তাপের যান্ত্রিক সমতা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বিজ্ঞানের ইতিহাসে, তাপের যান্ত্রিক সমতা বলতে বোঝায় যে, গতি এবং তাপের মধ্যে হওয়া পারস্পরিক বিনিময় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রদত্ত পরিমাণের কাজ একই পরিমাণ তাপ উৎপন্ন করতে পারে, যদি কাজটি সম্পূর্ণরূপে তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তাপের যান্ত্রিক সমতা এমন একটি ধারণা ছিল, যেটি উনিশ শতকে শক্তির নিত্যতার বিকাশ ও গ্রহণযোগ্যতা এবং তাপগতিবিজ্ঞানের অন্তর্নিহিত বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

ইতিহাস এবং অগ্রাধিকারের বিরোধ[সম্পাদনা]

তাপের যান্ত্রিক সমতা পরিমাপের জন্য জুলের যন্ত্রপাতি। এই যন্ত্রে পতনশীল ওজনের "কাজ" জলে মন্থনের "তাপে" রূপান্তরিত।

আনুমানিক ১৭৯৭ সালে জার্মানির মিউনিখে বেঞ্জামিন থম্পসন, কাউন্ট রামফোর্ড লক্ষ্য করেছিলেন অস্ত্রাগারে কামানের নল খননের সময় ঘর্ষণের ফলে উত্তাপ সৃষ্টি হয়। রামফোর্ড জলের মধ্যে একটি কামানের নল নিমজ্জিত করেছিলেন এবং একটি বিশেষ ভোঁতা খনন সরঞ্জাম দিয়ে খননের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে জলটি প্রায় আড়াই ঘন্টার মধ্যে ফোটানো যেতে যেতে পারে এবং ঘর্ষণজাত উত্তাপ সরবরাহ আপাতদৃষ্টিতে অফুরন্ত ছিল।

এই পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে, তিনি "অ্যান এক্সপেরিমেন্টাল এনকোয়ারি কনসার্নিং দ্য সোর্স অফ দ্য হিট হুইচ ইজ এক্সাইটেড বাই ফ্রিকশন" (১৭৯৮) (ফিলোজফিক্যাল ট্রানজাকশনস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি পৃষ্ঠা ১০২) লেখাটি প্রকাশ করেছিলেন।[১] এই বৈজ্ঞানিক পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠিত উত্তাপের তত্ত্বগুলির বিরুদ্ধে সারগর্ভ অভিযোগ উত্থাপন করেছিল এবং ১৯শ শতাব্দীতে তাপগতিবিজ্ঞানে বিপ্লব উপস্থিত করেছিল। রামফোর্ডের পরীক্ষাটি ১৮৪০ এর দশকে জেমস প্রেসকট জুলকে অনুপ্রাণিত করেছিল তাঁর পরীক্ষাগুলি করার জন্য। সমতা সম্পর্কে জুলের আরও সঠিক পরিমাপ ক্যালরীয় তত্ত্বের জায়গায় গতিতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮৪২ সালে, শীর্ষস্থানীয় জার্মান পদার্থবিজ্ঞান পত্রিকায়, জুলিয়াস রবার্ট ভন মায়ারও তাপ এবং কাজের সমতার ধারণাটি নিয়ে লিখেছিলেন। ১৮৪৩ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় জেমস প্রেসকট জুল স্বাধীনভাবে এই বিষয়ে তাঁর মত প্রকাশ করেছিলেন। ১৮৪০-১৮৪৩ সালে লুডউইগ এ. কোল্ডিং অনুরূপ কাজ করেছিলেন, যদিও তাঁর কাজটি তাঁর জন্মস্থান ডেনমার্কের বাইরে খুব প্রচারিত হয়নি।

