বিষয়বস্তুতে চলুন

ডাকজি

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
স্কুইড গেম টিভি সিরিজে ব্যবহৃত নীল এবং লাল রঙের ডাকজি

ডাকজি (কোরীয়: 딱지; আরআর: ttakji; এমআর: ttakchi; আধ্বব: [t͈a̠k̚t͡ɕ͈i])[] হলো কোরিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলনা। এটি মূলত কাগজ ভাঁজ করে তৈরি করা হয়। এই খেলনাটি দিয়ে যে খেলাগুলো খেলা হয়, সেগুলোকে কোরীয় ভাষায় একত্রে ডাকজি চিগি (কোরীয়: 딱지치기; RR: ttakji chigi; MR: ttakchi ch'igi; আক্ষরিক অর্থে: "ডাকজি খেলা বা আঘাত করা"; IPA: [t͈a̠k̚t͡ɕ͈i t͡ɕʰiɡi]) বলা হয়। খেলার নিয়ম অনুযায়ী, একজন খেলোয়াড় তার হাতের ডাকজিটি অন্য একটি ডাকজির ওপর জোরে ছুড়ে মারেন।

ডাকজি খেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতিটির নাম হলো নমগিও মোগি। এই পদ্ধতিতে নিজের ডাকজি দিয়ে মাটিতে রাখা প্রতিপক্ষের ডাকজিটিকে আঘাত করে উল্টে দিতে হয়। যদি সেটি উল্টে যায়, তবে ওই ডাকজিটি বিজয়ী খেলোয়াড় জিতে নেন। ২০২১ সালে জনপ্রিয় নেটফ্লিক্স সিরিজ স্কুইড গেমে এই খেলাটি দেখানোর পর এটি আন্তর্জাতিকভাবে বেশ পরিচিতি পেয়েছে। এই খেলাটি কোরিয়ার জোসন রাজবংশের শাসনামল (১৩৯২–১৮৯৭) থেকে প্রচলিত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

বর্তমানে এটি উত্তর ও দক্ষিণ - উভয় কোরিয়াতেই জনপ্রিয়।[] দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এটি দারুণ জনপ্রিয় ছিল।

সাধারণত দুই টুকরো কাগজ ভাঁজ করে বর্গাকৃতির ডাকজি তৈরি করা হয়। তবে বাজারে কিনতে পাওয়া যায় এমন গোল আকৃতির ডাকজিও বেশ জনপ্রিয়, যেগুলোতে সাধারণত বিভিন্ন কার্টুন আঁকা থাকে।

বিস্তারিত বিবরণ

[সম্পাদনা]

ডাকজি সাধারণত মোটা কাগজ ভাঁজ করে তৈরি করা হয়। এগুলো বর্গাকার, আয়তাকার বা গোলাকার হতে পারে।[][] তবে ক্ষেত্রবিশেষে পঞ্চভুজ বা ষড়ভুজ আকৃতির ডাকজিও দেখা যায়।[] সাধারণত হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন যেকোনো কাগজ দিয়েই এটি তৈরি করা সম্ভব।[] অনেকে ডাকজির ওপর সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকেন বা আগে থেকে নকশা করা রঙিন কাগজ দিয়ে এটি তৈরি করেন।[] বিশেষভাবে তৈরি বড় আকৃতির ডাকজিগুলোকে কোরীয় ভাষায় 'ওয়াং ডাকজি' (왕딱지; আক্ষরিক রাজা ডাকজি).[] বলা হয়।

ডাকজির আকৃতি, পুরুত্ব এবং ওজনের ওপর খেলার ধরন ও কৌশল নির্ভর করে। ডাকজিটি কতটা ভারী বা হালকা, তার ওপর নির্ভর করে খেলোয়াড়রা ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে এটি ছুড়ে মারেন। অনেক খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের ডাকজি সহজে উল্টে দেওয়ার জন্য নিজেদের পছন্দমতো ওজন ও আকারের বিশেষ ডাকজি তৈরি করে থাকেন।[][]

