ডলুরা গণকবর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ডলুরা গণকবরের প্রধান ফটক

ডলুরা গণকবর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত আটচল্লিশজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার গণসমাধি। ডলুরা সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত, মেঘালয় সীমান্তবর্তী গারো আদিবাসী-অধ্যুষিত একটি গ্রাম।

পটভূমি[সম্পাদনা]

ডলুরা গণকবরে শহীদদের সমাধি

বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু : ডলুরা শহীদ স্মৃতি সৌধে প্রতি বছর একবার যাই সহযোদ্ধাদের কবর জিয়ারত করতে। তখন মনে পড়ে যায় একাত্তর সালের কথা। যাদের রক্তে দেশটা শত্র“মুক্ত হয়েছিল তাদেরকে কী অনাদরে অবহেলায় আমরা ফেলে রেখেছি। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া এদেরকে দেখার কেউ নেই। মঙ্গলবারে আছে বর্ডার হাট। তাই ডলুরার দিকে যাওয়া। দিনটিতে প্রচুর লোকজন শহর থেকে ডলুরাতে গেছেন। মনে হয় ঈদের পর ছুটির আমেজে অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে ছুটে গেছেন। ডলুরা শহীদ স্মৃতি সৌধের পাশে দৃষ্টি নন্দন মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্যের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার হিড়িক পরেছে। আবার বর্ডার হাটে গিয়ে দেখি একই অবস্থা। যেন একটা উৎসব উৎসব আমেজ বিরাজ করছে। ডলুরা শহীদ স্মৃতি সৌধের দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন চলে গেছে একাত্তরে। কি এমন একটা আকর্ষণে আত্মাহুতি দিয়েছেন এই তরুণেরা। স্বাধীনতা কি এক আকর্ষণ, কি এক আকাঙ্খা। হঠাৎ একটা মেয়ের কন্ঠ শুনে সম্বিত ফিরে পেলাম। বড় বোনটাকে বলছে ‘আপা ভুল আছে, এখানে লিখা ৪২জন শহীদের কবর কিন্তু আছে ৪৩টা’। এই ছোট্ট মনিদের ভুল ভাঙ্গানোর জন্য এগিয়ে গেলাম। আসলে ৪২ জন শহীদের পাশে আমরা আরো একজনকে এখানে রেখেছি। তিনি হচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মধু মিয়া। একাত্তর সালে বাঙালি জাতি এক সাথে রুখে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, জনতা সবাই এক কাতারে এসে অস্ত্র হাতে প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দিচ্ছিল মুক্তিযোদ্ধারা। দাফন করার নির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় সহযোদ্ধারা খুশি মত তাদেরকে কবর দিচ্ছিলেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এই আগুনঝরা দিনে আনসারের এক জওয়ান শহীদদের লাশ মর্যাদার সাথে দাফন করার জন্য এগিয়ে আসেন। তিনি আবুল কালাম ওরফে মধু মিয়া। যুদ্ধে শহীদদের জন্য তিনি কবরের জায়গা খুঁজতে থাকেন। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিজের দখলে থাকা সরকারি খাস জায়গাকেই উপযুক্ত হিসাবে বিবেচনা করেন। ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন মন্তাজ মিয়া। জামালগঞ্জ থানার কামলাবাজ গ্রামে বাড়ি মন্তাজ মিয়ার। আনসার বাহিনীর এই তরুন দেশ মাতৃকাকে শত্র“মুক্ত করার অদম্য বাসনায় যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। বালাট সাব-সেক্টরের এই যোদ্ধা মৃত্যুর আগে মীরেরচর গ্রামের কাঁচা মিয়াকে নিজের পাঞ্জাবী ও চশমা দিয়ে বলেছিলেন যুদ্ধে যদি আমি মারা যাই তবে আমার বৃদ্ধ মাতাকে এই দুটো জিনিস দিয়ে দিবেন। এর কিছুদিন পরেই সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন মন্তাজ মিয়া। মধু মিয়া শহীদ মন্তাজের খবর জানতে পেরে ছুটে যান তার সঙ্গী সাথী নিয়ে। আর শহীদ মন্তাজ মিয়াকে দাফন করেই গোড়াপত্তন হয় ডলুরা শহীদ স্মৃতি সৌধের। তারপর আর থেমে থাকেননি মধু মিয়া। যেখানেই খবর পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন। বাংলাদেশ সরকারের এ অঞ্চলের প্রতিনিধি জাতীয় পরিষদ সদস্য দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে মধু মিয়ার কাজের স্বীকৃতি দেন। তবে দাফন কাফনের পাশাপাশি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালে প্রেরণ এবং প্রত্যেক শহীদকে তাদের ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী দাফন কাফনের ব্যবস্থাসহ দাহ করার জন্য তাকে আহব্বায়ক করে একটি কমিটি করে দেন। আত্মনিবেদিত মধু মিয়া তার এই মহৎ কাজের অংশীদার করতে নিয়ে আসেন মুন্সী তারু মিয়াকে, যিনি মাওলানা হিসাবে জানাজা পড়াতেন। আর কবর দিতে ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের হাসপাতালে পাঠাতে সাহায্য করতেন আফসার উদ্দিন, কিতাব আলী, আব্দুর রহিম, মগল মিয়া, হযরত আলী ও মাফিজ উদ্দিন। হিন্দু মুক্তিযোদ্ধাদের দাহ করতে পুরোহিত হিসাবে কাজ করার জন্য নিয়ে আসেন নেপু ঠাকুরকে। এরাই ছিলেন প্রবাসী সরকারের ৯ সদস্য বিশিষ্ট অনুমোদিত কমিটি। আত্মনিবেদিত মধু মিয়ার লেখাপড়া পাঠশালা পর্যন্ত। