তুলসীদেবী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

তুলসীদেবী কৃষ্ণ প্রিয়া রাধিকার সহচরী ছিলেন। একদিন গোলকে (স্বর্গে) তুলসীকে কৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়ারত দেখে রাধিকা একে অভিশাপ দেন যে তুমি মানবীরূপে জন্মগ্রহণ করবে। এতে কৃষ্ণ দু:খিত হয়ে তুলসীকে সান্তনা দিয়ে বলেন, মানবীরূপে জন্মগ্রহন করলেও তপস্যা দ্বারা অামার একঅংশ প্রাপ্ত হবে। রাধিকার শাপে তুলসী পৃথিবীতে রাজা ধর্ম ধর্ব্বজের ও মাধবী র গর্ভে জন্মগ্রহন করে তুলসী নামে অভিহিত হন। অত:পর তুলসী বনগমণ করে ব্রক্ষ্মার কঠোর তপস্যায় অাত্মনিয়োগ করেন,তার কঠোর তপস্যায় ব্রক্ষ্মা স্হির থাকতে না পেরে তাকে বর দিতে সম্মত। তুলসী বলেন তিনি নারায়ণকে স্বামীরূপে কামনা করেন। ব্রক্ষ্মা বলেন এখন তুমি কৃষ্ণের অংশ সুদামের স্ত্রী হও। পরে কৃষ্ণকে লাভ করবে। রাধিকার শাপে সুদাম দানবরূপে জন্মগ্রহন করবে, তার নাম হবে শঙ্খচূড়। নারায়ণেরর শাপে তুলসী বৃক্ষরূপে জন্মগ্রহন করবে। তুমি না জন্মগ্রহন করলে তার সকল পূজা ব্যর্থ হবে। যথা সময়ে শঙ্খচূড়ের সঙ্গে রাজা ধর্ম ধর্ব্বজের কন্যা তুলসীর বিবাহ হয়। শঙ্খচূড়ের বর ছিল যে,তার স্ত্রীর সতীত্ব নষ্ট হলেই তার মৃত্যু হবে। শঙ্খচূড়ের উৎপাত ও অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে দেবতারা অতিষ্ঠ হয়ে বৃক্ষ্মার সহিত শিবের নিকট গিয়ে উপস্হিত হন। শিব তখন সকলের সঙ্গে নারায়ণের সমীপস্হ হন। দেবতাদের দুর্দশা দর্শনে নারায়ণ বললেন যে, আমার শূল দ্বারা শিব যু্দ্ধে রত হলে পর, আমি এর স্ত্রীর সতীত্ব নষ্ট করব। শিব শঙ্খচূড়ের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ ধারন করে তার স্ত্রীর সতীত্ব নাশ করেন। তখন শিবের হাতে শঙ্খচূড় নিহত হয়। তার অস্হি লবন সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হলে এই অস্হি হতে দেব পূজার জন্য নানা প্রকার শঙ্খের উৎপত্তি হয়। নারায়ণ শঙ্খচূড়ের রূপ গ্রহনপূর্বক তার সতীত্ব নষ্ট করেছেন জ্ঞাত হয়ে তুলসী নারায়ণকে অভিশাপ দেন যে, তুমি পাষানে পরিনত হও। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তুলসী নারায়ণের চরনে পতিত হন। তুলসীকে সান্ত্বনা দিয়ে নারায়ণ বললেন যে,তোমার দেহ থেকে গন্ডকী নদী উৎপন্ন হবে। আর তোমার কেশ থেকে উৎপন্ন হবে তুলসীবৃক্ষ। তুমি লক্ষ্মীর ন্যায় আমার প্রিয়া হবে। তুলসী নারায়ণকে গৃহে স্হান দিতে বললে নারায়ন বলেন, আমার গৃহে লক্ষ্মী রয়েছে, তোমার গৃহে নয় গৃহাঙ্গনে হবে। সেই থেকে নারায়ণ শিলারূপে অবস্হিত হয়ে সর্বদা তুলসীযুক্ত হয়ে থাকেন।( বৃক্ষ্মবৈবর্তপুরাণ)।

