ডেরিংকুয়ো ভূগর্ভস্থ শহর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পাতাল শহরের একটি পথ

ডেরিংকুয়ো ভূগর্ভস্থ শহর তুরস্কের মধ্য আনাতোলিয়ার কাপাদোশিয়ায় অবস্থিত । মাটির নিচে প্রায় ২৮০ ফুট গভীরে অবস্থিত শহরটির ছিল ১৮টি স্তর। এই স্তরগুলো জুড়ে ছিল স্কুল, গীর্জা, রান্নাঘর, গোয়াল, কবর সহ একটি সম্পূর্ণ শহর। প্রায় ২০,০০০ মানুষের বাসযোগ্য করে তৈরি করা হয়েছিল এটি। ১৯৬৩ সালে সাধারণ একটি বাড়ি মেরামতের সময় আবিষ্কৃত হয় মাটির নিচে লুকিয়ে রহস্যময় শহরটি।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

পাতাল শহরের বিদ্যালয়

তুরস্কের আনাতোলিয়ার ৩,৩০০ ফুট উঁচু মালভূমিতে অবস্থিত কাপাদোসিয়া ছিল অগ্নুৎপাতের জন্য বিখ্যাত। কয়েক মিলিয়ন বছর আগে এই এলাকাটিতে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছিল। সমস্ত এলাকা ডুবে গিয়েছিল ছাই ও লাভায়। পরবর্তীতে এই ছাই ও লাভা পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় নরম শিলায়।

আনাতোলিয়ার প্রাচীন অধিবাসীরা আবিষ্কার করে এই শিলা খোদাই করে ঘর বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব। তারা সেই নরম শিলা খুঁড়ে তৈরি করা শুরু করে ঘরবাড়ি ও আশ্রয়স্থল, মাটির নিচে তৈরি করে শহর। কাপাদোসিয়াতে মাটির নিচে এমন বহু স্থাপনা খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে এদের মধ্যে ডেরিংকুয়ো সবচেয়ে বিশাল ও গভীর হলো ।

আবিষ্কার[সম্পাদনা]

১৯৬৩ সালের ঐ এলাকার একজন বাসিন্দা তার বাড়ির দেয়ালের পিছনে একটি রহস্যময় কক্ক্ষ খুুঁযে পেয়ে আগ্রহী হয়ে আরো খুড়লে সুড়ঙ্গ টি পূন:আবিষ্কৃত হয়।[১]

নির্মাতা[সম্পাদনা]

কারা ঠিক কোন সময়ে এই শহরটির নির্মাতা তার সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ থেকে ১২০০ অব্দে ‘হিত্তিতি’দের রাজত্ব ছিলো আনাতোলিয়ায়। নানা দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধের ফলে হিত্তিতি সাম্রাজ্য ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই এলাকায় বলকান থেকে ‘ফ্রিজিয়ান’দের আগমন ঘটে। কেউ কেউ ধারণা করেন, ফ্রিজিয়ানদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্যই হিত্তিতিরা ডেরিংকুয়ো নির্মাণ করেছিল। আর হিত্তিতিরা যদি এই শহর তৈরি করে থাকে, তবে তা তারা তৈরি করেছিল খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের আগেই।

আবার কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মাটির নিচের এই শহর খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৮০০ অব্দের মধ্যে ফ্রিজিয়ানরাই তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে মিশরীয়, গ্রীক, আমেরিকান, সিরিয়ান লোকজনের আবির্ভাব ঘটে কাপাদোসিয়ায়। ইতিহাসে লিখিতভাবে গ্রীক সেনা ও ইতিহাসবিদ জেনোফোনের লেখায় কাপাদোসিয়ার এসব ভূগর্ভস্থ শহরের কথা সর্বপ্রথম দেখতে পাওয়া যায়। তিনি বহুকাল ধরে এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তার লেখা ‘অ্যানাবেসিস’ নামক বইতে তিনি লিখেছেন,

"এখানকার ঘরগুলো ছিল মাটির নিচে। ঘরের প্রবেশের মুখগুলো কুয়ার মতো হলেও নিচে ছিল যথেষ্ট প্রশস্থ। গবাদিপশুর যাতায়াতের জন্য ছিল সুড়ঙ্গ। তবে মানুষ যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করতো সিঁড়ি। ঘরগুলোতে ছাগল, ভেড়া, বাছুর সহ বিভিন্ন ধরনের পাখি পোষা হতো এবং প্রতিটি ঘরেই এদের সবার খাবারের ব্যবস্থা ছিল।"

