তুলসীদেবী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
তুলসী
ব্যাক্তিরূপে তুলসী গাছ
Tulsidevi01.jpg
বৃন্দা বা তুলসী দেবীর প্রতিমা
অন্যান্য নামবৃন্দা
দেবনাগরীतुलसी
সংস্কৃত লিপ্যন্তরTulasi
অন্তর্ভুক্তিদেবী,
আবাসতুলসী বৃক্ষ, বৈকুণ্ঠ
মন্ত্রওম সুভদ্রে নম মাতসাতুলসী গোবিন্দ হৃদ্যানন্দ কারিণী, নারায়ণস্য পূজার্থ চিনোমী ত্বন নমোষ্টুয় (পাতা ভাঙার সময়)
মহাপ্রসাদ জননী, সর্ব সৌভাগ্যবর্ধিনী আধি ব্যাধি হার নিত্য, তুলসী ত্ব নমোসুতাই (জলদানের সময়)
প্রতীকতুলসী গাছ
উৎসবতুলসী বিবাহ
সঙ্গী
মাতাপিতা
  • ধর্মধ্বজ এবং বেদবতী (তুলসী হিসেবে)
  • কালনেমি এবং স্বর্ণা (বৃন্দ হিসেবে)[১]


তুলসীদেবী বা বৃন্দা, কৃষ্ণ প্রিয়া রাধিকার সহচরী ছিলেন। প্রতিটি হিন্দু গৃহে পবিত্র বৃক্ষরূপে পূজিত হয়ে আসছেন। মূলত, তুলসী হলেন গোলোক বৃন্দাবনে (চিন্ময়জগতে) গোপিকা বৃন্দাদেবীরূপে তুলসী রাধাকৃষ্ণের নিত্য সেবিকা এবং তাদের বিচিত্র দিব্য লীলা সম্পাদনের মূল পরিচালিকা। তিনি শ্রীকৃষ্ণের দূতী, কুঞ্জাদি সংস্কারে অভিজ্ঞা ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পন্ডিতা। তিনি সমস্ত দেবীগণের মধ্যে পবিত্ররূপা এবং সমুদয় বিশ্বের মধ্যে তাঁর তুলনা নেই বলে তিনি তুলসী নামে কীর্তিতা (ব্র.বৈ.পু. প্রকৃতিখন্ড, ২২.২৪, ৪২)।

দেবীর আর্বিভাব লীলা[সম্পাদনা]

ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অনুসারে[সম্পাদনা]

একদিন গোলকে (স্বর্গে) তুলসীকে কৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়ারত দেখে রাধিকা তুলসীকে অভিশাপ দেন যে, "তুমি মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করবে"। এতে কৃষ্ণ দুঃখিত হয়ে তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করলেও তপস্যা দ্বারা আমার একাংশ প্রাপ্ত হবে। রাধিকার শাপে তুলসী পৃথিবীতে রাজা ধর্ম ধর্ব্বজের ও মাধবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে তুলসী নামে অভিহিত হন। অত:পর তুলসী বনগমণ করে ব্রহ্মার কঠোর তপস্যায় আত্মনিয়োগ করেন,তার কঠোর তপস্যায় ব্রহ্মা স্থির থাকতে না পেরে তাকে বর দিতে সম্মত হন। তুলসী বলেন তিনি নারায়ণকে স্বামীরূপে কামনা করেন। ব্রক্ষ্মা বলেন এখন তুমি কৃষ্ণের অংশ সুদামের স্ত্রী হও। পরে কৃষ্ণকে লাভ করবে। রাধিকার শাপে সুদাম দানবরূপে জন্মগ্রহণ করবে, তার নাম হবে শঙ্খচূড়। নারায়ণের শাপে তুলসী বৃক্ষরূপে জন্মগ্রহণ করবে। তুমি না জন্মগ্রহণ করলে তার সকল পূজা ব্যর্থ হবে। যথা সময়ে শঙ্খচূড়ের সঙ্গে রাজা ধর্ম ধর্ব্বজের কন্যা তুলসীর বিবাহ হয়। শঙ্খচূড়ের বর ছিল যে, "তার স্ত্রীর সতীত্ব নষ্ট হলেই তার মৃত্যু হবে"। শঙ্খচূড়ের উৎপাত ও অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দেবতারা অতিষ্ঠ হয়ে ব্রহ্মার সহিত শিবের নিকট গিয়ে উপস্হিত হন। শিব তখন সকলের সঙ্গে নারায়ণের সমীপস্হ হন। দেবতাদের দুর্দশা দর্শনে নারায়ণ বললেন যে, শূল দ্বারা শিব যু্দ্ধে রত হলে তারপর আমি এর স্ত্রীর সতীত্ব নষ্ট করব। শিব শঙ্খচূড়ের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ ধারণ করে শঙ্খচূড়ের স্ত্রীর সাথে ছলনা করব।