  • পদ্মপুরাণে তুলসী সম্বন্ধে এই রূপ বৃত্তান্ত কথিত আছে- জলন্ধর নামে এক অসুরের স্ত্রী ছিলেন বৃন্দা। জলন্ধর ইন্দ্রকে পরাস্ত করে অমরাবতী অধিকার করলে, ইন্দ্র শিবের শরনাপন্ন হন। শিব জলন্ধরের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলে পতিপরায়ণা বৃন্দা স্বামীর প্রানরক্ষার জন্য বিষ্ণুপূজায় প্রবৃত্ত হন। কিন্তু বিষ্ণু জলন্ধরের রূপ ধারণ করে বিন্দার নিকট এলে স্বামীকে অক্ষত দেহে ফিরে অাসতে দেখে, বৃন্দা অসমাপ্ত বিষ্ণুপূজা ত্যাগ করে অাসায় জলন্ধরের মৃত্যু হয় ( অন্য মতে বৃন্দার সতীত্ব অক্ষুন্ন রাখতে জলন্ধরের মৃত্যু হবে না জেনে বিষ্ণু জলন্ধরের রূপ ধরে বৃন্দার সতীত্ব নাশ করেন। বৃন্দা সমস্ত ব্যাপার জ্ঞাত হয়ে বিষ্ণুকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হন। সতীর সাপ অমোঘ জেনে বিষ্ণু ভীত হন এবং বৃন্দাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, তুমি সংযত হও তোমার ভস্মে তুলসী, ধাত্রী,পলাশ ও অশ্বথ্থু এই চারিপ্রকার বৃক্ষ উৎপন্ন হবে। বৃন্দা হতেই তুলসীর জন্ম। ( পদ্মপুরাণ)

[১]

অভিশাপ:[সম্পাদনা]

ধর্মরাজের মেয়ে তুলসী এমন রূপসী এবং উচ্চমার্গের সাধিকা ছিলেন যে বহু দেবতাই তাঁকে প্রেমিকা হিসাবে পেতে চাইতেন। কিন্তু, তুলসী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। তাই তাঁকে ঘাটাতে কেউ সাহস করত না। তুলসী একদিন গঙ্গা নদীর তীরে ধ্যানমগ্ন গণেশের মুখোমুখি হলেন। গণেশের অনিন্দ্যকান্তি রূপে মুগ্ধ হয়ে যান তুলসি। তিনি জানতেন না, যাঁকে দেখে তাঁর হৃদয়ে বাধ ভাঙা প্রেম এসেছে, তিনি আসলে গণেশ, যিনি শিব ও পার্বতীর পুত্র। গণেশকে দেখে প্রেমে পাগল তুলসী শুধু যে নির্লজ্জের মতো এগিয়ে গেলেন তাই নয়, গণেশের কাছে প্রেম নিবেদন করে তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু গণেশ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি যাঁকে বিয়ে করবেন তাঁকে পার্বতীর মতো গুণসম্পন্না হতে হবে, এবং মাতা পার্বতী যেভাবে পিতা শিবের সেবা করেন, তাঁর স্ত্রীও সেভাবে সেবা করবেন বলে তিনি আশা করেন। এমন বাক্যে যারপরনাই অপমানিত বোধ করেন তুলসী। তিনি তৎক্ষণাৎ গণেশকে অভিশাপ দেন যে, তাঁকে তাঁর অপছন্দের পাত্রীকেই বিয়ে করতে হবে। এতে গণেশও খেপে যান। তিনিও পাল্টা তুলসীকে শাপ দিয়ে বলেন, তাঁর বিয়ে অসুরের সঙ্গে হবে। অভিশাপ পেয়ে ভেঙে পড়েন তুলসী। বুঝতে পারেন, তিনি পার্বতী ও শিব নন্দনকে শাপ দিয়ে কতবড় বিপদ ডেকে এনেছেন। গণেশকে বোঝাতে থাকেন তুলসী। মন শান্ত হলে গণেশও তুলসীর অবস্থা অনুধাবন করেন এবং শাপ কাটানোর উপায় বাতলে দেন। গণেশ বলেন, তাঁর দেওয়া শাপ একমাত্র কাটাতে পারেন খোদ বিষ্ণু। তাঁর দেওয়া আশীর্বাদে তুলসী দেবী রূপে গণ্য হবেন। তবে, গণেশের আশপাশও তিনি মাড়াতে পারবেন না। সারাজীবনই তুলসীকে গণেশের থেকে দূরে থাকতে হবে। গণেশকে নিয়ে যা কিছু পূজার্চনা হবে তার কোনওটাতেই তুলসী থাকবেন না। এরপর গণেশের অমতেই তাঁর বিয়ে হয়। তুলসীর সঙ্গে বিয়ে হয় অসুর বীর শঙ্খচূড়ার সঙ্গে। তবে, শঙ্খচূড়ার অত্যাচারে ক্ষিপ্ত শিব তাঁকে হত্যা করেন।[২]

