তামিল তাম্রশাসন
তামিল তাম্রশাসন হলো বিভিন্ন দক্ষিণ ভারতীয় রাজবংশের সদস্যের দ্বারা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে গ্রাম, চাষযোগ্য জমি বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদানের রাজকীয় সনদ তথা প্রমাণপত্র যা তাম্রলিপিতে জারি করা হত।[১] এগুলি বর্তমানে অতীতের রাজবংশসমূহের প্রত্নবস্তু। তামিলনাড়ুর ইতিহাস পুনর্গঠনে এই তাম্রফলকগুলির অধ্যয়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।[২] অনুদান সম্পর্কিত তামিল তাম্রলিপিগুলি দশম শতাব্দী হতে ঊনবিংশ শতাব্দী সময়ের এবং এগুলির বড় অংশ পাণ্ড্য ও চোল রাজবংশের বলে জানা যায়। এই ফলকগুলি সূত্র-লিপি উৎকিরণবিদ্যার তথা শিলালিপিবিদ্যার দিক থেকে মূল্যবান যেহেতু দক্ষিণ ভারতের মধ্যযুগীয় সময়ের সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের বিশেষ অন্তদৃষ্টি প্রদান করে এবং কালানুক্রমিক শূন্যস্থান পূরণে সহায়তা করে।
দক্ষিণ ভারতীয় শিলালিপি
[সম্পাদনা]তামিলনাড়ুর বেশিরভাগ শিলালিপিই তামিল ভাষায় লেখা। তবে ষষ্ঠ শতকের তাম্রলিপি ও শিলালিপি সংস্কৃতে এবং কিছু দ্বিভাষিকও লক্ষ্য করা গেছে।[২] ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিগত ১২০ বছরে বহু শিলালিপি আবিষ্কার করেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে অধ্যাপক ইউজিন হুল্টশ মাদ্রাজ সরকারের শিলালিপি বিশারদ নিযুক্ত হওয়ার পর পদ্ধতিগতভাবে দক্ষিণ ভারতীয় শিলালিপি সংগ্রহ শুরু করেন।
বর্তমানে বিদ্যমান তাম্রলিপিগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম লিপি হলো দশম শতাব্দীর। এগুলোর মধ্যে লাইডেন লিপি, সম্রাট প্রথম রাজরাজ চোলের পুত্র রাজেন্দ্র চোলের থিরুভালানগাদু অনুদান, সুন্দর চোলের আনবিল লিপি এবং বীর রাজেন্দ্র চোলের কন্যাকুমারী শিলালিপি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত এবং প্রকাশিত হয়েছে। এগুলি থেকে চোল সাম্রাজ্যের বংশতালিকা পাওয়া যায়।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কৃত থিরুভালানগাদুর তাম্রলিপিগুলো এখনও পর্যন্ত উদ্ধারকৃত তাম্রলিপির মধ্যে বৃহত্তম। সংস্কৃত ও তামিল ভাষায় লিপিবদ্ধ ৩১টি তাম্রফলক রয়েছে। এগুলিতে থিরুভালানগাদুর মন্দিরে প্রথম রাজেন্দ্র চোল প্রদত্ত অনুদানের বিবরণহ লিপিবদ্ধ।
চোল শিলালিপি
[সম্পাদনা]ভারত সরকারের চেন্নাইস্থিত জাদুঘরে আনুমানিক দশম শতকের একটি বিশেষ চোল তাম্রলিপি রয়েছে। এটি তামার আংটায় গাঁথা পাঁচটি তাম্রফলক সমন্বিত যার প্রতিটিতে আছে চোল সাম্রাজ্যের সিলমোহর। সিলমোহরে খোদিত আছে - ডান দিকে মুখ করে উপবিষ্ট বাঘ ও তার ডানদিকে দুটি মাছ। এই তিন মৃর্তির নিচে একটি ধনুক, উপরে একটি ছাতা ও দুটি চামর এবং প্রতিটির পাশে একটি করে প্রদীপ রয়েছে। সিলমোহরের চারপাশে গ্রান্থ হরফে উৎকীর্ণ - "রাজা পরমকেশরী বর্মন এমন এক অতুলনীয় শাসক, যিনি তাঁর রাজ্যের রাজাদের ন্যায়বিচার দিতেন, তাঁদের সঠিক পথে পরিচালনা করতেন"।
চোল সাম্রাজ্যের শিলালিপির একাংশ সংস্কৃতে এবং বাকি অংশ তামিলে লেখা হত।
ফলকগুলিতে চোল সম্রাট কো-পারা-কেশরীবর্মণ ওরফে উত্তম চোল তাঁর মন্ত্রীর অনুরোধে কাচ্ছিপ্পুতে (অধুনা কাঞ্চীপুরমে) রাজকীয় ফরমানের স্থান দিতেন যা কাচ্ছিপ্পুতে অবস্থিত বিষ্ণু মন্দিরে প্রদেয় নির্দিষ্ট কর সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি শিলালিপির বিষয়বস্তু নিশ্চিত করত এবং মন্দিরে সেবার জন্য গৃহীত ব্যবস্থার বর্ণনা থাকত।
প্রসঙ্গত, উত্তমা চোল ছিলেন প্রথম রাজরাজা চোলের পিতৃব্য এবং পূর্বসূরি।
