তুষারগোলক

তুষারগোলক হল তুষার দিয়ে তৈরি একটি গোলাকার বস্তু, যা সাধারণত হাত দিয়ে তুষার তুলে সেটিকে ঠেসে ও চেপে একটি গোলকের আকৃতি প্রদান করে তৈরি করা হয়।[১] তুষারগোলককে প্রায়শই তুষারগোলক লড়াইয়ের মতো খেলায় ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া একটি ছোট তুষারগোলককে তুষারাবৃত পৃষ্ঠের উপর গড়িয়ে তৈরি করা একটি অপেক্ষাকৃত বড় তুষারের গোলককেও একটি তুষারগোলক বলা হতে পারে। ছোট তুষারগোলকটি গড়ানোর সময় অতিরিক্ত তুষার সংগ্রহ করে বড় হতে থাকে। "তুষারগোলক ক্রিয়া " এবং "তুষারগোলকায়ন" পরিভাষাগুলি দিয়ে এই প্রক্রিয়াটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনাকে রূপকার্থে নির্দেশ করা হয়। ওয়েলসীয় নৃত্য "Y Gasseg Eira "-এর নামটিও একটি বড় তুষারগোলকের গড়ানোর সাথে সাদৃশ্য রেখে নেওয়া হয়েছে।[২] একটি বড় তুষারগোলক তৈরির এই পদ্ধতিটি প্রায়শই একটি তুষারমানব তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
তুষারগোলক গঠনের পেছনের মূল ভৌত প্রক্রিয়াটি হলো তাপজ ঘনসংবন্ধন (সিন্টারিং), যেখানে একটি কঠিন বস্তু গলনাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় সংকুচিত হয়।[৩] তুষারগোলকের গঠন সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সূচনা হয়েছিল ১৮৪২ সালে মাইকেল ফ্যারাডের একটি বক্তৃতার মাধ্যমে, যেখানে তিনি বরফ কণাগুলোর মধ্যকার আকর্ষণ বল পরীক্ষা করেছিলেন। জেমস টমসনের একটি প্রভাবশালী প্রাথমিক ব্যাখ্যায় চাপজ পুনঃহিমায়ন (রিজেলেশন) প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছিল, যেখানে একটি কঠিন বস্তুকে চাপে গলানোর পরে পুনরায় জমিয়ে ফেলা হয়।
কখন ও কীভাবে
[সম্পাদনা]তুষারগোলক যদি হাতে ঠেসে করে তৈরি করা হয়, তাহলে তুষারের উপর হাতের চাপই এর চূড়ান্ত রূপটি নির্ধারণ করে। চাপ কম দিলে হালকা ও নরম তুষারগোলক তৈরি হয়। আর্দ্র বরফকে উচ্চ চাপ প্রয়োগ করে জমাট বাঁধালে বা 'ঠাসলে' আরও শক্ত তুষারগোলক তৈরি হয়, যাকে কখনও কখনও 'বরফগোলক' (আইসবল) বলা হয়। তুষারগোলক লড়াইয়ের সময় বরফগোলক ছুঁড়লে তা প্রতিপক্ষকে আহত করতে পারে।
তুষারগোলক গঠিত হবার জন্য তাপমাত্রার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তুষার খুব ঠান্ডা হলে ভালো তুষারগোলক তৈরি করা কঠিন।[১] এছাড়া শুকনো গুঁড়ো তুষার দিয়ে তুষারগোলক তৈরি করা কঠিন। ০ °সে (৩২ °ফা)-এর নিচের তাপমাত্রায় তুষারের মধ্যে মুক্ত জলের পরিমাণ কম থাকে, যার ফলে তুষারগোলকগুলি সহজে ভেঙে যায়। ০ °সে (৩২ °ফা) তাপমাত্রায়, তুষারে মুক্ত জলের পরিমাণ কম থাকে, যার ফলে তুষারগোলকগুলি ঝুরঝুরে হয়।[৪] কিন্তু ঐ তাপমাত্রার উপরে তুষারের মধ্যে থাকা গলিত জল আরও ভাল সংহতি প্রদান করে।[৫] তবে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার উপরে তুষারগোলক গলাতুষারে পরিণত হয়, যার অভ্যন্তরে যান্ত্রিক শক্তি কমে যায়, ফলে তুষারকণাগুলি আর একসাথে লেগে থাকে না। এই ক্রিয়াটির জ্ঞান কাজে লাগিয়ে স্কি খেলার অঞ্চলগুলিতে তুষারধসের ঝুঁকি বের করার নিয়ম আছে। এই নিয়ম অনুযায়ী যদি একটি তুষারগোলক থেকে জল বের করা সম্ভব হয়, তবে তুষারধসের ঝুঁকি বেশি থাকে।[৬]
প্রাকৃতিক তুষারগোলক
[সম্পাদনা]নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বায়ুপ্রবাহের ফলে প্রাকৃতিক তুষারগোলক তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিগুলি নিম্নরূপ:[৭]
- মাটির উপরে বরফের একটি স্তর থাকতে হবে। এতে তুষারগোলকটি মাটিতে আটকে যাবে না।
- ওই বরফে নিশ্চয়ই কিছু ভেজা ও আলগা তুষার আছে, যা গলনাঙ্কের কাছাকাছি।
- তুষারগোলকগুলিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বায়ুপ্রবাহকে যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হবে, কিন্তু খুব বেশি শক্তিশালী হলে চলবে না।
অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে একটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাতাসের দ্বারা বাহিত হয়ে ছোট ছোট নীহারগোলক তৈরি হয়, যা স্থিরবৈদ্যুতিক আকর্ষণের উপর নির্ভর করে;[৮] বাতাসের দ্বারা গড়ানো এই নীহারগোলকগুলি ইউকিমারিমো নামে পরিচিত।
