তারা (রামায়ণ)

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
তারা (রামায়ণ)
Episode from Kishkinda Kanda.jpg
তারা (সবচেয়ে বাঁয়ে), তাঁর স্বামী সুগ্রীব (বাঁদিক থেকে দ্বিতীয়), এবং হনুমানের (সবচেয়ে ডানে) সাথে কিষ্কিন্ধ্যার রাজপ্রাসাদে লক্ষ্মণের সাক্ষাৎকার
দেবনাগরীतारा
সংস্কৃত লিপ্যন্তরতারা
অন্তর্ভুক্তিবানর/অপ্সরা, পঞ্চকন্যা
আবাসকিষ্কিন্ধ্যা

হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণে, তারা (সংস্কৃত: तारा, Tārā, আক্ষরিক অর্থে "তারকা";[১]) হলেন কিষ্কিন্ধ্যার রাণী ও বানররাজ বালীর সহধর্মিনী। বিধবা হবার পর তিনি বালীর ভাই সুগ্রীবের পাটরাণী হন। রামায়ণে, বানরবৈদ্য সুষেণের কন্যা হিসেবে তারাকে চিত্রিত করা হয়েছে।

পরবর্তী আকরগ্রন্থসমূহে, ক্ষীরসমুদ্র মন্থনের ফলে অপ্সরারূপে (স্বর্গীয় যুবতী) তাঁর জন্ম হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। তিনি বালীকে বিবাহ করেন ও অঙ্গদ নামের এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। এক দৈত্যের সাথে যুদ্ধে বালীকে সম্ভাব্য মৃত অনুমান করে সুগ্রীব রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন ও তারাকে নিজ অধিকারভুক্ত করেন। তবে, বালী ফিরে এসে তাঁর ভাইকে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে নির্বাসনে পাঠান ও তারাকে পুনরায় লাভ করেন।

সুগ্রীব বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলে তারা বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের মাধ্যমে বালীকে তা প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেন; এর কারণ হিসাবে তিনি সুগ্রীবের সঙ্গে রামের (ভগবান বিষ্ণুর অবতার ও রামায়ণের নায়ক) মিত্রতার কথা জানান। কিন্তু, বালী তার কথা অগ্রাহ্য করেন এবং সুগ্রীবের ছলনায় রামের নিক্ষিপ্ত তীরে বালীর মৃত্যু ঘটে। মূল রামায়ণ কাহিনী এবং এর অধিকাংশ সংস্করণেই তারার বিলাপ গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ফুটে উঠেছে। তবে অধিকাংশ দেশীয় ভাষার অনূদিত সংস্করণে, তারার নিজ সতীত্বের বলে রামকে অভিশাপ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। কিছু সংস্করণে, রাম তারার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

সুগ্রীব রাজসিংহাসন ফিরে পেয়ে হৈ-হল্লায় ও মদ্যপানে মেতে রাবণ কর্তৃক অপহৃত রামের স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারকল্পে রামকে প্রতিশ্রুত সহায়তায় অসমর্থ হন। সুগ্রীবের অনুমিত বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তিস্বরূপ রামের ভাই লক্ষ্মণ কিষ্কিন্ধ্যা ধ্বংস করতে উদ্যত হলে তারা (বর্তমানে সুগ্রীবের রাণী ও প্রধান কূটনীতিবিদ) লক্ষ্মণকে শান্ত করেন এবং রামের সাথে কৌশলে সুগ্রীবের পুনর্মিলন ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। এই ঘটনার পর, তারা একবারমাত্র সুগ্রীবের রাণী এবং অঙ্গদের মা হিসাবে, যখন কাহিনিটি কিষ্কিন্ধ্যা থেকে লঙ্কায় সীতার উদ্ধারে চরম পরিণতিমূলক যুদ্ধে মোড় নেয়, প্রসঙ্গক্রমে উল্লিখিত হয়েছেন।

তারার বুদ্ধিমত্তা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, নির্ভীকতা এবং স্বামী বালীর প্রতি তাঁর ভক্তি মহিমান্বিত হয়। তাঁকে পঞ্চকন্যার (পাঁচজন (পবিত্র) নারী) একজন হিসাবে উচ্চপ্রশংসা করা হয়, যাঁদের নাম আবৃত্তি করলে পাপ দূরীভূত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।

জন্ম ও প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

রামায়ণে, তারা বানরবৈদ্য সুষেণের কন্যা হিসেবে বালী কর্তৃক সম্বোধিত হয়েছেন।[২][৩] কখনও কখনও, রামায়ণের প্রথম গ্রন্থ বাল কাণ্ডের সর্গগুলিতে, প্রধান বানরগণের বিভিন্ন দেব-দেবীর দ্বারা সৃষ্ট হওয়ার বর্ণনা যোগ করা হয়: বালী এবং সুগ্রীবকে যথাক্রমে দেবরাজ ইন্দ্র ও সূর্য-দেবতা সূর্য্যের পুত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; যেখানে তারাকে দেবগুরু বৃহস্পতির কন্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।[৪] দ্বাদশ শতাব্দীর তামিল রামাবতারম্ এবং তেলুগু রঙ্গনাথ রামায়ণে বলা হয়েছে যে, অমরত্বদায়ী সুধা (অমৃত) অর্জনের উদ্দেশ্যে দেবতা এবং অসুরদের দ্বারা সমুদ্র মন্থনের সময় ক্ষীরসমুদ্র থেকে অন্যান্য অপ্সরাদের সঙ্গে তারা ও রুমা উত্থিত হন।[২][৩] কেরালার থেইয়াম নাট্যঐতিহ্যে, দেবতাগণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে বালীকে মন্থনে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ করেন। বালী মন্থন আরম্ভ করা মাত্র, তারা সমুদ্রের থেকে উঠে আসেন এবং এভাবে বালী তারাকে উপহাররূপে লাভ করেন।[৫]