তখন শিবের হাতে শঙ্খচূড় নিহত হয়। তার অস্থি লবণ সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হলে এই অস্থি হতে দেব পূজার জন্য নানা প্রকার শঙ্খের উৎপত্তি হয়। নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ গ্রহণপূর্বক তার সতীত্ব নষ্ট করেছেন জ্ঞাত হয়ে তুলসী নারায়ণকে অভিশাপ দেন যে, তুমি পাষানে পরিনত হও। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তুলসী নারায়ণের চরনে পতিত হন। তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে নারায়ণ বললেন যে,তোমার দেহ থেকে গন্ডকী নদী উৎপন্ন হবে। আর তোমার কেশ থেকে উৎপন্ন হবে তুলসীবৃক্ষ।

তুমি লক্ষ্মীর ন্যায় আমার প্রিয়া হবে। তুলসী নারায়ণকে গৃহে স্থান দিতে বললে নারায়ন বলেন, আমার গৃহে লক্ষ্মী রয়েছে, তোমার গৃহে নয় গৃহাঙ্গনে হবে। সেই থেকে নারায়ণ শিলারূপে অবস্হিত হয়ে সর্বদা তুলসীযুক্ত হয়ে থাকেন।

পদ্মপুরাণ অনুসারে[সম্পাদনা]

পদ্মপুরাণে তুলসী সম্বন্ধে এই রূপ বৃত্তান্ত কথিত আছে- জলন্ধর নামে এক অসুরের স্ত্রী ছিলেন বৃন্দা। জলন্ধর ইন্দ্রকে পরাস্ত করে অমরাবতী অধিকার করলে, ইন্দ্র শিবের শরনাপন্ন হন। শিব জলন্ধরের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলে পতিপরায়ণা বৃন্দা স্বামীর প্রানরক্ষার জন্য বিষ্ণু পূজায় প্রবৃত্ত হন। কিন্তু বিষ্ণু জলন্ধরের রূপ ধারণ করে বিন্দার নিকট এলে স্বামীকে অক্ষত দেহে ফিরে আসতে দেখে, বৃন্দা অসমাপ্ত বিষ্ণু পূজা ত্যাগ করে আসায় জলন্ধরের মৃত্যু হয় ( অন্য মতে বৃন্দার সতীত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে জলন্ধরের মৃত্যু হবে না জেনে বিষ্ণু জলন্ধরের রূপ ধরে বৃন্দার সতীত্ব নাশ করেন। বৃন্দা সমস্ত ব্যাপার জ্ঞাত হয়ে বিষ্ণুকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হন। সতীর সাপ অমোঘ জেনে বিষ্ণু ভীত হন এবং বৃন্দাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, তুমি সংযত হও তোমার ভস্মে তুলসী, ধাত্রী, পলাশঅশ্বত্থ এই চারিপ্রকার বৃক্ষ উৎপন্ন হবে। বৃন্দা হতেই তুলসীর জন্ম। [২]

