ডানা রাফায়েল
ডানা লুইস রাফায়েল (৫ জানুয়ারি ১৯২৬ – ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬) ছিলেন একজন বিশিষ্ট আমেরিকান চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী। তিনি স্তন্যদানের একজন শক্তিশালী প্রবক্তা ছিলেন এবং প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে মাকে সহায়তা করার জন্য অ-চিকিৎসা কর্মী বা সেবাদানকারী নিয়োগের আন্দোলনের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি এই ধরণের সেবাদানকারীদের "ডুলা" নামে অভিহিত করতেন।[১] "ডুলা" শব্দটি (উচ্চারণ: ডু-লা; প্রাচীন গ্রিক ডোলি থেকে আগত, যার অর্থ নারী ক্রীতদাসী) ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত বই "দ্য টেন্ডার গিফট: ব্রেস্টফিডিং" এর মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করে।[২]
এছাড়াও তিনি "ম্যাট্রিসেন্স" শব্দটির প্রবর্তক ছিলেন। এটি হলো মাতৃত্বের সেই রূপান্তরকালীন পর্যায় বা উত্তরণ, যেখানে "নারীর শারীরিক অবস্থা, দলের মধ্যে তার মর্যাদা, আবেগীয় জীবন, দৈনন্দিন কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দু, আত্মপরিচয় এবং তার চারপাশের সবার সাথে সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে।"[৩]
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
[সম্পাদনা]ডানা লুইস রাফায়েল ১৯২৬ সালের ৫ জানুয়ারি কানেকটিকাটের নিউ ব্রিটেনে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা লুইস রাফায়েল ছিলেন একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোর চেইনের মালিক এবং মা ছিলেন নাওমি কাপলান। রাফায়েল নিউ ইয়র্ক সিটির কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে স্নাতক এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পিএইচডি গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী মার্গারেট মিড।[৪][৫] উল্লেখ্য যে, তার গবেষণা সবসময় সমাদৃত হয়নি; কলাম্বিয়ার কিছু শিক্ষক তাকে উপহাস করে "দ্য টিট লেডি" বা 'স্তন মানবী' বলে ডাকতেন।[৬]
কর্মজীবন
[সম্পাদনা]স্তন্যদান সংক্রান্ত কাজ
[সম্পাদনা]১৯৫০-এর দশকের প্রথাগত রীতিনীতি উপেক্ষা করে তিনি একটি অপ্রচলিত বিবাহ অনুষ্ঠান করেছিলেন এবং স্বামীর পদবি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। বোতলে দুধ খাওয়ানোর প্রচলিত প্রথার বিরোধিতা করলেও নিজের প্রথম সন্তানকে স্তন্যদান করতে গিয়ে তিনি বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হন।[৬] তিনি পরবর্তীতে বলেছিলেন, "দুধ নিঃসরণের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং সহায়তা আমার ছিল না। আমার ক্ষুধার্ত ছেলেটা যত চিৎকার করত, আমি তত বেশি অপরাধবোধে ভুগতাম।"[১]
তিনি লক্ষ্য করেন যে, মানব ইতিহাসের পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় আধুনিক যুগে নতুন মায়েদের জন্য সামাজিক সহায়তার অভাব রয়েছে। তাছাড়া যুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীর স্তনকে যৌনতার প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা স্তন্যদানের প্রতি নেতিবাচক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিল। তার গবেষণার পদ্ধতির মধ্যে ছিল নিউ ইয়র্ক সিটির বিভিন্ন মানুষের জরিপ এবং অন্যান্য দেশের মাতৃত্বের রীতিনীতি অধ্যয়ন করা।
১৯৭৫ সালে রাফায়েল এবং মিড মিলে 'দ্য হিউম্যান ল্যাকটেশন সেন্টার' প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল বিশ্বজুড়ে স্তন্যদানের ধরন গবেষণার জন্য নিবেদিত একটি প্রতিষ্ঠান।[৭] তাদের গবেষণায় দেখা যায় যে, দরিদ্র নারীরা প্রায়ই অপুষ্টি ও মানসিক চাপের কারণে স্তন্যদান করতে পারেন না এবং এসব ক্ষেত্রে ফর্মুলা দুধ গুরুত্বপূর্ণ এবং এমনকি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।[৬]
'ডুলা' ধারণার স্বীকৃতি
[সম্পাদনা]স্তন্যদান সংক্রান্ত কাজের সূত্র ধরেই 'ডুলা' ধারণাটির উদ্ভব ঘটে। গ্রিসে অবস্থানকালে তিনি এক নারীর কাছে জানতে পারেন যে 'ডুলা' অর্থ নারী ক্রীতদাসী। রাফায়েল মনে করেছিলেন যে, যিনি গৃহস্থালির অন্যান্য কাজ করে দিয়ে একজন সদ্য মাকে সহায়তা করেন, তার ভূমিকার সাথে 'সেবিকা' বা 'সহায়তাকারী' শব্দটি মানানসই। ১৯৬৬ সালে বিভিন্ন সংস্কৃতির স্তন্যদান প্রথা নিয়ে তার পিএইচডি গবেষণাপত্রে তিনি এই শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে একটি ম্যাগাজিন আর্টিকেলের মাধ্যমে তিনি শব্দটিকে জনসমক্ষে নিয়ে আসেন এবং ১৯৭৬ সালে তার বই "দ্য টেন্ডার গিফট: ব্রেস্টফিডিং" এ এটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