জাভানি ওয়ায্যাং পুতুল ঐতিহ্য অনুযায়ী, তারা (দেউয়ি তারা) ইন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী উইয়াতি-এর অপ্সরা কন্যা। তার ভাইবোনদের মধ্যে একটি বোন লঙ্কার রাক্ষসরাজ রাবণ (রাহ্ওয়ান)-এর সঙ্গিনী দেউয়ি তরী এবং ভাইরা চিতরত, চিত্রগণ, জয়ন্তক, জয়ন্তর, এবং হার্জুনাওয়াংসা।[৬]

যদিও রামায়ণ বলে যে, তারা প্রথমে বালীকে বিবাহ করেছিলেন; কিছু রামায়ণ সংস্করণ কখনও কখনও তারা, বালী এবং সুগ্রীবের একটি বহুভর্তৃক সম্পর্ক উপস্থাপন করে। রঙ্গনাথ রামায়ণ বলে যে, দেবতাদের সাহায্য করার জন্য একটি পুরস্কার হিসাবে তারাকে বালী এবং সুগ্রীবের কাছে দেওয়া হয়। [৩] একজন তামিল লোককাহিনী অনুযায়ী, অমৃত উঠে আসার পর, তারা আবির্ভূতা হন এবং তাকে বালী ও সুগ্রীব উভয়ের একটি সাধারণ স্ত্রী হিসাবে দেওয়া হয়। [৭] মহাভারতে একটি প্রসঙ্গে আছে, বালী এবং সুগ্রীবের মধ্যে একটি অজ্ঞাতনামা নারীকে নিয়ে যুদ্ধ হয়, এই নারীটি তারাও হতে পারে বলে পুরাণবিদ্ ভট্টাচার্য মনে করেন।[৩]

মহাভারতের কিছু সংস্করণ সহ রামায়ণের কিছু পুনঃকথন নরসিংহ পুরাণমহানাটক এ তারাকে মূলত সুগ্রীবের স্ত্রী হিসাবে চিত্রিত করা হয়, যাকে বালী ছিনিয়ে নিয়েছিল।[৩][৮] থাই রামাকেইন বলে যে, দেবতারা বালী এবং সুগ্রীবকে যথাক্রমে একটি ত্রিশূল ও তারাকে দেন, কিন্তু বালী তারাকেও নেন এবং তাকে বিয়ে করেন। [৩] বালিনীয় নৃত্য কেব্যার এবং ওয়ায্যাং ঐতিহ্যও বলে যে,প্রাথমিকভাবে তারার সাথে সুগ্রীবের (সুগ্রীওয়া) বিয়ে হয় , কিন্তু বালী (সুবালী) কর্তৃক ভোগকৃত হন। [৩][৬]

সব সংস্করণে, বালীর সাথে তারার বিবাহ থেকেই অঙ্গদের জন্ম হয়।[৩][৬]

রামায়ণে, বালী একটি গুহার মধ্যে দৈত্য মায়াবীর সাথে যুদ্ধ করতে যান এবং সুগ্রীবকে নির্দেশ দেন যে, গুহা থেকে রক্ত প্রবাহিত হলে গুহার দরজা বন্ধ করে দিতে ( তিনি মারা গেছেন ভেবে নিয়ে), কিন্তু যদি দুধ বেরোতে থাকে, সেটা ইঙ্গিত করবে যে মায়াবী মৃত। যুদ্ধের এক বছর পর, মৃতপ্রায় দৈত্য জাদু দ্বারা তার দুধের মত রক্তের রং লালে পরিবর্তন করে। সুগ্রীব বালীকে মৃত ভেবে নিয়ে গুহার একমাত্র প্রবেশপথটি বন্ধ করে দেন। এছাড়াও সুগ্রীব বালীর "বিধবা পত্নী" তারাকে ভোগদখল করেন, যা কখনও কখনও বিবাহ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়। [৯] বালী ফিরে আসার পর, সুগ্রীবের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে তিনি সুগ্রীবকে নির্বাসিত করেন এবং তারাকে পুনরায় লাভ করা ছাড়াও প্রতিশোধ চরিতার্থ করতে সুগ্রীবের স্ত্রী রুমাকে আটক করেন।[৯][১০] যদিও রুমার স্বামী জীবিত থাকাকালীন বালীর তাকে অধিকারভুক্ত করার কাজটি সার্বজনীনভাবে রামায়ণ টিকাকারদের দ্বারা সমালোচিত হয়, তারা সুগ্রীবের তারাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণের বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন, যেহেতু সুগ্রীব বিশ্বাস করতেন যে তারা বিধবা।[১১]

