বিষয়বস্তুতে চলুন

তাবুকের অভিযান

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(তাবুকের যুদ্ধ থেকে পুনর্নির্দেশিত)
তাবুকের অভিযান
غزوة تبوك
তারিখ: ৯ হিজরি/৬৩০ খ্রি.
স্থান: তাবুক, সৌদি আরব
ফলাফল: মুসলিম বাহিনীর বিজয় লাভ
প্রতিপক্ষ
ইসলামি বাহিনী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য
সেনানায়কবৃন্দ
নবি মুহাম্মাদ হিরাক্লিয়াস
শক্তি
৩০,০০০ ৪০,০০০
ইসলামি বিজয়াভিযানের মানচিত্র (তাবুকসহ)

তাবুকের অভিযান ( আরবি: غزوة تبوك; গাযওয়াতু তাবুক) ছিল ইসলামের নবি মুহাম্মাদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযান। এটি “কষ্টের অভিযান” ( গাযওয়াতুল উসরা) নামেও পরিচিত; কারণ অভিযানটি গ্রীষ্মে সংঘটিত হয় এবং আবহাওয়ার তীব্রতার কারণে মুসলমানরা প্রচুর কষ্ট ভোগ করেন। এটি নবম হিজরির শাওয়ালে ( অক্টোরব, ৬৩০ খ্রি.) সংঘটিত হয়। মূলত উত্তর আরবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সম্ভাব্য আক্রমণের খবর পাওয়ার প্রেক্ষিতে এই অভিযান শুরু করা হয়। নবি মুহাম্মদ প্রায় ৩০,০০০ সৈন্যের একটি বৃহৎ বাহিনী নিয়ে উত্তর আরবের তাবুকের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। তাবুক আকাবা উপসাগরের নিকটে অবস্থিত, যা বর্তমান উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের অন্তর্ভুক্ত।[][][]

যদিও এই অভিযানে কোনো সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, তবে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অভিযান ছিল। এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে ইসলামি শক্তির উপস্থিতি সুস্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হয় এবং এর ফলে মুসলমানদের সাথে বিভিন্ন গোত্র ও সীমান্তবর্তী শক্তির সঙ্গে কৌশলগত জোট ও চুক্তি সম্পাদিত হয়।

পটভূমি

[সম্পাদনা]

মক্কা বিজয়ের পরপর সংঘটিত হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের ফলে আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। এই বিজয়ের মাধ্যমে নবগঠিত ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তি আরো সুদৃঢ় হয় এবং আরবের বিভিন্ন গোত্র ইসলামের প্রভাব ও নেতৃত্ব স্বীকার করতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে নবি মুহাম্মদের নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নেতৃত্বে শাম অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ করছে।[] আরো বলা হয় যে, তারা তাদের মিত্র আরব খ্রিস্টান গোত্র, বিশেষ করে গাসসানীয় গোত্রের সহায়তায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এসব সংবাদ মুসলমানদের কাছে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়; কারণ শাম কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং বাইজেন্টাইনদের সামরিক শক্তিও সুসংগঠিত ছিল।[]

ঐতিহাসিক সূত্রগুলিতে এই সংবাদের সত্যতা নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী, তখন ধারণা করা হয় যে, সম্রাট হিরাক্লিয়াস দক্ষিণ সিরিয়ার বালকায় একটি বৃহৎ সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছেন। এই তথ্য মুসলমানদের মধ্যে সতর্কতা সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী অভিযানের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলে। তবে অনেক আধুনিক গবেষক ও ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, তখন প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য হয়তো অতিরঞ্জিত ছিল অথবা নিশ্চিত প্রমাণভিত্তিক ছিল না। তাঁদের মতে, বাইজেন্টাইনদের পক্ষ থেকে সরাসরি ও ব্যাপক আক্রমণের প্রস্তুতির বিষয়টি সম্ভবত গুজব বা সীমিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রচারিত হয়েছিল। ফলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে ভিন্নমত দেখা যায়।[]

