তাবুক যুদ্ধ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

গাজওয়ে তাবুক বা তাবুক যুদ্ধ। এটি ছিলো ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবনের শেষ যুদ্ধ এবং যা রোম সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। তৎকালীন সময়ের অর্ধেক পৃথিবীর একচ্ছত্র শাসক রোম সম্রাটের সিরিয় গভর্নরের বিরুদ্ধে ৮ম হিজরীর জুমাদাল ঊলা মাসে পরিচালিত ‘মুতা’ অভিযানে এক অসম যুদ্ধে রোমকদের পিছুটানের ফলে আরব উপদ্বীপে মুসলিম শক্তির শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রভাব বিস্তৃত হয়। ইসলামের ইতিহাসে এটি তাবুক অভিযান নামেও পরিচিত। [১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

এ সময় মদীনার সাবেক আউস নেতা ও খৃষ্টান ধর্মীয় গুরু আবু আমের আর-রাহেব হোনায়েন যুদ্ধের পর সবদিক দিয়ে নিরাশ হয়ে অবশেষে সিরিয়ায় (শাম) চলে যান। কেননা এটি তখন ছিল খৃষ্টানদের কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে গিয়ে তিনি রোম সম্রাটকে মদীনা আক্রমণের জন্য প্ররোচনা দিতে থাকেন। এ উদ্দেশ্যে মদীনার মুনাফিকদের সাথে তিনি পুরা যোগাযোগ রাখেন এবং তাদেরকে দিয়ে তিনি মসজিদে ক্বোবার অদূরে ‘মসজিদে যেরার’ নির্মাণ করান মসজিদের মুখোশে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র হিসাবে। রোম সম্রাটকে তিনি বুঝাতে সক্ষম হন যে, মদীনায় হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিরুদ্ধে তার একটি বিরাট দল রয়েছে। যারা বাহ্যিকভাবে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর দলে মিশে আছে। বাইরে থেকে রোমকরা হামলা করলেই তারা ঘুরে দাঁড়াবে এবং রোমকদের সহজ বিজয় লাভ হবে।

একদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা অন্যদিকে আবু আমেরের এই প্ররোচনা রোম সম্রাটকে উৎসাহিত করল। পূর্ণরূপে শক্তি সঞ্চয়ের পূর্বেই উঠতি ইসলামী শক্তিকে নির্মূল করে দেবার সংকল্প নিয়ে তিনি ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্ত্ততি শুরু করেন। যাতে রোম সাম্রাজ্য সংলগ্ন আরব এলাকা থেকে ভবিষ্যতে কোনরূপ ফিৎনা বা বিদ্রোহ দেখা দেবার সুযোগ সৃষ্টি না হয়।[২]

মদীনায় রোমক ভীতি[সম্পাদনা]

রোম সম্রাটের ব্যাপক যুদ্ধ প্রস্ত্ততির খবর মদীনায় পৌঁছে গেলে মুসলমানদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভীতির সঞ্চার হয়। বিশেষ করে মুনাফিকদের অধিকমাত্রায় অপপ্রচারের ফলে সাধারণ ও দুর্বলমনা মুসলমানদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

রোমকদের যুদ্ধ যাত্রার খবর[সম্পাদনা]

এইরূপ ভীতিকর অবস্থার মধ্যে শাম থেকে মদীনায় আগত তৈল ব্যবসায়ী নাবাত্বী দলের মাধ্যমে সংবাদ পাওয়া গেল যে, রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস তার একজন বিখ্যাত সেনাপতির অধীনে ৪০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী প্রস্ত্তত করেছেন। যার মধ্যে লাখাম, জোযাম প্রভৃতি খৃষ্টান গোত্রগুলি সহ অন্যান্য আরব মিত্র গোত্রসমূহ রয়েছে। তাদের অগ্রবর্তী বাহিনীটি ইতিমধ্যে সিরিয়ার বালক্বা (البلقاء) নগরীতে পৌঁছে গেছে। খবরটি এমন সময় পৌঁছল, যখন ছিল গ্রীষ্মকাল এবং ফল পাকার মৌসুম। মানুষের মধ্যে ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্রে্যর তীব্র কষাঘাত। রাস্তা ছিল বহু দূরের এবং অতীব ক্লেশকর।[১][২]

যুদ্ধযাত্রা[সম্পাদনা]