রূপভেদ[সম্পাদনা]

তুলসী গাছ (তুলসী দেবীকে প্রতিনীধিত্বকারী গাছ)

রাধাকৃষ্ণের নিত্যপ্রিয়া ও সেবিকা তুলসী তথা বৃন্দাদেবী জগতের কল্যাণে বিভিন্ন যুগে ও মন্বন্তরে ভিন্ন ভিন্নভাবে এ মর্তে আবির্ভূত হন। তুলসীর আবির্ভাব সম্পর্কে পুরাণে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। একই তুলসীদেবী কখনো জলদ্ধরের পত্নী, কখনো শঙ্খচূড়ের পত্নী, আবার কখনো বা ধর্মদেবের পত্নী, কখনো ধর্মধ্বজ কন্যা, কখনো চন্দ্রভানু কন্যা, আবার কখনো কেদাররাজের কন্যারূপে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অবশ্যই জেনে রাখা দরকার যে, এই প্রত্যেক কন্যাই এক বৃন্দাদেবী এবং প্রত্যেক জন্মেই তিনি কৃষ্ণভক্তিপরায়ণা ছিলেন।

বৃন্দা[সম্পাদনা]

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে (শ্রীকৃষ্ণজন্মখন্ড, ৮৬ অধ্যায়) উল্লেখ আছে যে, শ্রীকৃষ্ণের পিতা নন্দমহারাজের এক প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, হে ব্রজরাজ, সৃষ্টির প্রারম্ভে স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরের প্রথম পাদে স্বয়ম্ভুব মনু ও শতরূপার দুইপুত্র হয়-প্রিয়ব্রত ও উত্তাপনপাদ। উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব। ধ্রুব মহারাজের পুত্র নন্দসাবর্ণি, তাঁর পুত্র কেদার রাজ। তিনি ছিলেন পরম বৈষ্ণব ও সসাগরা পৃথিবীর অধিপতি। একসময় কেদার রাজার যজ্ঞকুন্ড থেকে লক্ষীদেবীর অংশরূপে এক কন্যা আবির্ভূত হন (কমলা কলয়া জাতা যঞ্জকুন্ড সমুদ্ভবা। বহ্নিশুদ্ধাং শকধানা রত্নভূষণ ভূষিতাস) এবং সে কন্যা কেদার রাজ ও তাঁর পত্নীকে তাঁর পিতা-মাতারূপে গ্রহণ করেন। পিতামাতাকে অবগত করে সেই কন্যা তপস্যার উদ্দেশ্যে যমুনার তীরবর্তী রমণীয় পূণ্য বনে গমন করেন। ঐ কেদারকন্যার নাম ছিল বৃন্দা। তাই, তার তপোবন বলে সেই বন জগতে বৃন্দাবন নামে প্রসিদ্ধ হয়।

ধর্মধ্বজরাজের কন্যা[সম্পাদনা]

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে, প্রকৃতিখন্ডে, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে, দেবর্ষি নারদের প্রশ্নের উত্তরে ভগবান শ্রীনারায়ণ তাঁর নিকট তুলসীর বৃত্তান্ত বর্ণনা করেন। নারায়ণের বর্ণনানুসারে, একসময় দক্ষসাবর্ণি নামক মনুর বংশোদ্ভুত রাজা ধর্মধ্বজ লক্ষীদেবীর উপাসনা করেছিলেন। লক্ষীদেবী তাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়ে তাঁকে বরদান করেন। ফলে, ধর্মধ্বজরাজের পত্নী মাধবী লক্ষীর অংশরূপিণী মনোহরা এক পদ্মিনী কন্যা প্রসব করেন। চম্পকবর্ণা সুকেশী মনোহরা অপূর্ব সুন্দরীকন্যাকে দর্শন করে নরনারীগণ তাঁর তুলনা দিতে অক্ষম হয়েছিলেন বলে পুরাবিদ পন্ডিতগণ তাঁকে ‘তুলসী’ নামে অভিহিত করেন।