প্রস্তুতি ও সৈন্য সমাবেশ

[সম্পাদনা]

এই প্রেক্ষিতে নবি মুহাম্মদ সৈন্যসমাবেশের আহ্বান জানান। এই অভিযানটি প্রচণ্ড গরম ও তীব্র খরার সময়ে পরিচালিত হয়, যা মুসলমানদের ঈমানি দৃঢ়তাকে কঠোরভাবে পরীক্ষা করে। কুরআন এই অভিযানকে “কষ্টের অভিযান” হিসেবে উল্লেখ করেছে [কুরআন ৯:১১৭], যেখানে অভিযানে দুর্ভোগ এবং এতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু সাহাবির প্রাথমিক অনীহার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।[][]

সেনাবাহিনীটিতে মোট প্রায় ৩০,০০০ সৈন্য ছিল, যার মধ্যে ১০,০০০ জন অশ্বারোহী ছিল, যা তৎকালীন মুসলমানদের সর্ববৃহৎ বাহিনী ছিল।[] উসমান ইবনে আফফানের মতো ধনী সাহাবিরা এতে আর্থিক ও সামগ্রীগতভাবে উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করেন। ইবনে হিশাম উল্লেখ করেন, উসমান পুরো সেনাবাহিনীর এক-তৃতীয়াংশের ব্যয়ভার বহন করেন এবং ১,০০০ স্বর্ণ দিনার দান করেন।[১০]

মুসলিম বাহিনী মদিনা থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার উত্তরে অগ্রসর হয়ে নবম হিজরির রজব মাসে (অক্টোবর, ৬৩০ খ্রি) [১১][১২] তাবুকে পৌঁছে, যা আকাবা উপসাগরের নিকটে এবং বর্তমান সৌদি আরব ও জর্ডান সীমান্তের কাছে অবস্থিত। এটি তাঁর সর্ববৃহৎ ও শেষ সামরিক অভিযান ছিল।[১১]

অভিযান

[সম্পাদনা]

তিনি আলি ইবনে আবি তালিবকে মদিনার দায়িত্বে নিযুক্ত করে তাবুক অভিমুখে রওনা হন।[১৩] তিনি তাবুকে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করেন এবং ওই সময়ে আশপাশের নেতাদের সঙ্গে জোট গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ছিল আয়লাহ (বর্তমান আকাবা), জারবা ও আজরুহ অঞ্চলের শাসকরা, যারা নিরাপত্তা পাওয়ার বিনিময়ে জিজিয়া কর দিতে সম্মত হন। [১৪] বাইজেন্টাইন বাহিনীর কোনো উপস্থিতি দেখা না যাওয়ায়[] তিনি মদিনায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।[১৫] কিছু পণ্ডিত অনুমান করেন যে, হয়তো বাইজেন্টাইনরা নবি মুহাম্মদের আগমনের কথা শুনে সরে গিয়েছিল। কোনো যুদ্ধ সংঘটিত না হলেও অক্সফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব দ্য ইসলামিক ওয়ার্ল্ড অনুসারে, এই অভিযানের মাধ্যমে নবি মুহাম্মদ বাইজেন্টাইনদের উদ্দেশ্যে শক্তির প্রদর্শন করেন এবং তিনি মক্কা থেকে সিরিয়া অভিমুখী বাণিজ্যপথের উত্তরাংশের নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেন।[]

মদিনায় প্রত্যাবর্তন

[সম্পাদনা]

অভিযানটি কোনো যুদ্ধ ছাড়াই শেষ হলেও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল। মুসলিম বাহিনী মদিনায় ফিরে এলে সেখানে অবস্থানরত মুসলিমরা তাদের স্বাগত জানায়। এই অভিযান নবি মুহাম্মদের নেতৃত্বকে আরো সুদৃঢ় করে এবং ভবিষ্যতে আরব ভূখণ্ডে বাইজেন্টাইন হস্তক্ষেপকে নিরুৎসাহিত করে। [১০]