ওয়ায্যাং-এর বিভিন্নতায়, বালী (সুবালী) গুহায় কিষ্কিন্ধ্যার দৈত্য শাসক-ভ্রাতৃদ্বয় যাতাসুর এবং লেম্বুসুর এর সঙ্গে লড়াইয়ে যান। অনুরূপভাবে রামায়ণে, সুগ্রীব (সুগ্রীওয়া) বালীকে মৃত অনুমান করেন। দেবতাগণ সুগ্রীবকে মুকুট পরিয়ে কিষ্কিন্ধ্যার রাজারূপে অভিষিক্ত করেন এবং তাঁর "মৃত" ভাইকে সহযোগিতা করার একটি পুরস্কার হিসাবে তারাকে প্রদান করেন। বালী ফিরে আসেন এবং রাবণের উস্কানিতে তারা ও রাজ্যটি দখল করেন। [৬]

বালীর মৃত্যু[সম্পাদনা]

রাক্ষসরাজ রাবণ কর্তৃক স্ত্রী সীতার অপহরণের পর, রাম ও তাঁর ভাই লক্ষ্মণ তাকে অনুসন্ধানের জন্য বনে বনে ঘুরে বেড়ান। বানর-যোদ্ধা হনুমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পরে, তাদেরকে নির্বাসিত সুগ্রীবের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।বালীকে পরাজিত করে সুগ্রীবের স্ত্রী রুমা এবং তার রাজত্ব পুনরায় ফিরে পেতে সাহায্য করার জন্য রাম সুগ্রীবের সঙ্গে একটি জোট গঠন করেন। বিনিময়ে সুগ্রীব সীতার অনুসন্ধানে সাহায্য করবেন। সম্মতিক্রমে, সুগ্রীব বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করেন, কিন্তু রামের দুই যোদ্ধাকে আলাদাভাবে চিনতে অক্ষম হন এবং সুগ্রীব প্রতিযোগীতায় হেরে যান৷ রাম সুগ্রীবকে তার বিধেয় ব্যাখ্যা করেন এবং তাকে পুনরায় বালীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান করতে বলেন, কিন্তু এইবার রাম সুগ্রীবের থেকে বালীকে পৃথক করতে পেরে সুগ্রীবকে বিজয়মাল্যে ভূষিত করেন।[১২]

তারার সতর্কবার্তা[সম্পাদনা]

তারার বালীকে (কেন্দ্রে) বিরত থাকার উপদেশ প্রদান, যেহেতু সুগ্রীব বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করেন

রামায়ণের কিষ্কিন্ধ্যা কাণ্ডে, সুগ্রীব পুনরায় বালীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আহ্বান জানালে তারা ইঙ্গিত দেন যে, "এর উপস্থাপনা শঠতাপূর্ণ" [৩] এবং সাধারণত, একজন যোদ্ধা এত শীঘ্র একটি নিষ্পত্তিমূলক পরাজয়ের পর আবার একটি যুদ্ধের জন্য ফিরে আসতে পারেন না। রাম এবং সুগ্রীবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্বের কথা শুনে, তিনি বালীকে সাবধান করেন। তারা একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে সুগ্রীবকে ক্ষমা করে যুবরাজ হিসেবে তাঁকে অভিষিক্ত করতে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন ও তাঁর সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে বলেন এবং তার চেয়ে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন রামের সাথে বন্ধুত্ব করার উপযোগী পরামর্শ দেন। তারা বালীকে তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে মিনতি করেন, কিন্তু তারার ভালবাসা ও ভক্তি স্বীকার করেও বালী যুক্তি দেন যে, তার মত একজন যোদ্ধা একটি দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান অস্বীকার করতে পারে না; এসত্ত্বেও, তিনি সুগ্রীবকে হত্যা না করে শুধু তার দর্প চূর্ণ করার প্রতিশ্রুতি দেন।[৩][৯][১৩]

মহাভারতের পুনঃকথনে, সুগ্রীব পুনরায় বালীকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলে তারা বালীকে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত হতে বলেন এবং মনোযোগ আকর্ষণ করেন যে, সুগ্রীবের একটি প্রতিরক্ষক থাকতে পারে। চাঁদের মত দ্যুতিময়ী তারাকে বালী এই বলে প্রশংসা করেন যে, তিনি তেমন একজন যিনি সমস্ত প্রাণীর ভাষা বোঝেন এবং বিচক্ষণতার সাথে তার বিবৃতি শোধন করে দেন। তারা রামের সঙ্গে সুগ্রীবের জোটের বিষয়ে এবং সুগ্রীব ও তার উপদেষ্টাদের হাতে বালীর মৃত্যুর চক্রান্ত সম্পর্কে তাকে সতর্ক করেন। বালী শুধুমাত্র তারার পরামর্শ উপেক্ষাই করেন না, উপরন্তু তারাকে সুগ্রীবের সঙ্গে মিলে তাকে প্রতারণার সন্দেহ প্রকাশ করেন। বালী তারার প্রতি রূঢ় বক্তব্য রেখে বেরিয়ে যান৷[১৪]