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। একটা ডাইরিতে লিখে রাখতেন শহীদদের নাম এবং কোথায় কোন যুদ্ধে তারা শহীদ হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে কাউকে দিয়ে এ তথ্যগুলো লিখিয়ে রেখেছেন। আর এটাই হয়েছে আজ ইতিহাস। মধু মিয়ার ডাইরি থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকেই জানা যায় শহীদদের নাম ঠিকানা। মধু মিয়ার ডাইরিটি স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। মধু মিয়ার ডায়েরি থেকে সংগৃহিত তথ্য মোতাবেক ৪২ জন মুসলিম শহীদকে দাফন করা হয়েছে এবং ৬ জন হিন্দু মুক্তিযোদ্ধাকে ডলুরাতে দাহ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে যেমন সুনামগঞ্জ জেলার মুক্তিযোদ্ধা আছেন ঠিক তেমনি অন্যান্য জেলার মুক্তিযোদ্ধাও আছেন। ডলুরা ছিল একসময় বিচ্ছিন্ন একটি এলাকা। স্বাধীনতার পর দেশের সূর্য্য সন্তানদের কবরকে সংরক্ষিত করার জন্য প্রশাসন সহ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ধর্না দিয়েছেন মধু মিয়া। ১৯৭৯ সালে স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্ট শহীদদের কবরগুলি সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়। ৮২ ফুট লম্বা, ৮১ ফুট প্রস্থ ও ৫ ফুট উচ্চতার এই দেয়াল তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের আরেক বীর সেনানী সাব সেক্টর কমান্ডার লে.কর্ণেল (অব) এ,এস, হেলালউদ্দিন শহীদদের নাম মার্বেল পাথরে খোদাই করে লিখে গেইটে বসিয়ে দেন। একসময় ডলুরা যাওয়ার কোন রাস্তা ঘাট ছিল না। আমরা মংলকাটা পর্যন্ত রিক্সায় যেতে পারতাম পরে পায়ে হেঁটে শহীদদের কবর জিযারত করতাম। মধু মিয়া ডলুরা যাওয়ার জন্য রাস্তা করার আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন কবর জিয়ারত করতে এসে রাস্তা করার উদ্যোগ নেন। আজকে ডলুরা পরিণত হয়েছে একটি জনপদে। রাস্তা ঘাট হওয়ায় সুবাদেই ডলুরাতেই হয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ বর্ডার বাজার। স্বপ্ন দেখেছেন এই সশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা মধু মিয়া। তার দেওয়া কাগজপত্র ঘেটে দেখা যায় ডলুরার শহীদ স্মৃতিসৌধের সাথে একটি রেস্ট হাউস, একটি পুকুর ও একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা করার ছক তিনি তৈরি করেছিলেন। রেস্ট হাউসের কথা তিনি উত্থাপন করেছিলেন সাব সেক্টর কমান্ডার লে. কর্ণেল (অব:) হেলালউদ্দিনের কাছে। কর্ণেল হেলাল প্রাথমিকভাবে রেস্ট হাউস নির্মানের জন্য এক লক্ষ টাকার একটি চেক লিখে দেন জেলা প্রশাসকের কাছে। পরে জেলা পরিষদ আরো ২,৬৯০০০ (দুই লক্ষ উনসত্তর হাজার) টাকা বরাদ্দ দিয়ে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। ডলুরা সীমান্তে যেখানে শহীদ স্মৃতিসৌধ, সেটা ছিল সরকারি খাস খতিয়ানের জায়গা। শহীদ মাজারের জন্য বন্দোবস্ত চেয়ে ১১.০৪.১৯৯৪ তারিখে জেলা প্রশসকের কাছে আবেদন করেন মধু মিয়া। সুনামগঞ্জ সদর থানার ফেটারগাও মৌজার ২ দাগের ৪.৫০ শততক ও ২/১৫৭ দাগের ১.৫০ শতক ভূমি সেটেলম্যান্ট জরিপে ছন ও লায়েক পতিত হিসাবে রেকর্ডকৃত ছিল। সেগুলোর শ্রেণী পরিবর্তন করে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় শহীদ স্মৃতিসৌধের বরাবরে। কাগজপত্র ঘেটে দেখা যায় এগুলো সবই মুক্তিযোদ্ধা মধু মিয়ার অবদান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩২ বছর স্বাধীনতার স্মৃতি চিহ্নকে বহন করে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে কাজ করে গেছেন আত্মনিবেদিত মধু মিয়া। ১৩৪৪ বাংলায় ভারতের নওগা জেলার গিলানি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রাইমারি শিক্ষা সমাপ্ত করে পিতামাতার সাথে মোহাজির হিসাবে চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। আসার পর থেকেই সুনামগঞ্জ সদর থানার ডলুরা গ্রামে তারা বসবাস শুরু করেন। পূর্ব পাকিস্তানে আসার