১৮২০ এর দশকে নিকোলাস ক্লেমেন্ট এবং নিকোলাস লোনার্ড সাদি কার্নো যৌথভাবে একই সূত্র ধরে চিন্তাভাবনা করেছিলেন।[২] ১৮৪৫ সালে, জুল "দ্য মেকানিক্যাল ইকুইভ্যালেন্ট অফ হিট" শীর্ষক একটি লেখা প্রকাশ করেছিলেন। একক তাপ উৎপাদন করতে কতটা পরিমাণে যান্ত্রিক কাজ করতে হবে, তার একটি সংখ্যাসূচক মান, এই লেখায় তিনি নির্দিষ্ট করেছিলেন। বিশেষত জুল, এক পাউন্ড জলের এক ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা বাড়ানোর প্রয়োজনে ঘর্ষণ দ্বারা উৎপাদিত যান্ত্রিক কাজের পরিমাণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন এবং দেখেছিলেন প্রতিবারই মান সামঞ্জস্যপূর্ণ ৭৭৮.২৪ ফুট পাউন্ড (৪.১৫৫০ জুল·ক্যালরি−১) হচ্ছে। জুল দাবি করেছিলেন যে গতি এবং তাপের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় হতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রদত্ত পরিমাণের কাজ একই পরিমাণ তাপ উৎপাদন করে। ১৮৪৫ সালে ভন মায়ার তাপের যান্ত্রিক সমতুল্যের জন্য একটি সংখ্যাসূচক মানও প্রকাশ করেছিলেন তবে তাঁর পরীক্ষামূলক পদ্ধতিটি তেমন বিশ্বাসযোগ্য ছিল না।

যদিও ২০শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে একটি প্রমিত মান ৪.১৮৬০ জুল·ক্যালরি−১ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ১৯২০ এর দশকে, শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করা গিয়েছিল যে ধ্রুবকটি সম্পূর্ণভাবে জলের বিশিষ্ট তাপ। এই রাশিটি তাপমাত্রার সঙ্গে সামান্য পরিবর্তিত হয়,- ৪.১৭ থেকে ৪.২২ জুল·গ্রাম−১·°সেন্টিগ্রেড−১। এককে পরিবর্তনের কারণ হল পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়নের একক হিসাবে ক্যালোরির ব্যবহার লুপ্ত হওয়া।

ভন মায়ার এবং জুল এই দুজনেই শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় পদার্থবিজ্ঞানের পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করা সত্ত্বেও প্রাথমিক অবহেলা ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবে ১৮৪৭ সালের মধ্যে সে সময়ের অনেক শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী তাঁদের কাজের প্রতি মনোযোগী হয়েছিলেন। ১৮৪৭ সালে হারমান হেলহোটজ একটি লেখা প্রকাশ করেছিলেন, যেটি শক্তির নিত্যতার একটি চূড়ান্ত বিবৃতি হিসাবে বিবেচিত হয়। যদিও হোলহোটজ জুলের প্রকাশনাগুলি থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, তবুও তিনি শেষ পর্যন্ত জুল এবং ভন মায়ার উভয়কেই কৃতিত্ব দিয়েছিলেন।

১৮৪৭ সালেই, ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্স এর বার্ষিক সভায় জুল একটি উপস্থাপনা করেছিলেন, যেটি শুনতে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। শ্রোতাদের মধ্যে একজন ছিলেন উইলিয়াম থমসন। থমসন এই বিষয়ে কৌতূহলী ছিলেন তবে শুরুতে তাঁর সংশয় ছিল। পরের দুই বছর ধরে, থমসন জুলের তত্ত্বে ক্রমশ বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন, অবশেষে ১৮৫১ সালে তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ছাপার অক্ষরে স্বীকার করেছিলেন, একই সাথে তিনি ভন মায়ারকেও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। থমসন জুলের সাথে একসাথে কাজ করেছিলেন, মূলত চিঠিপত্রের মাধ্যমে। জুল পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন, পরীক্ষার ফলগুলি বিশ্লেষণ করে থমসন আরও পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই সহযোগিতাটি ১৮৫২ সাল থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। এর প্রকাশিত ফলাফলগুলি জুলের কাজ এবং গতিতত্ত্বে সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা আনার জন্য অনেক কিছু করেছিল।