কম্বরের রামাবতারম্ এ, রামের বালীকে হত্যা করার পরিকল্পনা সম্পর্কে তারা সতর্ক করেন। যাইহোক, বালী তার সতর্কবার্তা ভিত্তিহীন হিসাবে খারিজ করেন এই বলে যে, রামের মতো একজন ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির পক্ষে তার এবং সুগ্রীবের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ চলাকালীন তার প্রতি তীরনিক্ষেপ সম্ভবপর নয়। বালী তারার প্রতি সুগ্রীবকে হত্যা করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে বেরিয়ে যান৷[১৫]

তারার বিলাপ[সম্পাদনা]

তিরুপুল্লামঙ্গাই মন্দিরের মধ্যে ক্ষুদ্র প্যানেল, পশুপতিকোলি ভাল্লির (বালী) মৃত্যুর দৃশ্য ধারণ করে। বানরের মুখের আদলে চিত্রায়িত তারা তাঁর চরণে উপবিষ্ট হয়ে তাঁর মৃত্যুতে বিলাপরত

রামায়ণের সমস্ত ঘটনার সারসংক্ষেপযুক্ত ’'বাল কাণ্ড গ্রন্থে, তারার বিলাপ একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়[১৬]

তারার বিচক্ষণ পরামর্শ উপেক্ষা করে বালী সুগ্রীবের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। লড়াই চলাকালীন রাম পিছন থেকে বালীর প্রতি একটি তীর নিক্ষেপ করেন, তাতে বালী মারাত্মকভাবে আহত হন। বালীর মৃত্যুর খবর তারার কাছে পৌঁছাতেই তিনি অঙ্গদের সঙ্গে তাকে দেখতে যান৷ তিনি দেখলেন যে, বানরেরা ত্রস্ত অবস্থায় সেই পথে দৌড়াচ্ছে। তারা তাকে প্রাসাদে ফিরে যেতে উপদেশ দিল এবং অঙ্গদকে রাজা হিসেবে আসীন হতে বলল। তারা অসম্মতি প্রকাশ করে বললেন যে, তিনি প্রথমে তাঁর স্বামীকে দেখতে চান এবং তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে বালীর কাছে নিয়ে যেতে বললেন। [৯][১৭] মৃত্যুপথযাত্রী বালীকে আলিঙ্গন করে, সুগ্রীব এবং রামকে ধিক্কার দিতে দিতে তারা তাঁর মৃত্যুতে বিলাপ করতে লাগলেন। রুমাকে দখল এবং সুগ্রীবকে নির্বাসিত করার শাস্তি হিসেবে তারা বালীর মৃত্যুকে মেনে নিলেন।[১৮][১৯]

রামায়ণের উত্তর ভারতীয় পাণ্ডুলিপিগুলিতে, কিছু প্রক্ষেপ তারার বিলাপকে সম্প্রসারিত করে। তারা বৈধব্যের যন্ত্রনার কথা উল্লেখ করেন এবং তা থেকে মৃত্যুকে পছন্দ করেন। তিনি অন্যায়ভাবে বালীকে হত্যা করার জন্য রামকে দায়ী করেন এবং তাকে বলেন যে, যদি তাঁরা একটি বলিষ্ঠ জোট গড়তেন, বালী তাঁকে সীতা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারতেন। তারা তাঁর সতীত্বের[২০] ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে রামকে অভিশাপ দেন যে, তিনি সীতাকে পুনরুদ্ধারের পর শীঘ্রই হারাবেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, সীতা পৃথিবীর মধ্যে ফিরে যাবেন।[২১] অভিশাপের ঘটনাটি উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাণ্ডুলিপিগুলিতেও দেখা যায়।[২২] রামায়ণের বিভিন্ন দেশীয় সংস্করণ যেমনঃ সরলা দাস প্রণীত ওড়িয়া বিলঙ্ক রামায়ণ এ, তারার অভিশাপ পুনর্ব্যক্ত হয়।[৩] সীতার থেকে রামের বিচ্ছেদের উপরোক্ত অভিশাপ ছাড়াও বাংলা কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এর মধ্যে , তারা রামকে আরও একটি অভিশাপ দেন যে, পরের জন্মে তিনি বালী কর্তৃক নিহত হবেন।[৩][২৩] মহানাটক এবং আনন্দ রামায়ণ বর্ণনা করে যে, পরজন্মে বালী ব্যাধরূপে জন্মগ্রহণ করে রামের কৃষ্ণ অবতারকে বধ করেন।[৩]

হনুমান তারাকে তার ছেলে অঙ্গদের ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে দেখার জন্য সান্ত্বনা দেন। হনুমান প্রস্তাব দেন তার ক্ষতিপূরণ করতে অঙ্গদকে রাজপদে অধিষ্ঠিত করার জন্য, কিন্তু তারা বলেন যে, যেহেতু তার পিতৃব্য সুগ্রীব জীবিত, তাই এটি অযৌক্তিক।[৩][২৪] তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত, বালী সুগ্রীবকে পরিত্যাগ করার মূর্খামি স্বীকার করেন এবং সুগ্রীবকে সমর্থন করতে অঙ্গদ ও তারার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি ঘোষণা করেন যে:

"তারা .... সূক্ষ্ম বিষয়ে সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এবং ভবিষ্যতের বিভিন্ন পূর্বলক্ষণ সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জ্ঞানসম্পন্ন। সে যা-ই বলে তা নিঃসন্দেহে পালন করা উচিত, অন্যথায় তারার বিশ্বাসকে কিছুতেই নির্বাপিত করা উচিৎ নয়।"[২৫]