অন্যান্য কিছু বিরল পরিস্থিতিতে উপকূলীয় ও নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে বরফ ও তুষারের উপর তরঙ্গ ক্রিয়ার কারণে সৈকতে তুষারগোলক বা বরফের গোলা তৈরি হতে পারে। [৯]
- বরফের গোলা
- ইউকিমারিমো
- বাতাসে গড়ানো তুষারগোলক
- সৈকতের তুষারগোলকটিতে হিমক্ষয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে
তুষার লণ্ঠন
[সম্পাদনা]
তুষার লণ্ঠন বলতে তুষারগোলক দিয়ে তৈরি একটি আলংকারিক কাঠামোকে বোঝায়, যা সাধারণত একটি ফাঁপা শঙ্কুর আকৃতিতে তৈরি করা হয়। এটি সাধারণত কোনও আলোর উৎসের আবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেমন মোমবাতি বা ইউকিমি গাতা নামে পরিচিত জাপানি প্রস্তরবাগানের লণ্ঠন। সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের মতো দেশগুলিতে তুষার লণ্ঠন শীতকালীন ঐতিহ্যের একটি অংশ, যেখানে বড়দিনের মৌসুমে এগুলি তৈরি করে জ্বালানো হয়। এই কাঠামোগুলি শীতের ভূদৃশ্যকে আলোকিত করে। তুষারময় অঞ্চলের উৎসবমুখর উদযাপনের সাথে এগুলি জড়িত।
সাহিত্যে পরোক্ষ উল্লেখ
[সম্পাদনা]বারবারা স্লেই রচিত ১৯৬৯ সালের শিশুতোষ কল্পকাহিনী উপন্যাস দ্য স্নোবল -এর প্রধান চরিত্র হলো একটি তুষারগোলক, যা একটি শিশুতে রূপান্তরিত হয়।[১০]
চিত্রসম্ভার
[সম্পাদনা]- ত্রিকোণ শঙ্কু (পিরামিড) আকৃতিতে সজ্জিত তুষারগোলকের সংগ্রহ
- ইতালি থেকে প্রাপ্ত মধ্যযুগের একটি চিত্র যেখানে লোকেরা তুষারগোলক ছুঁড়ছে ( আনু. ১৪০০ )
- আমব্রোজিও লরেঞ্জেত্তির শীতকাল ( আনু. ১৩৩৮–১৩৪০ )
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 Schmitz, Kenneth S (২০১৬)। Physical Chemistry: Concepts and Theory। Elsevier। পৃ. ২০৬। আইএসবিএন ৯৭৮০১২৮০০৬০০৯। উদ্ধৃতি ত্রুটি:
<ref>ট্যাগ বৈধ নয়; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "schmitz" নামটি একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে - ↑ Windham। "Windham | Y Gaseg Eira"। Windham | Y Gaseg Eira। সংগ্রহের তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩।
- ↑ Denny, Mark (২০১১)। Gliding for Gold: The Physics of Winter Sports। JHU Press। আইএসবিএন ৯৭৮১৪২১৪০২১৫৪।
- ↑ Steinkogler, Walter; Gaume, Johan (২০১৪)। Granulation of Snow: Experiments and Discrete Element Modeling (পিডিএফ)। পৃ. ৭৩৩ –&#৩২, ৭৩৭। ২৮ মার্চ ২০২০ তারিখে মূল থেকে (পিডিএফ) আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ২৮ মার্চ ২০২০।
- ↑ Morag Challenor (২০০৬)। "No-Ball Snow"। Does Anything Eat Wasps?: And 101 Other Unsettling, Witty Answers to Questions You Never Thought You Wanted to Ask। Simon and Schuster। পৃ. ১৫৭। আইএসবিএন ৯৭৮০৭৪৩২৯৯১৭৬।
- ↑ Luo, Jian (১৬ জানুয়ারি ২০১২)। "Developing Interfacial Phase Diagrams for Applications in Activated Sintering and Beyond: Current Status and Future Directions"। Journal of the American Ceramic Society। ৯৫ (8): ২৩৫৮–২৩৭১। ডিওআই:10.1111/j.1551-2916.2011.05059.x।
- ↑ Rare self-rolling giant snow balls found in UK ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২০১০-০১-১২ তারিখে, The Telegraph, January 8, 2010
- ↑ J. Nelson; M. Baker (২০০৩)। "Charging of ice-vapor interfaces" (পিডিএফ)। Atmospheric Chemistry and Physics Discussions। ৩: ৪১–৭৩।
- ↑ Emerson, Sarah (৮ নভেম্বর ২০১৬)। "Thousands of Snowballs on This Siberian Beach Are Straight From a Fairy Tale"। Motherboard। Vice Media। ৯ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৮ নভেম্বর ২০১৬।
- ↑ University of Oxford libraries Retrieved 14 September 2018. ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৭ অক্টোবর ২০২০ তারিখে