অনেকে মনে করেন, বাইজেন্টাইন যুগে ডেরিংকুয়োর বর্ধন ও সংস্করণ করা হয়। তখন এটা ‘মালাকোপিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টানরা মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে এখানে আশ্রয় নিতো।[২][৩] এছাড়াও বহু জাতি বিভিন্ন দুর্যোগের সময়ে এটিকে আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যবহার করেছে।[৪][৫]

বৈশিষ্ট্য[সম্পাদনা]

গবেষকদের মতে কাপাদোসিয়াতে ভূগর্ভস্থ শহরের সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি। এদের মধ্যে সবচেয়ে গভীর ডেরিংকুয়ো। মাটির নিচের এই শহরের খনন কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। আঠারো স্তর বিশিষ্ট এই শহরের মাত্র আটটি স্তর এখন দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

পাথরের নরম শিলা খোদাই করে তৈরি করা হয়েছিল এই শহর। শহরটি জুড়ে রয়েছে বড় বড় সুড়ঙ্গ পথ। আর এই সুড়ঙ্গ পথগুলো যুক্ত করেছে খোদাইকৃত বিভিন্ন গুহাকে। এই গুহাগুলোতে প্রায় দশ হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারতো।

এসব গুহা ছাড়াও এখানে ছিল কয়েকটি উপাসনালয়, খাবারের দোকান, মদের ভান্ডার এবং স্কুল। এছাড়াও মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য ছিল কয়েকটি গোরস্থান। যতদিন না পর্যন্ত নিরাপদে মাটির উপরে গিয়ে এগুলো সৎকার করা যায়, ততদিন এগুলো মাটির নিচের গোরস্থানে সংরক্ষণ করা হতো। বিভিন্ন ঝোপঝাড়, দেয়াল ও বাড়ির উঠানের আড়ালে লুকানো ছিল প্রায় একশর মতো প্রবেশপথ। মাটির নিচের এই শহরে প্রবেশের প্রতিটি দ্বার বন্ধ করা থাকতো প্রায় ৫ ফুট চওড়া ও ৫০০ কেজি ওজনের গোলাকার পাথরের দরজা দিয়ে।

গোলাকার পাথরের এই দরজাগুলো শহরকে রক্ষা করতো নানা রকম বিপদের হাত থেকে। প্রতিটি স্তরে এগুলো এমনভাবে বসানো হয়েছিল যাতে প্রতিটি স্তর আলাদা আলাদাভাবে বন্ধ করে দেওয়া যায়। পুরো শহরজুড়ে বায়ুচলাচলের জন্য ছিল প্রায় কয়েক হাজার খাঁদ। এগুলোর একেকটি ছিল ১০০ ফুট গভীর।

শহরের তলদেশ দিয়ে একটি নদীর প্রবাহ ছিল। গোটা শহরজুড়ে তৈরি করা হয়েছিল অনেকগুলো কুয়া। এই কুয়াগুলো সেই নদীর সাথে যুক্ত ছিল। কুয়া থেকেই সংগ্রহ করা হতো নিত্যদিনের খাবার পানি।

ডেরিংকুয়োর তৃতীয় তলায় ছিল খিলানযুক্ত একটি পিপে আকৃতি প্রশস্ত কক্ষ। ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হতো এটি। প্রত্যেক বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা অংশ ছিল এই শিক্ষাকেন্দ্রের।

একটি ১৮০ ফুট চওড়া খাদ শহরের প্রধান কূপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এটি মাটির উপর এবং নিচে উভর দিকের মানুষই ব্যবহার করতে পারতো। শহরের তৃতীয় স্তরে ছিল তিন মাইল লম্বা একটি সুড়ঙ্গ। এটি দিয়ে পার্শ্ববর্তী ভূগর্ভস্থ শহর কায়ামাকলিতে যাওয়া যেত। এই পথটি বর্তমানে ভূমিধ্বসের ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

বৈরী আবহাওয়া থেকেও সুরক্ষা দিতো এই ডেরিংকুয়ো। প্রচন্ড গরম কিংবা তীব্র ঠান্ডা ও তুষারপাতের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতো এই শহর। উপরে যখন তীব্র গরম কিংবা শীত, নিচের এই শহরে তখন বিরাজ করতো আরামদায়ক আবহাওয়া। ফলে পশুপাখি কিংবা খাদ্যদ্রব্য খুব সহজে সংরক্ষণ করা যেত এই শহরে।