পরই দেশ সেবার জন্য যোগ দেন আনসার বাহিনীতে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সহযোদ্ধাদের মৃত্যু তাকে ব্যথিত করে তুলে। শহীদদের পরিচয় আগামী প্রজন্মের কাছে ধরে রাখার জন্য পাগলের মত সাব সেক্টরের বিভিন্ন জায়গায় তিনি ঘুরেছেন। যেখানেই খবর পেয়েছেন সহযোদ্ধারা আহত বা নিহত হয়েছেন সেখানেই ছুটে গেছেন। আর সেই সাধনা আজ হয়েছে ইতিহাস। বাংলাদেশের একমাত্র কুমিল্লার কুলাপাথর ছাড়া এত শহীদের এক সাথে কোন কবর নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে মধু মিয়া তার কাজের স্বীকৃতি এখনও পাননি। আনসার বাহিনী থেকে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭৮ সালে প্রশংসাপত্র সহ ২১১/২৫ (দুশো এগার টাকা পচিশ পয়সা) তাকে দেওয়া হয়। এটা দেখিয়ে তিনি বলতেন আমার কাজের স্বীকৃতি আমি পেয়েছি। ২০০৪ সালের ১৫ মার্চ রাত ১২ টায় মধু মিয়া আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তার মৃত্যুর পর মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্টের জরুরি সভা ডেকে ডলুরা শহীদ স্মৃতিসৌধের ভিতরেই তাকে দাফন করা হয়। ৪২ জন শহীদের সাথে তিনি একসাথে ঘুমিয়ে আছেন। মধু মিয়া রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলে নুতন প্রজন্ম থেকে এরকম আরো আত্মনিবেদিত মানুষের জন্ম হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। সুবেদার আব্দুল মালিক চৌধুরী: বীর বিক্রম, বীর প্রতীক মাহফুজুর রহমান: সুবেদার আব্দুল মালিক চৌধুরী, বীর বিক্রম, বীর প্রতীক। মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের ত্রৈলোক্য বিজয় গ্রামে সুবেদার আব্দুল খালিক চৌধুরীর জন্ম ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে। তার পিতা আব্দুল মন্নাফ চৌধুরী, ১৬.০১.১৯৪৮ সালে তিনি ইপিআর বাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সুবেদার হিসেবে রংপুর জেলার পাটগ্রামে কর্মরত ছিলেন। ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট কার্যকরে ঢাকা শহরে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, জহুরুল হক হল, এসএম হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টার পুলিশ সদর দপ্তর রাজারবাগ ও ইপিআর হেড কোয়ার্টার পিলখানায় আক্রমণ চালায়। পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা তাদের প্রথম টার্গেটে ছিলেন। পাকিস্তানী সৈন্যদের অভিযানে প্রথম প্রহরেই নৃশংসভাবে নিহত ছাত্র, যুবক, পুলিশ, ইপিআর বাহিনীর সদস্যরা। এ খবর এ দিন রাতে পেয়ে যান ইপিআর এর রেডিও বার্তার মাধ্যমে সুবেদার আব্দুল মালিক চৌধুরী। এ সময় তার কাছে খবর আসে রংপুর সেনানিবাসে বাঙালি ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনকে হত্যার পরিকল্পনা করে হানাদার বাহিনী, তিনি পালিয়ে রক্ষা পান। দিনাজপুরে হানাদার বাহিনী ইপিআর বাহিনীর উপর আক্রমণ চালিয়েছে। এ সমস্ত কারণে সুবেদার আব্দুল মালিক চৌধুরীর মনে প্রতিশোধের চেতনা শানিত হতে থাকে। এ সময় পাটগ্রাম সহ অন্যান্য সীমান্তগুলোতে ইপিআর বাহিনী বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনের নেতৃত্বে সুবেদার আব্দুল মালিক চৌধুরী প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এ সময় পাটগ্রাম সমবেত হয়ে ইপিআর বাহিনীতে থাকা, পাঞ্জাবী, পাঠান, বিহারী সৈন্যদের প্রথমে হত্যা করা হয়। ২৮ মার্চ সুবেদার আব্দুল মালিক চৌধুরী তার কোম্পানীসহ কাকিলা রেলস্টেশনে যেয়ে সুবেদার বুরহার উদ্দিনের নেতৃত্বে অন্য আরও একটি একদল এক সাথে হয়ে পাটগ্রাম বাউড়া মেতাল হাট ও লালমনিরহাট রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ সময় সুবেদার আব্দুল মালিক চৌধুরীর কোম্পানীতে ছিল ১২১ ও ৪ রাইফেল, এল,এম,জি রকেট লাঞ্চারসহ ভারী অস্ত্র। ইপিআর এর চারটি কোম্পানী ছাত্র, যুবক, মুজাহিদ, আনসার বাহিনীর সমন্বয়ে ক্যাপ্টেন নোয়াজেশ উদ্দিনের নেতৃত্বে এই দলটি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ পরিচালনা করে। এই দলটি কালীগঞ্জ থানা আক্রমণ করে ৪০টি ৩৩৩ রাইফেলস, ৭টি সিভিল বন্দুক, একটি মটর সাইকেল সংগ্রহ করে। খবর পেয়ে পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলি শুরু করে। এ সময় সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরীর মাথায় ও পায়ে দুটি গুলি লাগে। আহত