'ডাইনোসর কিং' কার্টুন সিরিজের চরিত্র প্রদর্শিত বিভিন্ন চরিত্র সংবলিত কিছু ডাকজি

দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন ডাকজি হাতে তৈরির পাশাপাশি দোকানেও কিনতে পাওয়া যায়।[][] ১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশকের মধ্যে কার্টুন চরিত্র সংবলিত গোল আকৃতির ডাকজিগুলো শিশুদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে কিছু ডাকজি প্লাস্টিক বা ধাতু দিয়েও তৈরি করা হয়, যা খেলোয়াড়দের পক্ষে নিজে তৈরি করা সম্ভব নয়।[]

খেলার একটি প্রচলিত নিয়ম হলো যে হেরে যাবে, সে বিজয়ীকে নিজের ডাকজিটি দিয়ে দিতে হয়। যখন এই ডাকজিগুলো দোকান থেকে কেনা হয়, তখন এটি প্রতিপক্ষের কাছে হারানোর ভয় খেলোয়াড়দের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা সৃষ্টি করে; কারণ এতে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি জড়িয়ে থাকে।[]

ডাকজি চিগি

[সম্পাদনা]

ডাকজি চিগি হলো ডাকজি দিয়ে খেলা সব ধরণের খেলার একটি সাধারণ নাম। এই খেলার অনেকগুলো ধরণ রয়েছে এবং প্রতিটি ধরণের লক্ষ্য ও নিয়ম আলাদা হতে পারে।[] খেলাটিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করার জন্য হারলে শাস্তির ব্যবস্থাও থাকে।[] ঐতিহাসিকভাবে, কোরীয় কিশোরদের ঘরের বাইরে খোলা জায়গায় এই খেলাটি খেলতে বেশি দেখা যেত, তবে এটি ঘরেও খেলা সম্ভব।[][]

নমগিও-মোগি

[সম্পাদনা]

নমগিও-মোগি (넘겨먹기; আক্ষরিক উল্টে দেওয়া) ডাকজি খেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় ধরণ। এই খেলায় অন্তত দুইজন খেলোয়াড় অংশ নেয়। খেলার উদ্দেশ্য হলো নিজের ডাকজি দিয়ে আঘাত করে প্রতিপক্ষের ডাকজিটিকে মাটিতে উল্টে দেওয়া।

প্রথমে রক-পেপার-সিজার খেলার মাধ্যমে কে আগে চাল দেবে তা ঠিক করা হয়। হারলে নিজের ডাকজিটি মাটিতে রাখতে হয়। এরপর অন্য খেলোয়াড় তার ডাকজিটি জোরে মাটির দিকে ছুড়ে মারেন যাতে মাটির ডাকজিটি উল্টে যায়। এভাবে যার ডাকজি প্রথমে উল্টে যায়, সে হেরে যায়।[][]

অনেকে প্রতিপক্ষের ডাকজির পাশে পা রেখে ভারসাম্য তৈরি করে এটি উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেন।[] আবার অনেকে ডাকজি ছোড়ার সময় এমনভাবে বাতাস তৈরি করেন যাতে বাতাসের চাপে প্রতিপক্ষের ডাকজিটি সরে যায় বা উল্টে যায়।[][] অনেক সময় খেলোয়াড়রা নিজেদের পোশাক বা হাত ব্যবহার করে বাতাস তৈরি করে জেতার চেষ্টাও করেন, যা এক ধরণের কারচুপি হিসেবে গণ্য হয়।[]

নমগিও-মোগির বিভিন্ন ধরণ

[সম্পাদনা]

এই খেলার আরও কিছু মজার নিয়ম আছে।[][]

