তাফসীর আল-বায়দাভী
| লেখক | নাসিরুদ্দিন আল-বায়জাবি |
|---|---|
| মূল শিরোনাম | أنوار التنز وأسرار التأويل |
| অনুবাদক | জিবরিল ফুয়াদ হাদ্দাদ |
| প্রকাশনার স্থান | শিরাজ, পারস্য |
| ভাষা | আরবি সংস্করণ এবং ১৪টি পাণ্ডুলিপি, ১২টি ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও ১৬টি সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে ইংরেজি অনুবাদ। |
| বিষয় | কুরআনের তাফসির |
| প্রকাশক | বিকন বুকস |
প্রকাশনার তারিখ | ১৭ জুলাই ২০১৬ |
| পৃষ্ঠাসংখ্যা | ৯০২ পৃষ্ঠা |
| আইএসবিএন | ৯৭৮০৯৯২৬৩৩৫৭৮ |
| সুন্নিদের নিকট অন্যতম প্রামাণিক কুরআনের তাফসির হিসেবে বিবেচিত। | |
আনওয়ারুত তানজিল ওয়া আসরারুত তাবিল (আরবি: أنوار التنزيل وأسرار التأويل; অর্থ: 'অবতরণের আলোকবর্তিকা ও ব্যাখ্যার রহস্যসমূহ'), যা মূলত তাফসিরে বায়জাবি (আরবি: تفسير البيضاوي) নামেই অধিক পরিচিত, হলো ১৩শ শতাব্দীর ইসলামি পণ্ডিত নাসিরুদ্দিন আল-বায়জাবি (মৃত্যু: ১৩১৯ খ্রিষ্টাব্দ) কর্তৃক রচিত কুরআনের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ধ্রুপদী সুন্নি ব্যাখ্যাগ্রন্থ বা তাফসির। এটি বিশেষ করে অনারব মুসলিম অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।[১]
এই গ্রন্থটি মূলত জমখশরি রচিত আল-কাশশাফ এর ওপর ভিত্তি করে সংকলিত হয়েছে। আল-কাশশাফ গ্রন্থে কিছু মুতাযিলা মতাদর্শের প্রতিফলন ছিল, যা আল-বায়জাবি সংশোধন করেছেন অথবা কিছু ক্ষেত্রে বর্জন করেছেন।[২] তাফসিরে বায়জাবি রচনার ক্ষেত্রে আল-বায়জাবি রাঘিব আল-ইসফাহানির মুফরাদাত আলফাজ আল-কুরআন এবং তার তাফসির, সেইসাথে ফখরুদ্দিন আল-রাজির তাফসিরে কাবির (বা মাফাতিহুল গায়ব) এর সাহায্য গ্রহণ করেছেন।[৩]
গ্রন্থটির শুরুতে একটি সংক্ষিপ্ত ভূমিকা রয়েছে, যেখানে লেখক কুরআনের আয়াতসমূহের ব্যাখ্যার গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে, কুরআনের তাফসির হলো সকল বিজ্ঞানের শীর্ষস্থানীয় শাখা। এরপর লেখক তার গ্রন্থের নামকরণ করেন এবং কুরআনের প্রথম সূরা আল-ফাতিহার ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে মূল আলোচনা শুরু করেন।[৪]
গুরুত্ব ও প্রভাব
[সম্পাদনা]ইসলামি পণ্ডিত জিবরিল ফুয়াদ হাদ্দাদের মতে, এই গ্রন্থটি "সাত শতাব্দী ধরে সকল তাফসিরের মধ্যে সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ হিসেবে টিকে আছে" এবং এটিকে "ইসলামের ইতিহাসে কুরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাগ্রন্থ" হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তাফসিরে বায়জাবি-কে কুরআনের আরবি ব্যাকরণ ও শৈলীগত ব্যবহারের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বিশ্লেষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুন্নি সাহিত্যে এটি কুরআনের অলৌকিকত্বের (ইজাজ মানাউয়ি ওয়া-লুগাউয়ি) অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। এর খ্যাতি ও প্রভাবের কারণে পরবর্তীকালে অসংখ্য পণ্ডিত এই গ্রন্থের ওপর টীকা ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ (হাশিয়া) রচনা করেছেন।[৫]
এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম মানসম্মত তাফসির গ্রন্থে পরিণত হয়েছে এবং বিভিন্ন মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে কুরআনের ব্যাখ্যার প্রধান পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি ইউরোপে প্রকাশিত (১৮৪৬-৪৮) প্রথম দিকের কুরআনের তাফসিরগুলোর মধ্যে অন্যতম।[৬]
বিবরণ