এছাড়াও এতে এমন কিছু ব্যক্তির ভণ্ডামি প্রকাশ পায়, যারা অভিযানে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। কুরআনে কয়েকটি আয়াতে তিরস্কার করা হয়েছে, বিশেষ করে সুরা তাওবায় [কুরআন ৯:৮১–৯৬] তাদের মুনাফিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরো পড়ুন

[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র

[সম্পাদনা]
  1. George F. Nafziger; Mark W. Walton (২০০৩), Islam at War: A History, Praeger Publishers, পৃ. ১৩
  2. Welch, Alford T.; Moussalli, Ahmad S. (২০০৯)। "Muḥammad"Esposito, John L. (সম্পাদক)। The Oxford Encyclopedia of the Islamic World। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫৩০৫১৩-৫
  3. 1 2 3 Welch, Alford T.; Moussalli, Ahmad S. (২০০৯)। "Muḥammad"Esposito, John L. (সম্পাদক)। The Oxford Encyclopedia of the Islamic World। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫৩০৫১৩-৫
  4. George F. Nafziger; Mark W. Walton (2003), Islam at War: A History, Praeger Publishers, p. 13
  5. Hitti, Philip K. (1957-04-01). "Muhammad at Medina. By W. Montgomery Watt. (New York: Oxford University Press. 1956. Pp. xiv, 418. $6.75.)". The American Historical Review. 62 (3): p. 605–606
  6. Crone, Patricia (1983-04-01). "Fred Mcgraw Donner. The Early Islamic Conquests. (Princeton Studies on the Near East.) Princeton: Princeton University Press. 1981. Pp. xviii, 489. $35.00". The American Historical Review. 88 (2): P. 440–442
  7. Berg, Herbert (২৩ ডিসেম্বর ২০২১)। "Abū Jaʿfar Muḥammad b. Jarīr al-Ṭabarī, Selections from The Comprehensive Exposition of the Interpretation of the Verses of the Qurʾān. Translated by Scott C. Lucas"Journal of the American Oriental Society১৪১ (4): ৯৯৬। ডিওআই:10.7817/jaos.141.4.2021.br014আইএসএসএন 2169-2289
  8. Muir, William (১০ আগস্ট ২০০৩)। Life of MahometKessinger Publishing Co। পৃ. ৪৫৪। আইএসবিএন ৯৭৮-০-৭৬৬১-৭৭৪১-৩
  9. Lings, Martin (২০০৬)। Muhammad: his life based on the earliest sources। Rochester, Vt: Inner Traditions। পৃ. ৩০৯। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৯৪৭৭-১৫৩-৮
  10. 1 2 Ibn Ishaq, Translated by A. Guillaume (২০০২)। Ibn Ishaq's Sirat Rasul Allah - The Life of Muhammad Translated by A. Guillaume। পৃ. ১৮৬।
  11. 1 2 Welch, Alford T.; Moussalli, Ahmad S. (২০০৯)। "Muḥammad"Esposito, John L. (সম্পাদক)। The Oxford Encyclopedia of the Islamic World। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫৩০৫১৩-৫
  12. Richard A. Gabriel (২০০৭), Muhammad: Islam's First Great General, University of Oklahoma Press, পৃ. ১৯৭, আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮০৬১-৩৮৬০-২
  13. Sachedina, Abdulaziz (২০০৯)। "ʿAlī ibn Abī Ṭālib"Esposito, John L. (সম্পাদক)। The Oxford Encyclopedia of the Islamic World। Oxford University Press। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৫৩০৫১৩-৫
  14. Richard A. Gabriel (২০০৭), Muhammad: Islam's First Great General, University of Oklahoma Press, পৃ. ১৯৭, আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮০৬১-৩৮৬০-২
  15. George F. Nafziger; Mark W. Walton (২০০৩), Islam at War: A History, Praeger Publishers, পৃ. ১৩