তারিক মেহমুদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(তারেক মাহমুদ থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বিগ্রেডিয়ার তারেক মাহমুদ শাহেদ (যিনি বিগ্রেডিয়ার টিএম হিসেবে খ্যাত এবং বর্তমানে টিএম শাহেদ নামে, ৮ অক্টোবর ১৯৩৮- ২৯ মে ১৯৮৯) ছিলেন একজন পাকিস্তানি সৈন্য। যদিও তার নামের আদ্যক্ষর টিএম। তিনি এসএসজির কমান্ডার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন, যখন তিনি ১৯৮৯ সালে গুজরানওয়ালার নিকটে রাহওয়ালিতে একটি প্যারাসুট দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন সেইসমস্ত শীর্ষ অফিসারদের একজন যিনি এসএসজির হয়ে দুটি যুদ্ধ ও বিভিন্ন বিশেষ অপারেশনে অংশ নিয়েছেন।

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা[সম্পাদনা]

মাহমুদ ৮ই অক্টোবর ১৯৩৮ সালে মুলতানে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সরকারি কলেজের প্রফেসর ছিলেন আসগরমল রাওয়ালপিন্ডিতে। ১৯৫৬ সালে রাওয়ালপিন্ডির গর্ডন ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে লাহোর গমন করেন। সেখানের সরকারি কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে স্নাতক সমাপ্ত করেন। তিনি কলেজের ক্রিকেট দলের সদস্য ছিলেন যার অধিনায়ক ছিল জাভেদ বুকরি। সেখান থেকে আইনশাস্ত্র পড়ার জন্য পেশওয়ার বিশ্ববিদ্যালয় গমন করেন। একইসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতেও নির্বাচিত হন। তখন তিনি দেশের সেবা করাটাকেই প্রাধান্য দেন এবং ১৯৬০ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমীতে একজন ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে পিএমএ থেকে মিলিটারি বিজ্ঞান ও যুদ্ধ শিক্ষা উভয় বিষয়ে ডাবল বিএসসি সহকারে স্নাতক করেন। তিনি কোয়েটা কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজে যোগদান করেন এবং ১৯৬৯ সালে স্টাফ কোর্স শেষ করেন।

মিলিটারি ক্যারিয়ার[সম্পাদনা]

মাহমুদ বেলুচ রেজিমেন্টে ১৯৬০ সালে কমিশন পেয়েছিলেন। পিএমএ থেকে পাসিং আউট হয় ১৯৬৩ সালে। একই বছর তিনি ৫১তম প্যারা ট্রুপার ডিভিশন এয়ারবোর্ণ কর্পসে অভিষিক্ত হন, সেখান থেকে এসএসজির জন্য নির্বাচিত হন। এসএসজির বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষ করার পর তাকে ১ম কমান্ডো ব্যাটালিয়ন (ইয়ালদ্রম) শাহিন কোম্পানিতে পোস্টিং দেয়া হয়।

১৯৬৫ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৯৬৫ সালে এসএসজি কাশ্মীরে কভার্ট অপারেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইতিমধ্যে মাহমুদ মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ ফোর্সের সাথে উন্নত কোর্সের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি নিজেকে কভার্ট অপারেশনের জন্য বেছে নেন কোর্সের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পরিবর্তে। তিনি সিতারা-ই-জুরাত খেতাবে ভূষিত হন ১৯৬৫ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারনে। তিনি ১৯৭০ সালে মেজর পদে উন্নীত হন এবং পেশোয়ারে অবস্থান করছিলেন। তাকে পোস্টিং দেয়া হয় প্যারাসুট ট্রেনিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট হিসেবে।

১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে মাহমুদ স্বেচ্ছায় পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে যুদ্ধে যোগদান করতে আসেন। তাকে শাহজালাল বিমানবন্দরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে একটি অপারেশনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য পাঠানো হয়। বিমানবন্দরটি মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা খুবই সুরক্ষিত ছিল এবং তারা এটাকে নো ফ্লাই জোন বিবেচনা করছিলো। মাহমুদ শাহিন কোম্পানিকে নেতৃত্ব দেন। ১ম কমান্ডো ব্যাটালিয়ন এবং তার কোম্পানি সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। ৩৪ ঘণ্টা পর শাহিন কোম্পানি বিমানবন্দ ও তার আশেপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে সমর্থ হয়। এলাকাটা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। উভয়পক্ষই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং যুদ্ধে বিমানবন্দর প্রায় ধংস হয়ে যায়।