[সম্পাদনা]রচনার পর থেকেই সুন্নি ধর্মতাত্ত্বিকদের নিকট এই গ্রন্থটি এক অটল মর্যাদার অধিকারী। আরবি ভাষায় তাফসিরে বায়জাবি-র ওপর ১৩০টিরও বেশি ব্যাখ্যাগ্রন্থ বা হাশিয়া লেখা হয়েছে। ব্রোকেলম্যান (১৮৯৮) এ ধরনের ৮৩টি গ্রন্থের তালিকা তৈরি করেছেন, যার মধ্যে শিহাব উদ্দিন আল-খাফাজি (মৃত্যু: ১০৬৯ হিজরি/১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মুহাম্মদ বিন মুসলিহ উদ্দিন মুস্তফা আল-কুহি (মৃত্যু: ৯৫১ হিজরি/১৫৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) এর বহু খণ্ডের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। আল-বায়জাবির এই তাফসিরটি অনারব মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি ১০৮৫ হিজরি/১৬৭৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মালয় ভাষায় রচিত আবদ আল-রউফ আল-সিংকিলির পূর্ণাঙ্গ তাফসির তরজুমান আল-মুস্তাফিদ এর প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করেছে। পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার উচ্চতর স্তরে এটি একটি মৌলিক পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হয়।[৭]
লেখক পরিচিতি
[সম্পাদনা]আল-বায়জাবি ছিলেন কুরআনের তাফসির, ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একজন বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত।[৪] তিনি পারস্যের শিরাজ শহরের নিকটবর্তী বায়দা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন শাফিঈ-আশআরি পণ্ডিত, একজন বিচারক, একজন সুফি এবং একজন মুফাসসির। তিনি আইনশাস্ত্রে কট্টর শাফিঈ এবং ধর্মতত্ত্বে আশআরি মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন এবং শিয়া ও মুতাযিলা মতবাদের বিরোধী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস, আইনশাস্ত্র, আরবি ভাষা এবং ফারসি ভাষায় ইতিহাসের ওপর বেশ কিছু পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। শিরাজ শহরে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি তাবরিজে চলে যান এবং সেখানেই ৬৮৫ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।
আল-বায়জাবির পিতা ছিলেন ফারস প্রদেশের প্রধান বিচারপতি। তার দাদা ফখরুদ্দিন আলী আল-বায়জাবিও প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আল-বায়জাবি মূলত তার পিতার নিকট শিক্ষা লাভ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, তার শিক্ষকগণ এমন এক পরম্পরার অংশ যা সরাসরি ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত পৌঁছেছে। তার মতে, তার দাদা আবু হামিদ আল-গাজ্জালির (মৃত্যু: ১১১১ খ্রিষ্টাব্দ) ছাত্র পরম্পরার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।[৮]
সমালোচনা
[সম্পাদনা]আল-বায়জাবি তার লেখার সংক্ষিপ্ততার জন্য এবং কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। কিছু পণ্ডিত অভিযোগ করেছেন যে, তিনি জমখশরির আল-কাশশাফ থেকে কিছু মুতাযিলা দৃষ্টিভঙ্গি তার আনওয়ারুত তানজিল এ অন্তর্ভুক্ত হতে দিয়েছেন।[৭] তবে অধিকাংশ সুন্নি পণ্ডিত মনে করেন যে, তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই মতবাদগুলো সংশোধন করেছেন।
ইংরেজি অনুবাদ
[সম্পাদনা]এই গ্রন্থের একটি প্রধান ইংরেজি অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন জিবরিল ফুয়াদ হাদ্দাদ। হাদ্দাদ ব্রুনাই দারুসসালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (সোয়াসিস) ফলিত তুলনামূলক তাফসির বিভাগের একজন সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। তিনি লেবাননের বৈরুতে জন্মগ্রহণ করেন এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, লেবানন ও সিরিয়ায় পড়াশোনা করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি সিরিয়ার দামেস্কে নয় বছর (১৯৯৭-২০০৬) অবস্থান করে ১৫০ জনেরও বেশি শায়খের কাছ থেকে ইজাজত (সনদ) লাভ করেন। তাকে বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী মুসলিমের তালিকায় "পশ্চিমে ঐতিহ্যবাহী ইসলামের অন্যতম স্পষ্ট কণ্ঠস্বর" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।[৯]