বালী রামকে এবিষয়ে যত্নবান হতে অনুরোধ করেন যে, তারার অপমান যাতে না হয় এবং সুগ্রীবকে উপদেশ দেন প্রশ্নাতীতভাবে তার উপদেশ অনুসরণ করতে।[৩][২৬]

তারা (ডানে), একজন মানুষ হিসেবে চিত্রিত, মৃত্যুপথযাত্রী বালীকে তার বাহুতে নিয়ে হাহাকাররত

বালী তারাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় মারা যান, তারা একটি বেদনাপূর্ণ এবং তীব্র তিরস্কারসূচক উক্তিতে তার মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেন।[২৭] লেফেবার-এর মতে, তারার বিলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে, যদি সম্পূর্ণরূপে যুক্ত না হয়ে থাকে, শত শত বছর ধরে বিস্তৃত করা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় পাণ্ডুলিপিগুলিতে, পরবর্তী কিছু প্রক্ষেপ তারার বিলাপকে সম্প্রসারিত করেছে, যেখানে তারা রামকে বলেন তাঁকে হত্যা করতে এবং তাঁকে বালীর নিকটে পৌঁছে দিতে৷ রাম তারাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, তার এই পূর্বনির্ধারিত ভবিতব্যকে মেনে নেওয়া উচিৎ।[৩][২৮] রাম তাকে নিশ্চয়তা দেন যে, তার এবং অঙ্গদের অধিকারসমূহ সুরক্ষিত হবে এবং তিনি "অব্যাহত আরাম" উপভোগ করবেন।[২৯] তিনি তারাকে বলেন যে, একজন বীরের স্ত্রীর ব্যক্তিগত দুঃখ ধরে রাখা উচিৎ নয়।[৯]

অধ্যাত্ম রামায়ণ-এ, যখন তারা বালীর মৃত্যুতে আর্তনাদরত, তখন রাম তাকে ধর্মোপদেশ দেন যে, শরীর ক্ষণজীবী, শুধুমাত্র আত্মা শাশ্বত; তিনি তাকে বালীর শরীরের ক্ষয়ে শোক না করতে নিষেধ করেন। তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন যে, "যদি শরীর অনিত্য হয়, তবে কেন সবাই আনন্দ এবং ব্যথা অনুভব করে"। রাম তাকে জানান যে, অহঙ্কারের (অহমিকা) কারণে মন কামনার দাসত্ব-শৃংখলে আবদ্ধ হয়। তিনি ঘোষণা করেন যে, তারা কর্মফল দ্বারা অস্পৃষ্ট থাকবে এবং জীবনের দাসত্ব থেকে মুক্ত হবে। তার ধর্মোপদেশ শুনে, এবং যেহেতু তিনি এক পূর্বজন্মে তার প্রতি গভীর অনুরক্ত ছিলেন, তাই তারা অহমিকা মুক্ত হয়ে আত্মোপলব্ধির পথে অগ্রসর হলেন।[৩০] তুলসীদাস-এর রামচরিতমানস-এও রামের এই উপদেশ বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু এটি শুধু দুটি পংক্তিতেই সংক্ষিপ্ত এবং সম্ভবত আগেকার পাঠ্য থেকে ধার করা।[৩১] রাম বলেন যে, শরীর বিনাশশীল, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর এবং এই কথা শুনে, জ্ঞানোদ্দীপ্ত তারা রামের প্রতি প্রণত হন এবং পরম ভক্তির আশীর্বাদলাভ করেন।[৩২]

রামায়ণের একটি সংস্করণে, বালীর মৃত্যুর পর তাঁকে নিজ হাতে রাজ্য সুস্থির করার প্রচেষ্টক হিসাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তিনি ঘোষণা করেন যে, "তাঁর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত, রাজা বালী আপনাদের (তার বিশ্বস্ত প্রজা) কাছে প্রার্থনা করেছেন আপনাদের ধর্মসম্মত রাজা হিসেবে তার ভাইকে [সুগ্রীব] অনুসরণ করতে।"[৩৩] অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিয়মাচরণে তারা ও সুগ্রীবের সহযোগিতায় অঙ্গদ বালীর শবদাহ করেন। [৩৪]

সুগ্রীবকে বিবাহ[সম্পাদনা]

বালী মৃত্যুর পর সুগ্রীব তারা সহ বালীর রাজত্ব অর্জন করেন।[১৪] রামায়ণে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবাহ বা আচারগত পরিশোধনের নথি নেই[৩৫]—রাম কর্তৃক রাবণের থেকে সীতা উদ্ধারের পর, তাকে যেমন অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল—যা তারাকে সুগ্রীবকে বিবাহের সময় কিংবা বালীর অনুমিত মৃত্যুর থেকে তার প্রত্যাবর্তনের পর তার কাছে ফিরে আসার সময় পালন করতে হয়েছিল।[৩৫] আনুষ্ঠানিক বিবাহর বর্ণনার ঘাটতি—কিছু সমালোচকের মতে—ইঙ্গিত দেয় যে, সুগ্রীবের সাথে তারার সম্পর্ক বিধবা পুনর্বিবাহ কিংবা বহুভর্তৃকত্ব কোনটিই নয়, বরং কেবল সুগ্রীবের দ্বারা ভোগকরণ।[৩৬] রাজা হিসেবে সুগ্রীবের রাজ্যাভিষেকের বিভিন্ন তথ্যসূত্রে, অঙ্গদকেও আপাত-উত্তরাধিকারী যুবরাজ হিসেবে (যখন তারাকে সুগ্রীবের স্ত্রী হিসাবে উল্লেখ করা হয়) বর্ণনা করা হয়েছে।[৩৫] অধ্যাত্ম রামায়ণ ঘোষণা করে যে, সুগ্রীব তারাকে অর্জন করেন।[৩৭]

