ডন সোসাইটি
ডন সোসাইটি (১৯০২-১৯০৬) ছিল একটি প্রগতিশীল জাতীয় শিক্ষামূলক সংস্থা, যা ১৯০২ সালে ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় শিক্ষাবিদ সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়-এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পেছনের মূল প্রেরণা ছিল ১৯০২ সালের ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের প্রতিকূল প্রতিবেদন, যা ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির পক্ষে অধিক ক্ষমতা প্রদান করত।[১]
ইতিহাস ও কার্যক্রম
[সম্পাদনা]ডন সোসাইটির গোড়ার ইতিহাসের সাথে ১৮৯৬ সালে স্থাপিত সতীশচন্দ্রের 'ভাগবৎ চতুষ্পাঠী'-র সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে ভারতীয় ধর্ম, দর্শন এবং জাতীয় পরিচয়ের উপর গবেষণা চলত। সন্ধ্যাবেলায় মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে (বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ) এই পাঠদান হতো। ডন সোসাইটির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করত ডন ম্যাগাজিন; এতে ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্পকলা ইত্যাদি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো।[১]
সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় খুব অল্প সময়ে অনেক মেধাবী তরুণকে একত্রিত করেন, যেমন: বিনয়কুমার সরকার, রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, হারাণচন্দ্র চাকলাদার, কিশোরী মোহন গুপ্ত, রবীন্দ্রনারায়ণ ঘোষ প্রমুখ। পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অরবিন্দ ঘোষ, রাজেন্দ্র প্রসাদ, রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিক, জগদীশচন্দ্র বসু, নীলরতন সরকার, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এর সাথে যুক্ত হন। এমনকি প্রযুক্তি শিক্ষায় রামকান্ত রায় এবং কুঞ্জ বিহারী সেন-এর মত ব্যক্তিরাও বক্তৃতা দিতেন।
ডন সোসাইটি, তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নির্ভরশীল ঔপনিবেশিক শিক্ষার প্রবল সমালোচনা করে। তারা মনে করত এই শিক্ষা পদ্ধতি অতিমাত্রায় সাহিত্যনির্ভর, অনুৎপাদনমুখী এবং অবৈজ্ঞানিক। সোসাইটি জাতীয় ভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পক্ষে ছিল। তারা ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রযুক্তি বিভাগে সাবান, তেল প্রস্ত্ততকরণ ও যান্ত্রিক কাজ শেখানো হতো এবং ছাত্ররা উৎপাদিত পণ্য বড়বাজারের স্বদেশী দোকানে বিক্রি করত।
প্রকাশনা
[সম্পাদনা]ডন সোসাইটির শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল আলোচনা-ভিত্তিক। শিক্ষকেরা বক্তৃতা দিতেন, ছাত্ররা নোট করত এবং পরে আলোচনা করত। ডন ম্যাগাজিন-এ লেখার জন্য ছাত্রদের উৎসাহিত করা হতো। এই ম্যাগাজিনে 'ইন্ডিয়ানা' নামে একটি বিভাগ ছিল, যার মাধ্যমে ভারত সম্পর্কে জ্ঞান ও জাতীয়তাবোধ জাগানোর প্রচেষ্টা চালানো হতো।
ডন ম্যাগাজিন জাতীয় শিক্ষার লক্ষ্য ও ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যাবলী বিশ্লেষণ করে সমাধানের দিকনির্দেশ দিত। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি মানস ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
১৯০৬ সালে ডন সোসাইটি ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর এডুকেশন-এর সঙ্গে একীভূত হয়, কিন্তু ডন ম্যাগাজিন ১৯১৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। ডন সোসাইটির শিক্ষা ও কার্যক্রম নিঃসন্দেহে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং জাতীয় শিক্ষানীতির প্রতিষ্ঠায় এক গুরত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- 1 2 "ডন সোসাইটি - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০২৫।
- সাউথ এশিয়া আর্কাইভ - ডন ম্যাগাজিন ও ডন সোসাইটির ওপর তথ্য
- Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib. নিতীশ কে. সেনগুপ্ত. ২০১১. পেঙ্গুইন বুকস ইন্ডিয়া. পৃষ্ঠা ৩০৩
- চিত্তব্রত পালিত, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় শিক্ষা: ১৯০৫-১৯২০