ব্যবহার:[সম্পাদনা]

অপব্যবহার:[সম্পাদনা]

নিষেধ:[সম্পাদনা]

  • সকালে সূর্যোদয়ের আগে কিংবা সন্ধায় সূর্যাস্তের পরে, এবং দ্বাদশী তিথিতে কখন ও তুলসীপত্র চয়ন করতে নেই।
  • আগের কিংবা সকালে তোলা তুলসীপত্র শুখিয়ে গেলেও, তা শ্রীবিগ্রহ অর্চ্চনায় ব্যবহার করা চলে।সকালে ভক্তের উচিত্ কয়েকটি তুলসী গাছ রাখা। তবে খুব সতর্কতার সাথে এগুলোর যত্ন করতে হবে। কারণ তুলসী কৃষ্ণ প্রেয়সী। তুলসী গাছ গুলো এমন যায়গায় রাখতে হবে যাতে মানুষ অথবা পশু তাঁর উপর দিয়ে হেঁটে যেতে না পারে, তাঁকে দুমরে মুচরে দিতে না পারে। মঞ্জরী গুলো কচি সময় হাত দিয়ে (নখ দিয়ে নয়) ভেঙ্গে দিলে গাছ্টি অত্যন্ত সুস্থও সবল ভাবে বেরে উঠবে।
  • শ্রীমতী তুলসীদেবীর যাতে কোনও প্রকার ব্যথা সৃষ্টি না হয়, সেই বিষয়ে বিশেষ যত্নবান হতে হয়। ডান হাত দিয়ে তাঁর পত্র চয়ণের সময়ে বামহাত দিয়ে শাখাটিকে ধরে রাখতে হয় যাতে সেটি ভেঙ্গে না যায়। তুলসী পত্র চয়ণের শেষে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়।শুধুমাত্র বিষ্ণুতত্ত্ব বিগ্রহসমূহ ও চিত্রপটসমূহের প্রতি তুলসী চরণে তুলসী চরণে নিবেদন করা যায় না। ভগবানকে ভোগ নিবেদনের সময় প্রত্যেক সামগ্রীতে একটি করে তুলসী পাতা বা মঞ্জরী দিতে হয়।
  • শ্রীগোবিন্দের চরণ ব্যতীত তুলসীপত্র অর্পণ করতে নেই গুরুদেব ভগবানের মতো শ্রদ্ধেয় হলেও তিনি কখনই ভগবান নন৷ তিনি ভগবানের প্রিয় সেবকমাত্র৷ তিনি ভগবানের ভক্ত৷ আর তুলসী হচ্ছেন গোবিন্দবল্লভা৷ শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সী। একমাত্র বিষ্ণুতত্ত্ব ব্যতীত কারও চরণে তুলসীপত্র অর্পণ করা কখনই উচিত নয়, কারণ তা মহা অপরাধ। শ্রীঅনন্ত সংহিতা শাস্ত্রে পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে-