যাইহোক, ১৮৪৮ সালে, ভন মায়ার প্রথম জুলের কাগজপত্র দেখেছিলেন এবং ফরাসী ফ্রেঞ্চ একাডেমি অফ সায়েন্সেস কে লিখেছিলেন অগ্রাধিকার দাবী করে। তাঁর চিঠিটি কমপ্টিস রেণ্ডাস পালেভল এ প্রকাশিত হয়েছিল এবং জুল দ্রুত তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। জুলের সাথে থমসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁকে বিতর্কের মধ্যে টেনে এনেছিল। তাঁরা পরিকল্পনা করেছিলেন যে যান্ত্রিক সমতার ধারণার জন্য জুল মেনে নেবেন ভন মায়ারের অগ্রাধিকারকে, কিন্তু পরীক্ষামূলক যাচাইকরণের স্বীকৃতিটি জুল নেবেন। থমসনের সহযোগী, সহকর্মী এবং আত্মীয়রা যেমন উইলিয়াম জন র‍্যাংকিন, জেমস থমসন, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, এবং পিটার গুথ্রি টেইট জুলের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।

যাইহোক, ১৮৬২ সালে, জন টিন্ডল, রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে বল এর[১] ওপর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যার মধ্যে তিনি ভন মায়ারকে তাপের যান্ত্রিক সমতার ধারণা করার ও পরিমাপ করার কৃতিত্ব দিয়েছিলেন। এখানে বলা দরকার থমসন এবং তাঁর চেনাশোনা গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর অনেক বাদানুবাদ ছিল, যা তিনি জনপ্রিয় বিজ্ঞানের অনেক পর্বে এবং সর্বসাধারণের সামনেও প্রকাশ করেছিলেন। থমসন এবং টেইট ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, এবং ফিলজফিক্যাল ম্যাগাজিন এবং আরও জনপ্রিয় গুড ওয়ার্ডসএর পাতায় অসম্মানকর প্রকাশ্য চিঠিপত্রের বিনিময় হয়েছিল। ভন মায়ারকে হতাশ করার চেষ্টায় টেইট এমনকি কোল্ডিংয়ের পক্ষ নিয়েও কথা বলেছিলেন।

টীকা[সম্পাদনা]

  1. ^ টেমপ্লেট:Early science terminology warning

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "IV. An inquiry concerning the source of the heat which is excited by friction"। সংগ্রহের তারিখ ১৩ অক্টোবর ২০২০ 
  2. Lervig, P. Sadi Carnot and the steam engine:Nicolas Clément's lectures on industrial chemistry, 1823-28. Br. J Hist. Sci. 18::147, 1985.

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Foucault, L. (1854) “Equivalent mécanique de la chaleur. M. Mayer, M. Joule. Chaleur spécifique des gaz sous volume constant. M. Victor Regnault”, Journal des débats politiques et littéraires, Thursday 8 June
  • Lloyd, J.T. (১৯৭০)। "Background to the Joule-Mayer Controversy"। Notes and Records of the Royal Society25 (2): 211–225। ডিওআই:10.1098/rsnr.1970.0030 
  • Sharlin, H.I. (১৯৭৯)। Lord Kelvin: The Dynamic Victorian। Pennsylvania State University Press। আইএসবিএন 0-271-00203-4 , pp. 154–5
  • Smith, C. (১৯৯৮)। The Science of Energy: A Cultural History of Energy Physics in Victorian Britain। Chicago University Press। আইএসবিএন 0-226-76421-4 
  • Smith, C. (2004) "Joule, James Prescott (1818-1889)", Oxford Dictionary of National Biography, Oxford University Press, <http://www.oxforddnb.com/view/article/15139, accessed 27 July 2005> (subscription required)
  • Zemansky, M.W. (1968) Heat and Thermodynamics: An Intermediate Textbook, McGraw-Hill, pp. 86–87

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]