আরব এলাকায় রোমকদের প্রবেশ করার আগেই তাদেরকে রোম সীমান্তের মধ্যেই আটকে ফেলার জন্যে যুদ্ধ কৌশল নেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। যাতে আরব ও মুসলিম এলাকা অহেতুক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অন্য সময় হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ‘তাওরিয়া’ করেন। অর্থাৎ একদিকে যাওয়ার কথা বলে অন্যদিকে যেতেন। কিন্তু এবার তিনি সরাসরি ঘোষণা করলেন যে, রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে হবে। অতঃপর এ ব্যাপারে তিনি সবাইকে জোরালোভাবে উৎসাহিত করতে থাকেন। যাতে ভীতি ঝেড়ে ফেলে সবাই যুদ্ধের জন্য জোরে শোরে প্রস্ত্ততি গ্রহণ করতে পারে। দেখা গেল যে, একমাত্র মুনাফিকরা ব্যতীত সবাই যুদ্ধে যাত্রার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। মক্কাবাসীদের নিকটে ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলির নিকটে খবর পাঠানো হ’ল। একই সময়ে সূরা তওবার অনেকগুলি আয়াত নাযিল হ’ল মুনাফিকদের যুদ্ধভীতির বিরুদ্ধে ও মিথ্যা ওযর-আপত্তির বিরুদ্ধে।[১]

দান[সম্পাদনা]

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সঙ্গী ইসলামে প্রথম খলিফা আবুবকর ছিদ্দীক তার সর্বস্ব এনে হাযির করলেন। আল্লাহ ও রাসূল ব্যতীত তার পরিবারের জন্য কিছুই ছেড়ে আসেননি। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি জিহাদ ফান্ডে দানের সূচনা করেন। অপর সঙ্গী ওমর ফারূক তার সমস্ত মাল-সম্পদের অর্ধেক দান করেন। ওসমান গণী পরপর পাঁচবারে হাওদাসহ ৯০০ উট, গদি ও পালান সহ ১০০ ঘোড়া, প্রায় সাড়ে ৫ কেজি ওযনের কাছাকাছি ১০০০ স্বর্ণমুদ্রা, প্রায় ২৯ কেজি ওযনের কাছাকাছি ২০০ উক্বিয়া রৌপ্য মুদ্রা দান করেন এবং যুদ্ধের ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক তৃতীয়াংশ তথা দশ হাজার সৈন্যের ব্যয়ভার তিনি গ্রহণ করেন । [১]

আব্দুর রহমান বিন আওফ ২০০ উক্বিয়া রৌপ্যমুদ্রা দান করেন। আববাস ইবনু আব্দুল মুত্ত্বালিবও অনেক সম্পদ দান করেন। আছেম বিন আদী ৯০ অসাক্ব অর্থাৎ প্রায় ১৩,৫০০ কেজি খেজুর জমা দেন। এতদ্ব্যতীত ত্বালহা, সা‘দ বিন ওবাদাহ, মুহাম্মাদ বিন মাসলামাহ প্রমুখ প্রচুর মাল-সম্পদ দান করেন। এভাবে এক মুদ, দুই মুদ করে কম-বেশি দানের স্রোত চলতে থাকে।

তাবুকের পথে মুসলিম বাহিনী[সম্পাদনা]

৯ম হিজরীর রজব মাসের এক বৃহস্পতিবারে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ৩০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সেনা অভিযান। এই সময় তিনি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ আনছারীকে মতান্তরে সেবা‘ বিন আরফাতা -কে মদীনার প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং হযরত আলীকে (সঃ) তার পরিবারের দেখাশুনার দায়িত্ব দিয়ে যান। কিন্তু মুনাফিকেরা তাকে ভীতু, কাপুরুষ ইত্যাদি বলে ঠাট্টা করায় ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি পুনরায় গিয়ে পথিমধ্যে সেনাদলে যোগ দেন।[১]

সেনাবাহিনীতে বাহক ও খাদ্য সংকট[সম্পাদনা]

সাধ্যমত দান-ছাদাক্বা করা সত্ত্বেও তা এই বিশাল সেনাবাহিনীর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে প্রতি ১৮ জনের জন্য একটি করে উটের ব্যবস্থা হয়। যার উপরে তারা পালাক্রমে সওয়ার হতেন। অনুরূপভাবে খাদ্য সংকট দেখা দেয়ায় তারা গাছের ছাল-পাতা খেতে থাকেন। যাতে তাদের ঠোটগুলো ফুলে যায়। পানির অভাবে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার উপক্রম হ’লে বাহন সংকট থাকা সত্ত্বেও তারা মাঝে-মধ্যে উট নহর করতে বাধ্য হ’তেন এবং উটের পিঠের কুঁজোতে (الكرش) সঞ্চিত পানি পান করতেন। বাহন ও খাদ্য-পানীয়ের এই কঠিন সংকটের কারণে তাবুক বাহিনীকে জায়শুল উসরাহ অর্থাৎ অভাব-অনটনের বাহিনী বলা হয়।[১]

পথিমধ্যে সেনাবাহিনী ব্যাপক হারে পানি সংকটে পড়ায় তারা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর নিকটে এসে পানির অভিযোগ পেশ করেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আল্লাহর নিকটে পানি প্রার্থনা করলেন। ফলে আল্লাহ বৃষ্টির মেঘ পাঠিয়ে দেন, যা বিপুল বৃষ্টি বর্ষণ করে। সেনাবাহিনী তৃপ্তি সহকারে পানি পান করেন এবং পাত্রসমূহ ভরে নেন।