শঙ্খচূড়ের পত্নিরূপে[সম্পাদনা]

শঙ্খচূড় গোলোকবৃন্দাবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই অংশপ্রকাশ সুদামাসখারূপে নিত্য বিদ্যমান। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় রাধারাণীর অভিশাপে তিনি শঙ্খচূড় রূপে মর্ত্যে জন্মগ্রহণ করেন। (ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্র.খন্ড, ২০,২১ অধ্যায়) শঙ্খচূড় শিবের কাছ থেকে বর প্রাপ্ত হয়েছিলেন যে, যতদিন তার পত্নী তুলসী সতীত্ব বজায় থাকবে, ততদিন তাকে কেউ বধ করতে পারবে না। এরপর দেবতাদের অজেয় শঙ্খচূড়ের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। তখন দেবতাদের প্রার্থনায় কৃষ্ণাংশ ভগবান শ্রীবিষ্ণু শঙ্খচূড়ের ছদ্মবেশে তুলসীকে তার পূর্বকৃত তপস্যার ফলদান তথা পতিসঙ্গ দান করেন; ফলে শঙ্খচূড় নিহত হন।

গন্ডকী নদী ও তুলসী বৃক্ষরূপে[সম্পাদনা]

শঙ্খচূড়ের পত্নি তুলসী যখন পতিবিয়োগ ও বিষ্ণুর ছলনা বুঝতে পারলেন তিনি তখন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। ক্রোধ সংবরন করতে না পেরে তিনি বিষ্ণুর এ আচরণকে পাষাণ হৃদয় বিবেচনা করে তাঁকে পাষাণ (পাথর) হয়ে যাওয়ার অভিশাপ দেন এবং তৎক্ষণাৎ দেহত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। পরে তুলসী তার ভুল বুঝতে পারেন যে, তিনি ভগবানের প্রতি অভিশম্পাত করছেন। তখন ভগবানও তুলসীকে বরদান করেন।

শ্রীবিষ্ণুর বরে সাধ্বি তুলসী দেহত্যাগের পর দিব্যদেহ ধারণপূর্বক গোলোকে শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে প্রাপ্ত হন; তাঁর শরীর ভারতে গন্ডকী নামে প্রসিদ্ধা, মনুষ্যগণের পুণ্যপ্রদা পবিত্রা নদীরূপে পরিণত হয় এবং তাঁর কেশকলাপ তুলসী কেশসম্ভুতা বলে তুলসী নামে বিখ্যাত পবিত্র বৃক্ষরূপ ধারণ করে।

অভিশাপ[সম্পাদনা]

ধর্মরাজের মেয়ে তুলসী এমন রূপসী এবং উচ্চমার্গের সাধিকা ছিলেন যে বহু দেবতাই তাঁকে প্রেমিকা হিসাবে পেতে চাইতেন। কিন্তু, তুলসী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। তাই তাঁকে ঘাটাতে কেউ সাহস করত না। তুলসী একদিন গঙ্গা নদীর তীরে ধ্যানমগ্ন গণেশের মুখোমুখি হলেন। গণেশকে বিষ্ণু ভেবে তার অদ্ভুত অনিন্দ্যকান্তি রূপে মুগ্ধ হয়ে যান তুলসী। তিনি জানতেন না, যাকে দেখে তাঁর হৃদয়ে বাধ ভাঙা প্রেম এসেছে, তিনি আসলে গণেশ, যিনি শিব ও পার্বতীর পুত্র। গণেশকে দেখে প্রেমে পাগল তুলসী শুধু যে নির্লজ্জের মতো এগিয়ে গেলেন তাই নয়, গণেশের কাছে প্রেম নিবেদন করে তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু গণেশ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি যাঁকে বিয়ে করবেন তাঁকে পার্বতীর মতো গুণসম্পন্না হতে হবে, এবং মাতা পার্বতী যেভাবে পিতা শিবের সেবা করেন, তাঁর স্ত্রীও সেভাবে সেবা করবেন বলে তিনি আশা করেন। এমন বাক্যে যারপরনাই অপমানিত বোধ করেন তুলসী।


