টাইপ ২৬ রিভলবার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
টাইপ ২৬ রিভলবার
প্রকার রিভলবার
উদ্ভাবনকারী জাপানী সম্রাজ্য
ব্যবহার ইতিহাস
ব্যবহারকাল ১৮৯৩-১৯৪৫
ব্যবহারকারী জাপানী সম্রাজ্য
যুদ্ধে ব্যবহার রুশ-জাপানী যুদ্ধ
দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
উৎপাদন ইতিহাস
নকশাকাল ১৮৯৩
উৎপাদনকারী কইশিকাওয়া অস্ত্রাগার, টোকিও
উৎপাদনকাল ১৮৯৩-১৯৩৫
উৎপাদন সংখ্যা ৫৯,৩০০-৫৯,৯০০
তথ্যাবলি
ওজন ৮৮০ গ্রাম (খালি অবস্থায়)
দৈর্ঘ্য ২৩১ মি.মি. (৯.০৯ ইঞ্চি)
ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ১২১ মি.মি. (৪.৭৬ ইঞ্চি)
উচ্চতা ১৩০মি.মি. (৫.১২ ইঞ্চি)

টাইপ ২৬ বা মডেল ২৬ ছিল রাজকীয় জাপানী সেনাবাহিনী দ্বারা ব্যবহৃত প্রথম আধুনিক রিভলবার। এটিকে টোকিও শহরের অদূরে অবস্থিত কইশিকাওয়া অস্ত্রাগারে নকশা করা হয়েছিল এবং সেখানেই প্রস্তুত করা হতো। এরা প্রথম সার্ভিসে আসে ১৮৯৩ এবং তখন তৎকালীন জাপানী সম্রাজ্যের মেইজি শাসনামলের ২৬ তম বছর চলছিল তাই সেই বছর অনুযায়ী এদের নাম দেয়া হয় টাইপ ২৬ রিভলবার। এদের জাপানে স্থানীয় ভাবে নকশা করা দাবি করা হলেও এটি মূলত তৎকালীন বিভিন্ন রিভলারের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য একীভূত করে তৈরী করা হয়েছিল। ১৯০৬ সালে এদের আরও উন্নত নামবু পিস্তল দ্বারা রিপ্লেস করা হলেও রুশ-জাপানী যুদ্ধ, দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এদের ব্যবহার করা হয়েছে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৯২৩ সালে ভূমিকম্পের পূর্বে কইশিকাওয়া অস্ত্রাগার

জাপানীদের কাছে মেইজি ২৬ নেন কেন জু নামে পরিচিত[১] এই রিভলভারগুলো তৈরী করা হয়েছিল স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন নিউ মডেল ৩ রিভলবার গুলোকে রিপ্লেস করার জন্য[২]। অফিশিয়ালি ১৮৯৪ সালের ২৯ শে মার্চ সার্ভিসে যুক্ত হয়ে এটি নিউ মডেল ৩ কে রিপ্লেস করে[৩]। আগেই বলা হয়েছে এই রিভলবার গুলোতে অন্যান্য রিভলবারের বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছিল[৪] যেমন এর লকিং মেকানিজম ছিল গ্যালান্ড রিভলবারের মতো, এতে ব্যবহৃত হিঞ্জড ফ্রেম ছিল স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন রিভলবার গুলোর মতো এবং হিঞ্জড সাইড প্যানেল ছিল মডেল ১৮৯২ রিভলবারগুলোর মতো [৪]। তবুও এই রিভলবারগুলোকে জাপানী পিস্তল তৈরীর ক্ষেত্রে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও সফল ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৮৯৩ সালে এদের উৎপাদন শুরু হওয়ার পরে তা প্রায় ১৯২৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু ১৯২৩ সালে এক ভূমিকম্পে কইশিকাওয়া অস্ত্রাগার প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নতুন করে এদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। যদিও ভূমিকম্পের পরে পূর্বের তৈরী পার্টস গুলো দ্বারা নতুন কিছু রিভলবার তৈরী করা হয়েছিল[৫] কিন্তু পুনঃরায় আর কখনই ব্যাপকভাবে এদের উৎপাদন শুরু করা হয়নি। উৎপাদন বন্ধের আগে এজাতীয় প্রায় ৫৯,০০০ রিভলবার তৈরী করা হয়েছিল এবং প্রায় ৯০০টির মতো উৎপাদন শুরুর আগে পরীক্ষামূলক ভাবে তৈরী করা হয়েছিল[৬]। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন অস্ত্রের সল্পতা দেখা দেয় তখন অনেক পুরানো টাইপ ২৬ রিভলবারকে ঠিক করে ও কিছু পরিবর্তন করে আবার ব্যবহার করা শুরু হয় এবং যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত এদের ব্যবহার করা হয়েছিল[৭]

নকশা[সম্পাদনা]