উপদেশবাণী[সম্পাদনা]

মুসলিম বাহিনী তাবুকে অবতরণ করে যথারীতি শিবির স্থাপন করল এবং রোমকদের অপেক্ষা করতে থাকল। এই অবস্থায় আল্লাহর হাবিব ও ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তার সেনা দলের উদ্দেশ্যে একটি সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ ভাষণ দেন।

ফলাফল[সম্পাদনা]

মুসলিম বাহিনীর তাবুকে উপস্থিতির খবর শুনে রোমক ও তাদের মিত্ররা ভীত হয়ে দের সীমান্তের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শহরে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। তৎকালীন বিশ্বশক্তির এই বিনাযুদ্ধে পলায়নের ফলে সমস্ত আরব উপদ্বীপে মুসলিম শক্তির জন্য এমন সব অযাচিত রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়। যেমন-

  1. আয়লার খৃষ্টান শাসনকর্তা ইউহান্নাহ বিন রু’বাহ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সাথে সন্ধি করেন এবং তাঁকে জিযিয়া প্রদান করেন।
  2. আযরুহ ও জারবা -এর নেতৃবৃন্দ এসে জিযিয়া প্রদান করে।
  3. হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাদের প্রত্যেককে সন্ধির চুক্তিনামা প্রদান করে, যা তাদের কাছে রক্ষিত থাকে। শুধুমাত্র জিযিয়ার বিনিময়ে তাদের জান-মাল-ইযযত ও ধর্মের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার নিশ্চয়তা দেয়া হয়।
  4. মুসলিম প্রধান দূমাতুল জান্দালের শাসনকর্তা উকায়দিরের কাছে ৪২০ জন অশ্বারোহী সৈন্যের একটি বাহিনী সহ খালেদ বিন ওয়ালীদকে প্রেরণ করেন। যাত্রাকালে তিনি বলে দেন যে, إ ‘তুমি তাকে জংলী নীল গাভী শিকার করা অবস্থায় দেখতে পাবে।’ সেটাই হ’ল। চাঁদনী রাতে দুর্গটি পরিষ্কার দেখা যায়, এমন দূরত্বে পৌঁছে গেলে হঠাৎ দেখা গেল যে, একটি নীল গাভী জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে দুর্গদ্বারে শিং দিয়ে গুঁতা মারছে। এমন সময় উকায়দির গাভীটাকে শিকার করার জন্য লোকজন নিয়ে বের হলেন। এই সুযোগে খালেদ তাকে বন্দী করে ফেললেন।
  5. সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে রোমক বাহিনীর সাথে কোনরূপ সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয় ছাড়াই বিজয় সম্পন্ন হয়।
  6. বিশ্বশক্তি রোমকবাহিনীর যুদ্ধ ছাড়াই পিছু হটে যাওয়ায় মুসলিম শক্তির প্রভাব আরব ও আরব এলাকার বাইরে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
  7. রোমকদের কেন্দ্রবিন্দু সিরিয়া ও তার আশপাশের সকল খৃষ্টান শাসক ও গোত্রীয় নেতৃবৃন্দ মুসলিম শক্তির সাথে স্বেচ্ছায় সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষর করে। ফলে আরব এলাকা বহিঃশক্তির হামলা থেকে নিরাপদ হয়।
  8. শুধু অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি হিসাবে নয়, সর্বোচ্চ মানবাধিকার নিশ্চিতকারী বাহিনী হিসাবে মুসলমানদের সুনাম-সুখ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে খৃষ্টানরা মুসলমান হয়ে যায় ।

মুহাম্মদকে হত্যার চেষ্টা[সম্পাদনা]

মুবারকপুরী বলেন, মদীনায় ফেরার পথে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) (ছাঃ) একটি সংকীর্ণ গিরিসংকট অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তার সাথে কেবল আম্মার বিন ইয়াসির ও হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান ছিলেন। প্রথমোক্ত জন রাসূলের উষ্ট্রীর লাগাম ধরে সামনে হাঁটছিলেন এবং শেষোক্ত জন পিছনে থেকে উষ্ট্রী হাঁকাচ্ছিলেন। মুসলিম বাহিনী তখন পিছনে উপত্যকায় ছিল। ১২ জন মুনাফিক যারা এতক্ষণ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, তারা মুখোশ পরে দ্রুত এগিয়ে এসে ঐ গিরিসংকটে প্রবেশ করল এবং পিছন থেকে অতর্কিতে রাসূলকে হত্যা করতে উদ্যত হল। হঠাৎ পদশব্দে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) পিছন ফিরে তাকান এবং তার সঙ্গী হুযায়ফাকে ওদের ঠেকানোর নির্দেশ দেন। হুযায়ফা তার ঢাল দিয়ে ওদের বাহনগুলির মুখের উপরে আঘাত করেন। ‘তারা চেয়েছিল সেটাই করতে, যা তারা পারেনি’ (তওবাহ ৯/৭৪)।

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]