যদিও বালীর রুমাকে অধিগ্রহণ—বড় ভাইয়ের তাঁর ভ্রাতৃবধূকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ— সর্বজন নিন্দিত; তবে তারার ক্ষেত্রে, বড় ভাইয়ের বিধবাকে তাঁর দেবরের বিবাহ একটি সামাজিক আদর্শ বলে মনে হয়। রামাশ্রয় শর্মা বিবেচনা করেন যে, তারা ও সুগ্রীবের বিবাহের ঘটনায় রামের নীরবতা কাজটিতে তাঁর অস্বীকৃতির সংকেত জ্ঞাপন করে না, বরং তিনি উচ্ছৃঙ্খল চরিত্রের বানরদের যৌন সম্পর্কের বিষয়টি—যেখানে তারা ও রুমা এই ভাইদের মধ্যে হাতের আদানপ্রদান ঘটাচ্ছেন—নিয়ে উদ্বিগ্ন নন।[৩৮] রামায়ণ উল্লেখ করে যে, সুগ্রীব নারীদের সাথে (রুমা ও তারা সহ, যাদের প্রতি তিনি লোলুপ ছিলেন) অবাধে যৌনকামনা চরিতার্থ করেন।[৩৯] যাইহোক, রামায়ণে অঙ্গদ সুগ্রীবকে তার মাতৃসমা বড় বৌঠাকুরাণীর সাথে কামলালসাপূর্ন বিবাহের জন্য সমালোচনা করেন।[৯][৪০] একটি রাজনৈতিক পরিণয় সত্বেও, তারা অনুগতভাবে সুগ্রীবের পরিচর্যা করেন।[৩৩]

রামায়ণের বিভিন্ন টিকা ইঙ্গিত দেয় যে, সুগ্রীবের বিধবা তারাকে বিবাহ করার কাজটি ন্যায়সম্মত ছিল। কাটক মাধব যোগীন্দ্র-এর অমৃতকাটক বলে যে, এই কাজটি সঙ্গত কারণ তারা পশু ছিল। নরেশ ভট্ট (রামবর্মা) প্রণীত তিলক তারাকে সুগ্রীবের বিবাহের যথার্থতা দেয় যেহেতু সুগ্রীব ছিলেন তাঁর মৃত স্বামীর ভাই। এটি আরও বলে যে, তারার পুনর্বিবাহ করা উচিত কারণ তিনি প্রথম তিনটি বর্ণের অন্তর্গত ছিলেন না এবং তরুণী ছিলেন।[৪১] বালী মৃত্যুর পর, তারার সুগ্রীবকে তার স্বামী হিসেবে গ্রহণের কাজটি অঙ্গদ এবং রাজ্যটির ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার জন্য তার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।[৩][৩৩]

রামাবতারম্-এর মত কিছু বিরল দৃষ্টান্তে, তারা পুনর্বিবাহ করেননি। সুগ্রীব তাকে এক মাতৃচরিত্ররূপে গ্রহণ করেন এবং তাকে অভিবাদন করেন।[৪২]

তারার লক্ষ্মণকে সান্ত্বনাপ্রদান[সম্পাদনা]

সুগ্রীবের তারার (বামে) সান্নিধ্য উপভোগহেতু লক্ষ্মণের আগমন

বর্ষাকালের সূচনা এবং সমাপ্তি ঘটল এবং রাম হতাশায় ভয় করতে লাগলেন যে, সীতার গমনচিহ্ন অনুসরণ করে তাকে উদ্ধার করতে সাহায্য করার সুগ্রীবের প্রতিশ্রুতি তিনি ভুলে গেছেন। রাম লক্ষ্মণকে কিষ্কিন্ধ্যায় পাঠালেন আত্মতুষ্ট রাজার তাকে সাহায্য করার প্রতিজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। ব্যূহবেষ্টিত নগরটিতে প্রবেশের বাধায় বিরক্ত হয়ে, লক্ষ্মণ নগরের ফটকে পদাঘাত করেন এবং তাঁর দৈবীশক্তির দ্বারা সুগ্রীব এবং বানরগণের রাজত্ব ধ্বংস করার হুমকির দেন। রাম যখন একাকীত্বে ভুগছেন, তখন সুগ্রীবের রামের প্রতি তাঁর সংকল্প লঙ্ঘনপূর্বক বস্তুগত এবং ইন্দ্রিয়গত আনন্দ উপভোগ লক্ষ্মণের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে।