ম্যাট্রিসেন্স তত্ত্ব
[সম্পাদনা]মাতৃত্ব এবং প্রারম্ভিক শিশু যত্বের এই অধ্যয়নের একটি সামগ্রিক কাঠামো হিসেবে রাফায়েল 'ম্যাট্রিসেন্স' তত্ত্বের প্রবর্তন করেন। তিনি মাতৃত্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং জৈবিক উত্তরণ বা সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি লিখেছিলেন, "ম্যাট্রিসেন্স গর্ভধারণ এবং মাতৃত্বের চেয়েও বেশি কিছু," কারণ নারী কখন এবং কীভাবে মা হয় এবং শিশুদের যত্ন নেয়, এ বিষয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তার মতে, "শুধুমাত্র জন্মদান করলেই একজন নারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে মা হয়ে ওঠে না।"[৩]
ব্যক্তিগত জীবন
[সম্পাদনা]ডানা রাফায়েল হাওয়ার্ড বুন জ্যাকবসনকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের তিন সন্তান ছিল, সেথ, জেসসা এবং ব্রেট।[১][৭] তিনি তার দ্বিতীয় সন্তানকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত স্তন্যপান করিয়েছিলেন। তার তৃতীয় সন্তান ছিল দত্তক নেওয়া এবং রাফায়েল কৃত্রিমভাবে দুগ্ধ নিঃসরণ ঘটিয়ে তাকেও স্তন্যপান করিয়েছিলেন।[৫][৬]
২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কানেকটিকাটের ফেয়ারফিল্ডে নিজের বাড়িতে কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউরের জটিলতায় রাফায়েল মৃত্যুবরণ করেন।[৪]
নির্বাচিত প্রকাশনা
[সম্পাদনা]- বই
- বিয়িং ফিমেল: রিপ্রোডাকশন, পাওয়ার, অ্যান্ড চেঞ্জ (১৯৭৫), দ্য হেগ: মাউটন।
- দ্য টেন্ডার গিফট: ব্রেস্টফিডিং (১৯৭৬), নিউ ইয়র্ক: স্কোকেন বুকস।
- ব্রেস্টফিডিং অ্যান্ড ফুড পলিসি ইন আ হাঙ্গরি ওয়ার্ল্ড (১৯৭৯), নিউ ইয়র্ক: একাডেমিক প্রেস।
- অনলি মাদারস নো: প্যাটার্নস অফ ইনফ্যান্ট ফিডিং ইন ট্র্যাডিশনাল কালচারস (১৯৮৫), ওয়েস্টপোর্ট: গ্রিনউড প্রেস।
প্রবন্ধ
[সম্পাদনা]রাফায়েল, ডানা। "দ্য মিডওয়াইফ অ্যাজ ডুলা: এ গাইড টু মদারিং দ্য মাদার," জার্নাল অফ নার্স-মিডওয়াইফারি, ২৬(৬), নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৮১, পৃষ্ঠা ১৩-১৫।[৮]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 3 রবার্টস, স্যাম (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "ডানা রাফায়েল, স্তন্যদান এবং ডুলা ব্যবহারের প্রবক্তা, ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত"। নিউ ইয়র্ক টাইমস।
- ↑ রাফায়েল, ডানা (১৯৭৩)। দ্য টেন্ডার গিফট: ব্রেস্টফিডিং। এঙ্গলউড ক্লিফস, নিউ জার্সি: প্রেন্টিস-হল। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৩-৯০২৪৭৮-৮।
- 1 2 রাফায়েল, ডানা (১৯৭৫)। "ম্যাট্রিসেন্স, বিকামিং এ মাদার, এ "নিউ/ওল্ড" রাইট ডি প্যাসেজ"। বিয়িং ফিমেল: রিপ্রোডাকশন, পাওয়ার, অ্যান্ড চেঞ্জ। ডিগ্রুয়েটার। পৃ. ৬৫–৭১।
- 1 2 রবার্টস, স্যাম (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। "ডানা রাফায়েল, স্তন্যদান এবং ডুলা ব্যবহারের প্রবক্তা, ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত"। নিউ ইয়র্ক টাইমস।
- 1 2 "ডানা লুইস রাফায়েল (১৯২৬–২০১৬)"। এমব্রায়ো প্রজেক্ট এনসাইক্লোপিডিয়া।
- 1 2 3 4 জোন্স, ম্যাগি (২১ ডিসেম্বর ২০১৬)। "যাঁরা জীবনকে যাপন করেছেন: ডানা রাফায়েল"। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস।
- 1 2 "দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ক্লাব অফ রোম - জীবনী"।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: ইউআরএল-অবস্থা (লিঙ্ক) - ↑ রাফায়েল, ডি (নভেম্বর ১৯৮১)। "দ্য মিডওয়াইফ অ্যাজ ডুলা: এ গাইড টু মদারিং দ্য মাদার"। জার্নাল অফ নার্স-মিডওয়াইফারি। ২৬ (৬): ১৩–১৫।
- বিংশ শতাব্দীর আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী
- বিংশ শতাব্দীর আমেরিকান লেখিকা
- আমেরিকান স্বাস্থ্য ও সুস্থতা বিষয়ক লেখক
- চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী
- আমেরিকান নারী নৃবিজ্ঞানী
- ইহুদি আমেরিকান সমাজ বিজ্ঞানী
- ইহুদি আমেরিকান অ-কল্পকাহিনী লেখক
- স্তন্যদান বিষয়ক কর্মী
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্তন্যদান
- কলাম্বিয়া গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের প্রাক্তন শিক্ষার্থী
- কানেকটিকাটের ব্যক্তি
- ১৯২৬-এ জন্ম
- ২০১৬-এ মৃত্যু
- ২০শ শতাব্দীর মার্কিন লেখিকা
- মার্কিন নারী নৃবিজ্ঞানী
- ইহুদি মার্কিন অ-কল্পকাহিনী লেখক