তিনি তৎক্ষণাৎ গণেশকে অভিশাপ দেন যে, তাঁকে তাঁর অপছন্দের পাত্রীকেই বিয়ে করতে হবে। এতে গণেশও খেপে যান। তিনিও পাল্টা তুলসীকে শাপ দিয়ে বলেন, তাঁর বিয়ে অসুরের সঙ্গে হবে। অভিশাপ পেয়ে ভেঙে পড়েন তুলসী। বুঝতে পারেন, তিনি পার্বতী ও শিব নন্দনকে শাপ দিয়ে কতবড় বিপদ ডেকে এনেছেন। গণেশকে বোঝাতে থাকেন তুলসী। মন শান্ত হলে গণেশও তুলসীর অবস্থা অনুধাবন করেন এবং শাপ কাটানোর উপায় বাতলে দেন। গণেশ বলেন, তাঁর দেওয়া শাপ একমাত্র কাটাতে পারেন খোদ বিষ্ণু। তাঁর দেওয়া আশীর্বাদে তুলসী দেবী রূপে গণ্য হবেন। তবে, গণেশের আশপাশও তিনি মাড়াতে পারবেন না। সারাজীবনই তুলসীকে গণেশের থেকে দূরে থাকতে হবে। গণেশকে নিয়ে যা কিছু পূজার্চনা হবে তার কোনওটাতেই তুলসী থাকবেন না। এরপর গণেশের অমতেই তাঁর বিয়ে হয়। তুলসীর সঙ্গে বিয়ে হয় অসুর বীর শঙ্খচূড়ার সঙ্গে। তবে, শঙ্খচূড়ার অত্যাচারে ক্ষিপ্ত শিব তাঁকে হত্যা করেন।[৩]



পূজা-পদ্ধতি, প্রার্থনা ও আরতি[সম্পাদনা]

তুলসী মঞ্চ

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণঃ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ (প্রকৃতিখন্ড, ২২ অধ্যায়) অনুসারে, একসময় দেবী তুলসী অভিমান বশত অন্তর্হিত হলে তুলসীবনে গমনপূর্বক শ্রীহরি তুলসীর পূজা ও স্তব করেন। তখন দেবী তুলসী বৃক্ষ হতে আবির্ভূতা হন এবং শ্রীহরির পাদপদ্মে শরণ নেন। সেখানে এও বলা হয়েছে, যে মানব হরিপ্রণীত মন্ত্ররাজ পাঠ করত ঘৃতপ্রদীপ, ধূপ, সিঁদুর, চন্দন, পুষ্প, নৈবেদ্য ও অন্যান্য উপহার দ্বারা যথাবিধি তুলসীর পূজা করবেন, তিনি সর্বসিদ্ধি লাভ করবেন।

ঘরের উঠোনে তুলসী মঞ্চ


পদ্মপুরাণ পদ্মপুরাণের উত্তরখন্ডে (অধ্যায় ২৩) মহাদেব নারদমুনিকে সম্বোধন করে বলেন-তুলসী সম্বন্ধীয় পত্র, পুষ্প, ফল, মূল, শাখা, ত্বক, স্কন্ধ এবং মৃত্তি

কাদি সমস্তই পবিত্র। যে গৃহে তুলসী-বৃক্ষ অবস্থিত, তার দর্শন-স্পর্শনেই ব্রহ্মহত্যাদি পাপ বিলয়প্রাপ্ত হয়। যে যে গ্রহে, গ্রামে বা বনে তুলসী বৃক্ষ বিরাজ করে, জগৎপতি শ্রীহরি প্রীতচিত্তে সেই সেই ক্ষেত্রে বাস করেন।