চোল সাম্রাজ্যের তাম্রশাসন
[সম্পাদনা]তামিলনাড়ুর নাগাপট্টিনম জেলার কিলভেলুর তালুকে অবস্থিত ১৫০০-এর কিছু বেশি জনসংখ্যার গ্রাম আনাইমঙ্গলম ঐতিহাসিকভাবে চোল সাম্রাজ্যের আমলের বিখ্যাত তামার পাত বা তাম্রশাসনের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত ছিল। একাদশ শতাব্দীতে চোল রাজত্বকালে প্রথম রাজারাজার সময় এই আনাইমঙ্গলম গ্রামের রাজস্ব ও ভূমি অনুদান হিসেবে প্রদান করা হয়েছিল। তাম্রশাসনে অনুদানের উদ্দেশ্য ছিল নাগপত্তনমে অবস্থিত শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের শৈলেন্দ্র বংশের শাসক দ্বারা নির্মিত বৌদ্ধ বিহার, চূড়ামণি বিহারের পরিচালনা ও ব্যয়ভার বহন করা। চোল সাম্রাজ্যের বিশাল সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রসার এবং ধর্মীয় সহনশীলতার এক অনন্য নিদর্শন এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রাচীনকাল থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তুলে ধরে। ঐতিহাসিকভাবে ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ডাচদের কাছে চলে যায় চোল সাম্রাজ্যের প্রাচীন আনাইমঙ্গলম গ্রামের তাম্রশাসন তথা তামার প্লেট। স্থান হয় নেদারল্যান্ডস-এর লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে। সেকারণে আনাইমঙ্গলম গ্রামের তাম্রফলকগুলিকে 'লাইডেন প্লেটস্'ও বলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত ছিল।
একাদশ শতকের চোল সাম্রাজ্যের এই রাজকীয় সনদ প্রায় ৩০ কেজি ওজনের ২১ টি বড় এবং ৩ টি ছোট তামার পাতের সংগ্রহ যা একটি ব্রোঞ্জের আংটি দিয়ে একত্রিত করা এবং এগুলিতে রাজকীয় চোল সাম্রাজ্যের শিলমোহর লক্ষ্যনীয়।[৪]
২০২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মে তারিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী এবং নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মহামান্য শ্রী রব জেটেনের উপস্থিতিতে, লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার তাম্রফলকগুলি ভারত সরকারের কাছে ফিরিয়ে দেয়। ভারত সরকার, নেদারল্যান্ডসের সরকার এবং লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বছরের পর বছর চলা কূটনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে হস্তান্তর সম্পন্ন হয়।[৫]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ "Nature and Importance of Indian Epigraphy - Chapter IV"। সংগ্রহের তারিখ ১৭ মে ২০২৬।
- 1 2 "History and Culture of Tamil Nadu : As Gleaned from the Sanskrit Inscriptions"।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}:|url=অনুপস্থিত বা খালি (সাহায্য);|সংগ্রহের-তারিখ=এর জন্য|ইউআরএল=প্রয়োজন (সাহায্য) |archive-date=3 February 2010 |archive-url=https://web.archive.org/web/20100203131221/http://www.vedamsbooks.com/no48436.htm |url-status=dead }} - ↑ Rice, Benjamin Lewis (১৮৯৪)। Epigraphia Carnatica: Volume IX: Inscriptions in the Bangalore District। Mysore Department of Archaeology। সংগ্রহের তারিখ ৫ আগস্ট ২০১৫।
- ↑ "Restitution of Chola Copper Plates (May 16, 2026)"। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০২৬।
- ↑ "তাম্রলিপি ফেরত"। সংগ্রহের তারিখ ১৮ মে ২০২৬।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- দক্ষিণ ভারতীয় শিলালিপিসমূহ ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ১৫ এপ্রিল ২০১২ তারিখে।