খেলাটি একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে খেলা হয়ে থাকে, যার বাইরে ডাকজি চলে গেলে সেটি বাতিল হয়ে যায়। যদি একজনের ডাকজি ছুড়ে মারার পর তা অন্য ডাকজির নিচে ঢুকে যায়, তবে ওপরের ডাকজিটি বাদ পড়ে। অন্যদিকে ছুড়ে মারা ডাকজি ওপরে পড়লে সেই ডাকজিটিও অনেক সময় বাদ বলে গণ্য হতে পারে।

অনেক সময় ডাকজিগুলো একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে উল্টে দেওয়ার নিয়ম থাকে। এই ক্রম ডাকজির ওপর লেখা থাকে বা সামরিক পদের মতো চিহ্নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয়।[]

ডাকজির অন্যান্য খেলা

[সম্পাদনা]
  • নাল্লিও-মোগি (날려먹기; আক্ষরিক উড়িয়ে দেওয়া) এই খেলায় ডাকজি নিচের দিকে না ছুড়ে আনুভূমিকভাবে (সামনের দিকে) দূরে ছুড়ে দেওয়া হয়। যে সবচেয়ে দূরে ডাকজি পাঠাতে পারে সে জিতে যায়। অথবা নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যের ওপর ডাকজি ফেলার প্রতিযোগিতা করা হয়।[][]
  • বিওক-চিগি (벽치기; আক্ষরিক দেয়ালে আঘাত): খেলোয়াড়রা দেয়ালের দিকে ডাকজি ছুড়ে মারেন। দেয়াল থেকে ধাক্কা খেয়ে কার ডাকজিটি কত দূরে পড়ল, তার ওপর জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়।[][]
  • মিরোনায়েগি (밀어내기; আক্ষরিক ধাক্কা দেওয়া)[]: একটি নির্দিষ্ট সীমানার ভেতর এক বা একাধিক ডাকজি রাখা থাকে। খেলোয়াড়রা তাদের হাতের ডাকজি দিয়ে সীমানার ভেতরের ডাকজিগুলোকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করার চেষ্টা করেন। যদি কেউ কোনো ডাকজি সীমানার বাইরে বের করতে পারেন, তবে সেটি তিনি জিতে নেন। কারো হাতে ডাকজি শেষ হয়ে গেলে সে খেলা থেকে বাদ পড়ে।[][]
  • বুরো-মোগি (불어먹기; আক্ষরিক ফুঁ দেওয়া)): এই খেলায় ডাকজি না ছুড়ে মুখ দিয়ে ফুঁ দিয়ে বাতাস তৈরি করে ডাকজিটি নড়ানোর বা উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।[]

ইতিহাস

[সম্পাদনা]

ডাকজি খেলাটির অস্তিত্ব কোরিয়ার জোসন রাজবংশের শাসনামল (১৩৯২–১৮৯৭) থেকে পাওয়া যায়। সেই সময়ে কাগজের অভাব থাকায় সাধারণ মানুষ কাগজ জাতীয় যেকোনো জিনিস দিয়ে এটি তৈরি করত।[] ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনামলেও এই খেলাটি প্রচলিত ছিল; তবে সে সময় কিছু ডাকজিতে জাপানি সেনাদের ছবিও দেখা যেত।[]

কোরিয়ার স্বাধীনতার পর জনসাধারণের কাছে কাগজের সহজলভ্যতা বেড়ে যায়, যার ফলে কাগজ ভাঁজ করে ডাকজি তৈরির চর্চা আরও বেড়ে যায়।[] উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং ইল এই খেলার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন বলে জানা যায় এবং তিনি উত্তর কোরিয়ায় এই খেলার প্রসারে উৎসাহ দিতেন। বর্তমানে এটি উত্তর এবং দক্ষিণ-উভয় কোরিয়াতেই সমানভাবে জনপ্রিয়।[]

সাংস্কৃতিক প্রসার

[সম্পাদনা]