বর্তমান অবস্থা[সম্পাদনা]

১৯৬৯ সাল থেকে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় মাটির নিচের রহস্যময় শহর ডেরিংকুয়ো। গোটা শহরের মাত্র ১০ ভাগ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Sometimes Interesting। "Derinkuyu & The Underground Cities of Cappadocia"Sometimes Interesting। সংগ্রহের তারিখ মার্চ ২৯, ২০১৫ 
  2. Horrocks, Geoffrey C. (২০১০)। Greek: A History of the Language and Its Speakers। John Wiley & Sons। পৃষ্ঠা 403আইএসবিএন 978-1-4051-3415-6None the less, at the beginning of the 20th century, Greek still had a strong presence in Silli north-west of Konya (ancient Ikonion), in Pharasa and other villages in the region drained by the Yenice river (some 100km south of Kayeri, ancient Caesarea), and in Cappadocia proper, at Arabison (Arapsu/Gulsehir) north-west of Nevsehir (ancient Nyssa), and in the large region south of Nevsehir as far down as Nigde and Bor (close to ancient Tyana). This whole area, as the home of St Basil the Great (329-79), his brother St Gregory of Nyssa (335-94) and his friend St Gregory of Nazianzos (330-89), was of great importance in the early history of Christianity, but is perhaps most famous today for the extraordinary landscape of eroded volcanic tufa in the valleys of Goreme, Ihlara and Soganh, and for the churches and houses carved into the ‘fairy chimneys’ to serve the Christian population in the middle ages. Many of the rock cut churches, which range in date from the 6th to the 13th centuries, contain magnificent frescos. Away from the valleys, some of the villages have vast underground complexes containing houses, cellars, stables, refectories, cemeteries and churches, affording protection from marauding Arabs in the days when the Byzantine empire extended to the Euphrates, and serving later as places of refuge from hostile Turkish raiders. The most famous of these are at Kaymakli and Derinkuyu, formerly the Greek villages of Anaku (Inegi) and Malakopi (Melagob), where the chambers extended down over several levels of depths of up to 85 metres. 
  3. Darke, Diana (২০১১)। Eastern TurkeyBradt Travel Guides। পৃষ্ঠা 139–140। আইএসবিএন 978-1-84162-339-9The area became an important frontier province during the 7th century when Arab raids on the Byzantine Empire began. By now the soft tufa had been tunneled and chambered to provide underground cities where a settled if cautious life could continue during difficult times. When the Byzantines re-established secure control between the 7th and 11th centuries, the troglodyte population surfaced, now carving their churches into rock faces and cliffs in the Goreme and Sogamli areas, giving Cappadocia its fame today. […] At any rate here they flourished, their churches remarkable for being cut into the rock, but interesting especially for their paintings, relatively well preserved, rich in coloring, and with an emotional intensity lacking in the formalism of Constantinople; this is one of the few places where paintings from the pre-iconoclastic period have survived. Icons continued to be painted after the Seljuk conquest of the area in the 11th century, and the Ottoman conquest did not interfere with the Christian practices in Cappadocia, where the countryside remained largely Greek, with some Armenians. But decline set in and Goreme, Ihlara and Soganli lost their early importance. The Greeks finally ending their long history here with the mass exchange of populations between Turkey and Greece in 1923. 
  4. Kinross, Baron Patrick Balfour (১৯৭০)। Within the Taurus: a journey in Asiatic Turkey। J. Murray। পৃষ্ঠা 168। আইএসবিএন 978-0-7195-2038-9Its inhabitants were Cappadocian Greeks, who may have found a refuge here, perhaps from Roman, from Iconoclast, or later from Turkish and Mongol threats. Urgup itself was the Byzantine Prokopion; the Emperor Nicephoros Phocas is said to have passed this way, after his Cilician campaign; and the neighborhood was populous enough to support, at different times, a number of bishoprics. 
  5. Dawkins, R. M. (১৯১৬)। Modern Greek in Asia Minor. A study of dialect of Silly, Cappadocia and Pharasa.। Cambridge University Press। পৃষ্ঠা 17। সংগ্রহের তারিখ ২৫ অক্টোবর ২০১৪these excavations are referred to as long ago as the campaigns of Timour Beg, one of whose captains was sent to hunt out the inhabitants of Kaisariyeh, who had taken refuge in their underground dwellings, and was killed by an arrow shot through the hole in one of the doors.