১৯৮৪ সিয়াচেন যুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৯৭৯ সালে তিনি কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৮৪ সালে বিগ্রেডিয়ার পদে উন্নীত হন। মাহমুদ তখন একজন এক তারকাবিশিষ্ট জেনারেল। তাকে এসএসজির কমান্ড্যান্ট বানানো হয়। ১৯৮৪ সালে মাহমুদ সিয়াচেন যুদ্ধে এসএসজিকে নেতৃত্ব দেন। সে এলাকাটা পুনরায় ভারতীয়দের হাতে চলে যায় তারা একটি সফল মিলিটারি অপারেশন পরিচালনা করার পর। এসএসজি ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি আগ্রাসী ঝটিকা অপারেশন পরিচালনা করে এবং মাহমুদ ১৯৮৪ সালে একটি বিজয় নিশ্চিত করেন। অপারেশনের নাম ছিল ‘অপারেশন মেঘদূত’। এটি পরিচালিত হয় সিয়াচেন হিমবাহকে পুনর্দখল করার জন্য।

অন্যান্য অপারেশন[সম্পাদনা]

১৯৮০ দশকের পুরোটাই এসএসজি ও আইএসআই ঘনিষ্ঠভাবে মার্কিন বিশেষ ফোর্স ও বিশেষ কার্যক্রম বিভাগের সাথে সহযোগিতা করছিলো গোপন অপারেশনে। যা অপারেশন সাইক্লোন নামে পরিচিত। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে হিল ৩২৩৪ এর যুদ্ধে মাহমুদ কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। যদিও সোভিয়েত এয়ারবোর্ণ ট্রুপস তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হয়। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ সালে প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩ করাচীতে ছিনতাই হয়। মাহমুদ দ্রুত করাচী আসেন সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বিমানটি মুক্ত করার অপারেশনের পরিকল্পনা করতে। তিনি সাধারণ মানুষের নজরে চলে আসেন যখন তিনি ছিনতাইকৃত বিমানটি মুক্ত করতে অপারেশন পানাম নামে একটি সফল অপারেশনে নেতৃত্ব দেন। ছিনতাইকারীরা এসএসজি দলের উপর গুলি করে ও যাত্রীদেরকে হত্যা ও আহত করতে শুরু করে কিন্তু এসএসজি দ্রুত তাদেরকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় ও অনেকগুলো জীবনকে রক্ষা করে। পরে ১৯৮৭-৮৮ সালে তিনি সিন্ধু অঞ্চলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অপারেশনে নেতৃত্ব দেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার[সম্পাদনা]

মাহমুদ নিহত হন ২৯ মে ১৯৮৯ সালে। যখন তিনি গুজরানওয়ালার রাহওয়ালিতে পাকিস্তান আর্মি এভিয়েশন স্কুলে এসএসজির প্যারাট্রুপারদের একটি ফ্রি-ফলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। জাম্পটি ছিল আর্মি এভিয়েশনের পাসিং আউট প্যারেডের একটি অংশ। দুর্ঘটনাটা ঘটে সেনাবাহিনীর একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার থেকে পরীক্ষামূলক লম্ফ দেয়ার সময়। তখন মাহমুদ তার মূল এবং মজুত উভয় প্যারাসুট খুলতে ব্যর্থ হয়। দুর্ঘটনা তদন্তের সময় দেখা গেছে, তার প্রথম প্যারাসুট খুলে নাই। দড়িগুলো বাজেভাবে পেচিয়ে গিয়েছিল। মাহমুদ তার ছোড়া দিয়ে দড়িগুলো কেটে ব্যাকআপ প্যারাসুট খোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নিজের অজ্ঞাতে মূল ও ব্যাকআপ উভয় প্যারাসুট কেটে ফেলেন এবং প্রচণ্ড গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়েন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]