ডাকজি খেলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে বেশ পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ২০২১ সালের নেটফ্লিক্স সিরিজ স্কুইড গেমের প্রথম পর্বে এই খেলাটি দেখানোর পর এটি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়। সিরিজের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সিজনের পর্বেও এটি দেখা যায়।[][] এই সিরিজের জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানুষ ঐতিহ্যবাহী এই কোরীয় খেলাটি খেলতে শুরু করে। এমনকি কিছু ক্যাসিনোতেও ডাকজি খেলার আয়োজন করা শুরু হয়েছে।[১০][১১]

বিশ্বজুড়ে কোরীয় সংস্কৃতির প্রসারে নিয়োজিত কোরীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো বিভিন্ন দেশে এই খেলাটি প্রচার ও প্রসারের কাজ করে থাকে।[১২] দক্ষিণ কোরিয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো রানিং ম্যান-এর বিভিন্ন মিশনে প্রায়ই ডাকজি খেলা ব্যবহার করা হয়। এই গণমাধ্যমগুলোর প্রভাবের ফলে ডাকজি এখন কেবল কোরিয়ার স্থানীয় খেলা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।[১৩][১৪]

  1. কিছু উপভাষায় এটিকে ttaegi (때기),[] ttangji (땅지), ppachi (빠치) বা pyo () নামেও ডাকা হয়ে থাকে।[]
  2. অথবা মিরো চিগি (밀어치기)[]
  1. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 김, 광언, 딱지치기, Encyclopedia of Korean Culture (কোরীয় ভাষায়), Academy of Korean Studies, সংগ্রহের তারিখ ২ জুন ২০২৪
  2. 1 2 3 4 5 딱지치기Korea Craft & Design Foundation। ২৬ ডিসেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ২ জুন ২০২৪
  3. 1 2 딱지치기, 지능발달 체력단련에 좋아The Hankyoreh (কোরীয় ভাষায়)। ২১ জুলাই ২০০৫। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২৪
  4. 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 Lee, Sangho। "Ttakjichigi"Encyclopedia of Korean Folk Culture (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২ জুন ২০২৪
  5. "How to play Squid Game's paper flip challenge"Radio Times (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২৪
  6. 1 2 3 4 5 6 7 정, 혜정। 딱지치기 - 디지털광주문화대전Encyclopedia of Korean Local CultureAcademy of Korean Studies। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২৪
  7. 추억의 딱지를 아십니까Korea Broadcasting System (কোরীয় ভাষায়)। ১৩ মার্চ ২০০৬। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২৪
  8. "All Squid Game Games In Order: Origins & Meaning Explained"ScreenRant (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)। ২৮ অক্টোবর ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ২৫ ডিসেম্বর ২০২১
  9. "Erm, why is Cate Blanchett in Squid Game season 3? Actor's cameo explained"Cosmopolitan (ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায়)। ৩০ জুন ২০২৫। সংগ্রহের তারিখ ২ জুলাই ২০২৫
  10. "Squid Game fever is real, here's how Singaporeans are joining the game"AsiaOne (ইংরেজি ভাষায়)। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২৪
  11. Yu, Jae-Dong (২৮ অক্টোবর ২০২১)। "New Yorkers play Squid Game"The Dong-A Ilbo (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২৪
  12. "Children day in Korean Cultural Centre SA"Korea.net (ইংরেজি ভাষায়)। মে ২০২৩। সংগ্রহের তারিখ ৩ জুন ২০২৪
  13. Talty, Stephan (২০১৫)। Under the Same Sky: From Starvation in North Korea to Salvation in America। Houghton Mifflin Harcourt। পৃ. ১০। আইএসবিএন ৯৭৮-০৫৪৪৩৭৩১৭৪। সংগ্রহের তারিখ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬
  14. Yi, I-hwa (২০০৬)। Korea's Pastimes and Customs: A Social History। Homa & Sekey Books। পৃ. ৫৮। আইএসবিএন ১৯৩১৯০৭৩৮২। সংগ্রহের তারিখ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬
[সম্পাদনা]