টাইপ ২৬ রিভলবারগুলো প্রায় ২৩১ মি.মি. লম্বা, ১৩০ মি.মি. উচ্চতা বিশিষ্ট ছিল এবং খালি অবস্থায় এদের ভর ছিল প্রায় ৮৮০গ্রাম[৮]। এই রিভলবারগুলোর ব্যারেল অষ্টভুজ আকৃতির ছিল এবং সামনের সাইটটি সরাসরি ব্যারেলের সাথেই স্থায়ীভাবে লাগানো থাকতো। তবে পিছনের সাইটটি রিভলবারের ফ্রেমের ওপর বসানো থাকতো এবং প্রয়োজনে এটিকে পরিবর্তন করার ব্যবস্থা ছিল [৯]। এই রিভলবার গুলো শুধু মাত্র ডাবল অ্যাকশন হিসেবে কাজ করতে সক্ষম ছিল কারণ এতে কোন ককিং স্পার ছিল না। এতে ককিং স্পার না দেয়ার মূল কারণ ছিল তখন লকিং মেকানিজম বর্তমানের মতো এতটা উন্নত ছিল না ফলে অসাবধানতাবশত কোন কিছুতে লেগে গুলি চলা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। তাই নিরাপত্তার জন্য এতে এই ককিং স্পারই বাদ দেয়া হয়[৪]। নিরাপত্তাজনিত কোন সমস্যা না থাকলেও ডাবল অ্যাকশন হওয়ার ফলে এদের কিছু অসুবিধাও ছিল। এর সেল্ফ ককিং সিস্টেম কিছুটা ধীরগতি সম্পন্ন ছিল ফলে এদের দ্বারা নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য ভেদ করা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল[৯]। এছাড়াও এর সিলিন্ডারেও কিছু সমস্যা ছিল যার কারণে মাঝে মাঝেই এটি বেশি ঘুরে গিয়ে খালি চেম্বার ফায়ারিং পজিশনে চলে আসত। কিন্তু পরবর্তীতে অবশ্য এই সমস্যাটির সমাধান করা হয়েছিল। এই রিভলবার গুলোকে খুবই উন্নত মানের স্টিল দ্বারা তৈরী করা হয়েছিল যদিও তৎকালীন পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় তা কিছুটা নরম[৫]। এছাড়াও এতে ব্যবহৃত ৯মি.মি. রাউন্ড গুলোও ছিল অন্যান্য ৯মি.মি. বুলেট থেকে আলাদা এবং এই বুলেটগুলো শুধু এই টাইপ ২৬ রিভলবারগুলোতেই ব্যবহার করা হয়েছিল[১]। ১৯০০ সালের আগ পর্যন্ত এই বুলেটগুলোতে ব্ল্যাক পাওডার ব্যবহার করা হলেও ১৯০০ সালের পরে এতে অধিক শক্তিশালী স্মোকলেস পাওডার ব্যবহার করা হতো [৬]

পাঁচবার উৎপাদনের সময়কাল[সম্পাদনা]

উৎপাদিত টাইপ ২৬ গুলো পর্যবেক্ষণ করে তাদের তৈরীর ধরন এবং মার্কিংগুলো দেখে ধারণা করা হয় এই রিভলবারগুলোকে পাঁচটি আলাদা সময়কালে আলাদা ভাবে তৈরী করা হয়েছিল[৭]

কোন চিহ্নবিহীন সীমিত প্রাথমিক উৎপাদন[সম্পাদনা]

টাইপ ২৬ রিভলবার গুলোর মধ্যে প্রথমদিকে উৎপাদিত গুলোর বাইরের কোন নির্দেশিকা চিহ্ন ছিল না[৭]। তবে এদের অভ্যন্তরে থাকা চিহ্ন গুলো থেকে ধারণা করা হয় এদের ১৮৯৩ সালের শেষের দিকে কিংবা ১৮৯৪ সালের প্রথম দিকে তৈরী করা হয়েছিল[৭]। ঐতিহাসিকদের মতে এধরণের প্রায় ৩০০টি রিভলবার তৈরী করা হয়ে থাকতে পারে।

সীমিত প্রথমিক উৎপাদন[সম্পাদনা]

এই ভার্সনগুলোতে বাইরের দিকে অস্ত্রাগারের নিজস্ব পরিচিতি নাম্বার থাকলেও কোন সিরিয়াল নাম্বার নেই[৭]। এই রিভলবার গুলোতে অস্ত্রাগারের পরিচিতি নাম্বার থাকলেও সিরিয়াল নাম্বার কেন দেয়া হয়নি তার কারণ কেউ সঠিক ভাবে বলতে পারে না[৭]। তবে এগুলোর কোন কোনটিতে ৯মি.মি. বুলেটের পরিবর্তে .৩৮ স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন বুলেট ব্যবহারের জন্য নকশায় কিছু পরিবর্তন করা হয়েছিল[১০]। তবে ধারণা করা হয় এই পরিবর্তনগুলো এদের যখন পুনঃরায় ব্যবহার শুরু করা হয় তখন করা হয়েছিল।