যখন উত্তেজিত লক্ষ্মণ—সুগ্রীবের অন্দরমহলে এবং তার প্রমোদকক্ষে পৌঁছে—রামের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন না করার জন্য এবং তার প্রতিশ্রুতি বিস্মৃত হওয়ার জন্য সুগ্রীবকে ভর্ৎসনা করেন,[৪৩] রামায়ণের সমালোচনামূলক সংস্করণ বলে যে, তারা তখন স্বেচ্ছায় লক্ষ্মণের ক্রোধ শান্ত করতে হস্তক্ষেপ করে থাকেন।[৪৪] রামায়ণের কিছু অনুবাদ সংস্করণে এবং রামায়ণের উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় পাণ্ডুলিপিগুলিতে, রুমা নন, তারার মাঝে সুগ্রীব বিভোর থাকাকালীন লক্ষ্মণ এসে উপস্থিত হন।[৩][৪৫] দক্ষিণ ভারতীয় পাণ্ডুলিপিগুলি বর্ণনা করে যে, মদ্যপ সুগ্রীব কামলালসাময় পানভোজনোৎসবে মগ্ন থাকায় লক্ষ্মণের ক্রোধের প্রতি অবিদিত ছিলেন এবং সেজন্য তারাকে পাঠিয়েছিলেন তাকে প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে; কিছু সংস্করণে, তারাও সেসময় মাতাল ছিলেন।[৩][৩৩][৪৬] যদিও "অর্ধ-নিমীলিত চক্ষু এবং টলমল চলনভঙ্গি" সহ মত্ত ছিলেন, তবুও তারা লক্ষ্মণকে নিরস্ত্র করতে সম্ভবপর হয়েছিলেন।[৩] তারার নেশা মূল রামায়ণেও বর্ণিত, কিন্তু একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। তারাকে সর্বদা "ভালোবাসার নতুন সুখ" চরিতার্থ করতে সুগ্রীবের কাছে যাওয়ার জন্য, এক প্রমত্ত অবস্থার অভ্যাসশীল রমণী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। [৪৭]

রামায়ণ-এর বর্ণনা: তারার বলেন যে, সুগ্রীবের মনোযোগী হওয়া দরকার কারণ রামের মাধ্যমেই সুগ্রীব রাজপদ, রুমা এবং তাঁকে অর্জন করেছেন। তিনি সুগ্রীবের পক্ষসমর্থন করেন এই বলে যে, মহান ঋষি বিশ্বামিত্রও ইন্দ্রিয়সুখ দ্বারা প্রলুব্ধ হয়েছিলেন, সেখানে সুগ্রীব—নিছকই এক বনবাসী বানর—তার অতীতের কষ্ট দ্বারা অবসন্ন এবং শ্লথ হয়ে পড়েছেন, কিন্তু জাগতিক সুখে অংশগ্রহণ করেননি। তারা সুগ্রীবকে জানান যে, বালী তাঁকে বলেছিলেন রাবণ একজন প্রবল ক্ষমতাবান রাজা যাঁর সেবায় বিভিন্ন রাক্ষস নিয়োজিত। তিনি লক্ষ্মণকে মনে করিয়ে দেন যে, সুগ্রীবের মত একজন মিত্র ছাড়া, রাম কোনোভাবেই একটি শক্তিশালী শত্রুপক্ষকে পরাজিত করতে পারবেন না। তারা তাকে জানান, সুগ্রীব রাজধানীতে সকল বানর সেনাপতি ও সৈন্যবাহিনীকে তলব করেছেন।[৩][৪৪] অধ্যাত্ম রামায়ণেও একটি অনুরূপ বর্ণনা আছে, যেখানে লক্ষ্মণকে প্রশমিত করতে সুগ্রীব তারা, অঙ্গদ এবং হনুমানকে প্রেরণ করেন।[৪৮] একটি সংক্ষিপ্ত এক-পংক্তির বর্ণনায়, রামচরিতমানসে বলা হয়েছে যে, সুগ্রীব কর্তৃক প্রেরিত তারা এবং হনুমান রামের প্রশস্তিগান গেয়ে লক্ষ্মণকে শান্ত করতে সফল হয়েছিলেন।[৩২] রামাবতারম্-এ, সুগ্রীবের দাম্পত্যসঙ্গী না হয়েও, তারা লক্ষ্মণকে প্রশমিত করেন। তারার প্রথাগত বিশেষণ, চাঁদের মতো উজ্জ্বল, রামাবতারম্-এ তার সাদা বেশভূষাকে, বিধবার চিহ্নরূপে উল্লেখ করা হয়। লক্ষ্মণ তারাকে দেখে নিজের বিধবা মাতাকে স্মরণ করেছেন।[৪২]

তারা কর্তৃক প্রশমিত এবং পরবর্তীতে সুগ্রীবের দ্বারা প্রশংসিত হয়ে, লক্ষ্মণ তাকে মন্দ ব্যবহারের জন্য সুগ্রীবের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।[৪৯] শুধুমাত্র তারার কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই এই সঙ্কটটি এড়ানো গিয়েছিল।[৫০]

টিকাভাষ্য[সম্পাদনা]

অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা।
পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহাপাতক নাশনম্‌।।

বঙ্গানুবাদ
অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারামন্দোদরী
- এই পঞ্চকন্যাকে নিত্য স্মরণ করলে মহাপাপগুলি দূরীভূত হয়।[৫১]