গৃহমন্দিরের সামনে তুলসী বৃক্ষ

পদ্মপুরাণ সৃষ্টিখন্ডে (অধ্যায়-৬০) সমস্ত পত্র পুষ্প মধ্যে মঙ্গলময়ী তুলসীই সাধুতমা। তা সর্বমঙ্গলপ্রদা, শুদ্ধা, বৈষ্ণবী, বিষ্ণুপ্রিয়া, ভক্তিমুক্তিপ্রদা, মুখ্যা এবং সর্বলোক মধ্যে পরম শুভা। যেখানেই তুলসী বন, সেখানেই ভগবান কেশব (কৃষ্ণ) এবং সেখানেই ব্রহ্মা, কমলা (লক্ষী) ও অন্য সমস্ত দেব সন্নিহিত। অতএব, তুলসী দেবীকে সর্বদাই পূজা করবে।

পদ্মপুরাণ, সৃষ্টিখন্ডে (অধ্যায়- ৬১.৫-৬)-তুলসী নামোচ্চারণমাত্রই মুরারি হরি প্রীতি লাভ করেন, পাপ সকল বিলয় প্রাপ্ত হয় এবং অক্ষয় পূণ্য লাভ হয়ে থাকে- এমন তূলসীকে লোকে কেন পূজা-বন্দনা করবে না?



নিত্যং যস্তুলসী দত্ত্বা পূজয়েন্মাঞ্চ মানবঃ।
লক্ষাশ্বমেধজং পুণ্যং লভতে নাত্র সংশয়ঃ।। 
     (ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্রকৃতিখন্ড ২১.৪৫) 

বঙ্গানুবাদঃ যে মানব প্রত্যহ তুলসীপত্র দ্বারা আমাকে পূজা করবেন, নিশ্চয়ই তার লক্ষ অশ্বমেধের ফল হবে।

তুলসী-প্রদক্ষিণ মন্ত্রঃ

যানি কানি চ পাপানি ব্রহ্মহত্যাদিকানি চ।
তানি তানি প্রনশ্যন্তি প্রদক্ষিণ পদে পদে ॥

অর্থঃ যখন মানুষ শ্রীমতী তুলসীদেবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে, তখন প্রতি পদক্ষেপে তার কৃত সকল পাপকর্ম, এমন কি ব্রহ্মহত্যার পাপও বিনষ্ট হয়ে যায়। তারপরে বাঁ হাতে পষ্ণপাত্র ধারণ করে তা থেকে ডান হাত দিয়ে শ্রীমতি তুলসীদেবীকে জল সিষ্ণন করতে হয়।

তুলসী প্রণাম মন্ত্রঃ

ওঁ বৃন্দায়ৈ তুলসী দৈব্যৈ প্রিয়ায়ৈ কেশবস্য চ ।
বিষ্ণুভক্তি প্রদে দেবী সত্যবত্যৈ নমো নমঃ ॥

তুলসী জাগরণ মন্ত্রঃ


উত্তিষ্টং তুলসীদেবী গাত্রোত্থানাং কুরু যথা।
অরুণোদয় প্রাতঃ প্রীচরণে প্রণমাম্যহম্।।

তুলসী জলদান মন্ত্রঃ

ওঁ গোবিন্দবল্লভাং দেবীং ভক্তচৈতন্যকারিণীম্ ।
স্নাপয়ামি জগদ্ধাত্রীং কৃষ্ণভক্তি প্রদায়িনীম্ ॥

তুলসী পূজা

তুলসীর মূল লেপন মন্ত্রঃ

তুলসী নিপয়তে গঙ্গা স্থানেমেকং বারাণসী।
সেবনে পঞ্চতীর্থানি তুলসীভ্যাং নমো নমঃ।।
তুলসী ত্বং সদা ভক্তা সর্বতীর্থফলং ভবেৎ।
লেপনাৎ তব মূলঃ সর্বপাপৈ প্রমুচ্যতে।।
তন্মুলে সর্বতীর্থানি তৎপত্রে সর্বদেবতা।
তদঙ্গে সর্বপুণ্যানি কৃষ্ণভক্তি প্রদায়িনীং।।

