তরঙ্গমুখ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

পদার্থবিজ্ঞানে, সময়ের সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল কোন তরঙ্গমুখ (ইংরেজি: wavefront) বলতে কোন তরঙ্গের ঐ সকল বিন্দুর সেট (সঞ্চারপথ) নির্দেশ করে, যেখানে বিন্দুগুলো সাইনুসয়েড এর সাথে একই দশায় অবস্থান করে।[১] যে ক্ষেত্রগুলোতে তরঙ্গের প্রতিটি বিন্দু, সময়ের সাপেক্ষে, একটি একক অস্থায়ী কম্পাঙ্ক সহকারে সাইন-সদৃশভাবে পরিবর্তিত হয়, সাধারণত কেবল ঐসব ক্ষেত্রেই এই পরিভাষাটি অর্থপূর্ণ হয়ে থাকে (অন্যথা তরঙ্গের দশা সুসংজ্ঞায়িত হয় না)।

তরঙ্গমুখ সাধারণত সময়ের সাথে সাথে চলমান প্রকৃতির। একমাত্রিক মাধ্যমের মধ্য দিয়ে অগ্রসরমান কোন তরঙ্গের তরঙ্গমুখ সাধারণত কতগুলো একক বিন্দু; দ্বিমাত্রিক মাধ্যমে এগুলো কতগুলো বক্ররেখা, এবং ত্রিমাত্রিক মাধ্যমে তা কতগুলো পৃষ্ঠতল (surface)।

কোন সমতল তরঙ্গের তরঙ্গমুখগুলো সমতল হয়।
কোন লেন্সের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর তরঙ্গমুখের আকৃতি পরিবর্তিত হয়।

কোন সাইন-সদৃশ সমতল তরঙ্গের জন্য, তরঙ্গমুখগুলো তরঙ্গের গতিপথের সাথে লম্বভাবে, এবং তরঙ্গের সাথে সাথে একই দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কোন সাইন-সদৃশ গোলকাকার (spherical) তরঙ্গের জন্য, তরঙ্গমুখগুলো হচ্ছে গোলক আকৃতির পৃষ্ঠতল যার ব্যাসার্ধ ক্রমশ বাড়তে থাকে। যদি কোন তরঙ্গমুখের বিভিন্ন বিন্দুতে এর সঞ্চরণ বেগ (speed of propagation) বিভিন্ন হয়, তাহলে প্রতিসরণের কারণ তরঙ্গমুখের আকৃতি এবং/ অথবা দিকবিন্যাস বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে লেন্স দ্বারা, কোন আলোকীয় তরঙ্গমুখের আকৃতি সমতল থেকে গোলকাকার, কিংবা বিপরীতক্রমে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

সরল তরঙ্গমুখ এবং সঞ্চরণ[সম্পাদনা]

আলোকীয় ব্যবস্থাগুলোকে ম্যাক্সওয়েল এর সমীকরণসমূহ দ্বারা বর্ণনা করা যায়। রৈখিকভাবে সঞ্চরণশীল তরঙ্গসমূহের (যেমন- শব্দ অথবা ইলেকট্রন রশ্মি) জন্য একই ধরনের তরঙ্গ সমীকরণ থাকে। তবে উপরিউক্ত সরলীকরণের সাপেক্ষে, হাইগেন এর নীতি হতে কোন মাধ্যম, যেমন- মুক্ত স্থান, দিয়ে কোন তরঙ্গমুখের সঞ্চরণ অনুমান করার জন্য একটি ত্বরিত পদ্ধতি পাওয়া যায়। এতে তরঙ্গমুখের গঠনপদ্ধতি নিম্নরূপ:

তরঙ্গমুখের প্রতিটি বিন্দুকে একটি নতুন বিন্দু উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি বিন্দু উৎসের প্রভাব বিবেচনা করে তা থেকে নতুন আরেকটি ক্ষেত্র নির্ণয় করা যায়। গণনামূলক অ্যালগরিদম অনেক ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। সরল তরঙ্গমুখের জন্য বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রগুলো সরাসরি নির্ণয় করা যায়। যেমন- কোন গোলকাকার তরঙ্গমুখের আকার একই থাকে, কেননা তা সবদিকে সমানভাবে শক্তি বণ্টন করে। তরঙ্গমুখের সাথে সর্বদা লম্বভাবে অবস্থানকারী, শক্তি প্রবাহের এমন দিকসমূহকে রশ্মি বলা হয়, যা অনেকগুলো নতুন তরঙ্গমুখের সৃষ্টি করে।[২]