তুলস্যা বিষয়ং তত্ত্বং বিষ্ণুমেব সমর্চয়েৎ ৷ সা দেবী কৃষ্ণশক্তিহি শ্রীকৃষ্ণবল্লভা মতা ৷৷ অতস্তাং বৈষ্ণবীং দেবীং নান্যপদে সমর্পয়েৎ ৷ অর্পণে তত্ত্বহানিংঃ স্যাৎ সেবাপরাধ এব চ ৷৷ অতত্ত্বজ্ঞস্ত পাষণ্ডো গুরুব্রুবস্য পাদয়োঃ ৷ অর্পয়ন্ তুলসীং দেবীমর্জয়েন্নরকং পদম্ ৷৷ “তুলসীপত্র দিয়ে শ্রীবিষ্ণু তত্ত্বের অর্চনা করা কর্তব্য। তুলসীদেবী কৃষ্ণশক্তি, শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়তমা। তিনি পরম বৈষ্ণবী। অন্য কারও পদে তুলসীপত্রাদী অর্পণ করা উচিত নয়৷ যদি কেউ অর্পণ করে তবে সে তত্ত্বজ্ঞানহীন হয় এবং তার সেবা অপরাধ হয়৷ আর যে তত্ত্বজ্ঞানহীন পাষণ্ড গুরুদেবের চরণে তুলসী অর্পণ করে তার নরকগতিই লাভ হয়৷যে ব্যক্তি চরণে তুলসীপত্র গ্রহণ করে সে কখনই গুরু নয়৷ সে পরমগুরুরত্ত বিরােধী৷ ভগবান শ্রীহরি ছাড়া কোনও দেবদেবীকে তুলসীপত্র দিয়ে কখনই অর্চনা করা উচিত নয়। বায়ুপুরাণে মহর্ষি ব্যাসদেব সেই কথা উল্লেখ করেছেন তুলসীদল মাত্রায় যোহন্যং দেবং প্রপূজয়েৎ ৷ ব্রহ্মহা স হি গোঘ্নশ্চ স এব গুরুতল্পগঃ ৷৷ “যে ব্যক্তি তুলসীপত্র দ্বারা অন্য দেবদেবীর পূজা করে তার নিশ্চয়ই ব্রহ্মহত্যা, গো-হত্যা ও গুরুপত্নী গমনের পাপ অর্জিত হয়ে থাকে৷ শ্রী শ্রী তুলসী আরতি- নমো নমঃ তুলসী ! কৃষ্ণপ্রেয়সী ৷ রাধাকৃষ্ণ-সেবা পাব এই অভিলাসী ৷৷ যে তোমার শরণ লয়, তার বাঞ্ছা পূর্ণ হয়, কৃপা করি কর তারে বৃন্দাবন বাসী ৷ মোর এই অবিলাস, বিলাস-কুঞ্জে দিও বাস, নয়নে হেরিব সদা যুগলরূপরাশি ৷৷ এই নিবেদন ধর, সখীর অনুগত কর, সেবা অধিকার দিয়ে কর নিজ দাসী ৷ দীন কৃষ্ণদাসে কয়, এই যেন মোর হয়, শ্রীরাধাগোবিন্দ প্রেমে সদা যেন ভাসী ৷৷ তুলসী-প্রদক্ষিণ মন্ত্রঃ যানি কানি চ পাপানি ব্রহ্মহত্যাদিকানি চ। তানি তানি প্রনশ্যন্তি প্রদক্ষিণ পদে পদে ॥ অর্থঃ যখন মানুষ শ্রীমতী তুলসীদেবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে, তখন প্রতি পদক্ষেপে তার কৃত সকল পাপকর্ম, এমন কি ব্রহ্মহত্যার পাপও বিনষ্ট হয়ে যায়। তারপরে বাঁ হাতে পষ্ণপাত্র ধারণ করে তা থেকে ডান হাত দিয়ে শ্রীমতি তুলসীদেবীকে জল সিষ্ণন করতে হয়। তুলসী প্রাণম মন্ত্রঃ ওঁ বৃন্দায়ৈ তুলসী দৈব্যৈ প্রিয়ায়ৈ কেশবস্য চ । বিষ্ণুভক্তি প্রদে দেবী সত্যবত্যৈ নমো নমঃ ॥ তুলসী জলদান মন্ত্রঃ ওঁ গোবিন্দবল্লভাং দেবীং ভক্তচৈতন্যকারিণীম্ । স্নাপয়ামি জগদ্ধাত্রীং কৃষ্ণভক্তি প্রদায়িনীম্ ॥ তুলসী চয়ন মন্ত্রঃ ওঁ তুলস্যমৃতজন্মাসি সদা ত্বং কেশবপ্রিয়া । কেশবার্থে চিনোমি ত্বাং বরদা ভব শোভনে ॥ দেবী তুলসী বৈদিক যুগ থেকে সনাতন ধর্মে অন্যতম স্তরে প্রাধান্য পেয়ে আসছেন। তো তাকে গৃহে প্রতিস্থাপন করে পবিত্রতা বিস্তার করুণ। সংগ্রাহক-সিদ্ধার্থ মজুমদার এইবেলাডটকম/এবি

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. পৌরাণিক অভিধান, রচনায় সুধীর চন্দ্র সরকার, পৃষ্ঠা নং ২০৫
  2. গণেশের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন প্রেমিকা তুলসী, তারপর... - Ebela.in https://ebela.in › lifestyle › tulsi-...