তুলসী চয়ন মন্ত্রঃ

ওঁ তুলস্যমৃতজন্মাসি সদা ত্বং কেশবপ্রিয়া ।
কেশবার্থে চিনোমি ত্বাং বরদা ভব শোভনে ॥


তুলসীর স্তুতিঃ

মহাপ্রসাদ জননী সর্বসৌভাগ্যবর্ধিনী।
আধিব্যাধিহরি নিত্যং তুলসী ত্বং নমোহস্তুতে।।

তুলসীর ধ্যানঃ

তুলসী সর্বভূতানাং মহাপাতকনাশিনী।
স্বর্গাপবর্গদে দেবী বৈষ্ণবানাং প্রিয়ে সদা।।
সত্যে সত্যবতীচৈব ত্রেতায়াং মানবী তথা।
দ্বাপরে অবতীর্ণাসি বৃন্দা ত্বং তুলসী কলৌ।।

তুলসী মঞ্চে সন্ধ্যাপ্রদীপ

শ্রী শ্রী তুলসী আরতি-


নমো নমঃ তুলসী ! কৃষ্ণপ্রেয়সী ৷
রাধাকৃষ্ণ-সেবা পাব এই অভিলাসী ৷৷
যে তোমার শরণ লয়, তার বাঞ্ছা পূর্ণ হয়,
কৃপা করি কর তারে বৃন্দাবন বাসী ৷
মোর এই অবিলাস, বিলাস-কুঞ্জে দিও বাস,
নয়নে হেরিব সদা যুগলরূপরাশি ৷৷
এই নিবেদন ধর, সখীর অনুগত কর,
সেবা অধিকার দিয়ে কর নিজ দাসী ৷
দীন কৃষ্ণদাসে কয়, এই যেন মোর হয়,
শ্রীরাধাগোবিন্দ প্রেমে সদা যেন ভাসী ৷৷
 


নিষেধ[সম্পাদনা]

একজন হিন্দু রমণী তুলসী বেদীতে জল দিচ্ছেন। ১৯৭০ সালে তোলা ছবি।
  • সকালে সূর্যোদয়ের আগে কিংবা সন্ধায় সূর্যাস্তের পরে, এবং দ্বাদশী তিথিতে কখন ও তুলসীপত্র চয়ন করতে নেই।
  • আগের কিংবা সকালে তোলা তুলসীপত্র শুকিয়ে গেলেও, তা শ্রীবিগ্রহ অর্চ্চনায় ব্যবহার করা চলে। সকালে ভক্তের উচিত কয়েকটি তুলসী গাছ রাখা। তবে খুব সতর্কতার সাথে এগুলোর যত্ন করতে হবে। কারণ তুলসী কৃষ্ণ প্রেয়সী। তুলসী গাছ গুলো এমন যায়গায় রাখতে হবে যাতে মানুষ অথবা পশু তাঁর উপর দিয়ে হেঁটে যেতে না পারে, তাঁকে দুমরে মুচরে দিতে না পারে। মঞ্জরী গুলো কচি সময় হাত দিয়ে (নখ দিয়ে নয়) ভেঙ্গে দিলে গাছটি অত্যন্ত সুস্থও সবল ভাবে বেড়ে উঠবে।
  • শ্রীমতী তুলসীদেবীর যাতে কোনও প্রকার ব্যথা সৃষ্টি না হয়, সেই বিষয়ে বিশেষ যত্নবান হতে হয়। ডান হাত দিয়ে তাঁর পত্র চয়ণের সময়ে বামহাত দিয়ে শাখাটিকে ধরে রাখতে হয় যাতে সেটি ভেঙ্গে না যায়। তুলসী পত্র চয়ণের শেষে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। শুধুমাত্র বিষ্ণুতত্ত্ব বিগ্রহসমূহ ও চিত্রপটসমূহের প্রতি তুলসী চরণে তুলসী চরণে নিবেদন করা যায় না। ভগবানকে ভোগ নিবেদনের সময় প্রত্যেক সামগ্রীতে একটি করে তুলসী পাতা বা মঞ্জরী দিতে হয়।
  • শ্রীগোবিন্দের চরণ ব্যতীত তুলসীপত্র অর্পণ করতে নেই। গুরুদেব ভগবানের মতো শ্রদ্ধেয় হলেও তিনি কখনই ভগবান নন৷ তিনি ভগবানের প্রিয় সেবকমাত্র৷ তিনি ভগবানের ভক্ত৷ আর তুলসী হচ্ছেন গোবিন্দবল্লভা, শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সী। একমাত্র বিষ্ণুতত্ত্ব ব্যতীত কারও চরণে তুলসীপত্র অর্পণ করা কখনই উচিত নয়, কারণ তা মহা অপরাধ। শ্রীঅনন্ত সংহিতা শাস্ত্রে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে-