তরঙ্গমুখের সবচেয়ে সরলতম আকার হচ্ছে সমতল তরঙ্গমুখ, যেখানে রশ্মিগুলো পরস্পরের সমান্তরাল থাকে। এ ধরনের তরঙ্গ হতে নিঃসৃত আলোকে কলিমেটেড রশ্মি (collimated; নিখুঁতভাবে সমান্তরাল, অনপসারী সরলরেখা বোঝাতে ব্যবহৃত পরিভাষা) বলা হয়ে থাকে। অতি বৃহদাকার কোন গোলকাকাকার তরঙ্গমুখের পৃষ্ঠচ্ছেদের জন্য একটি উত্তম মডেল হচ্ছে সমতল তরঙ্গমুখ; যেমন- সূর্যের আলো পৃথিবীতে আপতিত হয় গোলকাকার তরঙ্গমুখ হিসেবে, যার ব্যাসার্ধ প্রায় ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার (১ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক-একক)। অনেক ক্ষেত্রেই, পৃথিবীর ব্যাসের সাপেক্ষে এমন তরঙ্গমুখকে সমতল বলে ধরে নেওয়া যায়।

কোন সমসারক[৩] বা আইসোট্রপিক (isotropic[৪]) মাধ্যমে তরঙ্গমুখসমূহ সব দিকে আলোর বেগে গমন করে।

তরঙ্গমুখের অপেরণ[সম্পাদনা]

তরঙ্গমুখ পরিমাপ বা অনুমানের পদ্ধতিগুলোকে লেন্স আলোকবিদ্যার উন্নততর পদ্ধতি বলে বিবেচনা করা হয়, যেখানে লেন্সের পুরুত্ব কিংবা ত্রুটিজনিত কারণে একক কোন ফোকাস দূরত্বের অস্তিত্ব থাকে না। উৎপাদনের সুবিধার্থে, নিখুঁত লেন্সের পৃষ্ঠ গোলকাকৃতির (অথবা টোরয়ডাল (toroidal)) হয়ে থাকে, যদিও তাত্ত্বিকভাবে, আদর্শ পৃষ্ঠ অনিয়ত গোলাকার (aspheric; অ্যাস্ফেরিক) হওয়ার কথা। আলোকীয় ব্যবস্থায় এসব সীমাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট ত্রুটিসমূহকে বলা হয় আলোকীয় অপেরণ। সবচেয়ে পরিচিত ধরনের অপেরণের মধ্যে রয়েছে গোলকীয় অপেরণ (spherical aberration) এবং কোম্যা (coma)।[৫]

তবে অপেরণের আরও জটিল উৎসের অস্তিত্বও থাকতে পারে, যেমন- বৃহৎ দূরবীক্ষণ যন্ত্রে, বায়ুমণ্ডলের স্থানিক ভিন্নতার (spatial variations) কারণে সৃষ্ট প্রতিসরণাঙ্কের পার্থক্যের কারণে। কোন আলোকীয় ব্যবস্থায় আকাঙ্ক্ষিত নিখুঁত সমতলীয় তরঙ্গমুখ থেকে বিচ্যুতিকে বলা হয় তরঙ্গমুখ অপেরণ। তরঙ্গমুখ অপেরণ সচরাচর হয় নমুনাকৃত প্রতিরূপ (sampled image) হিসেবে নয়তো দ্বিমাত্রিক বহুপদী পদের সমষ্টি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আলোকীয় ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এসব অপেরণের মাত্রা কমানোকে আকাঙ্ক্ষিত বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

তরঙ্গমুখ সেন্সর এবং পুনর্গঠন পদ্ধতিসমূহ[সম্পাদনা]

