬৩৭ সালের মধ্যে, আরবরা সাসানীয় রাজধানী তিসফুন, সমগ্র ইরাক এবং সিরিয়ার বিশাল অংশের মালিকানা লাভ করে। এক বছর পর, তারা সমৃদ্ধ সাসানীয় প্রদেশ খুজেস্তন আক্রমণ করে, যা ইরানী অভিজাত হরমুজানের রাজ্যের অংশ ছিল। হরমুজান তিসফুনের পতনের পর হরমিজদ-আরদাশিরে ফিরে যান, যা তিনি আরবদের বিরুদ্ধে মেশানে অভিযানের সময় তার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।[১] সাসানীয় রাজা তৃতীয় ইয়াযদগারদ (শাসনকাল ৬৩২-৬৫১) এই অভিযানগুলিতে তাকে সমর্থন করেছিলেন এবং বিশ্বাস করেছিলেন যে আরবদের দ্বারা দখল করা অঞ্চলগুলি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।[২]
হরমুজান অবশেষে পরাজিত হন এবং শান্তি চুক্তির অনুরোধ করেন, যা আরবরা করের বিনিময়ে গ্রহণ করে। যাইহোক, হরমুজান শীঘ্রই কর প্রদান বন্ধ করে চুক্তি ভঙ্গ করেন। কিন্তু আবারও পরাজিত হয়, যখন খুজেস্তানের শহরগুলি ধীরে ধীরে একে একে পরাধীন হয়ে পড়ে। ৬৪১ সালের কিছু সময় পরে রাম-হরমিজদে পরাজয়ের পর, হরমুজান তুসতুরে পালিয়ে যান এবং শহরের কাছে আবার যুদ্ধ হয়, যাতে তিনি আবার পরাজিত হন, কিন্তু তিনি শহরের ভিতরে পৌঁছাতে সক্ষম হন আর তার ৯০০ জন লোক নিহত হয় এবং ৬০০ জনকে বন্দী করা হয় এবং পরে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।[৩] এরপর আরবরা শহরটি অবরোধ করে।
অবরোধ
[সম্পাদনা]তুসতুর শহরটি প্রায় চারদিক থেকে নদী ও খাল বেষ্টিত থাকার কারণে সুদৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত ছিল। তাদের মধ্যে একটি আর্দাশিরাগান নামে পরিচিত ছিল, যা প্রথম সাসানীয় রাজা আর্দাশির প্রথম (শাসনকাল ২২৪-২৪০) এর নামে নামকরণ করা হয়েছিল। আরেকটি শামিরাম নামে পরিচিত, যা কিংবদন্তি অ্যাসিরীয় রানী সেমিরামিসের নামে নামকরণ করা হয়েছে। শেষ উল্লেখিতটি দারায়াগান নামে পরিচিত ছিল, যা হাখমানেশি রাজা দারিয়াস প্রথম (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০-৪৮৬) এর নামে নামকরণ করা হয়েছিল।[৪] শহরটি কীভাবে দখল করা হয়েছিল তার বিভিন্ন মত রয়েছে; তাবারির মতে, অবরোধের সময়ে সিনা (অথবা সিনাহ) নামে একজন ইরানি পলাতক নুমানের কাছে গিয়ে শহরে প্রবেশের পথ দেখানোর জন্য তাকে সাহায্য করার বিনিময়ে তার জীবন রক্ষা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। নুমান রাজি হন এবং সিনা তাকে নিম্নলিখিত কথাটি বললেন: "জলের নির্গমনপথ দিয়ে আক্রমণ করো এবং তারপর তুমি শহর জয় করবে।"[৫]
নুমান তার কথামতো কাজ করলেন এবং তার সেনাবাহিনীর একটি ছোট অংশ নিয়ে তুসতুরে আক্রমণ করলেন। তুসতুরের দরজা খুলে দেওয়া এবং অনুপ্রবেশকারী এই ছোট দলগুলির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বারা ইবনে মালিক আনসারি।[৬] এরপর হরমুজান দুর্গে ফিরে যান এবং তার প্রতিরোধ অব্যাহত রাখেন, কিন্তু অবশেষে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।[৭][৫] তাবারির মতের কাছাকাছি হাওলায়াতে আরবিস্তান নামে গ্রন্থের মত অনুসারে, কাতার থেকে আসা একজন পক্ষত্যাগী, অন্য একজন ব্যক্তির সাথে, আরবদের কাছে তাদের গণিমতের কিছু অংশ চেয়েছিল শহরে প্রবেশের উপায়ের বিনিময়ে। মুসলিমরা রাজি হন এবং কিছুক্ষণ পর তারা শহরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন।[৪] বালাজুরির মতে, অবরোধের সময়ে আরবদের সিয়াহ উসওয়ারির নেতৃত্বে পেশাদার ইরানি অভিজাতদের একটি দল, যারা আসাওয়িরা নামে পরিচিত, তাদের দ্বারা শক্তিশালী করা হয়েছিল।[৮]