অবস্থায় সুবেদার মালেক চৌধুরী তার কোম্পানিকে গুলির নির্দেশ দেন। এ সময় প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয় এ যুদ্ধে ১১ জন পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হয়। ১২ জন হানাদার সৈন্যকে বন্দি করা হয়। ক্যাপ্টেন নোয়াজেশ এর নির্দেশে একদল মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বে পাকিস্তানী বাহিনীকে আক্রমণের জন্য ঠাকুরগাঁও পাঠানো হয়। ঠাকুরগাঁও থেকে খবর আসে সুবেদার গিয়াসের দল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে মার খাচ্ছে। তখন জরুরি সাহায্যের খবর আসে, খবর পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরী তার দল নিয়ে অগ্রসর হন। মাঝ রাত্রে ১০ গজ দূরত্বে থেকে মালেক ও তার দল পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। এতে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় এ যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর ৩০/৪০ জন সৈন্য নিহত হয়। সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরী পাটেশ্বরী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এখানে হানাদার বাহিনীর চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে এ সময় রাজগঞ্জ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদী সাঁতার দিয়ে সাহেবগঞ্জে ফিরে আসেন। সুবেদার আবদুল মালেক চৌধুরী বুরুঙ্গামারীতে হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে এসে মালেক ও তার দল ভারতীয় বাহিনীর সাথে এক সাথে যৌথ অভিযানে অংশ নেন। পাটগ্রামে ঈদের দিন তুমুল যুদ্ধ হয়। এতে মালেক ও তার দল এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় পাকিস্তানী বাহিনী টেংক আর্টিলারী সাহায্য আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী পাল্ট আর্টিলারী আক্রমণ চালালে হানাদার বাহিনী পিছু হটে যায়। সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরী যুদ্ধপাগল মানুষ। শরীরে দুটি গুলি নিয়ে ধারাবাহিক আক্রমণ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। এ সময় ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অধিনায়ক ক্যাপ্টেন নোয়াজেশ তাকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠান, কিছুদিন কলকাতায় চিকিৎসা নিয়ে শরীরে ভিতরে থাকা গুলি অপারেশন না করে পুনরায় রণাঙ্গণে ফিরে আসেন যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের সময় তার স্ত্রী ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেন। যুদ্ধের সময় আব্দুল মালেক চৌধুরী পরিবার পরিজন এর সাথে যোগাযোগ ছিলো না। শুরুতে রংপুরের যুদ্ধে তার চলাফেরার জন্য দুটি ঘোড়া ছিল ঘোড়ায় চড়ে তিনি অনেকগুলো অপারেশন পরিচালনা করেন। হানাদার বাহিনী আব্দুল মালেকের সকল স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাকে ধরে দেওয়ার জন্য এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। তারপরও দেশ মাতৃকার টানে যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তাকে দুটি রাষ্ট্রীয় খেতাব বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক প্রদান করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য সারাদেশ থেকে আরও অল্প কয়েকজন দুটি খেতাব প্রাপ্ত হন। সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরী বিরল ব্যক্তি যিনি দুটি খেতাব প্রাপ্ত। সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরী ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ রাইফেল থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে তার পরিবার পরিজন মৌলভীবাজার শহরের দক্ষিণ কলিমাবাদে বীরবিক্রম বীরপ্রতীক ভবনে বসবাস করছেন। সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরীর তিন ছেলে দুই মেয়ে। তার স্ত্রী কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করেন। সুবেদার আব্দুল মালেক চৌধুরী বার্ধক্যজনিত কারণে ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধের স্মৃতি দুটি গুলি আমৃত্যু তার শরীরে ছিল, দুঃখের বিষয় তার নিজ জেলা মৌলভীবাজারে কোথাও এই জাতীয় বীরের নামে কোন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় নাই। (মাহফুজুর রহমান, লেখক লোক গবেষক) [১]