সাধারণ উৎপাদন[সম্পাদনা]

সেনাবাহিনীর জন্য উৎপাদিত প্রায় সকল টাইপ ২৬ রিভলবারগুলোর সিরিয়াল নাম্বার ১,০০০ থেকে ৫৮,৯০০ এর মধ্যে[১০]। অনেক দিন ব্যবহারের ফলে এই রিভলারগুলোর বেশির ভাগই প্রায় নষ্ট হয়ে গিয়েছে ফলে এদের সহজেই চেনা যায়।

সীমিত চূড়ান্ত উৎপাদন[সম্পাদনা]

এগুলো ১৯২৩ সালের ভূমিকম্পের আগে তৈরী পার্টস দ্বারা ভূমিকম্পের পরে তৈরী করা হয়েছিল এবং ধারণা করা হয় এধরণের মাত্র ৩২৫টি রিভলবার তৈরী করা হয়েছিল[১০] যদিও এদের সঠিক নাম্বার কখনই জানা যায়নি। এদের সিরিয়াল নাম্বার ৫৮,৯০০ এর পর থেকে শুরু হয়েছিল[১০]

অস্ত্রাগারের পরিবর্তিত ভার্সন[সম্পাদনা]

প্রথমদিকের টাইপ ২৬ রিভলবারগুলোতে ব্লু চার্কোল ফিনিশ ছিল না ফলে পরবর্তীতে সেগুলোকে পরিবর্তন করে ব্লু চার্কোল ফিনিশ দেয়া হয় এবং নতুন গ্রিপ প্যানেল লাগানো হয়[১০]। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ত্রের চাহিদা দেখা দিলে অনেক পুরাতন রিভলবারের বিভিন্ন পার্টস পরিবর্তন করে আবার যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়[১০]। এগুলো অন্যান্য রিভলবার থেকে কিছুটা আলাদা কারণ সেসময় এদের আসল নির্মাতারা বা আসল পার্টস দ্বারা এই কাজগুলো করা হয়নি। তবুও সাধারণভাবে এদের চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব।

আনুষঙ্গিক উপকরণ[সম্পাদনা]

হোলস্টার[সম্পাদনা]

টাইপ ২৬ রিভলবারগুলোকে ক্ল্যামশেল হোলস্টার সহ ইস্যু করা হতো[১১]। এই হোলস্টারগুলো সাধারণত কালো রঙের হতো এবং এদের বেল্টগুলো হতো গাঢ় নীল রঙের[১২]। এই হোলস্টারগুলোতে ছোট একটি পকেট থাকতো যাতে রিভলবার পরিষ্কার করার উপকরণ রাখা হতো[১২]। কিন্তু একদম প্রথমদিকের কিছু হোলস্টারে এই পকেটগুলো ছিল না[১৩]। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে এদের জন্য কিছু সম্পূর্ণ কালো রঙের হোলস্টার তৈরী করা হয়েছিল এবং এগুলোতে কোন পকেট কিংবা বেল্টও ছিল না[১৩]

গ্রেনেড লঞ্চার[সম্পাদনা]

টাইপ ২৬ রিভলবারগুলোর জন্য টাইপ ৯০ কাঁদানেগ্যাসের গ্রেনেড লঞ্চার তৈরী করা হয়েছিল[১৪]। এই গ্রেনেডগুলো সাধারণ বুলেটের বদলে বিশেষ ভাবে তৈরী ৯×২২ মি.মি. বুলেটের মাধ্যমে ছোঁড়া হতো।

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Hogg, Ian, Military Small Arms of the 20th Century, 7th Edition, (2000) p. 66
  2. Kinard, Jeff. Pistols: An Illustrated History of Their Impact (2003), p. 161
  3. Derby, Harry L. Japanese Military Cartridge Handguns 1893–1945 (2003), p. 15
  4. Hogg, Ian, Pistols of the World, 4th Edition, (2004) p. 190
  5. Hogg, Ian, Pistols of the World, 4th Edition, (2004) p. 191
  6. Skennerton, Ian, Japanese Service Pistols Handbook (2008) p. 7
  7. Derby, Harry L. Japanese Military Cartridge Handguns 1893–1945 (2003), p. 20
  8. Derby, Harry L. Japanese Military Cartridge Handguns 1893–1945 (2003), p. 16
  9. McNab, Chris, The Great Book of Guns (2004) p. 113
  10. Derby, Harry L. Japanese Military Cartridge Handguns 1893–1945 (2003), p. 21
  11. Skennerton, Ian, Japanese Service Pistols Handbook (2008) p. 30
  12. Derby, Harry L. Japanese Military Cartridge Handguns 1893–1945 (2003), p. 24
  13. Derby, Harry L. Japanese Military Cartridge Handguns 1893–1945 (2003), p. 25
  14. Skennerton, Ian, Japanese Service Pistols Handbook (2008) p. 31

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

অন্যান্য প্রবেশদ্বার[সম্পাদনা]