নিষ্ঠাবান হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রত্যেক সকালে প্রার্থনার মাধ্যমে পঞ্চকন্যা: পাঁচজন কুমারী বা সতীকে নিত্য স্মরণ করে থাকেন; যদিও তাদের কেউই একজন আদর্শ নারী নন, যাদেরকে অনুকরণ করা যেতে পারে বলে মনে করা হয়।[৫২][৫৩][৫৪] তারা, অহল্যা ও মন্দোদরী সহ, রামায়ণের অন্তর্গত এবং বাকিরা মহাভারত থেকে উল্লিখিত।

তারা : আনসাংগ হিরোইন-এর লেখিকা ভি দেবিকা, একজন নারী হিসেবে তাঁর বর্ণনা করেছেন"একটি সমকক্ষ উপস্থাপনা ও তাঁর মতামত এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যেন তিনি অন্যতম একজন প্রতিনিধি।"[৩৩]রামায়ণ তারাকে, তাঁর স্বামী বালীর দ্বারা তীব্র প্রণয়প্রাপ্ত ও সম্মানিত, একজন নারী হিসাবে উপস্থাপন করে। তাঁর সম্মান এতটাই বেশি যে, বালীর প্রতি তাঁর পরামর্শে কখনও কখনও একটি আদেশের সুর থাকে।[৫৫]পঞ্চকন্যা: উইমেন অব সাবট্যান্স গ্রন্থে লেখক প্রদীপ ভট্টাচার্য, তারাকে "অস্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও আত্মবিশ্বাসসম্পন্ন একজন নারী.." হিসাবে বর্ণনা করেন।[৩] তাঁর স্বামীকে তারার ভক্তিও মহিমান্বিত হয়।[৫৬]

পাদটিকা[সম্পাদনা]

  1. Lefeber p. 234
  2. Mani p. 786
  3. Bhattacharya, Pradip (March–Apr 2004)। "Five Holy Virgins, Five Sacred Myths: A Quest for Meaning (Part I)" (PDF)Manushi (141): 7–8।  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)
  4. Goldman p. 316
  5. Freeman pp. 197–8
  6. Sudibyoprono pp. 536–7
  7. Pattanaik, Devdutt (২০০২)। The man who was a woman and other queer tales of Hindu lore। Harrington Park Press। পৃষ্ঠা 109। আইএসবিএন 1-56023-181-5 
  8. Meyer p. 411
  9. Mukherjee pp. 36–7
  10. Lefeber pp. 42, 157
  11. Lefeber p. 243
  12. Mani p. 106
  13. Lefeber pp. 84–5
  14. Ganguli, Kisari Mohan (১৮৮৩–১৮৯৬)। "SECTION CCLXXVIII"। The Mahabharata: Book 3: Vana Parva। Sacred texts archive। 
  15. Srinivasan pp. 149–50
  16. Goldman p.131
  17. Lefeber pp. 96–7
  18. Lefeber pp. 97–8
  19. Lefeber p. 250
  20. Shaw, Jane। "Chastity: definition"The Oxford Companion to the Body, cited at Answers.com। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মার্চ ২০১০A confusion of the terms ‘chastity’ and ‘celibacy’ has long existed. ‘Chastity’ — deriving from the Latin ‘castitas’, meaning ‘cleanliness’ or ‘purity’ — does not necessarily mean the renunciation of all sexual relations, but rather the temperate sexual behaviour of legitimately married spouses, for the purpose of procreation, or the sexual continence of the unmarried. 
  21. Lefeber p. 252
  22. Guruge p. 34
  23. Stewart, Tony K.; Dimock, Edward C. (২০০১)। "Krittibasa's Apochatic Critique of Rama's Kingship"। Richman, Paula। Questioning Ramayanas: a South Asian tradition। University of California Press। পৃষ্ঠা 254, 259। আইএসবিএন 0-520-22074-9 
  24. Lefeber pp. 99–100
  25. Lefeber p. 101
  26. Sharma p. 73
  27. Lefeber pp. 102–4
  28. Lefeber pp. 259–60
  29. Rao p. 57
  30. Nath pp. 168–9
  31. Tulsidasa's Shri Ramacharitamanasa p. 523
  32. Tulsidasa's Shri Ramacharitamanasa p. 516
  33. Devika, V.R. (অক্টোবর ২৯, ২০০৬)। "Women of substance: Tara : Unsung heroine"। The Week24 (48): 46। 
  34. Lefeber pp. 105–7
  35. Sharma p.48
  36. Guruge p. 203
  37. Nath p. 178
  38. Sharma pp. 97, 99–101
  39. Lefeber p. 115
  40. Singh, Sarva Daman (১৯৮৮)। Polyandry in Ancient India। Motilal Banarsidass Publ। পৃষ্ঠা 139–140। আইএসবিএন 81-208-0487-2 
  41. Lefeber p. 256
  42. Srinivasan p. 159
  43. Lefeber pp. 128–9
  44. Lefeber pp. 129–131
  45. Guruge p. 168
  46. Lefeber p. 286
  47. Meyer p. 328
  48. Nath pp. 182–3
  49. Lefeber pp. 131–2
  50. Rao p. 58
  51. Devika, V.R. (অক্টোবর ২৯, ২০০৬)। "Women of substance: Ahalya"। The Week24 (48): 52। 
  52. Mukherjee p. 36
  53. Mukherjee pp. 48–9
  54. Sharma p. 66
  55. Sharma p. 83
  56. Mukherjee p.50

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]