সমাহিত মুক্তিযোদ্ধাগণ[সম্পাদনা]

  1. মোঃ মন্তাজ মিয়া
  2. সালাউদ্দিন
  3. মোঃ রহিম বখত (ই পি আর হাবিলদার)
  4. মোঃ জবান আলী
  5. মোঃ তাহের আলী
  6. মোঃ আঃ হক
  7. মোঃ মজিবুর রহমান
  8. মোঃ নুরুল ইসলাম
  9. মোঃ আঃ করিম
  10. মোঃ সুরুজ মিয়া
  11. মোঃ ওয়াজেদ আলী
  12. মোঃ সাজু মিয়া
  13. মোঃ ধনু মিয়া
  14. মোঃ ফজলুল হক
  15. মোঃ সামছুল ইসলাম
  16. মোঃ জয়নুল আবেদিন
  17. মোঃ মরম আলী
  18. মোঃ আঃ রহমান
  19. মোঃ কেন্তু মিয়া
  20. মোস্তফা মিয়া
  21. মোঃ ছাত্তার মিয়া
  22. মোঃ আজমান আলী
  23. মোঃ সিরাজ মিয়া
  24. মোঃ সামছু মিয়া
  25. মোঃ তারা মিয়া
  26. মোঃ আবেদ আলী
  27. মোঃ আতর আলী
  28. মোঃ লাল মিয়া
  29. মোঃ চান্দু মিয়া
  30. মোঃ সমুজ আলী
  31. মোঃ সিদ্দিকুর রহমান
  32. মোঃ দান মিয়া
  33. মোঃ মন্নাফ মিয়া
  34. মোঃ রহিম মিয়া
  35. আলী আহমদ
  36. মোঃ সিদ্দিক মিয়া
  37. মোঃ এ, বি, সিদ্দিক
  38. মোঃ ছায়েদুর রহমান
  39. মোঃ রহমত আলী
  40. মোঃ আঃ হামিদ খান
  41. মোঃ আঃ সিদ্দিক
  42. মোঃ আঃ খালেক
  43. যোগেন্দ্র দাস
  44. শ্রীকান্ত বাবু
  45. হরলাল দাস
  46. অধর দাস
  47. অরবিন্দু রায়
  48. কবিন্দ্র নাথ
  49. মধু মিয়া (ডলুরা শহীদ স্মৃতি সৌধের প্রতিষ্ঠাতা)

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. http://archive.prothom-alo.com/detail/date/2010-06-29/news/74518 চারদিকঃ ডলুরার সেই পবিত্রভূমি, মৃত্যুঞ্জয় রায় | তারিখ: ২৯-০৬-২০১০

https://web.archive.org/web/20161202061950/http://jugabheri.com/

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]