তরঙ্গমুখ সেন্সর হচ্ছে এমন একটি যন্ত্র যা কোন আলোকীয় ব্যবস্থার তরঙ্গমুখের অপেরণ, একটি সুসংগত সংকেতের মাধ্যমে পরিমাপ করে ঐ ব্যবস্থার আলোকীয় গুণ বা গুণের অভাব বর্ণনা করে। এর একটি গতানুগতিক পদ্ধতি হচ্ছে শ্যাক-হার্টম্যান ক্ষুদ্রলেন্স (lenslet) সন্নিবেশ। অভিযোজনশীল আলোকবিদ্যা (adaptive optics), আলোকীয় পরিমাপবিদ্যা (optical metrology), এমনকি মানুষের চোখের অপেরণ পরিমাপ-সহ অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ বিদ্যমান। এই পদ্ধতিতে, একটি দুর্বল লেজার উৎস চোখে ফেলা হয় এবং অক্ষিপট দ্বারা সৃষ্ট প্রতিফলনের নমুনা গ্রহণ এবং তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়।

তরঙ্গমুখ সংবেদনের জন্য শ্যাক-হার্টম্যান পদ্ধতির বিকল্প পন্থাসমূহ ক্রমেই উদীয়মান। গাণিতিক পন্থাসমূহ, যেমন- দশা চিত্রায়ন (phase imaging) অথবা বক্রতা সংবেদন (curvature sensing), তরঙ্গমুখ অনুমানে সক্ষম। এই অ্যালগরিদমগুলো বিশেষায়িত তরঙ্গমুখ আলোকবিজ্ঞানের সহায়তা ছাড়াই, ভিন্ন ভিন্ন ফোকাস সমতল হতে গৃহীত প্রচলিত উজ্জ্বলক্ষেত্র চিত্র (brightfield images) হতে তরঙ্গমুখের চিত্র নির্ণয় করে। লেন্স সন্নিবেশের আকারের কারণে যেখানে শ্যাক-হার্টম্যান ক্ষুদ্রলেন্স সন্নিবেশ এর পার্শ্বীয় রেজোলিউশন সীমিত, সেখানে এই পদ্ধতিগুলো শুধুমাত্র তরঙ্গমুখ পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত ডিজিটাল চিত্রসমূহের রেজোলিউশন দ্বারা সীমাবদ্ধ। তবে তা সত্বেও, ঐ পদ্ধতিগুলো রৈখিকতাজনিত সমস্যায় জর্জরিত এবং দশা পরিমাপের ক্ষেত্রে, সেগুলো আসল শ্যাক-হার্টম্যান পদ্ধতির তুলনায় অনেক কম শক্তসমর্থ।

সফটওয়্যার দ্বারা দশা পুনর্গঠনের আরেকটি ব্যবহার হচ্ছে অভিযোজনশীল আলোকবিদ্যা ব্যবহার করে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ। একটি প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে রডিয়ার পরীক্ষা, যা তরঙ্গমুখের বক্রতা সংবেদন নামেও পরিচিত। এটা থেকে ভালো মাত্রায় সংশোধন পাওয়া যায় বটে, তবে এর সূচনা বিন্দু হিসেবে ইতোমধ্যে ভালো অবস্থায় আছে এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। প্রকৃতপক্ষে এমনটা ঘটে ওপরে উল্লিখিত রৈখিকতাজনিত সমস্যার কারণে। এজন্যই লোকজন পরবর্তী প্রজন্মের অভিযোজনশীল আলোকীয় ব্যবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের তরঙ্গমুখ সেন্সর (WFS) সংযোজন করে থাকে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Essential Principles of Physics, P. M. Whelan, M. J. Hodgeson, 2nd Edition, 1978, John Murray, আইএসবিএন ০-৭১৯৫-৩৩৮২-১
  2. University Physics – With Modern Physics (12th Edition), H. D. Young, R. A. Freedman (Original edition), Addison-Wesley (Pearson International), 1st Edition: 1949, 12th Edition: 2008, আইএসবিএন ০-৩২১-৫০১৩০-৬, আইএসবিএন ৯৭৮-০-৩২১-৫০১৩০-১
  3. "isotropy - Bengali Meaning - isotropy Meaning in Bengali at english-bangla.com | isotropy শব্দের বাংলা অর্থ"www.english-bangla.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-১০-১১ 
  4. "isotropic"The Free Dictionary 
  5. Encyclopaedia of Physics (2nd Edition), R.G. Lerner, G.L. Trigg, VHC publishers, 1991, ISBN (Verlagsgesellschaft) 3-527-26954-1, ISBN (VHC Inc.) 0-89573-752-3

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

পাঠ্যপুস্তক[সম্পাদনা]

গবেষণা সাময়িকী[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগসমূহ[সম্পাদনা]