হাদ্দাদ সংস্করণের বৈশিষ্ট্যসমূহ
[সম্পাদনা]জিবরিল ফুয়াদ হাদ্দাদ কর্তৃক সম্পাদিত ও অনূদিত সংস্করণে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- ব্রুনাইয়ের সুলতানের প্রতি উৎসর্গ।
- আনওয়ারুত তানজিল এর প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপির প্রচ্ছদ লিপি।
- অধ্যাপক ড. ওসমান বিন বকরের ভূমিকা।
- ভূমিকা অংশ:
- তাফসিরের ঐতিহ্যে আল-বায়জাবি ও তার গ্রন্থের অবস্থান।
- আল-বায়জাবির শিক্ষক ও শাফিঈ ফিকহের সিলসিলা।
- আইন, ব্যাকরণ, ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে বায়জাবির অন্যান্য কাজ।
- কুরআনের অলৌকিকত্ব এবং ভাষাগত জটিলতার ব্যাখ্যা।
- বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক আলোচনা: শরীরতত্ত্ব, আবহাওয়াবিদ্যা, ভূ-পদার্থবিদ্যা, ভ্রূণতত্ত্ব এবং মনোবিজ্ঞান।
- বায়জাবির প্রধান উৎসসমূহ: জমখশরি, আল-রাঘিব এবং আল-রাজি।
- সুফিবাদ: আল্লাহর দর্শন, নফসের বিনাশ এবং জান্নাতের সুখের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা।
- প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের নিকট এই গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা।
- পরিশিষ্ট:
- কারিগরি পরিভাষার আরবি-ইংরেজি শব্দকোষ।
- আল-বায়জাবি কর্তৃক উদ্ধৃত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের তালিকা।
- হাদিস ও প্রাচীন বর্ণনার সূচক।
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Oliver Leaman The Qur'an: An Encyclopedia Taylor & Francis, 2006 আইএসবিএন ৯৭৮০৪১৫৩২৬৩৯১ p. 118
- ↑ Imam al-Baydhawi। "Tafsir al-Bayḍāwī - Anwar al-Tanzil wa Asrar al-Ta'wil"। Looh Press; Islamic & African Studies।
- ↑ Dr. Gibril Fouad Haddad। "Tafsir al-Bayḍāwī: First Hizb, English"। UBD Press & Beacon Books।
- 1 2 al-Bayḍāwī's "Anwar al-tanzil wa asrar al-ta'wil" with Frontispiece. World Digital Library. সংগৃহীত: ২ অক্টোবর ২০১৭।
- ↑ Gibril Fouad Haddad। "Lights of Revelation & Secrets of Interpretation"। Beacon Books।
- ↑ "Baydawi"। Oxford Islamic Studies Online। ৩১ জুলাই ২০১৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত।
- 1 2 Oliver Leaman (২০০৬)। The Qur'an: An Encyclopedia। Routledge। পৃ. ১১৮। আইএসবিএন ৯৭৮১১৩৪৩৩৯৭৫৪।
- ↑ Gholamali Haddad Adel; Mohammad Jafat Elmi; Hassan Taromi-Rad (২০১২)। Quar'anic Exegeses: Selected Entries from Encyclopaedia of the World of Islam। EWI Press Ltd। পৃ. ১২২। আইএসবিএন ৯৭৮১৯০৮৪৩৩০৫৩।
- ↑ "Dr. Gibril Fouad Haddad"। University of Brunei Darussalam (UBD)। ৩১ জুলাই ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩০ জুলাই ২০১৭।
বহিঃসংযোগ
[সম্পাদনা]- জিবরিল ফুয়াদ হাদ্দাদ - ইউনিভার্সিটি ব্রুনাই দারুসসালাম ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে
- ইউটিউবে তাফসিরে বায়জাবির ওপর ড. জিবরিল ফুয়াদ হাদ্দাদের উপস্থাপনা
- তাফসীর আল-বায়দাভীর প্রতিটি সূরান্তে সন্নিবেশিত হাদীস - প্রকৃত, বৈশিষ্ট্য ও বিশুদ্ধতা বিচার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিএইচডি থিসিস।