তাদের দেশত্যাগের কারণ ছিল তাদের মর্যাদা এবং সম্পদ রক্ষা করা। তবে, হাওলায়াতে আরবিস্তান অনুসারে, তুসতুরে প্রবেশের পর আসাওয়িরা প্রথমে আরবদের কাছে চলে যায়। হরমুজানের ভাই শাহরিয়ার, আসাওয়িরার অংশ ছিলেন বলে জানা যায়।[৮]
পরিণতি
[সম্পাদনা]পরাজয়ের পর, হরমুজানকে আরবরা বন্দী করে তাদের রাজধানী মদিনায় পাঠিয়ে দেয়, যখন আরবরা ইরানে তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখে। মৃত্যু অথবা ইসলামের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার হুমকি পাওয়ার পর, হরমুজান ইসলাম গ্রহণ করেন।[৯] পরে হরমুজানকে খলিফায়ে রাশিদ উমরের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয় এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।[৭] ৬৫১ সালের মধ্যেই ইরানের বেশিরভাগ অঞ্চল আরবদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং ইয়াজদেগার্দ তৃতীয় তার ভৃত্য মাহোয়ে সূরির আদেশে নিহত হন। মাহোয়ে সূরি ছিলেন সুরেন বংশের একজন অভিজাত ব্যক্তি যিনি মার্ভের শাসক (মারজবান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। মার্ভ ছিল সাসানীয়দের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী দুর্গ। ৬৫৪ সাল পর্যন্ত পুরো ইরানই আরবদের অধীনে চলে যায়।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Morony 2005, পৃ. 193।
- ↑ Zarrinkub 1975, পৃ. 14।
- ↑ Jalalipour 2014, পৃ. 9।
- 1 2 Jalalipour 2014, পৃ. 10।
- 1 2 Jalalipour 2014, পৃ. 8।
- ↑ Zirikli, Khayr al-Din al- (২০০২)। الأعلام : قاموس تراجم لأشهر الرجال والنساء من العرب والمستعربين والمستشرقين (5th সংস্করণ)। পৃ. ২৭৯। সংগ্রহের তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২১।
- 1 2 Zarrinkub 1975, পৃ. 15।
- 1 2 Jalalipour 2014, পৃ. 12–13।
- ↑ Pourshariati 2008, পৃ. 238।
সূত্র
[সম্পাদনা]- Encyclopaedia Iranica, Vol. I, Fasc. 5।
{{বিশ্বকোষ উদ্ধৃতি}}:|title=অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য) - Pourshariati, Parvaneh (২০০৮)। Decline and Fall of the Sasanian Empire: The Sasanian-Parthian Confederacy and the Arab Conquest of Iran। I.B. Tauris। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৮৪৫১১-৬৪৫-৩।
- Zarrinkub, Abd al-Husain (১৯৭৫)। "The Arab conquest of Iran and its aftermath"। The Cambridge History of Iran, Volume 4: From the Arab Invasion to the Saljuqs। Cambridge University Press। পৃ. ১–৫৭। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৫২১-২০০৯৩-৬।
- Morony, Michael G. (২০০৫)। Iraq After The Muslim Conquest। Gorgias Press LLC। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৯৩৩৩-৩১৫-৭।
- Jalalipour, Saeid (২০১৪)। The Arab Conquest of Persia: The Khūzistān Province before and after the Muslims Triumph (পিডিএফ)। Sasanika।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]