তুলস্যা বিষয়ং তত্ত্বং বিষ্ণুমেব সমর্চয়েৎ ৷
সা দেবী কৃষ্ণশক্তিহি শ্রীকৃষ্ণবল্লভা মতা ৷৷
অতস্তাং বৈষ্ণবীং দেবীং নান্যপদে সমর্পয়েৎ ৷
অর্পণে তত্ত্বহানিংঃ স্যাৎ সেবাপরাধ এব চ ৷৷
অতত্ত্বজ্ঞস্ত পাষণ্ডো গুরুব্রুবস্য পাদয়োঃ ৷
অর্পয়ন্ তুলসীং দেবীমর্জয়েন্নরকং পদম্ ৷৷

বঙ্গানুবাদঃ তুলসীপত্র দিয়ে শ্রীবিষ্ণু তত্ত্বের অর্চনা করা কর্তব্য। তুলসীদেবী কৃষ্ণশক্তি, শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়তমা। তিনি পরম বৈষ্ণবী। অন্য কারও পদে তুলসীপত্রাদী অর্পণ করা উচিত নয়৷ যদি কেউ অর্পণ করে তবে সে তত্ত্বজ্ঞানহীন হয় এবং তার সেবা অপরাধ হয়৷ আর যে তত্ত্বজ্ঞানহীন পাষণ্ড গুরুদেবের চরণে তুলসী অর্পণ করে তার নরকগতিই লাভ হয়৷ যে ব্যক্তি চরণে তুলসীপত্র গ্রহণ করে সে কখনই গুরু নয়৷ সে পরমগুরুরত্ত বিরােধী৷

ভগবান শ্রীহরি ছাড়া কোনও দেবদেবীকে তুলসীপত্র দিয়ে কখনই অর্চনা করা উচিত নয়। বায়ুপুরাণে মহর্ষি ব্যাসদেব সেই কথা উল্লেখ করেছেন

তুলসীদল মাত্রায় যোহন্যং দেবং প্রপূজয়েৎ ৷
ব্রহ্মহা স হি গোঘ্নশ্চ স এব গুরুতল্পগঃ ৷৷

বঙ্গানুবাদঃ যে ব্যক্তি তুলসীপত্র দ্বারা অন্য দেবদেবীর পূজা করে তার নিশ্চয়ই ব্রহ্মহত্যা, গো-হত্যা ও গুরুপত্নী গমনের পাপ অর্জিত হয়ে থাকে৷


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. https://archive.org/stream/puranicencyclopa00maniuoft#page/778/mode/1up
  2. পৌরাণিক অভিধান, রচনায় সুধীর চন্দ্র সরকার, পৃষ্ঠা নং ২০৫
  3. গণেশের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন প্রেমিকা তুলসী, তারপর... - Ebela.in https://ebela.in › lifestyle › tulsi-...